হিন্দু মেলা

হিন্দু মেলা -র প্রতিষ্ঠা, স্থান, সম্পাদক, সহযোগিতা, প্রধান ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি, মেলার উদ্বোধন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, এই মেলার সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

হিন্দু মেলা

সূচনাকাল১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ
প্রধান উদ্যোক্তানবগোপাল মিত্র
অপর নামচৈত্র মেলা, জাতীয় মেলা, স্বদেশী মেলা
হিন্দু মেলা

ভূমিকা :- ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে স্বাদেশিকতার ভাব জাগরণ তথা জাতীয় চেতনার প্রসারের উদ্দেশ্যে আয়োজিত একটি মেলা হল হিন্দু মেলা।

প্রতিষ্ঠা

১৮৬৭ সালের ১২ এপ্রিল নবগোপাল মিত্র চৈত্র মেলা নামে একটি জাতীয় মেলার সূচনা করেন। পরে এই প্রতিষ্ঠানের নাম হয় হিন্দুমেলা।

স্থান

১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার চিৎপুরে নরসিংহ চন্দ্র বাহাদুরের বাগানবাড়িতে চৈত্র মেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সম্পাদক

এই মেলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সহসম্পাদক ছিলেন নবগোপাল মিত্র নিজেই।

অন্য নাম

এই প্রতিঠান জাতীয় মেলা ও স্বদেশী মেলা নামেও পরিচিতি লাভ করে।

সহযোগিতা

১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে ঠাকুর পরিবারের সহযোগিতায় কলকাতায় প্রথম হিন্দু মেলা আয়োজিত হয়েছিল।

প্রধান ব্যক্তিত্ব

রাজনারায়ণ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবগোপাল মিত্রের যৌথ উদ্যোগে প্রথম হিন্দু মেলার আয়োজন করা হয়।

বৈশিষ্ট্য

হিন্দু মেলার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলি হল –

  • (১) এই রাজনৈতিক সংগঠনটির সকলেই ছিল হিন্দু।
  • (২) হিন্দু জাতির আদর্শে দেশবাসীকে দেশপ্রেমে জাগরিত করা হত।
  • (৩) এই মেলায় স্বরচিত কবিতা ও গান পরিবেশিত হত।

উদ্দেশ্য

হিন্দু মেলার প্রধান উদ্দেশ্য হল –

  • (১) ভারতীয় বা দেশীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।
  • (২) মানুষ যাতে দেশীয় ভাষা নিয়ে চর্চা শুরু করতে পারে সেটিও ছিল হিন্দু মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
  • (৩) জনগণের মধ্যে দেশাত্মবোধ দেশমাতৃকা বোধের জাগরণ ঘটানো ছিল হিন্দু মেলার উদ্দেশ্য।
  • (৪) এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন দেশীয় সাহিত্য রচনা বা দেশীয় প্রতীক গুলির মর্যাদা দান করা।
  • (৫) ভারতের বা দেশীয় বিভিন্ন গৌরব বা ঐতিহ্যকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল হিন্দু মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
  • (৬) বিভিন্ন শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করে তোলার চেষ্টা করা হয়।

কর্মসূচি

এই মেলার কর্মসূচির মধ্যে ছিল লাঠি খেলা, তলোয়ার খেলা প্রদর্শনী, দেশাত্মমূলক সংগীত পরিবেশন, বক্তব্য দান ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন উপায়ে জনগণকে দেশ আনুরাগে উদ্দীপিত করা হত।

স্বদেশী আন্দোলনের পূর্বসূরি

দেশীয় শিল্পোৎপাদনে উৎসাহ দান, দেশীয় প্রতীক সমূহের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের জন্য এই মেলাকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের স্বদেশী আন্দোলনের পূর্বসূরি বলে মনে করা হয়।

কলকাতার সামাজিক ও সংস্কৃতির পরিবর্তন নির্দেশ

হিন্দু মেলা কলকাতার বাঙালি সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটি নির্দেশ করে।

উদ্বোধন

প্রথম দিকের হিন্দু মেলার উদ্বোধন হত চৈত্র সংক্রান্তির দিন। তাই এই প্রতিষ্ঠানটি চৈত্র মেলা নামেও পরিচিত।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

উদ্বোধন উপলক্ষে দেশাত্মবোধক কবিতা ও গান লেখা হত। বাঙালি ও পাঞ্জাবি ছাত্রদের মধ্যে কুস্তি প্রতিযোগিতাও আয়োজিত হত। হিন্দুদের কর্মদক্ষতা সংক্রান্ত নানা প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও থাকত।  

নবগোপাল মিত্রের উদ্দেশ্য

মেলার প্রধান উদ্যোক্তা নবগোপাল মিত্রের লক্ষ্য ছিল সরকারের উপর দেশের জনসাধারণের নির্ভরতা কমিয়ে তাদের স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করে তোলা।

মেলার পৃষ্ঠপোষক

হিন্দু মেলার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজা কমলকৃষ্ণ রমানাথ ঠাকুর, কাশীশ্বর মিত্র, দুর্গাচরণ লাহা, প্যারীচরণ সরকার, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণদাস পাল, রাজনারায়ণ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন, পণ্ডিত ভারতচন্দ্র শিরোমণি, পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

প্রথম সচিব

হিন্দু মেলার প্রথম সচিব ছিলেন গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ভারতবাসীর পরনির্ভরতা মনুষ্যত্বের পক্ষে লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করে আত্মনির্ভরতার চেতনাকে মেলার আদর্শের অঙ্গীভূত করার কথা বলেন।

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ইংরেজি আচার-আচরণের অনুকরণ কেবল ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যোগসূত্রটিকে দৃঢ়তা দান করবে, যা ভারতের সাংস্কৃতিক সংহতির পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তিনি আধুনিকতাবাদীদের পাশ্চাত্য অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে যথাযথ ভাবে অবহিত হতে এবং সমাজের ভিতর থেকে তার পরিবর্তন সাধনের শিক্ষা লাভের আহ্বান জানান।

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান

হিন্দু মেলা উপলক্ষে “লজ্জায় ভারত-যশ গাইব কী করে” গানটি লিখে গণেন্দ্রনাথ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এই গানটি হিন্দু মেলায় প্রায়শই গাওয়া হত।

হিন্দু মেলার দ্বিতীয় বছর

১৮৬৮ সালের দ্বিতীয় হিন্দু মেলায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন। এই উপলক্ষে তিনি মিলে সবে ভারতসন্তান গানটি রচনা করেন। এই গানটি ভারতের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা অর্জন করে।

জাতীয় মেলা

১৮৭০ সাল থেকে এপ্রিল মাসের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারি মাসে মেলার আয়োজন করা হতে থাকে। এই সময় মেলার নামকরণ হয় জাতীয় মেলা।

মেলার গৌরব দূরীভূত

মেলায় নবকুমার মিত্রের প্রভাব ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। তারপর তিনি মেলার আয়োজন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ১৯৮০-এর দশক থেকে হিন্দু মেলা ম্লান হয়ে যায়।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যোগদান

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অল্পবয়সেই হিন্দু মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। নবগোপাল মিত্রের অনুরোধে তিনি এই মেলায় একটি কবিতা পাঠ করেছিলেন। মেলার নবম বছরে তিনি মেলার সচিব নির্বাচিত হন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগদান

হিন্দু মেলার সূচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর বয়স ছিল ছয় বছর।

  • (১) কয়েক বছর পরেই তিনি এই মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছাপার অক্ষরে রবীন্দ্রনাথের নামযুক্ত প্রথম কবিতা ‘হিন্দু মেলায় উপহার’ এই মেলায় পঠিত হয়।
  • (২) ১৮৭৫ সালে রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে আয়োজিত হিন্দু মেলায় তিনি একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন।
  • (৩) ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ পত্রিকায় ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৫ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়েছিল, “Baboo Rabindranath Tagore, the youngest son of Baboo Debendranath Tagore, a handsome lad of some 15 had composed a Bengali poem on Bharat (India) which he delivered from memory; the suavity of his tone much pleased the audience.”
  • (৪) ১৮৭৭ সালে তিনি “দিল্লি দরবার” কবিতাটি হিন্দু মেলায় আবৃত্তি করেছিলেন।

সীমাবদ্ধতা

হিন্দু মেলার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যেমন –

  • (১) হিন্দু ধর্মের অত্যধিক প্রাধান্য নতুন প্রজন্মের কিছু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাঙালি সমর্থন করেনি।
  • (২) হিন্দু মেলা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি।
  • (৩) হিন্দুমেলার পরবর্তীকালে ভারত সভার প্রতিষ্ঠিত হলে এটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়তে থাকে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হিন্দু মেলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।যেমন –

  • (১) হিন্দুমেলা সমস্ত বিভেদ ও বৈষম্যকে দূরে সরিয়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দেয়।
  • (২) এই মেলা দেশবাসীকে পরনির্ভরশীলতা ও হীনমন্যতা দূর করে স্বদেশী চেতনার জাগরন ঘটায়।
  • (৩) আত্মনির্ভর জাতি নির্মানের জন্য হিন্দুমেলা জাতিকে স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হওয়ার শিক্ষা দেয়। হিন্দুমেলার এই শিক্ষা পরবর্তীকালের জাতীয় আন্দোলন গুলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
  • (৪) হিন্দুমেলার গ্রামীন অর্থনীতির বিকাশ, স্বদেশী ভাবধারার সঙ্গীত ও সংস্কৃতি চর্চা দেশীয় ঐতিহ্যের পুনঃজাগরন ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটাতে প্রভূত সাহায্য করে।
  • (৫) সর্বোপরি, ভারতীয়দের প্রতি ইংরেজদের ভীরু, দুর্বল, কাপুরুষ সম্বোধনের যোগ্য প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্য হিন্দুমেলা শরীরচর্চা, ব্যায়াম ও শারীরিক নানা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী জাতি নির্মানের আদর্শ স্থাপন করে।

উপসংহার :- হিন্দু মেলার আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতের প্রথম গুপ্ত সমিতি “অনুশীলন সমিতি” গড়ে উঠেছিল। আর অনুশীলন সমিতির মধ্য দিয়েই প্রথম ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের অভিষেক হয়েছিল।

(FAQ) হিন্দু মেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কে, কবে হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠা করেন?

নবগোপাল মিত্র ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে.

২. হিন্দু মেলার অপর নাম কী?

চৈত্র মেলা।

৩. হিন্দু মেলার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

Leave a Reply

Translate »