জাহাঙ্গীর

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর -এর জন্ম, সিংহাসনে আরোহণ, উপাধি, শিখ গুরুকে হত্যা, প্রশাসনিক বিধি, সাম্রাজ্য বিস্তার, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সম্পর্ক, নূরজাহানের অবদান, নূরজাহান চক্র, সম্রাটের কর্ম, স্থাপত্য, চিত্রকলা ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

জাহাঙ্গীর (১৬০৫-১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ)

জন্ম৩০ আগস্ট ১৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যু২৮ অক্টোবর ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ
পরিচিতিচতুর্থ মুঘল সম্রাট
রাজত্ব১৬০৫-১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিআকবর
উত্তরসূরিশাহজাহান
জাহাঙ্গীর

ভূমিকা :- মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট ছিলেন নূর উদ্দিন মহম্মদ সেলিম বা জাহাঙ্গীর। তিনি ১৬০৫ – ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর রাজকীয় নামটির (ফার্সী ভাষায়) অর্থ ‘বিশ্বের বিজয়ী’, ‘বিশ্ব-বিজয়ী’।

জন্ম

শাহজাদা সেলিম, পরে জাহাঙ্গীর ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট ফতেপুর সিক্রিতে আকবর এবং তার স্ত্রী অম্বররাজা বিহারিমলের কন্যা মরিয়ম-উজ-জামানির গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।

নাম

সেলিমের নাম ছিল শেখ সেলিম, যদিও আকবর তাকে সবসময় শেখু বাবা বলে ডাকতেন।

সিংহাসনে আরোহণ

১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র সেলিম ‘নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ গাজি’ নাম নিয়ে আগ্রা দুর্গে সিংহাসন আরোহণ করেন।

উপাধি

জাহাঙ্গিরের উপাধি ছিল ‘নূরউদ্দিন’। নূরউদ্দিন শব্দের অর্থ হল ‘সত্যের আলো’। আকবর জাহাঙ্গিরকে ‘শেকোবাবা’ বলে ডাকতেন।  ‘জাহাঙ্গির’ শব্দের অর্থ হল জগতের মালিক।

আত্মজীবনী

জাহাঙ্গিরের শিক্ষকের নাম ‘আবদুর রহিম-খান-ই-খানান’। জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি’ ফার্সি ভাষায় রচিত।

শিখগুরুকে হত্যা

জাহাঙ্গীর শিখগুরু অর্জুনকে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে হত্যা করেন। কারণ অর্জুন জাহাঙ্গিরের বিদ্রোহী পুত্র খসরুকে আশ্রয় দান ও সাহায্য করায় বাদশাহ তাঁকে অপছন্দ করতেন। জাহাঙ্গীর হরগোবিন্দকে গোয়ালিয়র জেলে ১২ বছর বন্দি করে রেখেছিলেন।

বিবাহ

জাহাঙ্গিরের দুই পত্নী হলেন যোধাবাঈ ও নূরজাহান

প্রশাসনিক বিধি

সিংহাসন আরোহণের পর জাহাঙ্গীর কিছু প্রজা কল্যাণমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

  • (১) তিনি ‘অমঘা’ বা ‘বিশেষ বাণিজ্য শুল্ক’ ও ‘মীর বাহরি’ বা জলপথে বাহিত পণ্যশুল্ক নিষিদ্ধ করেন।
  • (২) তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার ও রবিবার পশুহত্যা নিষিদ্ধ করেন।
  • (৩) সিংহাসন আরোহণের পর জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, আগ্রা দুর্গ থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত ৬০টি ঘণ্টা যুক্ত, ৩০ গজ লম্বা একটি সোনার শিকল প্রস্তর স্তম্ভে ঝুলিয়ে রাখতেন, যাতে বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি সম্রাটের কাছে হাজির হতে পারে।

সাম্রাজ্য বিস্তার

আকবরের নীতি অনুসরণ করে জাহাঙ্গীরও রাজ্যবিস্তারে মনোযোগী হন।

(ক) মেবার

তিনি প্রথম মেবার জয়ের পরিকল্পনা করেন। সেই সময় মেবারের অধিপতি ছিলেন রানা প্রতাপের পুত্র অমরসিংহ। জাহাঙ্গীর মেবারের বিরুদ্ধে পরপর কয়েকটি অভিযান পাঠান এবং শেষপর্যন্ত রানা অমর সিংহ ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হন।

(খ) বাংলা

  • (১) কররানী বংশের পতনের পর বাংলাদেশে ‘বারো ভূঁইয়া’ নামে পরিচিত হিন্দু ও মুসলমান জমিদাররা মুঘলদের নানাভাবে বিব্রত করে তুলেছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্য, মুসা খান, ঈশা খান, খাজা ওসমান প্রমুখ।
  • (২) ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গিরের ঘনিষ্ঠ শেখ সেলিম চিশতির পৌত্র ইসলাম খান ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এক এক করে ভূঁইয়াদের পরাস্ত করে বাংলায় মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। কোচবিহারের একাংশে এবং শ্রীহট্ট ও কাছাড় জেলাতেও মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৩) ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য জাহাঙ্গীর কাঙড়া ভ্রমণে এসে দুর্গের অভ্যন্তরে খুৎবা পাঠ করেন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন।

(গ) দাক্ষিণাত্য জয়

এরপর জাহাঙ্গীর দাক্ষিণাত্যে রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হন।

  • (১) আকবরের আমলে আহম্মদনগরের পতন হলেও তার একাংশে আহম্মদনগরের মন্ত্রী মালিক অম্বর রাজস্ব সংস্কার করে রাজ্যকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। মালিক অম্বরকে ‘মারাঠা’ ও ‘গেরিলা যুদ্ধের নায়ক বলা হয়।
  • (২) ১৬০৮, ১৬১০, ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে শাহজাদা পারভেজের অধীনে আহম্মদনগরের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গিরের প্রেরিত তিনটি অভিযান ব্যর্থ হয়। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর পারভেজকে এলাহাবাদ বদলি করেন।
  • (৩) এরপর জাহাঙ্গীর দাক্ষিণাত্যের যাবতীয় দায়িত্ব খুররমের হাতে অর্পণ করেন। খুররমের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মালিক অন্বর পরাজিত হন। মালিক অম্বরকে পরাস্ত করার পুরস্কার হিসাবে সম্রাট জাহাঙ্গীর শাহজাদা খুররমকে ‘শাহজাহান’ বা ‘জগতের অধিপতি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • (৪) কিন্তু এই সময় খুররম বিদ্রোহ করলে জাহাঙ্গীর যুবরাজ পারভেজ ও সেনাপতি মহাবৎ খানকে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। শেষপর্যন্ত শাহজাহান সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করলে মালিক অম্বর যুদ্ধ পরিত্যাগ করেন এবং ১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

(ঘ) কান্দাহার হাতছাড়া

মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত কান্দাহারের আধিপত্য নিয়ে মুঘল ও পারস্যের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকত। আকবরের আমলে কান্দাহার মুঘল সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত করা হয়েছিল। ১৬২২ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গিরের আমলে পারস্যের শাসক শাহ আব্বাস কান্দাহার পুনর্দখল করেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

  • (১) ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বাণিজ্য প্রসারে উদ্যোগী হয় এবং কোম্পানির প্রতিনিধি হিসাবে ক্যাপ্টেন হকিন্স ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের অনুরোধপত্র নিয়ে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গিরে দরবারে আসেন। জাহাঙ্গীর ক্যাপ্টেন হাকিন্সকে ‘খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • (২) এরপর একই উদ্দেশ্যে এডওয়ার্ডের নেতৃত্বে অপর একটি দৌত্য পাঠানো হয়। শেষপর্যন্ত প্রথম জেমসের দূত হিসাবে স্যার টমাস রো ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গিরের দরবারে আসেন এবং কিছু বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা লাভ করেন।

নূরজাহান

  • (১) নূরজাহানের পূর্বনাম ছিল মেহেরউন্নিসা। মুতামিদ খান লিখিত ইকবালনামা-ই-জাহাঙ্গিরি থেকে জানা যায় যে মেহেরউন্নিসা ছিলেন পারস্য দেশীয় মির্জা গিয়াস বেগ নামে এক ইরানির কন্যা।
  • (২) ভাগ্যানুসন্ধানে গিয়াস বেগের ভারত আসার পথে কান্দাহারে মেহেরউন্নিসার জন্ম হয়। ১৭ বছরের আলিকুলি বেগ বা আলিকুলি ইস্তাজার নামে এক ইরানি যুবকের সঙ্গে মেহেরউন্নিসার বিবাহ হয়। আলিকুলি পরে বর্ধমানের জায়গিরদার নিযুক্ত হন এবং ‘শের আফগান’ উপাধি লাভ করেন।
  • (৩) বাংলার সুবাদার কুতুবউদ্দিন খানের সাথে সংঘর্ষে শের আফগানের মৃত্যু হয়। মেহেরউন্নিসা ও প্রথম কন্যা লাডলি বেগমকে আগ্রায় পাঠানো হয়।
  • (৪) ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর মীনাবাজারে বিধবা মেহেরউন্নিসাকে দেখে আকৃষ্ট হন এবং বিবাহ করেন। জাহাঙ্গীর তাঁকে প্রথমে ‘নূরমহল’ বা ‘প্রাসাদের আলো’ ও পরে ‘নূরজাহান’ বা ‘জগতের আলো’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • (৫) শেষপর্যন্ত তাকে ‘পাদশাহ’ বা ‘বাদশাহ বেগম’ বলা হত। নূরজাহান পিতা মির্জা গিয়াস বেগের স্মৃতিতে আগ্রায় ইতিমাদউদৌল্লার সমাধি সৌধ নির্মাণ করেন।

নূরজাহান চক্র

সম্রাট জাহাঙ্গিরের বিলাসপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তাঁর পত্নী নূরজাহান পিতা মির্জা গিয়াস বেগ, ভ্রাতা আসফ খান এবং শাহজাদা খুররমকে নিয়ে দরবারে ‘নূরজাহান চক্র’ নামে একটি ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।

ধর্ম

তিনি সার্বজনীন বিতর্কে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের অংশগ্রহণ করতে দিতেন। তিনি কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বারণ করতেন। তিনি সকল প্রকার ধর্মের লোকেদের থেকে সমান খাজনা নিতেন। থমাস রো, এডওয়ার্ড টেরি-সহ অনেকেই তার এইপ্রকার আচরণের প্রশংসা করেন।

সাহিত্য

আকবরের মত জাহাঙ্গীরও ভাষা, সাহিত্যর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গী আত্মজীবনী রচনা করেন তার নাম তুজুক- ই – জাহাঙ্গীর। তাঁর সময়ে রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল মাসরি -ই- জাহাঙ্গীর, ইকবাল নামা -ই – জাহাঙ্গীর ইত্যাদি।

চিত্রকলা

সম্রাট জাহাঙ্গীর শাসনকালেই মুঘল চিত্রশিল্পের স্বর্ণ যুগ শুরু হয়। তিনি নিজেও ছিলেন দক্ষ চিত্রকর। তিনি রাজনৈতিক ঘটনা, প্রাকৃতিক দৃশ্য, জীবজন্তু, পুষ্প প্রভৃতি প্রকৃতিবাদী চিত্রের অতিরিক্ত উৎসাহী ছিলেন । তাঁর সময়কালে ওস্তাদ মুনসুর, মহেশ দাস, বিষেণ দাস, ফারুক বেগ প্রমুখ ছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর।

সঙ্গীত

জাহাঙ্গিরের দরবারে জগন্নাথ, জনার্দন, ভট্ট প্রমুখ সংগীতজ্ঞ উপস্থিত থাকতেন।

স্থাপত্য

তাঁর আমলে আকবরের সমাধি সৌধ সেকেন্দ্রাবাদের নির্মাণ কার্য শেষ হয়। এছাড়াও ইতিমাদউদৌল্লার সমাধি, বহু মসজিদ ও উদ্যান নির্মিত হয়।

মৃত্যু

১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে লাহোরের কাছে রাজৌরি নামক স্থানে জাহাঙ্গিরের মৃত্যু হয় এবং লাহোরের শাহদারায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

উপসংহার :- বিশাল ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তীতুল্য মেধার অধিকারী আকবরের পর সম্রাট হিসেবে মূল্যায়ন করলে যে কাউকেই নিষ্প্রভ মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবু জাহাঙ্গীর পিতার যোগ্য উত্তরসূরীই ছিলেন বলতে হয়।

(FAQ) সম্রাট জাহাঙ্গীর সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সম্রাট জাহাঙ্গীরের মাতার নাম কী?

মরিয়ম-উজ-জামানি।

২. সম্রাট জাহাঙ্গিরের পিতার নাম কী? – আকবর

আকবর।

৩. সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনীর নাম কী?

‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি।

Leave a Reply

Translate »