অকালবোধন (Akalbodhan)

অকালবোধন (Akalbodhan) প্রসঙ্গে প্রথমে বোধন, অকালবোধনের নামকরণ, অকালবোধন নামের বুৎপত্তি, রামচন্দ্রের অকালবোধনের কারণ, কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকালবোধনের উল্লেখ, রামচন্দ্রের অকালবোধনে নিয়োজিত পুরোহিত, রাজা সুরথের অকালবোধন।

দেবী দুর্গার অকালবোধন (Debi Durgar Akalbodhan)

উৎসবঅকালবোধন
সূচনাকারীরামচন্দ্র
ধরণধর্মীয় উৎসব
পালনকারীহিন্দু সম্প্রদায়
সংঘটনবার্ষিক
সময়কালআশ্বিন মাস
সম্পর্কিতমহালয়া, দুর্গাপূজা
দেবী দুর্গার অকালবোধন

ভূমিকা:- শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান হল অকালবোধন। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি অথবা শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে হিন্দু দেবী পার্বতীর দুর্গা রূপের পূজা আরম্ভের প্রাক্কালে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।

প্রথমে বোধন

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, শরৎকাল দেবলোকের রাত্রি দক্ষিণায়নের অন্তর্গত। তাই এই সময় দেবপূজা করতে হলে, সর্বপ্রথমে দেবতার বোধন (জাগরণ) করতে হয়।

অকালবোধন নামের কারণ

বিভিন্ন পুরাণ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত আছে যে, রাবণ বধের ঠিক আগে রাম দেবী পার্বতীর কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে বেল গাছের তলে বোধনপূর্বক দুর্গাপূজা করেছিলেন। শরৎকাল দেবপূজার ‘শুদ্ধ সময়’ নয় বলে রামচন্দ্র কর্তৃক দেবী পার্বতীর বোধন ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত হয়।

অকালবোধন নামের বুৎপত্তি

সংস্কৃত ‘অকাল’ ও ‘বোধন’ শব্দদুটি বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘অকাল’ শব্দের অর্থ হল ‘অসময়, শুভকর্মের অযোগ্য কাল বা অনুপযুক্ত সময়’। আবার ‘বোধন’ শব্দটির অর্থ ‘উদ্বোধন, নিদ্রাভঙ্গকরণ, বা জাগান’। একত্রে ‘অকালবোধন’ শব্দের অর্থ হল ‘অসময়ে বোধন বা জাগরণ, অসময়ে দেবী দুর্গার আরাধনা’।

রামচন্দ্রের অকালবোধনের কারণ

  • (১) শাস্ত্র অনুযায়ী বসন্তকাল দুর্গাপূজার প্রশস্ত সময় হলেও, আধুনিক যুগে শারদীয়া দুর্গাপূজাই অধিকতর প্রচলিত। দশানন রাবণ বসন্ত কালে চৈত্র মাসে পুজোর দ্বারা দেবী পার্বতীকে সন্তুষ্ট করলে দেবী তাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু যদি সে দেবীর পূজা মন্ত্রে কোনো রূপ ত্রুটি করে তবে দেবী তাকে ত্যাগ করবেন।
  • (২) এই কারণে রামের সকল অস্ত্র রাবণের উপর বিফল হয়ে যায়। তখন প্রজাপতি ব্রহ্মা রামচন্দ্র কে দেবী পার্বতীর পুজো করতে বলেন। কারণ দেবী পার্বতী এই সময় মর্ত্যে তাঁর মাতা পিতার গৃহে আসেন। এরপর রামচন্দ্র দেবী পার্বতীর পুজো শুরু করলে তাঁর উদ্দেশ্যে আনা একটি পদ্ম দেবী হরণ করেন।
  • (২) তখন রামচন্দ্র নিজ চক্ষু দেবীকে দান করতে চাইলে দেবী পার্বতী তাঁকে বিরত করেন ও বর দেন। এরপর হনুমান দশমী তিথিতে রাবণ কল্যাণে শ্রী চন্ডী পাঠ রত বৃহস্পতি কে অজ্ঞান করে মন্ত্রে ত্রুটি ঘটালে রাবণকে ত্যাগ করেন দেবী। রাবণ দেখে দেবী তাকে ত্যাগ করে কৈলাসে চলে যাচ্ছেন রাবণের শত মিনতি সত্ত্বেও দেবী পার্বতী আর ফিরে তাকালেন না। এরপরই রামচন্দ্র রাবণকে বধ করেন।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকালবোধনের উল্লেখ

  • (১) মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনও বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণ -এর অনুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্মপুরাণের কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন। কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুযায়ী, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। শিব তাঁকে রক্ষা করতেন।
  • (২) তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী দুর্গার পূজা করে তাঁকে তুষ্ট করতে। তাহলে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে দুর্গার বোধন, চণ্ডীপাঠ ও মহাপূজার আয়োজন করেন। আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন। তার পর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন।
  • (৩) মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব না ঘটায়, রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাঁকে ১০৮টি পদ্ম জোগাড় করে দেন। দুর্গা রামকে পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন। একটি পদ্ম না পেয়ে রাম পদ্মের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে দুর্গাকে নিবেদন করতে গেলে, দুর্গা আবির্ভূত হয়ে রামকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন।

রামচন্দ্রের অকালবোধনে নিয়োজিত পুরোহিত

  • (১) দশানন রাবণের বাবা বিশ্রবা মুনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাই রাক্ষসী কৈকসীর পুত্র হলেও রাবণ ব্রাহ্মণ। এখানেই শেষ নয়, শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন তিনি। সংস্কৃতজ্ঞ, সুপণ্ডিত এবং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ত্রিসন্ধ্যা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা রাবণকে তাই একজন উচ্চশ্রেণির ব্রাহ্মণ হিসেবেই ধরা হত। কেবল রাবণই নন, অহিরাবণ এবং মহিরাবণের মতো রাবণ বংশীয় অন্যদের সম্পর্কেও বলা হয়, তাঁরা রীতিমতো সাধক ছিলেন।
  • (২) রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে যখন একে একে লঙ্কার বড় বড় বীররা ধরাশায়ী, তখন রাবণ মা দুর্গার স্তব করলেন। দুর্গা কালীরূপে রাবণকে অভয় দিলেন। মা কালীর কোলে আশ্রিত রাবণ যুদ্ধে অপরাজেয় হয়ে উঠতে লাগলেন। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাকে তুষ্ট করতে অকালেই (বসন্তকালের বদলে শরৎকালে) তাঁর পুজো করতে মনস্থ করলেন রাম। কিন্তু সেই পুজোয় কে করবেন পৌরোহিত্য?
  • (৩) রামের অকালবোধনে পুরোহিত হিসেবে রাবণের নাম উত্থাপন করেন স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মা। তিনিই পরামর্শ দেন, ”তোমার এই পুজোর উপযুক্ত পুরোহিত হতে পারেন রাবণই।” অগত্যা রাক্ষসরাজ রাবণকেই পৌরোহিত্যের প্রস্তাব দেন রঘুনন্দন। আর রাবণও রাজি হয়ে যান।
  • (৪) বোধনের মন্ত্র বলার সময় রাবণ উচ্চারণ করেন, ”রাবণস্য বধার্থায়…” অর্থাৎ নিজের মৃত্যুর জন্য পুজোয় নিজেই পৌরোহিত্য করলেন, সংকল্প করলেন তিনি। আসলে রাবণ জানতেন, রাক্ষস বংশের উদ্ধারের জন্য রামের হাতেই তাঁর বধ হওয়া প্রয়োজন। আর সেই কারণেই এই পুজোয় পৌরোহিত্য করতে তাঁর রাজি হওয়া।

রাজা সুরথের অকালবোধন

  • (১) শ্রীশ্রী চণ্ডীতে সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্য-কর্তৃক মহিষাসুরমর্দিনী পুজোর কথা আছে। কিন্তু কোন ঋতুতে এই পূজা করেছিলেন তার কোনাে উল্লেখ নেই। যেহেতু অন্য ঋতুতে মহিষাসুরমর্দন হয় নি সেহেতু সুরথ রাজা এবং সমাধি বৈশ্য আশ্বিনেই মহিষাসুরমর্দিনী বিগ্রহে দুর্গোৎসব করেছিলেন। যদিও এই পুজো ঋকবৈদিক যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল।
  • (২) সুরথ রাজা ও সমাধি মহিষাসুরমর্দনের কথকতা শুনেছিলেন, দেখেন নি। যে আশ্রমে বসে কথা শুনেছিলেন বােধন সেই আশ্রমেই হয়। আশ্রমটি পুষ্পভদ্রা নদীর কুলে বালুকাময় ভূমিতে। এই নামে নদী আছে হিমালয় পর্বতমালার পশ্চিম অংশে। পুজো শেষে সুরথরাজা অশ্বপৃষ্ঠে আরােহণ করে স্বীয় রাজধানীতে প্রত্যাগমন করেন।
  • (৩) কিন্তু এই পুষ্পভদ্রা নামে নদী-অঞ্চলে অশ্বপৃষ্ঠে যাতায়াত চলে না। ভারত -এর তুঙ্গভদ্রা নদীর কথা সবাই জানে, কিন্তু পুস্পভদ্রা নামে নদী কি ছিল বা আছে? ভারতবর্ষে একই নামে একাধিক নদীকে পাওয়া যায় বলেই এই প্রশ্ন উঠছে। যমুনা নামে গােটা পাঁচেক নদীর কথা পাওয়া যায়। সরস্বতী নামে গােটা দুই তাে আছেই। আবার অলকানন্দা নামেও গােটা দুই নদী তাে বটে।
  • (৪) ঐতিহাসিক সুধীর কুমার মিত্র বর্তমান কুন্তী তথা কানা নদীর পূর্ব নাম লিখেছেন ‘পুষ্প শিপ্রা’ নদী। কিন্তু এই নাম ঠিক মনে হয় না। মধ্যভারত অঞ্চলের শিপ্রা নদীর কথা সকলের জানা। যমুনা- সরস্বতী-অলকানন্দা হিমালয়াগত নদী। তাই মনে হয়, কুন্তীর নামই পুস্পভদ্রা। তাই কুন্তীর মােহনায় ত্রিবেণী অঞ্চলেই ঋষির আশ্রম থাকা স্বাভাবিক।
  • (৫) মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর বর্ণনা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। এই স্থান থেকেই অশ্বপৃষ্ঠে আরােহণ করে সুরথ রাজা নিজ রাজধানীতে ফিরে যান। রাজধানীর নাম ‘কোলা’। দামােদর প্রবাহ পথে বর্তমান বর্ধমান -এর একটি সমৃদ্ধ গ্রাম। অতীতে বর্ধমান নগরটি ছিল অস্থিক গ্রামে।
  • (৬) চণ্ডীর বর্ণনায় কোলা রাজধানী যবন কর্তৃক অধিকৃত হয়। পুষ্পপুর তথাকুসুমগ্রাম কিন্তু যবন কর্তৃক অধিকৃত হয় নি। যবনেরা কোলা অধিকার করে নাম দিয়েছিল পার্থেনিস। নামটি যে পার্থিয়ান গ্রীক যবনদের দেওয়া তা সহজেই বােঝা যায়।
  • (৭) গ্রিক যবন আলেকজাণ্ডার বৃহৎবঙ্গে আসেন নি। এসেছিলেন মিনান্দার। কোনাে কোনাে গবেষক মনে করেন সুরথের বাড়ি গৌড় এবং সমাধির বাড়ি ছাটিগ্রাম অর্থাৎ চট্টগ্রামে। কিন্তু এই তথ্য ঠিক মনে হয় না। গ্রীক যবন কর্তৃক গৌড় দখল হয় নি। তাছাড়া গৌড় কোনাে প্রাচীন শহর নয়।
  • (৮) বরেন্দ্রীর প্রাচীন শহর হল পুন্ড্রবর্ধন। সমাধি বৈশ্যের বাড়ি চট্টগ্রামের বদলে সপ্তগ্রামে হওয়াই স্বাভাবিক। ত্রিবেণী নতুন কোনাে শহর নয়, প্লিনির ভ্রমণ কথায় এই নামটি আছে, যদিও সােনারগাঁও অঞ্চলে আর একটি ত্রিবেণী আছে। আবার বর্ধমানে সুরথগড় বলে একটি জায়গা আছে যা মঙ্গলকোটের ন্যায় হরপ্পা সভ্যতার ঐতিহ্য বহন না করলেও প্রাচীনতায় কম কিছু যায় না।
  • (৯) সুরথ নামে একজন বিখ্যাত রাজা যে ওই অঞ্চলে ছিলেন তা অবশ্য বােঝা যায়। যাইহোক কোথায় করেছিলেন তা জানা না গেলেও সুরথ রাজা যে দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন তা জানা স্পষ্ট।

উপসংহার:- রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। সেজন্যই হয়তো বাংলায় অকালবোধনের কোনো নির্দিষ্ট ‘ভাব’ নেই। কৃত্তিবাস ওঝার দৌলতে অবশ্য আমরা শিশুকাল থেকেই এই অকালবোধনের কথা শুনে আসছি।

(FAQ) অকালবোধন (Akalbodhan) সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অকালবোধন কোন উৎসবের সাথে জড়িত?

দুর্গোৎসব।

২. অকালবোধনের সূচনা করেছিলেন কে?

অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র।

৩. অকালবোধন কোন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়?

শরৎকালের আশ্বিন মাসে।

৪. কোন তিথিতে অকালবোধন হয়?

শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে।

৫. রামচন্দ্রের অকালবোধনে পুরোহিত কে ছিলেন?

দশানন রাবণ।

Leave a Comment