মহালয়া (Mahalaya)

হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব বিশেষ মহালয়া প্রসঙ্গে মহালয়া কি (What is Mahalaya?), মহালয়া শব্দের অর্থ, মহালয়ার প্রেক্ষাপটে মধু ও কৈটভের কাহিনী, মহালয়ার পূর্বে পিতৃপক্ষ, তর্পনের মহালগ্ন মহালয়া।

পিতৃপক্ষের শেষ দিন মহালয়া, মহালয়ায় দেবীর আহ্বান, মহালয়া লগ্নে জাগো মা দুর্গা, মহালয়ার শুভ লগ্নে জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী, মহালয়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের শ্লোক পাঠ, অমাবস্যা তিথি মহালয়া, দুর্গাপূজার সুচনাকাল মহালয়া, মহালয়ার শুভ লগ্নে মা পার্বতী পৃথিবীতে আসেন, মহালয়ার শুভক্ষণে কৈলাস ছেড়ে মায়ের পৃথিবীতে আগমন, মহালয়ার পর দিন নবরাত্রির সূচনা, মহালয়ার সাথে দুর্গাপূজার সম্পর্ক, বাঙালির কাছে মহালয়ার গুরুত্ব, মহালয়ার সময় চণ্ডীপাঠ, মহাভারতের কাহিনীর সাথে মহালয়ার সম্পর্ক, মহালয়ার দিন তর্পন করার কারণ, পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা ও শুভ অশুভের দিন মহালয়া।

মহালয়া

উৎসবমহালয়া
ধরণধর্মীয় উৎসব
সংঘটনবার্ষিক
পালনকারীহিন্দু সম্প্রদায়
তিথিঅমাবস্যা
মহালয়া

ভূমিকা:- পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ হল মহালয়া। অর্থাৎ পিতৃপক্ষের শেষক্ষণ ও দেবীপক্ষের সূচনাকালের সময়কেই বলা হয় মহালয়া।

মহালয়া কী

হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, মহালয়া এবং পিতৃপক্ষ অমাবস্যা একই দিনে পালিত হয়। বিশ্বাস করা হয় যে মহালয়ার দিন প্রতিটি ভাস্কর মা দুর্গার চোখ তৈরি করেন। এরপর মা দুর্গার প্রতিমাকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। দুর্গাপূজায় মা দুর্গার প্রতিমার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং এই মূর্তিগুলি প্যান্ডেলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।

মহালয়া শব্দের অর্থ

এই মহালয়া শব্দটির অর্থ হল মহান আলয় বা আশ্রম। এক্ষেত্রে দেবী দুর্গাই হলেন, সেই মহান আলয়। পুরাণ মতে, ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর অমর হয়ে উঠেছিলেন। শুধুমাত্র কোনও নারীশক্তির কাছে তার পরাজয় নিশ্চিত। অসুরদের অত্যাচারে যখন দেবতারা অতিষ্ঠ, তখন ত্রিশক্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর নারীশক্তির সৃষ্টি করেন। তিনিই মহামায়ারূপী দেবী দুর্গা। দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র দিয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন দুর্গা। এই জন্যেই বিশ্বাস করা হয় যে, এই উৎসব খারাপ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয় ঘোষণা করে।

মহালয়ার প্রেক্ষাপটে মধু ও কৈটভের কাহিনী

প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে শ্রীবিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হন। এই সময়ে বিষ্ণুর কর্ণমূল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়। তারা বিষ্ণুর নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হলে ভীত ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করর জন্য তাঁর নয়নাশ্রিতা যোগনিদ্রাকে স্তব করতে লাগলেন। দেবী শ্রীবিষ্ণুকে জাগরিত করলে তিনি পাঁচ হাজার বছর ধরে মধু ও কৈটভের সাথে মহাযুদ্ধে রত হন।

মহালয়ার পূর্বে পিতৃপক্ষ

বাংলা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ প্রতিপদ থেকে শুরু করে পরর্বতী অমাবস্যা র্পযন্ত সময়কে পিতৃ পক্ষ বলে। পুরাণ অনুযায়ী ব্রহ্মার নির্দেশে পতিৃপুরুষরা এই ১৫ দিন মনুষ্যলোকের কাছাকাছি চলে আসেন। তাই এই সময় তাঁদের উদ্দেশ্যে কিছু অর্পণ করা হলে তা সহজেই তাদের নিকট পৌঁছায়। তাই পুরো পক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও মননের মাধ্যমে র্তপণ করা হয়।

তর্পনের মহালগ্ন মহালয়া

পিতৃপক্ষে তর্পনের চূড়ান্ত প্রকাশ বা মহালগ্ন হল এই মহালয়া। অনেকেই এই দিনটিকে দেবীপক্ষের সূচনা বলে থাকেন। এটি একটি জনপ্রিয় কৃতকর্ম।

পিতৃপক্ষের শেষ দিন মহালয়া

মহালয়া পিতৃপক্ষের শেষ দিন। এর পরের দিন শুক্লা প্রীতিপদে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। সেই দিন থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫ দিনই হল দেবীপক্ষ।

মহালয়ায় দেবীর আহ্বান

  • (১) যা চন্ডি মধুকৈটভারী, দৈত্য দলনী, যা মহিষমর্দিনী, যা দূর্গে চন্ড মুন্ডোমালিনী, যা রক্ত বিজশ্বরী,শক্তি সুন্দরী সুন্দর দৈত্য দলনী যা। আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেঁজে উঠে আলোক মঞ্জিল, ধরনীর বর্হিআকাশে-অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তর আকাশে জাগরিত জোর্তিময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা, আনন্দময়ী মহামায়ার পদ্ধধ্বনি অসিম ছন্দে বেজে উঠে, রুপলোক ও রসলোকে আনে নবভাব মাধুরীর সঞ্জিবন, ত্রাহি আনান নন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে-মৃন্ময়ীকে আবাহন।
  • (২) আজ শক্তিরুপীনি বিশ্বজননীর শারদও শ্রীমন্ডিত প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানগ্রহিতা, মহামায়া-সনাতনী শক্তিরুপা গুনাময়ী-হে ভগবতী মহামায়া তুমিই ত্রিগুনাতিতা, তুমিই রজগুনে ব্রহ্মার গৃহিনী বাগদেবী,শপ্তগুনে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী, তমগুনে শিবের বনিতা পাবর্তী, আবার ত্রিগুনাতিত তুমিই অর্নিবচ্চনিয়া, আবার দেব ঋষি কণ্যা কাত্যায়নের কণ্যা কাত্যায়নী, তিনিই কণ্যাকুমারী আখ্যাতা দূর্গে, তিনিই দাক্ষ্যয়নি সতি, তিনিই আদিশক্তি।

মহালয়া লগ্নে জাগো মা দুর্গা

দেবী দুর্গা নিজদেহ সম্ভুত তেজপ্রবাহে শত্রুদহনকালে অগ্নিবর্ণা, অগ্নি লোচনা। এই উষা লগ্নে হে মহাদেবী তোমার উদ্বোধনে প্রানের ভক্তিরসে আলোকিত হোক দিকে দিকে, হে অমিতজ্যোতি, হে মা দুর্গা, তোমার আবির্ভাবে ধরনী হোক প্রাণময়ী, জাগো জাগো মা।

মহালয়ার শুভ লগ্নে জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী

জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী, অভয়াশক্তি বল প্রদায়নী তুমি জাগো-দেবী প্রসীদ পরিপালয়ে নো হরি ভীতে: নিত্যং যথাসুরবধদিধনৈব সদ্য: পাপানি সর্বজগতাঞ্চ শমং নয়াশু উত্‍পাতপাকজনিতাংশ্চ মহোপসর্গানা। পূত পবিত্র এই আহবানের মধ্যে দিয়ে দিবাগত রাতের শেষে ভোরে সারাবিশ্বে পালিত হবে পূণ্য তিথি মহালয়া।

মহালয়ায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের শ্লোক পাঠ

আকাশবাণী কলকাতা থেকে প্রচারিত হবে মহিষাসুরমর্দ্দিনী। বাণী কুমারের রচনা ও প্রবর্তনায় মাতৃসাধক বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের অমর কন্ঠের গ্রন্থনা ও শ্লোক পাঠে আবাহন হবে জগত্‍ জননী দেবী দুর্গার। দুর্গায়ে দুর্গাপারায়ৈ সারায়ৈ সর্ব্বকারিণ্যৈ, খ্যাত্যৈ তথৈব্য কৃষ্ণায়ৈ ধুম্রায়ৈ সতত: নম:। মাতৃবন্দনার এই আহবানে পবিত্র শুরু হয় পূণ্যতিথি মহালয়া। শারদীয়া দূর্গাপুজার সপ্তাহকাল পূর্বে মায়ের আরাধনা বন্দনায় মহালয়া পালিত হয়।

অমাবস্যা তিথি মহালয়া

শাস্ত্রমতে মহালয়া হল একটি অমাবস্যা তিথি। এই তিথিতে সাধারনত পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ তর্পণ করা হয়। এই দিন তর্পণ করলে পিতৃপুরুষরা নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের আশীর্বাদ প্রদান করেন।

দুর্গাপূজার সুচনাকাল মহালয়া

  • (১) মহালয়ার দিনে দেবী দূর্গার বোধন করা হয়, বোধন অর্থ জাগরণ। তাই মহালয়ার পর দেবীপক্ষের বা শুক্লপক্ষের প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার সুচনা করা হয়। শ্রাবন থেকে পৌষ ছয় মাস দক্ষিনায়ণ, দক্ষিণায়ণ দেবতাদের ঘুমের কাল। তাই বোধন করে দেবতাদের জাগ্রত করা হয়।
  • (২) মহালয়ার পর প্রতিপদে যে বোধন হয় সে সময় সংকল্প করে দুর্গাপূজার আয়োজন চলে। একে বলে কল্পরম্ভা, যদিও ষষ্ঠি থেকে পূজার প্রধান কার্যক্রম শুরু হয় তাই বলা হয় ষষ্ঠাদিকল্পরম্ভা এবং সপ্তমী থেকে বিগ্রহতে। প্রতিপদ থেকে শুধু ঘটে পূজো ও চন্ডী পাঠ করা হয়।

মহালয়ার শুভ লগ্নে মা পার্বতী পৃথিবীতে আসেন

বিশ্বাস করা হয় যে নবরাত্রির সময়, দেবী পার্বতী তার শক্তি এবং নয় রূপে শারীরিকভাবে পৃথিবীতে আসেন। তার সঙ্গে তার সঙ্গী যোগিনী এবং পুত্র গণেশ ও কার্তিকেয়ও পৃথিবীতে আসেন। দেবী মা তার মাতৃগৃহে আসেন এবং নবরাত্রির ৯ দিনে পৃথিবীতে অবস্থানকালে তিনি অসুর শক্তির বিনাশ করেন।

মহালয়ার শুভক্ষণে কৈলাস ছেড়ে মায়ের পৃথিবীতে আগমন

বিশ্বাস করা হয় যে নবরাত্রির সময় পৃথিবীতে আসার জন্য, মহালয়ার দিনে পিতৃ পুরুষদের বিদায়ের পর মা তার পরিবারের সঙ্গে কৈলাস পর্বত থেকে নেমে আসেন। তাই মহালয়ার দিনে দেবী মাকে স্বাগত জানাতে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। প্রতি বছর নবরাত্রি শুরুর দিন অনুসারে দেবীর বাহন ভিন্ন হয়।

মহালয়ার পরদিন নবরাত্রির সূচনা

মহালয়ার পরদিনই নবরাত্রি উৎসবের সূচনা। এই দিনেই অনেকবাড়িতে দুর্গার মূর্তিতে চোখ আঁকা হয়। অনেক পরিবারে আবার মহালয়া থেকে দুর্গাপুজো শুরুও হয়।

মহালয়ার সাথে দুর্গাপূজার সম্পর্ক

দুর্গাপূজার সঙ্গে মহালয়ার বাস্তব সম্পর্ক এইটুকুই যে, এই দিনেই দুর্গার মূর্তি-কারিগরেরা অনেকেই দুর্গামূর্তির চক্ষুদান করেন। হয়তো বা এইজন্যেই যে মা জননী চোখ খুলেই দেখবেন তাঁর সন্তানেরা পিতা-মাতা পিতৃপুরুষকে ভোলে নি, মহালয়ার তর্পণ সেরেই তারা বিশ্বাত্মিকা জগজ্জননীর পূজা-আরাধনায় মন দেবে। পাঁচ দিনের সাড়ম্বর মাতৃতন্ত্র যেন পনেরো দিনের পিতৃতান্ত্রিকতাকে আগলে নিয়ে চলতে পারে।

বাঙালিদের কাছে মহালয়ার গুরুত্ব

বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে মহালয়ার গুরুত্ব বিশেষ উল্লেখযোগ্য। খুব জাঁকজমক করে পালিত হয় দুর্গোৎসব। মা দুর্গার প্রতি বিশ্বাসী লোকেরা অবিরাম এই দিনের জন্য অপেক্ষা করে এবং মহালয়া দিয়ে দুর্গাপুজো শুরু করে। নবরাত্রি ও দুর্গাপূজার শুরুর দিন হল মহালয়া। কথিত আছে মহালয়ার দিন পিতৃপুরুষদের বিদায় দেওয়া হয় এবং মাকে পৃথিবীতে স্বাগত জানানো হয়।

মহালয়ার সময় চণ্ডীপাঠ

শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল দেবীভাগবত পুরাণ। এই গ্রন্থটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হিন্দুপুরাণ। অন্যদিকে দুর্গাপুজো ও দুর্গাকে ঘিরে রয়েছে বহু পৌরাণিক কাহিনী। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল শ্রী শ্রী চণ্ডী। যা দেবীমাহাত্ম্যম নামে পরিচিত। মহালয়ার পর দেবীপক্ষের সময় এই চণ্ডীপাঠকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী শ্রবণ করা বাঙালির রক্তে রক্তে বিদ্যমান। আর এই চণ্ডীপাঠের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ হল দুর্গাপুজো।

মহাভারতের কাহিনীর সাথে মহালয়ার সম্পর্ক

  • (১) মহালয়ার সঙ্গে মহাভারতের কাহিনিও জড়িয়ে আছে। দাতা কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে অবস্থান কালে তাঁকে সোনা এবং বিভিন্ন রত্নদ্রব্য খাদ্য হিসাবে দেওয়া হয়। কর্ণ এর কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, তিনি কোনও দিন পিতৃপুরুষের উদ্দেশে খাদ্যদ্রব্য এবং জল দান করেন নি। তিনি কেবলমাত্র সোনা এবং রত্নই দান করেছেন। সেই কারণেই কর্ণকে স্বর্গলোকে সোনা বা রত্ন খাদ্য হিসাবে দান করা হবে।
  • (২) কর্ণ স্বীকার করেন, তিনি পিতৃপুরুষ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। সেই কারণে তিনি পিতৃপুরুষকে অন্ন এবং জল দান থেকে বিরত ছিলেন। কর্ণকে এক পক্ষকাল সময় দেওয়া হয় মর্ত্যলোকে গিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দান করে পিতৃপুরুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। এই সময়কাল ছিল পিতৃপক্ষ।

মহালয়ার দিন তর্পন করার কারণ

  • (১) কিংবদন্তি অনুসারে, স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝে অবস্থান করে পিতৃলোক। এই লোকের শাসনকর্তা যম, যিনি মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন পুরুষ পিতৃলোকে অবস্থান করেন। লোকবিশ্বাস, পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষের আত্মা তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে মর্ত্যলোকে আগমন করে। পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দান করলে পূর্বপুরুষের তৃষ্ণা নিবারণ হয়।
  • (২) হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে, মৃত ব্যক্তির বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে দান করা জলে তাঁদের তৃষ্ণা নিবারণ হয়। যাঁরা পূর্বপুরুষের বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে সক্ষম হন না, তাঁরা পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষকে জল দান করতে পারেন। পিতৃপক্ষ প্রেতকর্মের জন্য (শ্রাদ্ধ, তর্পণ, মৃত্যু সংক্রান্ত আচার বা কর্ম) প্রশস্ত, শুভ কর্মের জন্য নয়। অমাবস্যা তিথি প্রেতকর্মের পক্ষে সর্বোত্তম তিথি।
  • (৩) এই কারণে মহালয়ার দিন অর্থাৎ পিতৃপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জল দান বা তর্পণ প্রথা পালিত হয়। পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণে জল দানে পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ মেলে বলে মনে করা হয়। সনাতন বিশ্বাসে সাংসারিক সুখ, সমৃদ্ধি এবং শান্তি প্রাপ্তি হয়।

পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা

কথিত আছে, জ্যোতিষ মতে সারা বছর সুখে শান্তিতে বাঁচার জন্য এই দিন কিছু নিয়মকানুন মানা প্রয়োজন। যেমন –

  • (১) বিশিষ্ট জ্যোতিষী রামকৃষ্ণ দে জানান, অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া পালন করা হয়। শাস্ত্র মতে, মহালয়ার এই শুভলগ্নে বাড়িতে কোনও রকম অনুষ্ঠান, যেমন – বিবাহ অথবা বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি না কেনাই ভাল।
  • (২) মহালয়ার দিনে যিনি তর্পণ করবেন এই দিনটিতে ভুলেও চুল দাড়ি কাটবেন না। পাশাপাশি, এদিন ধূমপান কিংবা মদ্যপান করা উচিত নয়। মাটি খনন করাও উচিত নয়।
  • (৩) মহালয়ার এই বিশেষ দিনে আমিষ গ্রহণ করা উচিত নয়। পারলে এই দিনে সপরিবারে নিরামিষ খান। এই দিনে কাউকে ধার দেবেন না।
  • (৪) এই দিন বাড়িতে কোন‌ও ভিক্ষুক এলে তাকে খালি হাতে ফেরাবেন না। জ্যোতিষ মতে মহালয়ার দিন গরিব-দুঃখিকে বস্ত্র কিংবা খাবার দান করা ভীষণ শুভ বলে মনে করা হয়।

শুভ অশুভের দিন মহালয়া

মহালয়ার দিন পূর্বসূরিদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে জলদান করা হয়। যেহেতু এটা এক প্রকার শ্রাদ্ধ সেহেতু মনে করা হয় এটি একটি শোকের দিন। তাই অনেকেই দিনটিকে শুভ বলে মানতে নারাজ। আবার কেউ কেউ এই দিনকে শুভ বলে মনে করেন। যাঁরা এমনটা মনে করেন তাঁদের মতে এই দিন মাতৃপক্ষের সূচনা হয় বলে সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটে। দেবীর আসার আনন্দে চারদিক ভরে ওঠে। তাই এই দিনটি কখনই অশুভ হতে পারে না।

উপসংহার:- শুভ অশুভর দ্বন্দ্ব আছেই। থাকবেও যাঁর যাঁর বিশ্বাস অনুযায়ী। কারণ আমাদের শাস্ত্রে দিনটি শুভ না অশুভ সেটা আলাদা করে উল্লেখ নেই। কিন্তু এই বিশেষ দিনের হাত ধরে যাতে সমস্ত খারাপ কিছু নাশ হয়ে শুভ হয় সেটাই সকলে প্রার্থনা করেন। তাই শুভ মহালয়া লিখলেও যেমন দোষের নয়, আবার যাঁরা কেবল মহালয়া লেখেন সেটাও ভুল নয়। শুধু ‘হ্যাপি’ মহালয়া না লেখাই বাঞ্ছনীয়।

(FAQ) মহালয়া (Mahalaya) সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন তিথিতে মহালয়া উৎসব পালন করা হয়?

অমাবস্যা।

২. কোন বিশেষ দিনে তর্পন করা হয়?

মহালয়ার দিন।

৩. মা দুর্গার প্রতিমায় চোখ অঙ্কন করা হয় কোন দিন?

মহালয়ার দিন।

৪. দেবীপক্ষের সূচনা হয় কোন দিন?

মহালয়ার দিন।

৫. মহালয়া শব্দের অর্থ কি?

মহালয়া শব্দটির অর্থ হল মহান আলয় বা আশ্রম। এক্ষেত্রে দেবী দুর্গাই হলেন, সেই মহান আলয়।

Leave a Comment