শাহজাহান

মুঘল সম্রাট শাহজাহান -এর জন্ম, সেনাপতি জীবন, সিংহাসনে আরোহণ, রাজত্বকাল, উপাধি, বিবাহ, বিদ্রোহ দমন, স্থাপত, চিত্রকলা, মুদ্রা, সম্রাটের শেষ জীবন ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

শাহজাহান (১৬২৭-১৬৫৮)

জন্ম৫ জানুয়ারি ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু২২ জানুয়ারি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ
পরিচিতিপঞ্চম মুঘল সম্রাট
রাজত্বকাল১৬২৭-১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিজাহাঙ্গীর (পিতা)
উত্তরসূরিঔরঙ্গজেব (পুত্র)
শাহজাহান

ভূমিকা :- শাহজাহান ছিলেন জাহাঙ্গিরের তৃতীয় পুত্র এবং তাঁর প্রকৃত নাম খুররম্। জাহাঙ্গিরের রাজপুত স্ত্রী যোধাবাঈ বা জগৎ গোঁসাইয়ের গর্ভজাত সন্তান হলেন শাহজাহান।

জন্ম

১৫৯২ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি শাহবুদ্দিন মুহাম্মদ খুররমের জন্ম হয়। সিংহাসন আরোহনের পূর্ব পর্যন্ত শাহাজাদা খুররম নামে পরিচিত ছিলেন।

সম্পূর্ণ নাম

সম্রাট শাহজাহানের সম্পূর্ণ নাম ছিল আবুল মোজাফ্ফর সাহিব উদ্দীন মোহাম্মদ সাহিব-ই কিরান শাহজাহান বাদশা গাজি।

সেনাপতি জীবন

  • (১) সেনাপতি হিসেবে শাহজাহান মেবারের বিদ্রোহী রাজা রানা অমর সিংহকে পরাজিত করেন ও মুঘলদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।
  • (২) তিনি দাক্ষিণাত্যের লোদীদের দমন করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যর সীমা ঠিক রাখতে পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীরকে সাহায্য করেন।
  • (৩) জাহাঙ্গীর তার ওপর যারপরনাই খুশি হয়ে তাকে পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা করেন এবং শাহজাদা খুররমকে “শাহজাহান” বা “পৃথিবীর সম্রাট” উপাধি দিয়ে দরবারের স্থায়ী সভ্য করে নেন।

সিংহাসনে আরোহণ

তিনি ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে তার পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাকে মোগল সাম্রাজ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট বলে মনে করা হয়।

মুঘল সম্রাট

তিনি ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, এবং জাহাঙ্গীরের পরে পঞ্চম মুঘল সম্রাট।

রাজত্বকাল

সম্রাট শাহজাহান ১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছেন।

উপাধি

তার উপাধি ‘আবুল মুজফফর মহম্মদ শাহজাহান বাদশাহ গাজি’। এছাড়া ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে খুররম সম্রাট জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে ‘শাহজাহান’ (পৃথিবীর অধিপতি) উপাধি লাভ করেন।

বিবাহ

১৬১২ খ্রিস্টাব্দে আসফ খানের কন্যা আর্জুমন্দবানু বেগম বা মমতাজ মহলের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

তুলনা

তাঁকে ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।

পারসিক প্রথা

শাহজাহান দরবারে পারসিক প্রথা ‘সিজদা’ তুলে দিয়ে ‘জমিনবস’ অর্থাৎ সম্রাটের সামনে মাটি চুম্বন প্রথা প্রবর্তন করেন।

যুদ্ধ ঘোষণা

সন্দেহপ্রবণ শাহজাহান মনে করেছিলেন যে, তার অনুপস্থিতিতে শাহরিয়ারকে নূরজাহান সিংহাসনে বসাবেন। তাই সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন অসুস্থ তখন তিনি পিতা ও ভাইদের এবং সম্রাজী নূরজাহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। এই যুদ্ধে তিনি জয়ী হন।

বিদ্রোহ দমন

  • (১) তিনি ঝুঝর সিংহ ও দাক্ষিণাত্যের খান-ই-জাহান লোদির বিদ্রোহ দমন করেন।
  • (২) ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে নিজামশাহি বংশের পতন ঘটিয়ে শাহজাহান আহম্মদনগর সম্পূর্ণভাবে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
  • (৩) তিনি কান্দাহারের শাসক আলিমর্দানকে প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে বশীভূত করে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে কান্দাহার দখল করেন।
  • (৪) পারস্যের শাসক দ্বিতীয় শাহ আব্বাস ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে কান্দাহার পুনর্দখল করলে কান্দাহার চিরকালের জন্য মুঘলদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
  • (৫) সম্রাট শাহজাহান ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার বলখ ও বাদাকশানে সামরিক অভিযান প্রেরণ করেছিলেন।

শক্তিশালী সেনাবাহিনী

শাহজাহানের সময় মুঘল বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দশ লক্ষে উন্নীত হয়। একে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করে।

প্রিন্স অফ আর্কিটেকচার

তাজমহল, লাল কেল্লা, দিল্লির শাহজাহানাবাদ শহর (পুরান দিল্লি) প্রভৃতি নির্মাণশৈলী তাকে ” প্রিন্স অফ আর্কিটেকচার ” খ্যাতি এনে দিয়েছে।

স্থাপত্য

শাহজাহানের আমলে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য কীর্তি হল দিল্লির লালকেল্লা, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, মোতি মসজিদ, জামা মসজিদ, খাসমহল, শিসমহল ভুবনবিখ্যাত তাজমহল ও ময়ূর সিংহাসন

তাজমহল

শাহজাহান তাঁর প্রিয়তম পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশে আগ্রা দুর্গের বিপরীতে যমুনা নদীর তীরে দুধ সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি তাজমহলের সমাধি সৌধ নির্মাণ করেন। এর প্রধান নকশা করেন ওস্তাদ আহমেদ এবং ওস্তাদ ঈশা। এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে।

লাল কেল্লা

সম্রাট শাহজাহান লাল কেল্লা তৈরি করেন। বর্তমানে এই লাল কেল্লা থেকেই প্রতিবছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

মুদ্রা

শাহজাহান স্বর্ণ (মোহর), রৌপ্য (রুপি) এবং তামা (দাম), এই তিন ধাতুর মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। সিংহাসন আরোহনের পূর্বে প্রচলিত মুদ্রায় তার নাম খুররম উল্লেখ করা ছিল।

সুবর্ণ যুগ

শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা এবং পারসিক ও হিন্দু সংস্কৃত ভাষায় গদ্য ও কাব্য রচনা করার জন্যই শাহজাহানের রাজত্বকালকে সুবর্ণযুগ বলা হয়।

চিত্রকলা

তাঁর আমলে দুটি চিত্রকলা হল রুস্তান ও গুলিস্তান। শাহজাহানের আমলে দুজন চিত্রশিল্পী হলেন নাদির সমরকান্দি ও মীর হাসিম।

সাহিত্য

শাহজাহানের আমলে ‘সুন্দর শৃঙ্গার সিংহাসন’ গ্রন্থটি রচনা করেন হিন্দু কবি জীবক চিন্তামণি। আবদুল হামিদ লাহোরি রচিত ‘পাদশাহনামা’ গ্রন্থটি। এতে শাহজাহানের রাজত্বকালের বিবরণ পাওয়া যায়।

উত্তরাধিকার যুদ্ধ

তাঁর জীবদ্দশায় চার পুত্রের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধ বাঁধে। চারপুত্র হলেন—দারাশিকো, শাহসুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ। এই যুদ্ধে ঔরঙ্গজেব জয়লাভ করেন। শাহজাহানের পুত্র দারার সাথে ঔরঙ্গজেব ও মুরাদের বাহিনীর মধ্যে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে ধর্মার্টের যুদ্ধ ও সামুগড়ের যুদ্ধ হয়। এছাড়া ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেওয়াই এর যুদ্ধ হয় ঔরঙ্গজেব ও দারার মধ্যে।

বিদেশি পর্যটক

শাহজাহানের আমলে ভারতে আগত কয়েকজন বিদেশি পর্যটক হলেন ইংরেজ পর্যটক ব্রুটন ও কার্টরাইট, ইতালীয় পর্যটক সিবাসটিয়ান মানরিক, ফরাসি পর্যটক তেভারনিয়ে ও বার্নিয়ে।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে দায়িত্ব

শাহজাহান স্থাপত্য শৈলি নির্মাণের ব্যয়ভার বহন করার সময় শাহী খাজনার দরজা খুলে দিতেন যেন কারিগররা ইচ্ছামত মজুরি নিতে পারে। ফলস্বরূপ ১৬৬৫ সাল নাগাদ মুঘল শাহী খাজনা প্রায় শূন্য হয়ে পড়ে। শাহজাহানের এই খামখেয়ালিপনাকে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সূচক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইতিহাসবিদরা।

শেষ জীবন

শাহজাহানের শেষ জীবন সুখের ছিল না। তিনি তার জীবনের শেষ বিশ বছর আগ্রা দুর্গে পুত্র ঔরঙ্গজেব কর্তৃক গৃহবন্দী হয়ে কাটান। তার জীবদ্দশায় ঔরঙ্গজেব তার অবশিষ্ট পুত্র ও তাদের ঘরের নাতিদের হত্যা করেন।

মৃত্যু

১৬৫৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পুত্র আওরঙ্গজেব তাকে বন্দী করেন এবং বন্দী অবস্থায় ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে আগ্রা দুর্গে তার মৃত্যু হয়।

উপসংহার :- মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট হিসেবে ধরা হলেও শাহজাহানের সময়কাল থেকেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়।

(FAQ) সম্রাট শাহজাহান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সম্রাট শাহজাহান মুঘল সাম্রাজ্যের কততম সম্রাট?

পঞ্চম।

২. সম্রাট শাহজাহানের কত জন পুত্র ছিল?

চার পুত্র, দারাশিকো, শাহসুজা, ঔরঙ্গজেব ও মুরাদ বখস।

৩. সম্রাট শাহজাহানের জৈষ্ঠ্য পুত্রের নাম কি?

দারাশিকো।

৪. সম্রাট শাহজাহানের প্রিয়তম স্ত্রীর নাম কি?

মমতাজ বেগম।

Leave a Reply

Translate »