অমৃতবাজার পত্রিকা

অমৃতবাজার পত্রিকা -র আত্মপ্রকাশ, প্রথম সম্পাদক, নামকরণ, পটভূমি, পত্রিকার ধরণ, দ্বিভাষিক সংবাদপত্র, প্রভাব, শোষণের বিরোধিতা, সম্প্রীতি রক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

অমৃতবাজার পত্রিকা

ধরণদৈনিক সংবাদপত্র
প্রতিষ্ঠাতাশিশির কুমার ঘোষ এবং মতিলাল ঘোষ
প্রতিষ্ঠাকাল২০ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ
ভাষাবাংলা এবং ইংরেজি (দ্বিভাষিক)
অমৃতবাজার পত্রিকা

ভূমিকা :- ভারতীয় প্রাচীন বাংলা ভাষার অন্যতম দৈনিক সংবাদপত্র হল অমৃতবাজার পত্রিকা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকালে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রথম প্রকাশ

১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি অমৃতবাজার পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়।

আত্মপ্রকাশ

১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ২০শে ফেব্রুয়ারি যশোর জেলার (অধুনা বাংলাদেশ) অমৃত বাজার গ্রামে এক বাংলা সাপ্তাহিক পত্ররূপে অমৃতবাজার পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করেছিল।

প্রতিষ্ঠাতা

ব্রিটিশ শাসনকালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির যশোর জেলার মাগুরার (অধুনা বাংলাদেশ) ধনী ব্যবসায়ী হরি নারায়ণ ঘোষের দুই পুত্র শিশির ঘোষ এবং মতি লাল ঘোষ এই সংবাদপত্র শুরু করেছিলেন।

প্রথম সম্পাদক

এই পত্রিকা প্রথম সম্পাদনা করেছিলেন শিশির কুমার ঘোষ এবং যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন মতিলাল ঘোষ, যাঁর প্রথাগত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছিল না।

মুদ্রণ যন্ত্র

৩২ টাকা দিয়ে কেনা পেটানো কাঠের মুদ্রণ যন্ত্রের সাহায্যে এই পত্রিকা ছাপা হয়েছিল।

নামকরণ

হরি নারায়ণ ঘোষের স্ত্রী অমৃতময়ীর নামে এই পরিবার একটি বাজার তৈরি করেছিল। এই অমৃতবাজার নাম থেকেই পত্রিকার নামকরণ করা হয় অমৃতবাজার পত্রিকা।

পটভূমি

নীলকর সাহেবরা যে সকল কৃষককে শোষণ করত তাদের পক্ষে লড়াইয়ের জন্য ঘোষ ভাইয়েরা এই পত্রিকা শুরু করেছিলেন।

সাপ্তাহিক পত্রিকা

শিশির ঘোষ এবং মতি লাল ঘোষ প্রথমে সাপ্তাহিক পত্র হিসেবে অমৃতবাজার পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন।

প্রচারিত স্থান

মূলত বাংলা লিপিতে প্রকাশিত প্রথম দ্বিভাষিক থেকে ইংরেজি বিন্যাসে বিবর্তিত হয়ে কলকাতা এবং অন্যান্য স্থান যেমন কটক, রাঁচি এবং এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত হত।

প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকা

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় -এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত বেঙ্গলি পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে উঠে এই পত্রিকা নিজের পাঠককুল তৈরী করেছিল।

তুষারকান্তি ঘোষের অবদান

শিশির ঘোষের অবসর নেওয়ার পর তার পুত্র তুষারকান্তি ঘোষ ১৯৩১ থেকে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পরবর্তী ষাট বছর সম্পাদনা করে পত্রিকাটি পরিচালনা করেন।

প্রকাশনা বন্ধ

এই সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশিত হওয়ার ১২৩ বছর পর ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পুরোনো ইংরেজি পত্রিকা

অমৃত বাজার পত্রিকা ছিল কোনো ভারতীয় মালিকানায় পরিচালিত সবথেকে পুরোনো ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা।

গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি

এই পত্রিকা ভারতীয় সাংবাদিকতার বিবর্তন ও বিকাশে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

লেনিনের অভিমত

১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লবী ভ্লাদিমির লেনিন এই পত্রিকাকে ভারতের সেরা জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র বলে বর্ণনা করেছিলেন।

স্থানান্তর

অমৃত বাজারে প্লেগ রোগের প্রকোপ দেখা দিলে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ২১ শে ডিসেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকা কলকাতার বৌবাজারে স্থানান্তরিত হয়। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত বৌবাজার থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে বাগবাজারে স্থানান্তরিত হয়।

 দ্বিভাষিক সংবাদপত্র

ইংরেজি এবং বাংলা দুই ভাষাতেই সংবাদ ও মতামত প্রকাশ করে কলকাতায় এই পত্রিকা একটি দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক হিসেবে চালু হয়।  

বিপুল প্রভাব

এই পত্রিকার সরকার-বিরোধী মতামত এবং জনগণের মধ্যে বিপুল প্রভাবের ফলে সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।

আইন জারি

ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিটন প্রধানত এই পত্রিকার বিরুদ্ধেই ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ই মার্চ ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’ প্রবর্তন করেছিলেন।

ইংরেজি ভাষায় পরিবর্তন

শিশিরকুমার ঘোষ এই বাংলা পত্রিকাকে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২১শে মার্চ ইংরাজী সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরিবর্তিত করেন।

প্রথম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি দৈনিক সংবাদপত্রে পরিণত হয়। ভারতীয় মালিকানার দৈনিক সংবাদপত্র গুলির মধ্যে এটিই প্রথম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চালু করে।

শোষণের বিরোধিতা

শিশির কুমার ঘোষও সীমাবদ্ধ নাগরিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে প্রচারে নেমেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন প্রশাসনে ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হোক।

তিলকের সংস্পর্শ

তিনি এবং তার ভাই মতিলাল, বাল গঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিলক যখন রাষ্ট্রদ্রোহের কারণে অভিযুক্ত হন, তার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে তারা কলকাতায় তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন।

সম্পাদকীয় প্রকাশ

যে বিচারক তিলকের কারাবাসের সাজা শুনিয়েছিলেন তারা তার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে সম্পাদকীয়ও প্রকাশ করেছিলেন, ‘একজন পরীক্ষিত এবং অতুলনীয় দেশপ্রেমী দুঃসাহসিকভাবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকতার শিক্ষা দেয়।’

কার্জনের সমালোচনা

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের জন্য ভাইসরয় লর্ড কার্জনকে এই পত্রিকায় ‘নবীন এবং সামান্য সারবত্তাহীন, অতীত কসরত ব্যতিরেকে কিন্তু অসীম শক্তি দিয়ে নিয়োজিত’ বলা হয়েছিল।

প্রেস অ্যাক্ট

লর্ড কার্জনকে সমালোচনা করার জন্য ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের প্রেস অ্যাক্ট পাস করে এই পত্রিকা থেকে ৫০০০ টাকা দাবি করা হয়েছিল। মতিলাল ঘোষের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু তার বাক্-পটুতা তাঁকে জিতিয়ে দেয়।

প্রেসিডেন্সি কলেজে হস্তক্ষেপ

সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য ছাত্র কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, এই পত্রিকা তাঁদের বিষয়গুলো অধিগ্রহণ করেছিল এবং তাঁদেরকে পুনরায় ভর্তির ব্যাপারে সফল হয়েছিল।

তুষারকান্তি ঘোষের কারাদণ্ড

লবণ সত্যাগ্রহ -এর সময় এই পত্রিকা থেকে ১০০০০ টাকার উচ্চ জামানত দাবি করা হয়েছিল। পত্রিকার সম্পাদক তুষার কান্তি ঘোষের কারাদণ্ডও হয়েছিল।

শেয়ার প্রদান

গান্ধিজির নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামে সাফল্যের উদ্দেশ্যে পত্রিকার শেয়ার দান করেছিল এবং ব্রিটিশ শাসকদের হাতে তার মতামত এবং কাজকর্মের জন্যে জবাবদিহি করতে হতো।

সম্প্রীতি রক্ষা

ভারত বিভাজনের সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকে এই পত্রিকা সমর্থন করেছিল। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ সময়কালে পত্রিকা তিন দিন ধরে তার সম্পাদকীয় স্তম্ভ ফাঁকা রেখে দিয়েছিল।

স্বাধীনতার পর সম্পাদকীয়

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট যখন স্বাধীনতার ভোর হয়, পত্রিকা এক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে, ‘এই হল ভোর, যদিও এটা মেঘাচ্ছন্ন। বর্তমানের সূর্যালোক একে ভাঙবে।’

সংরক্ষণ

  • (১) বর্তমানে অমৃতবাজার পত্রিকাটি নয়াদিল্লির জাতীয় বিজ্ঞান কেন্দ্রে রয়েছে।
  • (২) ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে প্রকাশিত পাঠ্য উদ্ধার করার প্রয়াসে ‘বিপন্ন আর্কাইভ প্রকল্প’-এর অংশ হিসাবে, সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা ২০১০ সালে পুরানো সংবাদপত্রগুলিকে (এবিপি এবং যুগান্তর) নিরাপদে সংরক্ষণ এবং পুণরুদ্ধারের জন্য ডিজিটালকরণের প্রকল্প গ্রহণ করে।
  • (৩) পত্রিকাটির সংরক্ষণগুলি নেহেরু স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগার, দিল্লিতে পাওয়া যায় এবং ২০১১ সালে গ্রন্থাগারটি কর্তৃক পত্রিকাটির এক লক্ষেরও বেশি চিত্র ডিজিটালকরণ করা হয়,  যা অনলাইনে উপলব্ধ।
  • (৪) কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় শিক্ষা কেন্দ্রেও এগুলি পাওয়া যায়।

উপসংহার :- অমৃতবাজার পত্রিকা ছিল অবিভক্ত ভারতে সম্পূর্ণ দেশীয় মালিকানায় প্রকাশিত প্রাচীনতম ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র।

(FAQ) অমৃতবাজার পত্রিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. অমৃতবাজার পত্রিকার প্রথম সম্পাদক কে ছিলেন?

শিশির কুমার ঘোষ।

২. অমৃতবাজার পত্রিকা প্রথম কবে প্রকাশিত হয়?

১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি।

৩. ভারতের সাংবাদিকতার জনক কে?

জেমস অগাস্টাস হিকি।

Leave a Reply

Translate »