প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ

প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ -এর সময়কাল, বিবাদমান পক্ষ, পেশোয়া নারায়ণ রাওকে হত্যা, রঘুনাথ রাওয়ের বিরোধিতা, রঘুনাথ রাওকে ক্ষমতাচ্যুত করা, সুরাটের সন্ধি, সন্ধির শর্ত, মারাঠা জাতির ঘৃণার পাত্র, প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত, রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ, পুরন্দরের সন্ধি, তেলেগাঁওয়ের যুদ্ধ, ওয়াড়গাঁও-এর সন্ধি, পুনরায় যুদ্ধ, সলবাই-এর সন্ধি, সলবাই-এর সন্ধির শর্ত ও সলবাই-এর সন্ধির গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৭৭৫-১৭৮২ খ্রি.)

সময়কাল১৭৭৫-৮২ খ্রিস্টাব্দ
বিবাদমান পক্ষইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মারাঠা জাতি
অবসান১৭৮২ খ্রিস্টাব্দ
সুরাটের সন্ধি১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ
পুরন্দরের সন্ধি১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দ
সলবাইয়ের সন্ধি১৭৮২ খ্রিস্টাব্দ
প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ

ভূমিকা :- পেশোয়া বালাজি বাজিরাও-এর মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম মাধব রাও পেশোয়া পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে মারাঠা সাম্রাজ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

গ্রান্ট ডাফের অভিমত

ঐতিহাসিক গ্রান্ট ডাফ যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, “পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ -এ পরাজয় অপেক্ষা পেশোয়া মাধব রাওয়ের অকাল মৃত্যু মারাঠা জাতির পক্ষে অধিকতর ক্ষতি হয়।”

পরবর্তী পেশোয়া

প্রথম মাধব রাওয়ের কোনও পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা নারায়ণ রাও-কে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান।

নারায়ণ রাওকে হত্যা

সিংহাসনে বসার ন’মাসের মধ্যে তাঁর পিতৃব্য রঘুনাথ রাও এই সপ্তদশ বর্ষীয় অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরিণত বালক নারায়ণ রাও কে হত্যা করে নিজে পেশোয়া পদ দখল করেন (১৭৭৩ খ্রিঃ)।

রঘুনাথ রাওয়ের বিরোধিতা

সখারাম বাপু, নানা ফড়নবীশ, মাহাদজি সিন্ধিয়া ও অন্যান্য মারাঠা নেতৃবৃন্দ পেশোয়া হিসেবে রঘুনাথ রাও কে মানতে রাজি ছিলেন না। তারা ১২ জন মারাঠা সর্দার ‘বারো ভাই-এর সমিতি’ নামে একটি রাজ-পরিষদ গঠন করে রঘুনাথ রাও-এর বিরোধিতা করতে থাকেন।

রঘুনাথ রাওকে ক্ষমতাচ্যুত করা

  • (১) ইতিমধ্যে মৃত নারায়ণ রাও-এর সন্তান-সম্ভবা বিধবা পত্নী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলে (১৭৭৪ খ্রিঃ) অবস্থা জটিলতর হয়ে ওঠে।
  • (২) মারাঠা নেতৃমণ্ডলী রঘুনাথ রাও-কে ক্ষমতাচ্যুত করে এই শিশু সন্তানটিকে দ্বিতীয় মাধব রাও বা মাধব রাও নারায়ণ (১৭৭৪ ৯৬ খ্রিঃ) নামে পেশোয়া পদে অধিষ্ঠিত করেন।
  • (৩) নারায়ণ রাওয়ের বিধবা পত্নী গঙ্গাবাঈ এই শিশুপুত্রের অভিভাবিকা নিযুক্ত হন।

সুরাটের সন্ধি

রাজ্যচ্যুত রঘুনাথ রাও বোম্বাই-এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হন। ইংরেজরা তাঁকে পেশোয়া পদ পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে সম্মত হয় এবং এই মর্মে১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ মার্চ  দু’পক্ষের মধ্যে সুরাটের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

সুরাটের সন্ধির শর্ত

সুরাটের সন্ধি অনুসারে স্থির হয় যে,

  • (১) ইংরেজ সাহায্য নিয়ে রঘুনাথ রাও ‘পেশোয়া’-র গদিতে বসবেন।
  • (২) ইংরেজরা রঘুনাথ রাও-কে আড়াই হাজার সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবে এবং তার যাবতীয় ব্যয় রঘুনাথ রাও-ই বহন করবেন।
  • (৩) ইংরেজদের সাহায্যের বিনিময়ে রঘুনাথ রাও তাদের সুরাট ও ব্রোচ জেলাদ্বয়ের রাজস্বের একাংশ এবং সলসেট ও বেসিন ছেড়ে দেবেন।
  • (৪) ইংরেজদের বিনা অনুমতিতে তিনি কোনও ইংরেজ-বিরোধী শক্তির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবেন না।

মারাঠা জাতির ঘৃণার পাত্র

সুরাটের সন্ধি ছিল এক ধরনের বশ্যতামূলক মিত্রতা চুক্তি। এই চুক্তি স্বাক্ষর করে রঘুনাথ রাও মারাঠা জাতির স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে উদ্যোগী হন এবং মারাঠা জাতির ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন।

গ্রান্ট ডাফের অভিমত

ঐতিহাসিক গ্রান্ট ডাফ-এর মতে সুরাটের চুক্তির অনিবার্য ফলশ্রুতি হল প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ।

প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত

রঘুনাথ রাও ও ইংরেজদের যুগ্মবাহিনী আরাসের যুদ্ধে পেশোয়ার সেনাদলকে পরাজিত করে (মে, ১৭৭৫ খ্রিঃ) এবং রঘুনাথ রাও পেশোয়ার গদিতে বসেন। এইভাবে প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ

ইতিমধ্যে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ করে বলে যে, যুদ্ধ ঘোষণা, শাস্তি স্থাপন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বোম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ‘কলকাতা কাউন্সিলের’ অনুমোদন সাপেক্ষ।

অনুমোদনহীন সুরাটের চুক্তি

কলকাতা কাউন্সিল সুরাটের চুক্তিকে ‘রাজনীতি জ্ঞানহীন, বিপজ্জনক, অনুমোদনহীন ও অন্যায়’ (‘unpolitic, dangerous, unauthorised and unjust’) বলে অভিহিত করে।

পুরন্দরের সন্ধি

গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সুরাটের চুক্তি বাতিল করে দিয়ে পেশোয়ার সঙ্গে পুরন্দরের সন্ধি (১৭৭৬ খ্রিঃ) স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধির শর্তানুসারে,

  • (১) সুরাটের সন্ধি বাতিল বলে গণ্য হয়।
  • (২) ইংরেজরা রঘুনাথ রাওয়ের পক্ষ ত্যাগ করে এবং দ্বিতীয় মাধব রাও-কে ‘পেশোয়া’ বলে মেনে নেয়।
  • (৩) স্থির হয় যে, রঘুনাথ রাও গুজরাটের কোপার গাঁও-এ বাস করবেন এবং তিনি বছরে তিন লক্ষ টাকা বৃত্তি পাবেন।
  • (৪) সলসেট ও থানা ইংরেজরা পাবে এবং
  • (৫) যুদ্ধের ব্যয় হিসেবে ইংরেজ কোম্পানিকে ১২ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে।

সুরাটের সন্ধির অনুমোদন

বোম্বাই কর্তৃপক্ষ পুরন্দরের সন্ধি মানতে রাজি ছিল না। এই ব্যাপারে তারা ইংল্যাণ্ডে কোম্পানির পরিচালক সভার কাছে আবেদন জানালে ইংল্যাণ্ডে কোম্পানির পরিচালক সভা সুরাটের সন্ধি অনুমোদন করে।

তেলেগাঁওয়ের যুদ্ধ

সুরাটের সন্ধি অনুমোদিত হলে বোম্বাই সরকার আবার রঘুনাথ রাওয়ের পক্ষ নিয়ে পেশোয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তেলেগাঁওয়ের যুদ্ধে ভারতের ‘ম্যাকিয়াভেলি’ নানা ফড়নবীশের কূটনীতির কাছে রঘুনাথ রাও ও ইংরেজদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

ওয়াড়গাঁও -এর সন্ধি

তেলেগাঁও -এর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বোম্বাই -এর ইংরেজ কর্তৃপক্ষ অপমান জনক ওয়াড় গাঁও-এর সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন (১৭৭৯খ্রিঃ)।

ওয়াড়গাঁও -এর সন্ধির শর্ত

এই সন্ধি অনুসারে ইংরেজরা ১৭৭৩ সাল থেকে বিজিত সকল স্থান প্রত্যর্পণে সম্মত হয়। স্থির হয় যে, বাংলাদেশ থেকে আগত সকল সৈন্য ফিরে যাবে এবং সিন্ধিয়া ব্রোচের রাজস্বের কিছু অংশ পাবেন।

পুনরায় যুদ্ধ

  • (১) হেস্টিংস এই অপমানজনক সন্ধি মানতে রাজি ছিলেন না। এই সন্ধি অস্বীকার করে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন।কিন্তু মারাঠাদের বিরুদ্ধে এই সময় জয়লাভ করা সহজসাধ্য ছিল না।
  • (২) দীর্ঘদিন যুদ্ধে ইংরেজরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তছাড়াতাদের নিরাপত্তার জন্য মহীশুরের হায়দার আলি-র ক্ষমতা খর্ব করা তখন অতি প্রয়োজনীয় ছিল।

সলবাইয়ের সন্ধি

শেষ পর্যন্ত মারাঠা নায়ক মাহাদজি সিন্ধিয়ার মধ্যস্থতায় ১৭৮২খ্রিস্টাব্দে সলবাই-এর সন্ধি দ্বারা দু’পক্ষে শান্তি স্থাপিত হয় এবং প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের অবসান ঘটে।

সলবাইয়ের সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির শর্তানুসারে,

  • (১) ইংরেজরা মাধব রাও নারায়ণকে পেশোয়া বলে স্বীকার করে এবং রঘুনাথ রাওয়ের পক্ষ ত্যাগ করে।
  • (২) রঘুনাথকে বার্ষিক তিন লক্ষ টাকা বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়।
  • (৩) ইংরেজরা সলসেট থানা ও বোম্বাই-সংলগ্ন কিছু অঞ্চল লাভ করে এবং
  • (৪) মারাঠা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অধিকৃত অঞ্চলগুলি তারা ফিরিয়ে দেয়।

সলবাইয়ের সন্ধির গুরুত্ব

সমকালীন ভারত ইতিহাসে নানা কারণে এই সন্ধি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,

  • (১) প্রত্যক্ষ ফলের দিক থেকে এই সন্ধি দ্বারা ইংরেজদের বিশেষ কোনও লাভ হয় নি—বরং এই যুদ্ধে তাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় এবং অর্থ-সংকট মোচনের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংস-কে বৈধ-অবৈধ নানা আপত্তিকর পথ অবলম্বন করতে হয়।
  • (২) পরোক্ষভাবে অবশ্য এই সন্ধি ইংরেজদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে নানাভাবে সাহায্য করে। মারাঠারাই তখন ছিল ভারতীয়দের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পরাক্রান্ত শক্তি। এই সন্ধি দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে মারাঠাও ইংরেজদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখে।
  • (৩) এই অবকাশে ইংরেজরা শক্তি সংগ্রহ করে মহীশূর, নিজাম, অযোধ্যার নবাব ও ফরাসিদের সঙ্গে চরম বোঝাপড়া করে নেয়। এই সব শক্তিগুলিকে ধ্বংস করার পর ইংরেজরা সর্বশক্তি নিয়ে মারাঠাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ ও তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
  • (৪) ঐতিহাসিক স্মিথ (Smith) বলেন এই সন্ধি শক্তিশালী মারাঠাদের সঙ্গে ইংরেজদের কুড়ি বছরের শান্তি স্থাপন করে আগামী দিনে ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসেবে তাদের আধিপত্য স্থাপনের সুযোগ করে দেয়।”
  • (৫) কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিক লুয়ার্ড (C. F. Luard) বলেন যে, সলবাইয়ের সন্ধি তর্কাতীতভাবে ভারতীয় রাজনীতিতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি বলেন যে, এই সন্ধি দ্বারা কোম্পানি মারাঠা শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলে।
  • (৬) পরবর্তীকালে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সার্বভৌম শক্তিরূপে কোম্পানির প্রতিষ্ঠা ছিল ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে সলবাইয়ের সন্ধির অনিবার্য ফল।
  • (৭) ঐতিহাসিক সরদেশাই (G.S. Sardesai) এই মতের বিরোধিতা করে বলেন যে, এই সন্ধির দ্বারা মারাঠা শক্তি ধ্বংস হলে মারাঠাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই ইংরেজদের আরও দু’টি যুদ্ধ করার কোনও প্রয়োজন হত না।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক সরদেশাই-এর মতে, সলবাইয়ের সন্ধি ইংরেজদের কূটনৈতিক ব্যর্থতার চরম নিদর্শন। ইংরেজ ঐতিহাসিক স্পিয়ার-এর মতে “প্রথম মারাঠা যুদ্ধের সূচনা ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং এর পরিচালনা ছিল দুর্ভাগ্যজনক।”

(FAQ) প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের সময়কাল কত?

১৭৭৫-৮২ খ্রিস্টাব্দ।

২. কোন সন্ধির দ্বারা প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের অবসান ঘটে?

সলবাইয়ের সন্ধি (১৭৮২ খ্রিস্টাব্দ)।

৩. প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধের  সময় গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন?

ওয়ারেন হেস্টিংস।

৪. সুরাটের চুক্তি কখন হয়?

১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ।

৫. পুরন্দরের সন্ধি কখন হয়?

১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »