জ্যোতিবা ফুলে

জ্যোতিবা ফুলে -র জন্ম, শিক্ষা, ঘর থেকে বিতাড়ন, জেহাদ ঘোষণা, সংস্কার কর্মসূচি, ব্রাহ্মণদের প্রাধান্যের বিরোধিতা, ব্রিটিশ রাজ সমর্থন, পাশ্চাত্য শিক্ষা সমর্থন, নিম্নবর্ণের উন্নতি, নারীর উন্নতি, জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা, রামায়ণের সমালোচনা, বর্ণপ্রথার সমালোচনা, দলিত কথার ব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও তাঁর মূল্যায়ন সম্পর্কে জানবো।

জ্যোতিবা ফুলে

জন্ম১১ এপ্রিল, ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দ
অন্য নামমহাত্মা ফুলে
পরিচিতিসমাজ সংস্কারক
মৃত্যু২৮ নভেম্বর, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ
জ্যোতিবা ফুলে

ভূমিকা :- ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলার বাইরে যেসকল সমাজসংস্কারক গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মহারাষ্ট্রের সমাজসংস্কারক জ্যোতিবা গোবিন্দরাও ফুলে।

জ্যোতিবা ফুলের জন্ম

সমাজ সংস্কারক জ্যোতিবা ফুলে ১১ এপ্রিল, ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের এক সম্পন্ন কুনবি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

জ্যোতিবা ফুলের শিক্ষা

স্কটিশ মিশনারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার ফলে সেখানকার প্রভাব তাঁর মনে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

ঘর থেকে বিতাড়ন

১৮৩৯ সালে জ্যোতিবা ফুলের বাবা তাদের স্বামী-স্ত্রীকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন।কারণ, মনুস্মৃতি অনুসারে তাদের কাজকে পাপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

পেশোয়ার থেকে জমি উপহার

রাজদরবারের আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ফুলের গদি এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য এতটাই প্রভাবিতহয়েছিলেন যে পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওজ্যোতিবা ফুলের পরিবারকে ৩৫ একর (14 হেক্টর) জমি প্রদান করেছিলেন, যার কোনো কর দিতে হত না।

জেহাদ ঘোষণা

মহারাষ্ট্রের জনজীবন ও শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রাহ্মণদের একাধিপত্য, জাতিভেদপ্রথা, শূদ্র ও নারীদের সীমাহীন দুর্দশা প্রভৃতি জ্যোতিবা ফুলেকে খুবই ব্যথিত করে। এসব অনাচারের বিরুদ্ধে জ্যোতিবা ফুলে ও তাঁর পত্নী সাবিত্রীবাঈ জেহাদ ঘোষণা করেন।

সংস্কার কর্ম

জ্যোতিবা ফুলে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপদ সম্পর্কে নিম্নবর্ণের মানুষদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে ব্যাপক প্রচার চালান এবং বিভিন্ন সমাজসংস্কারমূলক কাজে অংশ নেন। যেমন –

(১) ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরোধিতা

জ্যোতিবা ফুলে মনে করতেন যে, শূদ্রদের সামাজিক দাসত্ব বজায় রাখার জন্য ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রগ্রন্থগুলি রচিত এবং হিন্দুধর্মের ইতিহাস হল শুদ্রদের ওপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের কাহিনি।

(২) ব্রাহ্মণ বিরোধী প্রচার

তিনি কুনবি, মালি, মাঙ, মাহার প্রভৃতি তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ-বিরোধী প্রচার শুরু করেন।

(৩) ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে আক্রমণ

তাঁর রচিত ‘ব্রাক্ষ্মণাচে কসাব’ (‘পুরোহিততন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন’) ‘শ্বেতকার্যচ অসুদ (‘কৃষকদের চাবুক’) এবং ‘গুলামগিরি’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালানো হয়।

(৪) ব্রিটিশরাজকে সমর্থন

জ্যোতিবা ফুলে ছিলেন ব্রিটিশরাজের একনিষ্ঠ সমর্থক। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সময় তিনি ইংরেজদের সমর্থন করেন, কারণ তাঁর মতে, বিদ্রোহীরা সফল হলে ভারতে আবার ব্রাহ্মণ-রাজ প্রতিষ্ঠিত হত।

(৫) ইংরেজি শিক্ষাকে সমর্থন

তিনি মনে করতেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই শূদ্ররা নিজেদের অধিকার এবং তা রক্ষার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে।

(৬) নিম্নবর্ণের উন্নতি

জাতিভেদ প্রথার অবসান এবং নিম্নবর্ণের মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সত্যশোধক সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমাজের মুখপত্র ছিল ‘দীনমিত্র’। এ ছাড়া তিনি ‘দীনবন্ধু’ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। দক্ষিণ ভারতে তিনি অব্রাহ্মণ নিম্নবর্ণের আন্দোলন ছড়িয়ে দেন।

(৭) নারীর উন্নতি

জ্যোতিবা নারীকল্যাণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। নিম্নবর্ণের নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য তিনি মহারাষ্ট্রে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন।

(৮) জাতিভেদের বিরোধিতা

তিনি জাতিভেদপ্রথা ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের জন্যও যথেষ্ট প্রচার চালিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

দয়ানন্দকে দেওয়া সাক্ষাৎকার

১৮৫৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর খ্রিস্টান মিশনারী সাময়িকী দয়ানন্দ সরস্বতীকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎ কারে জ্যোতিবা ও সাবিত্রীবাই এবং তাঁর কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন।

ফুলের স্কুল বন্ধ

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, সরকারী সমর্থন প্রত্যাহার, এবং পাঠ্যক্রমের বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে জ্যোতিবা ফুলের স্কুল পরিচালনা কমিটি থেকে পদত্যাগের ফলে১৮৫৮ সালের মধ্যে তিনটি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়।

রামায়ণের সমালোচনা

ফুলে ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের নায়ক রামকে আর্য বিজয় থেকে উদ্ভূত নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।

বর্ণপ্রথা নিয়ে সমালোচনা

হিন্দুদের সবচেয়ে মৌলিক গ্রন্থ বেদ -এর উপর আক্রমণের মাধ্যমে বর্ণপ্রথা নিয়ে তার সমালোচনা শুরু হয়। তিনি এগুলোকে মিথ্যা চেতনার একটি রূপ বলে মনে করেন।

দলিত কথার ব্যবহার

প্রথাগত বর্ণ ব্যবস্থার বাইরের লোকদের জন্য বর্ণনাকারী হিসাবে মারাঠি শব্দ ‘দলিত’ পরিভাষাটি প্রবর্তনের জন্য তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। পরিভাষাটি পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে জনপ্রিয় হয়।

প্রভাব বিস্তার

জ্যোতিবা ফুলে ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী এবং ভারতীয় সংবিধান -এর প্রধান স্থপতি বি.আর. আম্বেদকরকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আম্বেদকর তাকেএকজন গুরু হিসেবে স্বীকার করেছিলেন।

মূল্যায়ন

জ্যোতিবা ফুলে দক্ষিণ ভারতে তাঁর সামাজিক আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সত্যশোধক সমাজ একাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। গেইল ওমডেট মনে করেন, সত্যশোধক আন্দোলনে এলিটিস্ট রক্ষণশীল ধারার সঙ্গে গণভিত্তিক রাডিক্যাল ধারার সমন্বয় লক্ষ করা গিয়েছিল। সত্যশোধক সমাজের উদ্যোগের ফলে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনা হ্রাস পায়।

উপসংহার :- বীঠলরাও কৃষ্ণজি ভান্ডারকর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতিবা ফুলেকে ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর অনুগামী সত্যশোধক নেতা নারায়ণ মেধাজি লোখান্ডে পরবর্তীকালে মহারাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

(FAQ) জ্যোতিবা ফুলে সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সত্যশোধক সমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?

জ্যোতিবা ফুলে।

২. সত্যশোধক সমাজের মুখপত্র কি ছিল?

দীনমিত্র।

৩. জ্যোতিবা ফুলে কোন উপাধিতে ভূষিত হন?

মহাত্মা।

Leave a Reply

Translate »