লালকেল্লা

মোঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মিত লালকেল্লা -র স্থাপনা কাল, স্থপতি, নামকরণ, অবস্থান, স্থাপত্য শৈলী, প্রবেশ দ্বার, আভ্যন্তরীণ স্থাপত্য, ব্রিটিশ লুণ্ঠন, বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জানবো।

লালকেল্লা

নির্মাণ কাল১৬৩৮-১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দ
প্রধান শিল্পীওস্তাদ আহমেদ ও ওস্তাদ হামিদ
নির্মাণকারীমোঘল সম্রাট শাহজাহান
অবস্থানপুরনো দিল্লির যমুনা নদীর তীরে
লালকেল্লা

ভূমিকা :- মোঘল রাজত্ব থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের নানা স্মৃতি বিজড়িত শহর দিল্লী। দিল্লীর বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে অন্যতম হল রেড ফোর্ট বা লালকেল্লা। ভারতের রাজধানী দিল্লীতে অবস্থিত এই লালকেল্লাকে ঘিরে আছে বহু ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

স্থাপনা কাল

১৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সম্রাট শাহজাহান সুবৃহৎ এই কেল্লাটির নির্মাণকার্য শুরু করেন এবং এর নির্মাণকার্য শেষ হয় ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে।

স্থপতি

মোঘল সাম্রাজ্যের দুই প্রতিষ্ঠিত স্থাপত্যশিল্পী ওস্তাদ আহমেদ ও ওস্তাদ হামিদের দক্ষতায় নির্মিত হয় দিল্লির লালকেল্লা।

অবস্থান

পুরনো দিল্লির যমুনা নদীর তীরে সম্রাটের জন্য নির্মিত হয় এক নতুন রাজকীয় ভবন লালকেল্লা।

নামকরণ

সম্রাট শাহজাহান এই দুর্গের নাম দিয়েছিলেন ‘কিলা-ই-মুবারক’ (‘আশীর্বাদধন্য দুর্গ’)। কারণ, এই দুর্গে সম্রাটের পরিবারবর্গ বাস করতেন। অনেকে মনে করে থাকেন যে, সম্পূর্ণ লাল বেলে পাথর ও ইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল বলেই পরবর্তীতে এই দুর্গের নাম দেওয়া হয়েছে লালকেল্লা।

প্রকৃত লাল রঙের নয়

এই কেল্লাটি পুরোপুরি লাল রঙের ছিল না। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, কেল্লার দালানের বিভিন্ন অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল চুনাপাথর। তাই এর প্রকৃত রঙ ছিল শ্বেতবর্ণ। কিন্তু আবহাওয়া, জলবাযু ও দূষণের প্রভাবে এর শুভ্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর উজ্জ্বলতা মলিন হতে থাকায় ইংরেজরা দুর্গের দেওয়ালে লাল রং করে দেয় এবং দুর্গটিকে ‘রেড ফোর্ট’ নামে ডাকতে শুরু করে।

স্থাপত্য শৈলী

পাশ্চাত্য ও ভারতীয় শিল্পকলার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি এই স্থাপত্য। এই কেল্লার স্বাতন্ত্র্য প্রশ্নাতীত। ভারতীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন দিল্লির এই লালকেল্লা। তাই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে লালকেল্লাকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

প্রবেশ দ্বার

লালকেল্লার প্রধান আকর্ষণ বিশালাকার প্রাচীর ও তার প্রবেশদ্বার গুলি।

(১) লাহোর গেট

এই গেটটি পাকিস্তানের লাহোরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলে এর নাম লাহোর গেট। এই লাহোর গেটকেই লালকেল্লার প্রধান প্রবেশদ্বার বলা হয়।

(২) দিল্লি গেট

রাজধানী শহর দিল্লির দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে বলেই এই গেটের নাম দিল্লি গেট।

(৩) ওয়াটার গেট

পরবর্তীতে জানা যায় যে, কেল্লাটিতে তৃতীয় একটি বহির্গমণ পথ ছিল। যমুনা নদীর তীরে হওয়ায় নদীর সাথে সংযোগ রাখতেই নির্মাণ করা হয়েছিল এই গেটটি, যা ওয়াটার গেট নামে পরিচিত।

চট্টাচক

লাহোর গেট দিয়ে ঢুকলে একটি লম্বা আচ্ছাদিত বাজারপথ পড়ে। এর নাম চট্টাচক। এই পথের দু দিকের দেওয়াল দোকানের মতো করে স্টল দিয়ে সাজানো।

অভ্যন্তরীণ স্থাপনা

লালকেল্লার অভ্যন্তরে অবস্থিত ছিল একাধিক স্থাপত্য।

(১) দিওয়ান-ই-আম

দিল্লিগেটের বাইরে একটি বড়ো মুক্তাঙ্গন আছে। একসময় এটি দিওয়ান-ই-আম -এর অঙ্গন হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখানে ঝরোখা নামে একটি অলংকৃত সিংহাসনে বসে সম্রাট জনসাধারণকে দর্শন দিতেন। এই স্তম্ভগুলো সোনায় চিত্রিত ছিল এবং সোনা ও রুপোর রেলিং দিয়ে সাধারণকে সিংহাসনের থেকে পৃথক করে রাখা হত।

(২) দিওয়ান-ই-খাস

পুরোপুরি শ্বেতপাথরে মোড়া একটি কক্ষ ছিল দিওয়ান-ই-খাস। এর স্তম্ভগুলো পুষ্পচিত্রে সজ্জিত ছিল। ভিতরের অলংকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মহামূল্যবান ধাতুসমূহ।

(৩) নহর-ই-বেহিস্ত

সম্রাট ও তার পরিবারের নিজস্ব মহলগুলো থেকে যমুনা নদীর বহমান ধারা দেখা যেত। মহলগুলির মাঝে ছিল এক জলধারা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল নহর-ই-বেহিস্ত বা স্বর্গের জলধারা। যমুনা নদীর জল দ্বারা এই জলধারার জল বহমান রাখা হত। এখানেই শাহী বুর্জ নামে একটি মহল আছে। এই মহলে সম্রাট শাহজাহান তার ব্যক্তিগত নানা রকম কাজ করতেন।

(৪) জেনানা

এই প্রাসাদের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত কক্ষ দুটি ছিল জেনানা বা মহিলাদের বাসস্থান। ছোটো কক্ষটির নাম মুমতাজ মহল (বর্তমানে একটি সংগ্রহালয়) এবং অপরটির নাম রঙমহল। রঙমহল তার চাকচিক্যময় অলংকৃত সিলিং এবং নহর-ই-বেহিস্ত-এর জলধারাপুষ্ট শ্বেতপাথরের জলাধারটির জন্য প্রসিদ্ধ।

(৫) মোতি মসজিদ

কেল্লার পশ্চিমে আছে ‘মোতি মসজিদ’। সম্রাট ঔরঙ্গজেব ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। এটি একটি ছোট, তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরে নির্মিত।

(৬) হায়াত বক্স বাগ

কেল্লার উত্তরে আছে একটি আনুষ্ঠানিক উদ্যান, যার নাম হায়াত বক্স বাগ বা জীবন প্রদায়ী উদ্যান। উদ্যানটি দুটি পরস্পরচ্ছেদী জলধারা দ্বারা বিভক্ত। উত্তর-দক্ষিণ জলধারাটির দুই প্রান্তে দুটি কক্ষ আছে।

(৭) নহবতখানা

নহবত শব্দের অর্থ হল গান-বাজনার স্থান। লালকেল্লার প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে সামান্য এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে এক বিশাল নহবতখানা বা ড্রামা হাউজ। এই নহবতখানাকে এককথায় কেল্লার প্রাণ কেন্দ্রও বলা হয়ে থাকে। কেল্লায় সম্রাটদের প্রবেশের সময় এখানে নানা রকমের সঙ্গীতের আয়োজন করা হত। সঙ্গীতের সুর-মূর্চ্ছনায় মহা সমারোহে সম্রাটদের স্বাগত জানানো হতো।

কেল্লার সুরক্ষা ব্যবস্থা

স্থাপত্যশিল্পীরা শুধু কেল্লা নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি। এর সুরক্ষার কথাও চিন্তা করেছিলেন।

  • (১) কেল্লার চতুর্দিকে নির্মাণ করা হয় বিশাল পরিখা। এর জল আসত যমুনা নদী থেকে। কেল্লার সুরক্ষায় পরিখায় রাখা হত কুমির।
  • (২) পরিখার পর কেল্লার দেওয়াল এমন পিচ্ছিল রাখা হয় যাতে কেউ দেওয়াল বেয়ে উঠতে না পারে। আর এই পিচ্ছিল বিশাল উঁচু খাড়া দেওয়াল বেয়ে প্রবেশ করা এক কথায় অসম্ভব ছিল।
  • (৩) এছাড়াও কেল্লার সুরক্ষায় সারা দিন-রাত পালাক্রমে প্রহরী নিয়োজিত রাখা হত।

মোঘলদের রাজধানী

১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মোঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এই লালকেল্লা। মূলত এই কেল্লা ছিল সম্রাট শাহজাহানের নতুন রাজধানী শাহজাহানাবাদের রাজপ্রাসাদ।

লালকেল্লায় বসবাসকারী শেষ মোঘল সম্রাট

লালকেল্লায় বসবাসকারী শেষ মোঘল সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার পর ১৭ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর লালকেল্লা পরিত্যাগ করেন।

ব্রিটিশদের ক্যন্টনমেন্ট

মহাবিদ্রোহের পর লালকেল্লার কর্তৃত্ব ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়। তারা এটিকে একটি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে।

ব্রিটিশ লুণ্ঠন

লাল কেল্লা দখলে নেওয়ার পর ব্রিটিশরা এই কেল্লায় নির্বিচারে লুন্ঠন চালায়। তারা বিলাসবহুল, দামী ফার্নিচার, তৈজসপত্র, মূল্যবান মনি-মাণিক্য, অলংকার, নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায়। কেল্লার অনেক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। তবে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নির্দেশে ১৮৯৯-১৯০৫ সালের দিকে কেল্লার সীমানা প্রাচীর, বাগান এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়।

বর্তমানে কেল্লার রক্ষণাবেক্ষণ

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত লাল কেল্লা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া এই কেল্লা রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্বে আছে।

ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম

লালকেল্লার বিভিন্ন দর্শনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হল ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’।

  • (১) লালকেল্লার নহবতখানার কিছুটা অংশ এবং পুরাতন মমতাজ মহলকে নিয়ে ১৯১১ সালে এই জাদুঘর তৈরি করা হয়।
  • (২) যেসব ভারতীয় সৈনিক বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে।
  • (৩) এই জাদুঘরে যুদ্ধকালীন সৈনিকদের ব্যবহৃত নানা অস্ত্রশস্ত্র, কামান, তলোয়ার, বর্ম, পোশাক ইত্যাদি সব রাখা আছে।

সার্বভৌমত্বের প্রতীক

এই কেল্লা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু স্বাধীনতা দিবস -এ লালকেল্লার মূল ফটকের উপরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করেন। সেই থেকে এই রেওয়াজ আজও প্রচলিত আছে।

আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার

১৯৪৫ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুআজাদ হিন্দ ফৌজ -এর পরাজয়ের পর এই লালকেল্লাতেই যুদ্ধবন্দীদের বিচার হয়।

প্রদর্শনী

বর্তমানে সন্ধ্যায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’র মাধ্যমে লালকেল্লায় মুঘল ইতিহাসের প্রদর্শনী করা হয়।

আক্রমণ

২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে লস্কর-ই-তৈবা নামে জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণে লালকেল্লা প্রাঙ্গনে দুই সেনা জওয়ান ও এক সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়।

পর্যটন কেন্দ্র

রাজধানী দিল্লীতে অবস্থিত এই লালকেল্লা একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক এই কেল্লা পরিদর্শনে আসেন। কেল্লার বিশালতা ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়েন আগত দর্শনার্থীরা।

উপসংহার :- লালকেল্লার স্থাপত্য সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিবেচনা করে ২০০৭ সালে ইউনেস্কো এই লালকেল্লাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।

(FAQ) লালকেল্লা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. লালকেল্লা কোথায় অবস্থিত?

পুরনো দিল্লির যমুনা নদীর তীরে।

২. লালকেল্লা কোন সময়ে নির্মিত হয়?

১৬৩৮-১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে

৩. লালকেল্লা কে তৈরি করে?

মোঘল সম্রাট শাহজাহান।

৪. লালকেল্লা কি দিয়ে তৈরি?

লাল বেলেপাথর ও ইট দিয়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে চুনাপাথর দিয়ে।

৫. লালকেল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কি?

লালকেল্লা পুরনো দিল্লির সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। প্রতিবছর অগণিত পর্যটক এই কেল্লাটি দেখতে আসেন। এই কেল্লার প্রাঙ্গনেই প্রতি বছর ১৫ অগস্ট স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। লালকেল্লা পুরনো দিল্লির বৃহত্তম স্থাপনাও বটে।

Leave a Reply

Translate »