মহাসপ্তমী (Maha Saptami)

দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী (Maha Saptami) প্রসঙ্গে মহাসপ্তমীতে দুর্গাপূজার সূচনা, মহাসপ্তমীর তিথি, মহাসপ্তমীতে বেল গাছের শাখা আনয়ন, মহাসপ্তমীর পূজা, মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গাকে প্রকৃতি হিসেবে পূজা, মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজায় নয়টি দেবী, মহাসপ্তমীর নবপত্রিকা পূজা সম্পর্কে গবেষকদের মত, মহাসপ্তমীতে দুর্গাসপ্তশতী পাঠ, মহাসপ্তমীতে কালরাত্রির পূজা, মহাসপ্তমীতে মনস্কামনা পূরণের প্রার্থনা, মহাসপ্তমীতে শক্তি ও বিজয় লাভের প্রার্থনা, মহাসপ্তমীতে বাচ্চাদের তাবিজ ধারণের শুভ দিক, মহাসপ্তমীতে সওয়া লক্ষবার মন্ত্র জপ করার ফল, মহাসপ্তমীতে খিচুড়ি প্রসাদ বিতরণ ও মহাসপ্তমীতে পালনীয় টোটকা।

মহাসপ্তমী (Maha Saptami)

উৎসবমহাসপ্তমী
অন্য নামদুর্গা সপ্তমী
ধরণধর্মীয় উৎসব
পালনকারীহিন্দু সম্প্রদায়
সময়কালআশ্বিন মাস
তিথিশুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথি
সম্পর্কিতমহালয়া, দুর্গাপূজা, অকালবোধন
মহাসপ্তমী

ভূমিকা:- আশ্বিন মাসে প্রায় দশ দিন ধরে দুর্গাপূজার উৎসব পালিত হয়। যদিও প্রকৃত অর্থে, উৎসব শুরু হয় ষষ্ঠীর দিন থেকে। দুর্গাপুজোর পাঁচ দিন দুর্গাষষ্ঠী বা মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত।

মহাসপ্তমীতে দুর্গাপূজার সূচনা

হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে পালিত হয় মহা সপ্তমী। ষষ্ঠীতে বোধনের পরে মহাসপ্তমী থেকে শুরু হয় মহা দুর্গাপূজা।

মহাসপ্তমীর তিথি

দুর্গাপুজোর আসল সময় হল বসন্তকাল। সেই পুজোকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। ত্রেতা যুগে রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক রামচন্দ্র তাঁর স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন। অসময়ে দেবীকে পুজো করেছিলেন বলে শরতের এই পুজোকে বলা হয় অকালবোধন। এই অকাল বোধনের পরিসরটাই বাঙালির ক্যালেন্ডারে হয়ে উঠেছে বছরের সেরা উৎসব দুর্গাপুজো। হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে পালিত হয় মহা সপ্তমী।

মহাসপ্তমীতে বেল গাছের শাখা আনয়ন

শরতকালে স্বর্গের দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই দেবীকে ঘুম থেকে তোলার জন্য আহ্বান করতে হয়। দেবী এই সময় কুমারী রূপে বেল গাছের পাতায় অবস্থান করেন। তাই ষষ্ঠীর দিন বেল গাছের তলায় দেবীর বোধন ও অধিবাস সম্পন্ন হয়। বেল গাছের একটি ডালকে চিহ্নিত করে রাখা হয় এদিন। তারপর সপ্তমীর দিন ওই চিহ্নিত ডাল কেটে মণ্ডপে পুজোর স্থানে নিয়ে আসতে হয়।

মহাসপ্তমীর পূজা

  • (১) মহাসপ্তমীর সকালে সর্বপ্রথম কলাবউ স্নান করানো হয়। কলাবউ বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। সপ্তমীর সকালে নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নবপত্রিকাকে মহাস্নান করাতে। তখনই শাস্ত্রবিধি মেনে স্নান করিয়ে নতুন শাড়ি পরানো হয় নবপত্রিকাকে ৷
  • (২) নয়টি উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা গঠন করা হয়। এই নয়টি উদ্ভিদ মা দুর্গার নয়টি শক্তির প্রতীক। এই নয়টি উদ্ভিদ হল কদলী বা রম্ভা (কলাগাছ), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মান ও ধান।
  • (৩) নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় বাড়ির পুজোর দালান অথবা বারোয়ারি পুজোমণ্ডপে ৷ সেখানে প্রবেশের পরই দুর্গাপূজার মূল প্রথাগত অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের পরই দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়।
  • (৪) এরপর মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধূপ-ধুনো, বেল-তুলসী, আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, পুষ্পমাল্য, চন্দনসহ ১৬টি উপাচার দিয়ে দেবী দুর্গাকে পূজা করা হয়।

মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গাকে প্রকৃতি হিসেবে পূজা

সপ্তমী পুজোতে নবপত্রিকা স্নানের একটি বিশেষ তাৎপর্য্য আছে। নবপত্রিকা স্নানের মধ্যে দিয়ে দেবী দুর্গাকে প্রকৃতি হিসেবে পুজো করা হয়। হিন্দু পুরাণ অনুসারে নবপত্রিকা আসলে দেবী দুর্গার ৯টি রূপ। দেবীর ৯টি রূপকে একত্রে পুজো করা হয় নবপত্রিকার মাধ্যমে।  ৯টি বৃক্ষ নিয়ে পুজো করা হয়। প্রতিটি বৃক্ষেই দেবী কোনও না কোনও রূপে অধিষ্ঠান করেন।

মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পূজায় নয়টি দেবী

মহাসপ্তমীতে দেবীর ৯টি রূপকে একত্রে পুজো করা হয় নবপত্রিকার মাধ্যমে।  ৯টি বৃক্ষ নিয়ে পুজো করা হয়। প্রতিটি বৃক্ষেই দেবী কোনও না কোনও রূপে অধিষ্ঠান করেন। যেমন –

  • (১) কলাগাছ – এই গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ব্রাহ্মণী।
  • (২) কচু – অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকা।
  • (৩) হরিদ্রা বা হলুদ – অধিকাষ্ঠাত্রী দেবী উমা
  • (৪) জয়ন্তী – অধিষ্ঠাত্রী দেবী কার্তিকী।
  • (৫) বিল্ব বা বেল – অধিষ্ঠাত্রী দেবী শিবা।
  • (৬) ডালিম বা বেদানা – অধিষ্ঠাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা।
  • (৭) অশোক – অধিষ্ঠাত্রী দেবী শোকরহিতা।
  • (৮) মানকচু – অধিষ্ঠাত্রী দেবী চামুণ্ডা।
  • (৯) ধান – অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী।

মহাসপ্তমীর নবপত্রিকা পূজা সম্পর্কে গবেষকদের মত

  • (১) গবেষকদের মতে নবপত্রিকা প্রকৃত পক্ষে শস্যের পুজো। বিশেষজ্ঞ শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, শস্যকেই বধূরূপে বা দেবী রূপে পুজো করা হয়। এটাই মূলত শারদীয়ার পুজো। প্রাচীনকালে দূর্গার সঙ্গে প্রকৃতিকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করা হত।
  • (২) দূর্গা পুরাণে নবদুর্গার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু নবপত্রিকার কথা নেই। আবার কালিকা পুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ নেই। কিন্তু সপ্তমী তিথিতে পত্রিকা পুজোর নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ না থাকলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই প্রথার উল্লেখ রয়েছে। 

মহাসপ্তমীতে দুর্গা সপ্তশতী পাঠ

শাস্ত্র মতে সপ্তমীর দিনে দুর্গা সপ্তশতীর পাঠ করলে দেবী দুর্গা প্রসন্ন হন এবং ভক্তদের সমস্ত মনস্কামনা পূরণ করেন। 

মহাসপ্তমীতে কালরাত্রির পূজা

মা দুর্গার পুজোর সপ্তম দিনে কালরাত্রির পুজো করা হয়ে থাকে। দুর্গার এই স্বরূপের পুজো করলে ভূত-প্রেত-সহ সমস্ত নেতিবাচক শক্তির অন্ত হয় এবং দেবী ভক্তদের আশীর্বাদ প্রদান করেন। শত্রু ও দুষ্টদের সংহারক কালরাত্রির পুজো করলে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তির আগমন ঘটে।

মহাসপ্তমীতে মনস্কামনা পূরণের প্রার্থনা

সপ্তমীর দিন বিশেষ কিছু নিয়ম পালন করলে জীবনে মঙ্গল ও সমৃদ্ধির আগমন ঘটে এবং বিবাদ দূর হয়। সপ্তমীর দিনে কালরাত্রির বীজ মন্ত্র ওম হৃীং ক্লীং চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চ্যৈ নমঃ মন্ত্র সওয়া লক্ষবার জপ করা উচিত। এর পর রাত্রি জাগরণ করুন ও দুর্গা সপ্তশতীর পাঠ করুন। এর প্রভাবে দুর্গা সমস্ত নেতিবাচক শক্তির প্রভাব দূর করেন ও সুখ-সমৃদ্ধির আশীর্বাদ দেন। সওয়া লক্ষ বার মন্ত্র জপ করলে মন্ত্র সিদ্ধ হয়। তার পর মনস্কামনা পূরণের প্রার্থনা করলে দুর্গা তা পূর্ণ করেন।

মহাসপ্তমীতে শক্তি ও বিজয় লাভের প্রার্থনা

সপ্তমীর দিন কালরাত্রির পুজোর সময় প্যাড়ার ভোগ নিবেদন করা উচিত। সপ্তমী তিথিতে কালরাত্রির উদ্দেশ্যে প্যাড়ার বলি দেওয়া হয়। মনে করা হয় এর ফলে শক্তি ও জয় লাভ করা যায়। পাশাপাশি কোনও আইনি জটিলতায় জড়িয়ে থাকলে তাতেও জয় লাভ করা সহজ হয়।

মহাসপ্তমীতে বাচ্চাদের তাবিজ ধারণের শুভ দিক

বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চা থাকলে নবরাত্রির সপ্তম দিনে তাবীজ পরান। কালো কাপড়ে হলুদ সরষে, ভাঙা সূচ দিয়ে মুড়ে দিন। তার পর সেটি বাচ্চার গলায় পরিয়ে দিতে হবে। মনে করা হয় সপ্তমী তিথিতে কালো শক্তি জাগ্ৰত হয়। তাই প্রাচীন কাল থেকে মানুষ এই উপায় করে আসছে।

মহাসপ্তমীতে সওয়া লক্ষবার মন্ত্র জপ করার ফল

দুর্গা সপ্তশতীতে একাধিক মন্ত্রের উল্লেখ আছে। পৃথক পৃথক মনস্কামনা পূরণের জন্য পৃথক পৃথক মন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে এখানে। নবরাত্রির সপ্তম দিনে কালরাত্রির পুজোর সময় আপনার মনস্কামনা অনুযায়ী সওয়া লক্ষবার মন্ত্র জপ করুন। কালরাত্রিকে শশা ও মালপোয়ার ভোগ নিবেদন করুন। এর ফলে ধন-ধান্যের বৃদ্ধি হয় এবং চাকরি ও ব্যবসায় উন্নতি হয়।

মহাসপ্তমীতে খিচুড়ি প্রসাদ বিতরণ

সপ্তমী তিথিতে দুর্গাকে খিচুড়ির ভোগ নিবেদন করা হয়। বিউলি ডালের খিচুড়ি তৈরি করে ঘিয়ের ফোড়ন দিয়ে দুর্গাকে ভোগ নিবেদন করুন। এর পর প্রসাদ হিসেবে তা বিতরণ করুন। এর ফলে দুর্গার আশীর্বাদ পাওয়া যায় ও গ্রহের প্রতিকূল প্রভাবও দূর হয়। এছাড়াও জবা ফুলের মালা দুর্গার বিশেষ প্রিয়। নবরাত্রির সপ্তমী তিথিতে পুজোর সময় লাল জবা ফুলের মালা অর্পণ করা উচিত।

মহাসপ্তমীতে পালনীয় টোটকা

মহাসপ্তমীর দিন সকালে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরে এই টোটকাগুলি করতে হবে। সঠিক নিয়ম মেনে এই টোটকাগুলি করতে পারলে জীবনের সকল সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন, আর্থিক উন্নতি হবে এবং পারিবারিক সুখ, শান্তিও বজায় থাকবে। যেমন –

  • (১) দু’টি পেরেক নিয়ে হনুমানজির মন্দিরে গিয়ে হনুমানজির চরণে রেখে দিন। পেরেক দু’টিতে হনুমানজির চরণের কমলা রঙের সিঁদুর লাগিয়ে রাখুন। এর পর হনুমান চালিশা পাঠ করুন। তার পর পেরেক দু’টি বাড়ির সদর দরজার দুই পাশে পুঁতে দিন। এতে বাড়ি থেকে সমস্ত অশুভ শক্তি দূর হবে, আর্থিক সঙ্কট কাটবে।
  • (২) সাতটি লাড্ডুর মধ্যে একটা করে লবঙ্গ গেঁথে দিন। তবে খেয়াল রাখবেন, লবঙ্গের ফুলটা যেন বাইরে বেরিয়ে থাকে। এর পর লাড্ডুগুলি একটি তামার পাত্রে রেখে মা দুর্গার মূর্তি বা ছবির সামনে নিবেদন করুন। ধূপ, ধুনো, কর্পুর দিয়ে মায়ের আরতি করুন এবং এই মন্ত্র ‘ওঁ শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে, সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমোহস্তুতে সহকারে’ জপ করুন।
  • (৩) সপ্তমীর দিন মায়ের চরণে ১০৮টি দুর্বা, ১০৮টি আতপ চাল, ১০৮টি যব এবং একটি আলতা নতুন কাপড়ে মুড়ে মায়ের চরণে অর্পণ করতে হবে।

উপসংহার :- ঢাকের কাঠি পড়া থেকে শিউলির স্নিগ্ধ ও মিষ্টি গন্ধে সারা বাংলার আকাশ জুড়ে দুর্গার আগমনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মহালয়ার একসপ্তাহ পর চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, বিজয়া পর্যন্ত বাঙালির কাছে অত্যন্ত প্রিয় এই শারদোৎসব।

(FAQ) মহাসপ্তমী (Maha Saptami) সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দুর্গা সপ্তমী কোন উৎসবের সাথে জড়িত?

দুর্গোৎসব।

২. দুর্গাপূজার সময় নবপত্রিকা পূজা হয় কবে?

দুর্গা সপ্তমীর দিন।

৩. মায়ের আগমনের দিন কি নামে পরিচিত?

মহাসপ্তমী বা দুর্গা সপ্তমী।

৪. দুর্গাপূজার সময় কলা বউ স্নান করানো হয় কবে?

দুর্গা সপ্তমীর দিন।

Leave a Comment