বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা

বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে লর্ড কার্জনের অভিমত, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর, বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব, বঙ্গভঙ্গের পক্ষে যুক্তি, কেম্ব্রিজ গোষ্ঠীর মত, বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত কারণ হিসেবে বাঙালির ঐক্য ও সংহতি রোধ, বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, লর্ড কার্জনের মূল উদ্দেশ্য, কংগ্রেসকে দুর্বল করে দেওয়া, বাঙালিদের পৃথক করাকরা ও হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি সম্পর্কে জানবো।

বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা

প্রস্তাব গ্ৰহণ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই
কার্যকর১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর
প্রধান উদ্যোক্তালর্ড কার্জন
বঙ্গভঙ্গ রদ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ
বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা

ভূমিকা :- তৎকালীন ভারতবর্ষে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতেবাঙালি ছিল সর্বাগ্রগণ্য। জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বও ছিল বাঙালির হাতে। এক কথায়, বাঙালিই তখন সমগ্র ভারতকে পথ দেখাত।

কার্জনের অভিমত

বাঙালির এই প্রগতিশীল ও জাতীয়তাবাদী মনোভাবে ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন আতঙ্কিত হন। তাঁর মতে, বাংলা ছিল ‘অশান্তির উৎস’।

বঙ্গভঙ্গকার্যকর

রাজনৈতিক চেতনাসম্পন্ন বাঙালিকে দুর্বল করে সমগ্র ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে লর্ড কার্জনকার্জনের আমলে বাংলাদেশকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব কার্যকরী করা হয়।

বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলন

স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমগ্র বাংলা তথা ভারতে যে আন্দোলনের উদ্ভব হয়, তা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বা স্বদেশী আন্দোলন নামে খ্যাত।

বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব

  • (১) লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার উদ্ভাবক ছিলেন না। তাঁর শাসনকালের বহু পূর্ব থেকেই একাধিকবার বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
  • (২) ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের শাসনভার একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের ওপর অর্পিত হয়। পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ বাদ দিয়ে সমগ্র উত্তর ভারতই ছিল বাংলার অন্তর্ভুক্ত।
  • (৩) তখন বাংলার আয়তন ছিল ২,৫৩,০০০ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬০ লক্ষ। এত বড় একটি প্রদেশের শাসনভার কেবলমাত্র একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না।
  • (৪)১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যায়ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সুদূর কলকাতা থেকে ত্রাণকার্যের ঘোরতর অসুবিধা দেখা দেয়। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য অনেকেই তখন নানা ধরনের প্রস্তাব দেন, কিন্তু তৎকালীন বড়লাট লর্ড লরেন্স এই সব প্রস্তাবে রাজি হন নি।
  • (৫) ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ২০ লক্ষ মানুষ-সহ আসামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি পৃথক প্রদেশে পরিণত করা হয়। এই সময় গোয়ালপাড়া, কাছাড় ও শ্রীহট্ট তিনটি বাংলা ভাষাভাষী জেলাও আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।
  • (৬) আসামের খারাপ জলবায়ু ও নাগরিক জীবনের নানা অসুবিধার জন্য কোনও দায়িত্বশীল সিভিলিয়ান আসামে যেতে রাজি হতেন না।
  • (৭) ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে আসামের চিফ কমিশনার উইলিয়াম ওয়ার্ড বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বলে সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাদ্বয়কে আসামের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন, কিন্তু প্রবল গণবিক্ষোভের ফলে এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।
  • (৮) ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন যে, কার্জন ভারতে আসার আগেই ইংরেজ সিভিলিয়ানরা বঙ্গ -ব্যবচ্ছেদের কথা ভেবেছিলেন এবং এর পশ্চাতে হয়তো প্রশাসনিক কারণই বড় ছিল।
  • (৯)বড়লাট হিসেবে ভারতে এসে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে কার্জন যখন আসাম পরিভ্রমণে যান তখন সেখানকার চা-বাগানের ইংরেজ মালিকরা তাকে বোঝান যে, আসাম থেকে কলকাতা বন্দরে চা পাঠাতে বিরাট রেলভাড়া পড়ে। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি ঘটিয়ে তা আসামের সঙ্গে যুক্ত করলে তাঁদের খুব সুবিধা হবে।
  • (১০) এই সময় কার্জন বাংলা, আসাম, মধ্যপ্রদেশ ও মাদ্রাজের বৈজ্ঞানিক সীমানা-বিন্যাসের কথা ভাবছিলেন—তখনও এর পেছনে কোনও রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল না।
  • (১১) ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে মার্চ বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যান্ড্রু ফ্রেজার আবার নতুন করে এক বঙ্গ ভঙ্গের প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব হাবার্ট রিসলে স্থির করেন যে, সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগ এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই পরিকল্পনা ‘রিসলে পরিকল্পনা’ (৩রা ডিসেম্বর, ১৯০৩ খ্রিঃ) নামে খ্যাত।
  • (১২) ডঃ ত্রিপাঠী বলেন যে, রিসলে পরিকল্পনা প্রকাশিত হওয়ার পরই কার্জনের কণ্ঠে রাজনৈতিক সুর শোনা যায়। তিনি বলেন যে, বাংলা-ভাগের এই পরিকল্পনা কার্জনের নয়—তা ছিল ফ্রেজারের মস্তিষ্ক প্রসূত এবং রিসলে অনুমোদিত।
  • (১৩) এটি ছিল চরমপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি ‘চ্যালেঞ্জ’ (“the first scheme of partition was a counterblast to Extremism, “)। ফ্রেজার ও রিসলে দু’জনেই মনে করতেন যে, চরমপন্থী আন্দোলন দমনের জন্য বাংলা ভাগ প্রয়োজন।
  • (১৪) ডঃ ত্রিপাঠী আরও বলেন যে, শ্বেতাঙ্গ আমলারা ভাইসরয়দের কীভাবে হাতের মুঠোয় রাখতেন বাংলা-ভাগের এই পরিকল্পনা তার প্রমাণ। এই পরিকল্পনা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশময় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে—এমনকী ইওরোপীয়দের মুখপত্র ইংলিশম্যানপত্রিকা এবং ইউরোপীয় বণিক সংঘগুলিও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
  • (১৫) প্রতিবাদের ব্যাপকতা লক্ষ্য করে কার্জন এই পরিকল্পনা রদ করেন এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে দলে টানার উদ্দেশ্যে ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করে মুসলিম জনসাধারণের সামনে নতুন আশার আলো তুলে ধরেন।
  • (১৬) মুসলিমদের বোঝানো হয় যে, বঙ্গভঙ্গ হলে মুসলিমদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তিনি ঢাকার নবাব সলিমুল্লাকে নামমাত্র সুদে ১ লক্ষ পাউণ্ড হার দেবার ব্যবস্থা করেন। এইভাবে তিনি মুসলিম সমর্থন লাভে প্রয়াসী হন।
  • (১৭) গোপনে বঙ্গভঙ্গের একটি নতুন পরিকল্পনা তৈরি হতে থাকে। নতুন পরিকল্পনা অনুসারে স্থির হয় যে, ঢাকা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, রাজসাহী বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, মালদহ জেলা এবং দার্জিলিং—অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হবে। এর রাজধানী হবে ঢাকা এবং শাসনভার থাকবে একজন ছোটলাট বা লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে।
  • (১৮) অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হবে মূল ‘বাংলা প্রদেশ” (‘Bengal’) এবং তার রাজধানী হবে কলকাতা।

বঙ্গভঙ্গের পক্ষে যুক্তি

এই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে কার্জন যুক্তি দেখান যে,

  • (১) মাত্র একজন গভর্নরের পক্ষে বাংলা বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত এতবড় একটি প্রদেশের শাসনভার বহন করা সম্ভব নয়।
  • (২) সুদূর কলকাতা থেকে দুর্গম পূর্ব বাংলাকে ভালোভাবে শাসন করা সম্ভব হচ্ছে না।
  • (৩) কলকাতা-কেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের জন্য পূর্ববঙ্গ, আসাম ও উড়িষ্যায় উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। মুসলিম-প্রধান পূর্ববঙ্গ হিন্দুদের প্রভাব থেকে মুক্ত হলে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেক সুবিধা হবে।
  • (৪) স্বতন্ত্র প্রদেশ হিসেবে গঠিত হলেও আসাম অবহেলিত ছিল। কোনও দক্ষ কর্মচারী সেখানে যেতে চাইত না। তাই আসাম পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হলে সেখানে একটি দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
  • (৫) স্বরাষ্ট্র সচিব রিসলে যুক্তি দেখান যে, আসাম পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হলে আসামের চা, তেল, কয়লা প্রভৃতি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কম খরচে বাইরে রপ্তানি করা যাবে।
  • (৬) সুতরাং সরকারি মতে শাসনতান্ত্রিক সুবিধা, অবহেলিত আসাম প্রদেশের উন্নতি এবং ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম ও উড়িয়া সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের জন্য বঙ্গভঙ্গ অপরিহার্য।

কেম্ব্রিজ গোষ্ঠীর মত

  • (১) সাম্প্রতিককালে কেম্ব্রিজ গোষ্ঠীর ঐতিহাসিকরা প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তিগুলিকে মেনে নিয়ে বলেন যে, বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের পশ্চাতে কোনও আদর্শবাদ বা মহৎ প্রেরণা ছিল না।
  • (২) সাধারণ মানুষের সঙ্গেও এই আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক ছিল না। বঙ্গভঙ্গের ফলে, সমাজের তথাকথিত ‘এলিট’ গোষ্ঠীর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এবং তাঁরাই এই আন্দোলন গড়ে তোলেন।
  • (৩) বিক্রমপুর ও পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত হিন্দুরা আশঙ্কা করে যে, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে উভয় বাংলায় নিম্ন সরকারি পদগুলি যা প্রায় তাঁদের একচেটিয়া হয়ে আছে, সেগুলি থেকে তাঁরা বঞ্চিত হবেন।
  • (৪) যে সব জমিদারের দুই বাংলায় জমিদারি ছিল তাঁরা দুই প্রদেশে জমিদারি পরিচালনার জন্য বেশি আমলা, উকিল প্রভৃতি রাখতে বাধ্য হবেন। এতে তাঁদের প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
  • (৫) ভাগ্যকুলের রায় পরিবার কলকাতায় একচেটিয়া পাট ও চালের ব্যবসা করতেন। নতুন প্রদেশ গঠিত হলে নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র ঢাকা ও চট্টগ্রামের উত্থানের আশঙ্কায় তাঁরা আতঙ্কিত হন।
  • (৬) কলকাতার আইনজীবীরা পূর্ববঙ্গে তাঁদের মক্কেল হারাবার এবং কলকাতার সংবাদপত্রগুলি পূর্ববঙ্গে তাদের বাজার হারাবার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হন।
  • (৭) যে সব রাজনৈতিক নেতা পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলার আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তাঁরা শঙ্কিত হন এবং কলকাতার গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকদের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ে।

বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত কারণ

বলা বাহুল্য, বঙ্গভঙ্গের জন্য লর্ড কার্জন শাসনতান্ত্রিক সুবিধার কথা বললেও তা গ্রহণযোগ্য ছিল না এবং কেম্ব্রিজ গোষ্ঠীর বক্তব্যও কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন –

(১) বাঙালির ঐক্য ও সংহতি বোধ

এই সময় সর্বস্তরের বাঙালির মধ্যে যে ঐক্য, সংহতি, স্বাজাত্যবোধ ও জাতীয় চেতনার সঞ্চার হয়েছিল কেম্ব্রিজ ঐতিহাসিকরা তা  বুঝতে পারেন নি। এই ঐক্যবোধ ও আত্মসচেতনতাই বাঙালিকে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রণোদিত করেছিল।

(২) বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা করেন। বাংলার বিশাল আয়তনই যদি মূল সমস্যা হত, তাহলে জাতীয় কংগ্রেসের প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলা থেকে উড়িষ্যা ও বিহারকে পৃথক করে বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষদের একসঙ্গে রাখা যেত। ক্যাম্পবেল, কটন, স্টিভেনস্, বাল্যাণ্ড প্রমুখ রাজকর্মচারী এবং বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ এই প্রস্তাবই দিয়েছিলেন।

(৩) কার্জনের মূল উদ্দেশ্য

প্রকৃতপক্ষে কার্জনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যমণি বাঙালিকে দুর্বল করে জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বলতর করে দেওয়া।

(৪) কংগ্রেস দুর্বল করে দেওয়া

নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে ৩ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ছিল মুসলিম এবং হিন্দু ছিল ১ কোটি ২০ লক্ষ। ‘বাংলা প্রদেশে’ বাঙালি হিন্দুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭০ লক্ষ এবং অপরদিকে হিন্দি ও উড়িয়া ভাষা ভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭০ লক্ষ। তাঁর পরিকল্পনা কার্যকরী হলে নবগঠিত দু’টি প্রদেশেই রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলত এবং এতে কংগ্রেসও দুর্বল হয়ে পড়ত।

(৫) ওল্ডহ্যামের অভিমত

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ওল্ডহ্যাম বঙ্গভঙ্গের সমর্থনে এক গোপন পত্রে লেখেন যে, এর ফলে “সংখ্যালঘু হিন্দুদের রাজনৈতিক প্রাধান্য অনেক কমে যাবে।”

(৬) বাঙালিদের পৃথক করা

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বাংলার গভর্নর ফ্রেজারকে লেখেন, “পূর্ববঙ্গের জেলাগুলির বাঙালিরা রাজদ্রোহাত্মক আন্দোলনকে উৎসাহ দেয়। অতএব তাদের বাকি প্রদেশ থেকে পৃথক করার প্রস্তাবের সপক্ষে এর চেয়ে দামি কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।”

(৭) রিসলের অভিমত

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বরস্বরাষ্ট্র সচিব রিসলে লেখেন যে, “ঐক্যবদ্ধ বাংলা একটি শক্তি। বিভক্ত বাংলা নানা টানা-পোড়েনে পর্যুদস্ত হবে। এটি খুব খাঁটি কথা এবং বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের সপক্ষে এটিই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ব্রিটিশ-বিরোধী দৃঢ়বদ্ধ দলটিকে ভেঙ্গে দুর্বল করে দেওয়া।”

(৮) হার্ডিঞ্জের অভিমত

পরবর্তীকালে বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ লেখেন প্রশাসনিক সুবিধাই যে বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ তাতে কোনও সন্দেহ নেই।কিন্তু এই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করার সময় বাঙালিদের ওপর একটি কঠিন আঘাত হানার ইচ্ছা অন্য উদ্দেশ্যগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

(৯) বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দুর্বল করে দেওয়া

হেনরি কটন (Henry Cotton)-এর মতে, প্রশাসনিক সুবিধা নয়—বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই কার্জন এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

(১০) হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি

কেবলমাত্র এই ই নয়— বাংলাকে দু টুকরো করে লর্ড কার্জন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করতে সচেষ্ট হন। তিনি মনে করেছিলেন যে, এই ভেদনীতির সাহায্যে তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থকে পরিণত করতে সক্ষম হবেন।

(১১) মিন্টো-র অভিমত

কার্জনের পরবর্তী বড়লাট লর্ড মিন্টো-র মতে, “শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও, আমার মতে বঙ্গভঙ্গ একান্ত প্রয়োজনীয়।”

উপসংহার :- বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে লর্ড কার্জন আসামের চা বাগিচাগুলির ইংরেজ মালিকদের স্বার্থরক্ষার কথাও চিন্তা করেছিলেন। এই সব চা-বাগিচার ইংরেজ মালিকরা তাকে বোঝান যে, পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে যদি আসামকে রেলপথে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা হয় তাহলে আসাম থেকে কলকাতা বন্দরে চা আনার খরচ অনেক কমে যাবে। বলা বাহুলা, তিনি ব্রিটিশ পুঁজির স্বার্থ সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন।

(FAQ) বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা করেন কে?

বড়লাট লর্ড কার্জন।

২. বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব গৃহীত হয় কবে?

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই।

৩. বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয় কবে?

১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর।

৪. বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় কবে?

১৯১১ খ্রিস্টাব্দে

Leave a Reply

Translate »