ঋষি অরবিন্দ ঘোষ

ভারতের শ্রেষ্ঠ যোগী ও রাজনৈতিক নেতা ঋষি অরবিন্দ ঘোষ -এর জন্ম, পিতামাতা, শিক্ষা, কর্মজীবন, বৈপ্লবিক প্রেরণার উৎস, গুপ্ত সমিতিতে যোগদান, কংগ্রেসের সমালোচনা, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগদান, বন্দেমাতরম পত্রিকার সম্পাদনা, স্বদেশী ও স্বরাজের আদর্শ, বিপ্লববাদ প্রচার, জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রকাশ, বিপ্লবী দলের মধ্যে সংযোগ, গ্ৰন্থ রচনা, আলীপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত, কারাবরণের পর রাজনীতি পরিত্যাগ ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ

জন্ম১৫ আগস্ট, ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে
পিতামাতাকৃষ্ণধন ঘোষ, স্বর্ণলতা দেবী
পরিচিতিযোগী, দার্শনিক, বিপ্লববাদী
মৃত্যু৫ ডিসেম্বর, ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ
ঋষি অরবিন্দ ঘোষ

ভূমিকা :- বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোগী, কবি, দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, চরমপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বৈপ্লবিক সংগ্রামের জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের জন্ম

১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের পিতামাতা

তাঁর পিতা ছিলেন ডাঃকৃষ্ণধন ঘোষ, মায়ের নাম স্বর্ণলতা দেবী এবং ‘জাতীয়তার পিতামহ’ রাজনারায়ণ বসু ছিলেন তাঁর মাতামহ।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের শিক্ষা

ইংল্যাণ্ডেই তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবন অতিবাহিত হয়। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপস’ লাভ করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের ধর্ম ও দর্শনে জ্ঞান অর্জন

তিনি বেদ, উপনিষদ, ষড়দর্শন, গীতা, পুরাণ প্রভৃতি হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন করে প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও দর্শনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের অধ্যাপনা

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতে ফিরে এসে পশ্চিম ভারতের বরোদা রাজ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের বৈপ্লবিক প্রেরণার উৎস

তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক প্রেরণার উৎস ছিল আয়ারল্যাণ্ড ও রাশিয়ার চলমান বিপ্লব, বঙ্কিমচন্দ্র -এর ‘আনন্দমঠ‘ উপন্যাস এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের গুপ্ত সমিতিতে যোগদান

বরোদা কলেজে অধ্যাপনা কালে তিনি মহারাষ্ট্রের ঠাকুর সাহেব নামে জনৈক ব্যক্তিপরিচালিত বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বাংলাদেশে গুপ্ত সমিতি গঠনের কাজেমনোনিবেশ করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক কংগ্রেসের সমালোচনা

১৮৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই-এর ‘ইন্দুপ্রকাশ’ পত্রিকায় ‘New Lamps for the Old’ শিরোনামায় প্রকাশিত প্রবন্ধমালায় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের চরমতম দুর্বলতা, অপদার্থতা ও বেইমানির সমালোচনা করে তিনি জাতিকে ‘রক্ত ও অগ্নিস্নানে পবিত্র হয়ে’ (‘purification by blood and fire’) চরম আত্মদানের মাধ্যমে এক বলিষ্ঠ কর্মপন্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের নিজস্ব অভিমত

তিনি স্পষ্টই বলেন যে, কংগ্রেসের লক্ষ্য (কিছু সংস্কার লাভ, সারা ভারতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন, ভারতে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ ও তার বয়স বৃদ্ধি এবং বিচার ও শাসন বিভাগের স্বতন্ত্রীকরণ) ভ্রান্ত, গঠনতন্ত্র (ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী) অবৈধ এবং কর্মপদ্ধতি (আবেদন-নিবেদন) নিন্দনীয়।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগদান

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু হলে তিনি বরোদা কলেজের সাড়ে সাতশ’ টাকা বেতনের উপাধ্যক্ষের চাকরি ত্যাগ করে১৯০৬ সালে বিনা বেতনে কলকাতার ‘জাতীয় কলেজ’-এ অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন।পরে অবশ্য এ জন্য তিনি পঁচাত্তর টাকা বেতন গ্রহণে বাধ্য হন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক বন্দেমাতরম্ পত্রিকা সম্পাদনা

এ সময় তিনি ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বও গ্রহণ করেন এবং সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঝাঁপ দেন। তাঁর পরিচালনায় ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকা প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং জাতীয়তাবাদী দলের মুখপত্রে পরিণত হয়।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক স্বদেশী ও স্বরাজের আদর্শ প্রকাশ

বন্দেমাতরম পত্রিকা মারফৎ তিনি দেশবাসীকে ‘স্বদেশী’ ও ‘স্বরাজ’-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন, নরমপন্থী রাজনীতির দুর্বলতা সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন এবং সরকারি অপশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র কষাঘাত হানেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক বিপ্লববাদ প্রচার

ভারতবর্ষে তিনিই সর্বপ্রথম জাতিকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণমুক্ত পূর্ণ ‘স্বরাজের’ মন্ত্রে দীক্ষিত করেন এবং ‘স্বরাজ’ অর্জনের উপায় হিসেবে ‘নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ’ (স্বদেশী ও ব্য়কট) ও বিপ্লববাদের কথা বলেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন গান্ধীজি ও সুভাষচন্দ্রের অগ্ৰদূত

তিনি ছিলেন অহিংস অসহযোগের প্রবর্তক গান্ধীজি এবং সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিমূর্তি নেতাজি সুভাষচন্দ্র -এর অগ্রদূত।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের দেশ সম্পর্কে ধারণা

দেশ বলতে তিনি পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী প্রভৃতি নিছক কোনও জড় পদার্থকে বোঝেন নি। তাঁর কাছে দেশ ছিল চিন্ময়ী মাতৃস্বরূপা।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের জাতীয়তাবাদের ধারণা

  • (১) জাতীয়তাবাদ বলতে তিনি কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই বোঝেন নি। দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ তাঁর কাছে ছিল ধর্মের সামিল। তাঁর কাছে সনাতন হিন্দুধর্ম ছিল জাতীয়তাবাদের নামান্তর।
  • (২) জাতীয়তাবাদ বলতে তিনি বুঝতেন জাতীয় জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাচীন ভারতীয় সত্যযুগের পুনরুত্থান, দূর অতীতের মতো বিশ্বের দরবারে ভারতের গুরুর আসন লাভ এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈদান্তিক আদর্শের পরিপূর্ণতা লাভের জন্য জনগণের আত্ম-স্বাধীনতা।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রকাশ

‘বন্দেমাতরম্’, ‘কর্মযোগীন’ ও ‘ধর্ম’ পত্রিকায় তাঁর জাতীয়তাবাদের এই সব আদর্শই প্রকাশিত হয়েছে।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ ও বিপ্লববাদ

কেবলমাত্র প্রকাশ্য গণ-আন্দোলন নয় – প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন বঙ্গীয় বিপ্লববাদের প্রাণপুরুষ ও মন্ত্রগুরু। তাঁর প্রত্যক্ষ উৎসাহ, পরামর্শ ও নেতৃত্বে মানিকতলা বাগানবাড়িতে ‘যুগান্তর’ দলের প্রধান কর্মকেন্দ্র স্থাপিত হয় এবং বাংলার বুকে বিপ্লববাদী কার্যকলাপ চলতে থাকে।

বিপ্লবী দলের সাথে ঋষি অরবিন্দ ঘোষের সংযোগ

বাংলা ও মধ্য প্রদেশে ভ্রমণ করে বিপ্লবী দলগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। লোকমান্য তিলক এবং ভগিনী নিবেদিতার সাথেও যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা

বাঘা যতীন হিসেবে পরিচিত যতীনাথ ব্যানার্জীর জন্য তিনি বারোদার সেনাবিভাগে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন

আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত ঋষি অরবিন্দ ঘোষ

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আলিপুর বোমার মামলায় তিনি ধৃত হন। এই সময় তাঁর আইনজীবী চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁকে ‘স্বদেশপ্রেমের কবি, জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ও মানবতার প্রেমিক’ (‘Poet of patriotism, prophet of nationalism and the lover of human ity’) বলে অভিহিত করেন।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক গ্ৰন্থ রচনা

অরবিন্দ ঘোষের বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় গ্ৰন্থ রচনা করেছেন।

(১) বাংলা গ্ৰন্থ

কারাকাহিনী, ধর্ম ও জাতীয়তা, অরবিন্দের পত্র।

(২) ইংরেজি গ্ৰন্থ

The Life Divine, Essays on Gita, Savitri, Mother India, The Hero and the Nymph Urvasie, Song of Myrtilla and other Poems, The age of Kalidasa, A System of National Education, The Renaissance in India, Speeches of Aurobinda.

ঋষি অরবিন্দ ঘোষের মৃত্যু

১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য

ঋষি অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছেন-

“দেবতার দীপ হস্তে যে আসিল ভবে সেই রুদ্র

দূতে, বলো, কোন রাজা কবে পারে শাস্তি দিতে,

বন্ধন শৃঙ্খল তার চরণ বন্দনা করি করে অভ্যর্থনা।”

উপসংহার :- আলিপুর বোমা মামলায় কারাবরণ করে মুক্তিলাভের পর রাজনীতির সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে পণ্ডিচেরীতে অতিমানবের সন্ধান ও দিব্য জীবনের সাধনায় রত হন অরবিন্দ ঘোষ।

(FAQ) ঋষি অরবিন্দ ঘোষ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. The Life Divine বা দিব্য জীবন গ্ৰন্থটি কে রচনা করেন?

অরবিন্দ ঘোষ।

২. কোন ঘটনার পর অরবিন্দ ঘোষ রাজনীতি পরিত্যাগ করেন?

আলিপুর বোমা মামলা।

৩. অরবিন্দ ঘোষ কোন পত্রিকা সম্পাদনা করেন?

বন্দেমাতরম্।

Leave a Reply

Translate »