মনসা পূজা

হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব মনসা পূজা প্রসঙ্গে পূজার উদ্দেশ্য বাংলায় মনসা পূজা, বণিক সম্প্রদায়ের মনসা পূজা, গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন দেবতা মনসা, শ্রাবণ মাসে মনসা পূজা, দশহরা পূজা, পূজার সময়কাল, পূজার পদ্ধতি ও পূজার গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

ধর্মীয় উৎসব মনসা পূজা

উৎসবমনসা পূজা
পালনকারীহিন্দু সম্প্রদায়
সংঘটনবার্ষিক
ধরণধর্মীয় উৎসব
সময়কালবর্ষাকাল
তারিখশ্রাবণ সংক্রান্তি
ধর্মীয় উৎসব মনসা পূজা

ভূমিকা :- দেবী মনসা হলেন একজন লৌকিক হিন্দু দেবী। ভাগবত, পদ্মাপুরাণ-সহ আরও অনেক পুরাণে দেবী মনসার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি সর্পদেবী। প্রধানত বাংলা অঞ্চল এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তার পূজা প্রচলিত আছে।

মনসা পূজার উদ্দেশ্য

সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে, সর্পদংশনের প্রতিকার পেতে, প্রজনন ও ঐশ্বর্যলাভের উদ্দেশ্যে দেবী মনসার পূজা করা হয়। দেবীর ঘট স্থাপন করে পূজা করা হয়।

দেবী মনসার পরিচয়

মনসা নাগরাজ বা সর্পরাজ বাসুকীর ভগিনী এবং ঋষি জরৎকারুর স্ত্রী। তাঁর অপর নামগুলি হল বিষহরি বা বিষহরা (বিষ ধ্বংসকারিণী), নিত্যা (চিরন্তনী) ও পদ্মাবতী। মনসা দেবাদিদেব মহাদেবের স্বীকৃতি কন্যা। মাতা পার্বতী প্রথমে তাঁকে ঘৃণা করলেও পরবর্তীকালে দেবী চণ্ডী মনসাকে নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

বাংলায় মনসা পূজা

বাংলায় সাধারণত মনসার মূর্তি পূজা হয় না। সিজ বৃক্ষের শাখায়, ঘটে বা সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপিতে মনসার পূজা হয়। তবে কোথাও কোথাও মনসার মূর্তিও পূজিত হয়। প্রধানত সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বা সর্পদংশনের প্রতিকার পেতে মনসার পূজা করা হয়।

বণিক সম্প্রদায়ের মনসা পূজা

বাংলার বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও মনসাপূজা বিশেষ প্রচলিত। এর কারণ মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সদাগর, যিনি প্রথম মনসার পূজা করেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন বণিক। এই কাব্যের নায়িকা বেহুলাও সাহা নামক এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

সর্বাধিক জনপ্রিয় মনসা পূজা

বাংলা অঞ্চলেই মনসার পূজা সর্বাধিক জনপ্রিয়। এই অঞ্চলে অনেক মন্দিরেও বিধিপূর্বক মনসার পূজা হয়। বর্ষাকালে যখন সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়, তখন মনসার পূজা মহাসমারোহে হয়ে থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন দেবতা মনসা

নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের কাছে মনসা একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন দেবতা। তাঁরা বিবাহের সময় ও সন্তান কামনায় মনসার পূজা করেন।

নেতোর পূজা

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মনসার সঙ্গে নেতোর (নেতা, নেতি ধোপানি, নেতল সুন্দরী ইত্যাদি নামেও পরিচিত) পূজাও করা হয়।

শ্রাবণ মাসে মনসা পূজা

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে পুরো শ্রাবণ মাস মনসা পুজো হয়। পুজো উপলক্ষে হয় পালা গান ‘সয়লা’। এই পালার বিষয় হল পদ্মপুরাণ বা মনসা মঙ্গল। সারা রাত ধরে গায়ক দোয়ারপি-সহ পালা আকারে ‘সয়লা’ গান গায়। পুরুলিয়ায় মনসা পূজায় হাঁস বলি দেওয়া হয়।

দশহরা পূজা

রাঢ়বঙ্গ বাঁকুড়ায় জ্যেষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে দশহরা ব্রত পালন করে মনসা পূজা করা হয়। তখন এখানে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। মনসা পুজার অঙ্গ হল অরন্ধন।

মনসা পূজায় পাঁঠা বলি

রাঢ়ে চৈতন্যদেবের সময়ে মনসাকে মা দূর্গার এক রূপ মনে করা হত। তাই কোনও কোনও জায়গায় পুজোয় বলি দেওয়া হত। আজও অনেক পুজোয় পাঁঠা বলি হয়।

মনসা পূজার সময়কাল

আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার পর যে পঞ্চমী তিথি (শ্রাবণ) তাকে নাগপঞ্চমী বলে। নাগপঞ্চমীতে উঠানে সিজগাছ স্থাপন করে মনসা পুজো করা হয়। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত পূজা করার বিধান আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একমাস যাবত্‍ পূজা করা হয়। শুধুমাত্র শেষ দিনে পুরোহিত দ্বারা পূজা করা হয়।

নাগদেবী মনসা সম্পর্কে বিশেষ উল্লেখ্য

বিশেষ উল্লেখ্য, নাগকুল কশ্যপমুনির জাত, যা সাধারণ সাপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন। যেমন – অনন্ত, শেষনাগ, বাসুকি প্রভৃতি। উদাহরণস্বরূপ বিষ্ণুর মস্তকের উপরে থাকেন শেষনাগ।

মনসা পূজার গুরুত্ব

বিশ্বাস করা হয় যে শিবের কন্যা মা মনসা হলেন সাপের দেবী। মা মনসার পূজা করলে সাপের কামড় থেকে নিরাপদ থাকা যায় এবং সর্প দোষ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। মনসা পূজা ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অন্যতম প্রধান উত্‍সব। তবে সারা দেশেই দেবী মনসার পূজা হয়।

দুধ ও কলা দিয়ে মনসা পূজা

মাটির সরায় দুধ ও কলা দিয়ে দেবী মনসাকে পূজা করা হয়। সারাদিন উপবাস করে পূজা শেষে সাবু-দুধ-কলা দিয়ে মনসার পূজা সম্পন্ন করে তবে উপবাস ভাঙেন মহিলারা।

দেবী মনসার পিতা ঋষি কাশ্যপ

তবে কোনও কোনও প্রাচীণ গ্রন্থ অনুসারে শিব নয়, ঋষি কাশ্যপ হলেন মনসার পিতা। মনসা এমনিতে ভক্তবৎসল হলেও তাঁর পূজা করতে অস্বীকার করলে তিনি নির্দয় হয়ে থাকেন।

বিষহরি মনসার পূজা

মনসা দেবীর আর এক নাম বিষহরী। সর্পবিষ হরণ করার কৌশল দেবীর জানা আছে বলেই এই নাম। মনসা পূজা হয় সাধারণত শ্রাবণ সংক্রান্তি বা আষাঢ়ী পঞ্চমীতে। কোথাও কোথাও দেবীর পরিবর্তে দেবীর প্রতীক হিসেবে অনন্ত, বাসুকি, পদ্ম, মহাপদ্ম, তক্ষক, কর্কট, শঙ্খ-র পূজাও করা হয়ে থাকে।

মনসা পূজার পদ্ধতি

  • (১) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেবী মা মনসা পূজিত হন বৃক্ষের ডালে। কোথাও সাপের ছবি আঁকা ঘট কিংবা ঝাঁপিতেও পূজা করা হয়। আবার কোথাও কোথাও মা মনসার মূর্তি পূজাও করা হয়। মা মনসার মন্দিরে এই দিনে ভক্তদের ঢল নামে। বিশুদ্ধ আচারে দেবীর পূজা করেন ভক্তেরা।
  • (২) বলা হয় যে, বর্ষাকালে সাপের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। তাই এই সময় সাপের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও দেবী মনসাকে সন্তুষ্ট করা হয়। শ্রাবণ মাসে নাগ পঞ্চমীও পালিত হয় বিশালাকারে। সারাদিন উপবাস থেকে ব্রত করে ভক্তেরা দুধ দিয়ে দেবী মনসার পুজো করেন।
  • (৩) পূরাণ মতে, মনসা পূজা বেশিরভাগ জায়গাতেই মনসাগাছে করে থাকেন ভক্তরা। মনসা পূজার উপকরণ হিসেবে নৈবেদ্য সহকারে পূজা করা হয়। নাগেদের দেবী মা মনসার পূজা করলে মন থেকে সাপের ভয় দূর হয়। এছাড়াও দেবী মনসার করুণায় দুঃখ দুর্দশা দূর হয়।
  • (৪) কথিত আছে যে, বর্ষাকালে সাপের প্রাদুর্ভাব বেশি থাকায় বহু বছর আগে বহু মানুষ সাপের কামড়ে প্রাণ হারাতেন। সেই সময় থেকেই দেবী মনসাকে সন্তুষ্ট করতে গ্রাম বাংলায় মনসা পূজা জাঁকজমক সহকারে হতে থাকে।
  • (৫) আগে মনসা পূজার দিনে অনেক জায়গায় পশু বলিও দেওয়া হত। কিন্তু আজ পশু বলির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কোথাও পুরোহিত দ্বারা মনসা পূজা করা হয়, আবার কোথাও বাড়ির লোকেরাই দেবী মনসার পূজা করেন। বহু নারী এইদিন সন্তান লাভের কামনায় দেবীর আরাধনা করে থাকেন।

মনসা পূজায় শুদ্ধ আচার পালন

পুরাণ মতে জানা যায়, মনসা পূজায় শুদ্ধ আচার মেনে চলা অবশ্যই দরকার। অন্যথায় দেবী ক্ষুব্ধ হতে পারেন।

মনসা পূজার উপকরণ

দেবী মনসার পূজা করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ গুলি হল – সিন্দুর, ঘট, মনসাগাছ বা তার ডাল, পূজার শাড়ি, মধুপর্কের বাটী, মধু, ঘৃত, দধি, তিল, হরিতকী, পুষ্প, দূর্ব্বা, তুলসী, বিল্বপত্র, ধূপ, দীপ, বড় নৈবেদ্য, অষ্টনাগের নৈবেদ্য, কুচা নৈবেদ্য, শীতলার শাড়ি, আসনাঙ্গুরীয়ক, মধুপর্ক, প্রতিমা হলে গদর্ভের ধুতি, আসনাঙ্গুরীয়ক, মধুপর্ক বাটী, দধি, মধু, ঘৃত, নথ, লোহা, শাঁখা, সিন্দুরচুবড়ি, রচনা, পুষ্পমাল্য, চন্দ্রমাল্য, হোম কলে বালি, কাষ্ঠ, সমিধ, হোমের ঘৃত ১ পোয়া, পূর্ণপাত্র, দক্ষিণা, বলি-দ্রব্য, আরতির দ্রব্য,

দেবী মনসার মন্ত্র

মনসা দেবীর আরাধনার জন্য মন্ত্রটি হল –

দেবীমম্বামহীনাং শশধরবদনাং চারুকান্তিং বদন্যাম।

হংসারূঢ়মুদারামসুললিতবসনাং সর্বদাং সর্বদেব।।

স্মেরাস্যাং মণ্ডিতাঙ্গীং কনকমণিগণৈমুক্তয়া চ।

প্ৰবালৈবন্দেহ হং সাষ্টনাগামুরুকু চগলাং ভোগিনীং কামরূপাম।।

মনসা মঙ্গল কাব্যে মনসা পূজার কাহিনী

মধ্যযুগের বাংলা মনসামঙ্গল কাব্যে বলা হয়, চাঁদ সওদাগরের কাছ থেকে পূজা পাবার বাসনায় একের পর এক সমস্যা তৈরি করেন দেবী মনসা। তাঁর পুত্র লখিন্দরের প্রাণ সর্পাঘাতে হরণ করেন দেবী তিনি। তারপর বেহুলার কৃতিত্বে লখিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় দেবী মনসা। এরপর মর্ত্যে দেবী হিসেবে পূজা পান মনসা দেবী।

উপসংহার :- মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছেন দেবী মনসা। বাংলা ভাষায় মনসা দেবীর কাহিনী নিয়ে লিখেছেন কেতকা দাস, নারায়ণ দত্ত, বিজয়গুপ্ত, কানাহরি দত্তর মত কবিরা। এঁদের লিখিত পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গলে দেবীর চরিত্রচিত্রণ করা হয়েছে বিচিত্র ভাবে।

(FAQ) মনসা পূজা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সাধারণ ভাবে কোন ঋতুতে মনসা পূজা করা হয়?

বর্ষাকালে।

২. মনসা কার কন্যা?

মহাদেব।

৩. মনসার স্বামী কে ছিলেন?

জরৎকারু মুনি।

৪. মনসার পুত্রের নাম কি?

আস্তিক।

৫. কখন মনসা পূজার প্রচলন আছে?

শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তি।

উৎসব

Leave a Comment