রেগুলেটিং অ্যাক্ট, ১৭৭৩ খ্রিঃ

রেগুলেটিং অ্যাক্ট প্রসঙ্গে প্রধান তিনটি প্রেসিডেন্সি, পরামর্শদাতা সভা, পরিচালক সভা, কোম্পানির মালিক সভা, সনদ গ্ৰহণ রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশের পটভূমি, বিতর্ক, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ, আইনের স্বরূপ, কোম্পানির গঠনতন্ত্র, ভারতীয় প্রশাসন, সুপ্রিম কোর্ট গঠন, রেগুলেটিং অ্যাক্টের ত্রুটি ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট, ১৭৭৩ খ্রিঃ (Regulating Act, 1773 A.D.)

সময়কাল১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীলর্ড নর্থ
সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ
রেগুলেটিং অ্যাক্ট

ভূমিকা :-  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এসেছিল বাণিজ্য করতে এবং এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ভারতে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ এই তিনটি কেন্দ্র থেকে কোম্পানির সকল কার্য পরিচালিত হত। এগুলিকে বলা হত প্রেসিডেন্সি।

তিনটি প্রেসিডেন্সি

কোম্পানির শাসনের প্রথম দিকে প্রধান তিনটি প্রেসিডেন্সি হল কলকাতা প্রেসিডেন্সি, বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি।

পরামর্শদাতা সভা

প্রত্যেক প্রেসিডেন্সিতে একজন করে গভর্নর ও তাঁর ‘কাউন্সিল’ বা পরামর্শদাতা সভা ছিল। তারাই বিভিন্ন প্রেসিডেন্সিতে কোম্পানির বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য কার্য পরিচালনা করত।

পরিচালক সভা

পরিচালক সভার ওপরেইংল্যাণ্ডেছিলকোর্টঅবডিরেক্টরস্ (Court of Directors) বা পরিচালক সভা। এই সভার নির্দেশেই ভারতে কোম্পানির সকল কার্য পরিচালিত হত।

কোম্পানির মালিক সভা

পরিচালক সভার ওপরে ছিল ‘কোম্পানির মালিক সভা (Court of Proprietors)। কোম্পানির সকল অংশীদার বা ‘শেয়ার হোল্ডার’ এই সভার সদস্য ছিলেন। এই সংস্থাই ছিল কোম্পানির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং এর সদস্যরাই ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস্’-দের নির্বাচিত করতেন।

সনদ গ্ৰহণ

ভারতে কোম্পানির শাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে কোম্পানির ‘পরিচালক সভা’ ও ‘মালিক সভা’-ই ছিল চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। এই বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কোনও হস্তক্ষেপ করতেন না, তবে প্রাচ্যদেশে বাণিজ্যের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিকে সরকারের কাছ থেকে একটি সনদ’ (charter) নিতে হত।

রেগুলেটিং অ্যাক্টের পটভূমি

রাওলাট অ্যাক্ট প্রবর্তনের পিছনে বেশ কিছু কারণ ছিল।যেমন –

  • (১) পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭ খ্রিঃ), বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪ খ্রিঃ) এবং দেওয়ানি লাভের ফলে (১৭৬৫ খ্রিঃ) অবস্থার ঘোরতর পরিবর্তন ঘটে। কোম্পানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
  • (২) দেওয়ানি লাভের পর প্রকৃত শাসনক্ষমতা লাভ করেও কোম্পানি নিজেকে আড়ালকরে বাংলা ও মাদ্রাজে ‘দ্বৈত শাসন’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর ফলে কোম্পানি দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও নবাব ক্ষমতাহীন দায়িত্বের অধিকারী হয়। বাংলার বুকে চরমতম নৈরাজ্যের সূচনা হয়। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলাকে সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌঁছে দেয়।
  • (৩) পলাশি ও বক্সারের যুদ্ধজয় এবং ‘দেওয়ানি’ লাভের ফলে কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা বাংলার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে এবং তারা নানাভাবে বাংলাকে শোষণ করতে থাকে।
  • (৪) বাংলার বুকে শুরু হয় ‘দস্তকের’ ব্যাপক অপব্যবহার, কোম্পানির কর্মচারীদের বিনাশুল্কে অবাধ ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং সর্বাত্মক লুণ্ঠন। তাদের অত্যাচারে বাংলার তাঁতি, ছোট শিল্পোৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের অবস্থা সঙ্গিন হয়ে পড়ে।
  • (৫) বাংলায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির অর্থাগম যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি তার ব্যয়ও যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়।
  • (৬) এতদিন পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানির বাণিজ্যের পুঁজি ইংল্যাণ্ড থেকে আনতে হত, কিন্তু পলাশির যুদ্ধের পরেই তা বন্ধ করে বোম্বাই, মাদ্রাজ ও বাংলার বাণিজ্যের পুঁজি বাংলা থেকে মেটাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
  • (৭) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধখাতে বিভিন্ন ব্যয়ও বাংলাকে মেটাতে হত। ভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির অংশীদাররা লগ্নিকৃত মূলধনের ওপর ১২% লভ্যাংশ আদায় করতে থাকেন।
  • (৮) ব্রিটিশ সরকারও কোম্পানির কাছ থেকে আদায়ীকৃত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে বার্ষিক ৪০ লক্ষ তাদের পাউন্ড করেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুণ্ঠনের ফলে বাংলার অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
  • (৯) কোম্পানির কর্মচারীরা নানা অবৈধ পথে উপার্জন করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ইংল্যাণ্ডে ফিরে মহা-আড়ম্বরের সঙ্গে জীবনযাপন করতেন। মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে ক্লাইভ যখন ভারত থেকে ইংল্যাণ্ডে ফিরে যান তখন তাঁর সম্পত্তির বার্ষিক আয় ছিল ৪০ হাজার পাউন্ড।
  • (১০) ইংল্যাণ্ডের মানুষ ভারত-প্রত্যাগত এই সব কর্মচারীদের ঐশ্বর্য দেখে ঈর্ষান্বিত হত। ইংল্যাণ্ডে তাঁদের বলা হত ‘ভারতীয় নবাব’।
  • (১১) বিপুল পরিমাণ ভারতীয় সম্পদ লুঠ করেও কোম্পানির আর্থিক অবস্থার কিন্তু বিন্দুমাত্র উন্নতি হয় নি, বরং তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়ে। আসলে কোম্পানির ওপরে যে আর্থিক দায় চাপানো হয়েছিল, তা মেটানোও দুরূহ ছিল।
  • (১২) এই অবস্থায় কোম্পানি ‘ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যাণ্ড’-এর কাছে ঋণের জন্য আবেদন জানায়। ব্যাঙ্ক ঋণ দিতে অস্বীকৃত হলে কোম্পানি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ১০ লক্ষ পাউন্ড ঋণের আবেদন জানায়।
  • (১৩) ঋণ দেওয়া যুক্তিসম্মত হবে কিনা তা দেখার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি কমিশন গঠন করলে বাংলায় কোম্পানির শাসনের প্রকৃত চিত্র ইংল্যাণ্ডবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে ইংল্যাণ্ডে ঝড় ওঠে।

বিতর্ক

ভারতে কোম্পানির বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন এবং বাংলার জনগণের ওপর আর্থিক শোষণ ইংল্যাণ্ডবাসী মেনে নিতে পারে নি। এই ব্যাপারে ইংল্যাণ্ডবাসীর প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট। যেমন –

  • (১) কোম্পানিকে যখন ভারতেএকচেটিয়া বাণিজ্যের সনদ দেওয়া হয়, তখন তাতে স্পষ্ট করে বলা ছিল যে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে কোম্পানি কোনও এলাকা বা রাজ্য দখল করলে সেই এলাকার ওপর ইংল্যাণ্ডেশ্বরীর কর্তৃত্ব বলবৎ হবে। এই ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের কোনও উদ্যোগ ছিল না।
  • (২) পার্লামেন্টের সদস্যরা কোম্পানির বাণিজ্যাধিকার সম্পর্কে নানা মতামত প্রকাশ করতে থাকেন। স্যার এডমন্ড বার্ক, অ্যাডাম স্মিথ প্রমুখ সদস্যরা বলেন যে, কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর রাজনৈতিক কর্মে যোগদানের কোনও অধিকারই নেই। তাঁরা এখনই ভারতে কোম্পানির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অবসানের দাবি জানান।
  • (৩) অনেকে আবার ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ভারতের দরজা ইংল্যাণ্ডের সব বণিক-সংস্থার জন্য খুলে দেবার দাবি জানান। অনেকে আবার নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে বলেন যে, কোম্পানির কার্যকলাপ ব্রিটিশ জাতির নামের ওপর কালিমা লেপন করেছে। সুতরাং জাতির স্বার্থে এখনই কিছু করা প্রয়োজন।

সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

  • (১) ব্রিটিশ সরকারের চিন্তা-ভাবনা ছিল অন্য রকম। কোম্পানির একচেটিয়া কর্তৃত্বের অবসানের অর্থ ছিল ভারতে কোম্পানির বিজিত অঞ্চলগুলির ওপর ব্রিটিশ সরকারের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
  • (২) ঠিক সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকার এই দায়িত্বভার গ্রহণে রাজি ছিলেন না। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে কোম্পানির কাজকর্মের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ (Regulate) আরোপ করা।এই উদ্দেশ্যেই রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ করা হয়।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থ-এর আমলে ভারতে কোম্পানির কাজকর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পাশ করা হয় ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ বা ‘নিয়ন্ত্রণ আইন’। এই আইনটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আইন, ১৭৭৩’ (The East India Company Act, 1773) নামেও পরিচিত। আইনটি ছিল ব্রিটিশ সরকার ও কোম্পানির কর্তাদের মধ্যে একটি সমঝোতা-বিশেষ।

আইনের স্বরূপ

এই আইন দ্বারা কোম্পানির অংশীদারদের সম্পত্তির ওপর বা মোগল সম্রাটের কাছ থেকে প্রাপ্ত দেওয়ানির অধিকারের ওপর কোনও হস্তক্ষেপ করা হয় নি। এই আইনের দ্বারা কোম্পানির কার্যকলাপকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল মাত্র। এই আইনের দু’টি দিক ছিল। যথা –

  • (১) ইংল্যান্ডে কোম্পানির পরিচালক সভা সম্পর্কিত,
  • (২) ভারতে কোম্পানির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কিত।

কোম্পানির গঠনতন্ত্র

কোম্পানির ডিরেক্টরস্ সভা’ (Court of Directors) এবং অংশীদারদের সভা’ (Court of Proprietors)-র গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন করা হয়। যেমন –

  • (১) আগে ৫০০ পাউন্ডের শেয়ার থাকলেই ‘অংশীদারদের সভা’-য় ভোট দেওয়া যেত। নতুন আইনে কেবলমাত্র ১০০০ পাউন্ড শেয়ারের মালিকরাই ভোটাধিকারের অধিকারী হন।
  • (২) ‘ডিরেক্টরস্ সভা’-র সদস্য সংখ্যা হবে ২৪ এবং তাঁরা চার বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন।
  • (৩) প্রতি বছর ডিরেক্টরদের এক-চতুর্থাংশ (অর্থাৎ ৬ জন) পদত্যাগ করবেন। এক বছর পর তাঁরা পুনরায় নির্বাচন প্রার্থী হতে পারবেন।
  • (৪) এই সভাই ভারত শাসনের জন্য সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তিদের (গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের সদস্যদের) নিযুক্ত করবেন—তবে এর জন্য সরকারের অনুমোদন অপরিহার্য।
  • (৫) ডিরেক্টরস সভাপ্রতি ছয়মাস অন্তর ভারত সম্পর্কিত সামরিক, বে সামরিক সকল তথ্যাদি এবং ভারতীয় রাজস্ব-সংক্রান্ত সকল হিসেব ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করতে বাধ্য থাকবে।

ভারতীয় প্রশাসন

এই আইন ভারত শাসন ব্যাপারেও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করে। যেমন –

  • (১) এই আইন অনুসারে ভারতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয়।বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি নিয়ে এই কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত।
  • (২) বাংলা প্রেসিডেন্সির গভর্নর-ই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হন এবং তাঁর পদের নাম হয় ‘গভর্নর জেনারেল’। বোম্বাই ও মাদ্রাজের ওপরেও তিনি কর্তৃত্বের অধিকারী হন।
  • (৩) ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার গভর্নর হিসেবে বাংলায় আসেন। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ অনুসারে তিনি বাংলা এবং ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন।
  • (৪) শাসনকার্যে তাঁকে সাহায্য করার জন্য চার সদস্য-বিশিষ্ট একটি ‘কাউন্সিল’ গঠিত হয়। ইংল্যাণ্ডের “ডিরেক্টরস্ সভা’-র পরামর্শক্রমে ইংল্যাণ্ডের রাজা এই সদস্যদের নিযুক্ত করতেন। এঁরা পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত হতেন।
  • (৫) গভর্নর জেনারেল ও তার কাউন্সিলের সদস্যদের একসঙ্গে বলা হত ‘স-পার্ষদ গভর্নর জেনারেল বা ‘Governor General-in-Council। ওয়ারেন হেস্টিংসের কাউন্সিলের প্রথম চারজন সদস্য হলেন ক্লেভারিং, মনসন, বারওয়েল ও ফিলিপ ফ্রান্সিস।
  • (৬) গভর্নর জেনারেল সকল বিষয়ে তাঁর কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করে চলতেন এবং কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গ্রহণ করতেন। কোনও বিষয়ে দুই পক্ষে সমান ভোট পড়লে গভর্নর জেনারেল তাঁর অতিরিক্ত ভোট (casting vote) প্রদান করতেন।
  • (৭) মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিও অনুরূপভাবে এক একজন গভর্নর ও চারজন সদস্য নিয়ে গঠিত ‘কাউন্সিলের মাধ্যমে শাসিত হত। তারাও স্ব স্ব প্রশাসন চালালেও যুদ্ধ ঘোষণা বা শান্তি স্থাপনের ব্যাপারে সর্বতোভাবে কলকাতা কাউন্সিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

সুপ্রিম কোর্ট

  • (১) এই আইন অনুসারে একজন প্রধান বিচারপতি ও তিনজন সাধারণ বিচারপতি নিয়ে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় একটি সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়।
  • (২) সকল ব্রিটিশ ‘প্রজা” অর্থাৎ ইউরোপীয়রা এই কোর্টের আওতাভুক্ত ছিল এবং এর বিচারকার্য পরিচালিত হত ইংল্যাণ্ডের আইন অনুসারে। স্যার এলিজা ইম্পে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি।
  • (৩) সুপ্রিম কোর্টের ওপর গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের কোনও কর্তৃত্ব ছিল না। এই আইন অনুসারে গভর্নর জেনারেল, গভর্নর কাউন্সিলের সদস্যগণ, প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের বেতন ধার্য করা হয়এবং তাঁদের পক্ষে পারিতোষিক গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়।

রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর ত্রুটি

অল্প দিনের মধ্যেই এই আইনের ত্রুটিগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। যেমন –

  • (১) গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের সদস্যদের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় নানা সমস্যা দেখা দেয়। ওয়ারেন হেস্টিংসের কাউন্সিলের তিনজন সদস্য প্রতিনিয়ত তাঁর বিরোধিতা করতেন। এর ফলে প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে।
  • (২) বোম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলের ওপর বাংলার গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় নানা জটিলতা দেখা দেয়। প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা ও দ্বিতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের সময় এই সমস্যা জটিলতর রূপ ধারণ করে।
  • (৩) সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা এবং গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে বর্ণিত না হওয়ায় অচিরেই দু’পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়।
  • (৪) সুপ্রিম কোর্টের এক্তিয়ার সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট দেশীয় বিচারালয়ের ক্ষমতার ওপরেও হস্তক্ষেপ করতে থাকে।
  • (৫) ভারতে অধিকৃত অঞ্চলগুলির ওপর সার্বভৌমত্বের অধিকারী কোম্পানি না ব্রিটিশ সরকার তাও এই আইন দ্বারা নির্ধারিত হয় নি।
  • (৬) বলাবাহুল্য, এই আইন দ্বারা ব্রিটিশ সরকার, কোম্পানির ওপর, কোম্পানির পরিচালক সভা তাঁর কর্মচারীদের ওপর, গভর্নর জেনারেল তাঁর কাউন্সিলের ওপর, কলকাতা প্রেসিডেন্সি বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ওপর কোনও সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব পায় নি।

ইলবার্টের অভিমত

এই সব ত্রুটির জন্য ইলবার্ট বলেন যে, “সুপ্রিম কোর্টের এলাকা, বাংলার সরকারের সঙ্গে কোর্টের সম্পর্ক এবং গভর্নর জেনারেল ও তাঁর কাউন্সিলের প্রকৃত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পর্কে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের আইন ছিল অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য।”

রবার্টসের অভিমত

ঐতিহাসিক পি. ই. রবার্টস (P. E. Roberts) বলেন যে, কোম্পানির ওপর মন্ত্রিসভার নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা, কোম্পানির কর্মচারীদের ওপর ডিরেক্টরস সভার নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা এবং কাউন্সিলের ওপর গভর্নর জেনারেলের নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা এই আইনে সুনির্দিষ্ট ছিল না।

রাউসের অভিমত

বাউটেন রাউস (Bouten Rouse)-এর মতে, “এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কিন্তু এর সৃষ্ট ব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ।

গুরুত্ব

নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই আইনের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। যেমন –

  • (১) এই আইনের মাধ্যমে ভারতে প্রথম একটি নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
  • (২) এই আইন ভারতে অলিখিত ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে উদ্যোগী হয়।
  • (৩) এটিই হল ব্রিটিশ ভারতে প্রথম লিখিত আইন এবং এই আইনই ভারতে প্রথম লিখিত ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনের সূচনা করে।
  • (৪) এই আইনের মাধ্যমেই ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নেয়। মাইকেল এডওয়ার্ডস্ (Michael Edwards) বলেন যে, এই আইন বাণিজ্য-শক্তি হিসেবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতনের সূচনা করে।

উপসংহার :- ভারতে শাসনতান্ত্রিক বিবর্তনের ইতিহাসে এই আইনই হল প্রথম এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই আইনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ইঙ্গ-ভারতীয় প্রশাসন গড়ে ওঠে।

(FAQ) রেগুলেটিং অ্যাক্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. রেগুলেটিং অ্যাক্ট কখন পাশ হয়?

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে।

২. রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাশ হওয়ার সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

লর্ড নর্থ।

৩. কোন আইন অনুসারে কখন কোথায় সুপ্রিম কোর্ট স্থাপিত হয়?

রেগুলেটিং আইন অনুসারে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায়।

Leave a Reply

Translate »