ঔরঙ্গজেব

মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব -এর জন্ম, বিভিন্ন নাম, সিংহাসনে আরোহণ, অভিষেক, রাজত্বকাল, শাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, ধর্মনীতি, হিন্দু বিরোধী পদক্ষেপ ও তার ফলাফল, রাজপুত নীতি, দাক্ষিণাত্য নীতি, সংস্কার, স্থাপত্য ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের জন্ম, ঔরঙ্গজেবের পিতামাতার নাম, ঔরঙ্গজেবের বিভিন্ন নাম, ঔরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণ, ঔরঙ্গজেবের অভিষেক, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকাল, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের দুই ভাগ, ঔরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য বিস্তার, ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি, ঔরঙ্গজেবের হিন্দু বিরোধী নীতি ও তার ফলাফল, ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি, ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি, ঔরঙ্গজেবের মন্দির ধ্বংস, ঔরঙ্গজেবের সেনাবাহিনী ও সেনাপতি, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে স্থাপত্য, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সাহিত্য, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুদ্রা ও ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু।

সম্রাট ঔরঙ্গজেব (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিঃ)

ঐতিহাসিক চরিত্রঔরঙ্গজেব
জন্ম৩ নভেম্বর ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু৩ মার্চ ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
পরিচিতিষষ্ঠ মুঘল সম্রাট
রাজত্বকাল১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিশাহজাহান (পিতা)
উত্তরসূরিপ্রথম বাহাদুর শাহ
ঔরঙ্গজেব

ভূমিকা :- মুঘল সম্রাটদের শেষ সফল উত্তরাধিকারী ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র ঔরঙ্গজেব। পিতার জীবনসায়াহ্নে সংঘটিত উত্তরাধিকার সংগ্রামে গভীর কূটনৈতিক জ্ঞান, বীরত্ব ও সমরকুশলতার মধ্য দিয়ে ঔরঙ্গজেব মুঘল সিংহাসন অধিকারের পথকে করেছিলেন নিষ্কণ্টক।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের জন্ম

ঔরঙ্গজেব ৩ নভেম্বর ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে গুজরাতের বাহবা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শাহজাহান এবং মমতাজ মহলের তৃতীয় সন্তান।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বিভিন্ন নাম

তিনি আওরঙ্গজেব বা ঔরঙ্গজেব, আল-সুলতান আল-আজম ওয়াল খাকান আল-মুকাররম আবুল মুজাফফর মুহি উদ-দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর, বাদশা গাজী, প্রথম আলমগীর নামেও পরিচিত।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণ

শাহজাহান অসুস্থ হলে তাঁর চার পুত্র ঔরঙ্গজেব, মুরাদ, সূজা ও দারার মধ্যে সিংহাসন নিয়ে ভ্রাতৃযুদ্ধ আরম্ভ হয়। ভ্রাতৃবিরোধে জয়লাভ করে এবং বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে নজরবন্দি করে ঔরঙ্গজেব ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের অভিষেক

আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন হয় ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে। তিনি ‘আলমগীর’ বা ‘বিশ্বজয়ী’ এবং ‘গাজি’ বা ‘ধর্মযোদ্ধা’ উপাধি গ্রহণ করেন।

ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব

ঔরঙ্গজেব ছিলেন বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানের পরে ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকাল

তিনি ১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪৯ বছর মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শাসনকাল দুভাগে বিভক্ত

ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালকে সমান দুভাগে বিভক্ত করা যায়। –

(১) ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের প্রথমার্ধ (১৬৫৮-১৬৮১ খ্রিঃ)

এই সময়ে তিনি উত্তর ভারত -এ অবস্থান করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের প্রথমার্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধ, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ, রাজপুতদের সঙ্গে যুদ্ধ এবং শিখ-জাঠ-বুন্দেলা সৎনামী বিদ্রোহ।

(২) ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের দ্বিতীয়ার্ধ (১৬৮১ ১৭০৭ খ্রিঃ)

এই পর্বে দক্ষিণ ভারতে জীবনের শেষ ২৬ বছর অতিবাহিত করেন। তাঁর রাজত্বের দ্বিতীয়ার্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল বিজাপুর ও গোলকুন্ডা বিজয় এবং শিবাজি ও মারাঠাদের সঙ্গে সুদীর্ঘ যুদ্ধ।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য বিস্তার

সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে ঔরঙ্গজেব জেব বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

(ক) ঔরঙ্গজেবের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত

  • (১) ঔরঙ্গজেবের নির্দেশে বিহারের শাসনকর্তা দাউদ খান ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রতাপরায়কে পরাস্ত করে পালামৌ অঞ্চল অধিকার করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য পালামৌ ও মুঘলদের বিরোধের মূল কারণ ছিল গবাদি পশু অপহরণ।
  • (২) উত্তরাধিকার যুদ্ধের সময় বাংলায় মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় অহোম রাজ জয়ধ্বজ সিং মুঘলের অধিকৃত পশ্চিম কামরূপ অধিকার করেন।
  • (৩) সম্রাটের আদেশে বাংলার সুবাদার তথা বিখ্যাত সেনাপতি মীরজুমলা কুচবিহার ও অহোম রাজ্য আক্রমণ করেন। ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে কুচবিহার মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। কুচবিহারের নাম বদল করে আলমগীরনগর রাখা হয়।
  • (৪) ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দে এক নৌযুদ্ধে অহোম বাহিনী পরাজিত হয় এবং মীরজুমলা অহোম রাজধানী গড়গাঁও দখল করেন। পরিশেষে অহোমরাজ জয়ধ্বজ ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রভূত পরিমাণ অর্থ ও বাৎসরিক করদানে স্বীকৃত হয়ে মীরজুমলার সঙ্গে সন্ধি করেন। জয়ধ্বজকে তাঁর দুর্বলতার জন্য ‘ভগনীয়ারাজা’ বলা হয়ে থাকে।
  • (৫) মীরজুমলার মৃত্যুর পর ঔরঙ্গজেবের মাতুল শায়েস্তা খানকে বাংলাদেশ -এর শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। তাঁর সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল আরাকান রাজের কাছে থেকে চট্টগ্রাম অধিকার (১৬৫৬ খ্রিঃ)।
  • (৬) এছাড়াও তিনি নৌবাহিনী দ্বারা মগ ও পোর্তুগিজদের শায়েস্তা করেন। তিনি পোর্তুগিজদের হাত থেকে সন্দীপ দখল করেন।

(খ) ঔরঙ্গজেবের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নীতি

কাবুল ও উত্তর-পশ্চিমে সীমান্ত অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা মুঘল সামরিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। ঔরঙ্গজেবের শাসনকালে কিছু আফগান উপজাতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই সকল বিদ্রোহগুলি হল –

(১) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে ইউসুফজাই গোষ্ঠীর বিদ্রোহ (১৬৬৭ খ্রিঃ)

১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ভাগু’ নামে এক ইউসুফজাই উপজাতীয় নেতা জনৈক মহম্মদ শাহকে সোয়াৎ উপত্যকায় রাজা হিসাবে ঘোষণা করে মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করেন। এই অভ্যুত্থানের প্রেরণা ছিল রোশনিয়া নামে আন্দোলন। শেষপর্যন্ত রাজপুতদের সহযোগিতায় মুঘল সেনাপতি মহম্মদ আমির খান বিদ্রোহ দমন করেন।

(২) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে আফ্রিদি গোষ্ঠীর বিদ্রোহ (১৬৭২ খ্রিঃ)

১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আফগান বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন আফ্রিদি নেতা আকমল খান। তিনি নিজেকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করেন। আলি মসজিদের যুদ্ধে মুঘল সেনাপতি মহম্মদ আমিন পরাস্ত হন। এই জয়ের ফলে আফ্রিদি ও পাঠানদের মধ্যে জাতীয় চেতনার সৃষ্টি হয়।

(৩) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে খট্টক উপজাতির বিদ্রোহ (১৬৭৯ খ্রিঃ)

আফ্রিদিদের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে খট্টক উপজাতি মুশহল খানের নেতৃত্বে বিদ্রোহী হয়। ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহীরা মুঘল সেনাপতি সুজাত খানকে নিহত করে। অবশেষে ঔরঙ্গজেব স্বয়ং পেশোয়ারের নিকটবর্তী হাসান নামক স্থানে স্বসেন্যে উপস্থিত হয়ে কূটনীতির সাহায্যে বিদ্রোহ দমন করেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও তার প্রতিক্রিয়া

সম্রাট ঔরঙ্গজেব ব্যক্তিজীবনে একজন কঠোর নিষ্ঠাবান সুন্নি মুসলমান ছিলেন। তাকে ‘জিন্দাপীর’ বলা হয়ে থাকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল দার-উল-হারব-কে দার-উল-ইসলামে পরিণত করা। এই কারণে তিনি অমুসলিমদের উপর নানা দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেন। তিনি দরবারে নানা অইসলামীয় অনুষ্ঠান ও প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে হিন্দু বিরোধী পদক্ষেপ

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কয়েকটি হিন্দু বিরোধী পদক্ষেপ হল –

  • (১) হিন্দুদের দোলযাত্রা বা হোলি, দীপাবলি, ধর্মমেলা, যাত্রা, সতীদাহ প্রভৃতি বন্ধ করেন দেন।
  • (২) ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে এক নির্দেশ দ্বারা রাজপুত ব্যতীত সকল হিন্দুর পালকি চড়া, হস্তী বা অশ্বারোহণ ও অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ হয়।
  • (৩) ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে এক নির্দেশ মারফত হিন্দুদের নতুন মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ হয়।
  • (৪) ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
  • (৫) উচ্চ পদগুলিতে হিন্দুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ হয়।

ঔরঙ্গজেবের হিন্দু বিরোধী নীতির ফলাফল

সম্রাটের এই পদক্ষেপ স্বরূপ দেখা দেয় নানা বিদ্রোহ। এইসব বিদ্রোহগুলি হল –

(১) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে জাঠ বিদ্রোহ

১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিলপৎ-এর জমিদার গোকলার নেতৃত্বে দিল্লি ও মথুরা অঞ্চলে জাঠ বিদ্রোহের সূচন হয়। জাঠেরা মুঘল ফৌজদার আবদুল নবীকে হত্যা করে। ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাঠরা দ্বিতীয়বার রাজারামের নেতৃত্বে বিদ্রোহী হয়। শেষপর্যন্ত চূড়ামনের নেতৃত্বে জাঠরা ভরতপুরে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম

(২) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বুন্দেলা বিদ্রোহ

বুন্দেলারা ছিল মধ্য ভারতের এক রাজপুত গোষ্ঠী। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালের সূচনায় বুন্দেলখণ্ডের রাজা চম্পত রায়ের নেতৃত্বে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাঁর পুত্র ছত্রশাল ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে নির্যাতিত হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে তিনি পূর্ব মালবে একটি স্বাধীন হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

(৩) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে কুর্মি বিদ্রোহ

১৬৭০-১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যে উত্তরপ্রদেশের আমেথি অঞ্চলের জগদীশপুরের কুর্মিরা বিদ্রোহ করে। এদের নেতা ছিলেন দাসীরাম।

(৪) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সৎনামী বিদ্রোহ

পাতিয়ালা ও আলোয়ার অঞ্চলে সৎনামী নামে এক হিন্দু ভক্ত সম্প্রদায় বাস করত। ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে গরীবদাস হাড়ার নেতৃত্বে জনৈক মুঘল কর্মচারীর সঙ্গে একজন সৎনামী চাষির বিবাদকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সংনামী বিদ্রোহ। শেষপর্যন্ত এরা পরাজিত হয়।

(৫) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে শিখ বিদ্রোহ

নবম শুরু তেগবাহাদুর ঔরঙ্গজেবের হিন্দু বিদ্বেষী নীতির প্রতিবাদ করেন এবং কাশ্মীরের ব্রাহ্মণদের ঔরঙ্গজেব প্রবর্তিত হিন্দু বিরোধী নীতি অমান্য করতে উপদেশ দেন। এই অপরাধে ঔরঙ্গজেব তাঁর প্রাণদণ্ড দেন (১৬৭৫ খ্রিঃ)। এই হত্যার ফলে শিখ জাতীয়তাবাদ উত্তাল হয়ে ওঠে। পরবর্তী গুরু গোবিন্দ সিং-এর নেতৃত্বে শিখরা সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। গোবিন্দ সিং খালসা সংস্থাকে সামরিক সংস্থায় পরিণত করে মুঘল বিরোধী সংঘর্ষে নেমে পড়েন।

(৬) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মাতিয়া বিদ্ৰোহ

১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে মাতিয়ারা ঔরঙ্গজেবের আহ্বানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে এক মাতিয়া নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হয় মাতিয়া বিদ্রোহ। শেষপর্যন্ত এরা পরাজিত হয়।

(৭) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে কোলি বিদ্রোহ

গুজরাটের কোলি কৃষকরা চানওয়ালের দুদে কোলির সমর্থনের দ্বারা শিকো নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। মহাবৎ খান বিদ্রোহ দমন করেন। অবশেষে ১৭১০-১২ খ্রিস্টাব্দে মুবারিজ খান নৃশংসভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন।

(৮) ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে শোভা সিংহের বিদ্রোহ

শোভা সিং ছিলেন ঔরঙ্গজেবের সময়ে বাংলাদেশের মেদিনীপুরের ঘাটাল অঞ্চলের জমিদার। তিনি ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি হুগলি পর্যন্ত অঞ্চল দখল করেন। ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলার তৎকালীন সুবাদার শাহজাদা আজিম-উস-শান এই বিদ্রোহ দমন করেন।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি

ঔরঙ্গজেব রাজত্বের প্রথমার্ধে উদারনীতি গ্রহণ করলেও রাজত্বের দ্বিতীয়ার্ধে অনুদার নীতি গ্রহণ করে রাজপুতদের মুঘল বিরোধী করে তোলেন।

  • (১) মারওয়াররাজ যশোবন্ত সিংহের উত্তরাধিকারিত্বের দাবি অস্বীকার করে মারওয়ার দখল করেন (১৬৭৯ খ্রিঃ) এবং পছন্দমতো ইন্দর সিংহকে সিংহাসনে বসান। ফলে দুর্গাদাসের নেতৃত্বে রাঠোর সর্দাররা মুঘলদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
  • (২) মেবার -এর রানা রাজসিংহ মারওয়ারের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করলে সম্রাট ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেবার আক্রমণ করেন। দীর্ঘ যুদ্ধ চলার পর ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে রাজসিংহের পুত্র জয়সিংহের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
  • (৩) ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সম্রাট বাহাদুর শাহ ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে অজিত সিংহকে মারওয়ারের রানা বলে স্বীকার করলে ত্রিশ বৎসর ব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটে।

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি

দাক্ষিণাত্যের উদীয়মান মারাঠা শক্তির সঙ্গে বিজাপুর ও গোলকুন্ডার ঘনিষ্ঠ যোগ ঔরঙ্গজেবের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। বিজাপুর ও গোলকুন্ডা রাজ্য দুটি জয় করা এবং মারাঠাদের দমন এই ত্রিবিধ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে রওনা হন (১৬৮১ খ্রিঃ)।

ঔরঙ্গজেবের আমলে বিজাপুরের পতন

সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আদেশে প্রেরিত যুবরাজ মোয়াজ্জম ও আজমের প্রথম অভিযান ব্যর্থ হয়। ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট এক ফরমান দ্বারা বিজাপুরের সুলতানের কাছে কিছু দাবি পেশ করেন। কিন্তু বিজাপুর সুলতান দাবি মানার পরিবর্তে গোলকুন্ডা ও মারাঠাদের সঙ্গে জোট স্থাপনের চেষ্টা করেন। এই অবস্থায় ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেব নিজেই বিজাপুর আক্রমণ করে বিজাপুর রাজ সিকন্দর আদিল শাহকে বন্দি করেন। বিজাপুর মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

ঔরঙ্গজেবের গোলকুন্ডা দখল

গোলকুন্ডা গোপনে বিজাপুর এবং মারাঠাদের সাহায্য করেছিল। এই অপরাধে সম্রাট স্বয়ং গোলকুন্ডা অবরোধ করেন। দীর্ঘ আট মাস অবরোধের পর ১৬৮৭ খ্রি. কুতুবশাহী বংশের শেষ সুলতান আবুল হাসান আত্মসমর্পন করেন। গোলকুন্ডা মুঘল সম্রাজ্যভুক্ত হয়।

ঔরঙ্গজেব ও মারাঠা

ভারতের ইতিহাসে দক্ষিনে মারাঠাদের উত্থান একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মারােঠাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন শিবাজী।ঔরঙ্গজেব দক্ষিনে থাকাকালীন শিবাজীকে দমন করার জন্য চেষ্ঠা করেছেন। সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু পর্যন্ত মুঘল মারাঠা সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল ।

ঔরঙ্গজেবের সংস্কার

সম্রাট ঔরঙ্গওজেব অত্যন্ত ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। তিনি বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেছিলেন। যেমন –

  • (১) তিনি আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত দীন-ই-ইলাহী রহিত করেন।
  • (২) মুসলিম জ্যোতির্বিদের দ্বারা তিনি নতুন পঞ্জিকা তৈরী করেন।
  • (৩)তিনি সম্রাজ্যে মদপান ও জুয়াখেলা নিষিদ্ধ করেন।
  • (৪)তার রাজত্ব কালে সঙ্গীত নিষিদ্ধ করেন।
  • (৫) সম্রাটের কপালে চন্দনের রাজটিকা দেওয়ার প্রথাও তিনি নিষিদ্ধ করা হয়।
  • (৬) স্ত্রী লোকদের সুফি সাধকের মাজার জেয়ারত নিষিদ্ধ করা হয়।
  • (৭) জনসাধরণের সুফি সাধকের মাজার জেয়ারত নিষিদ্ধ করা হয়।
  • (৮) তিনি মহররমের মিছিল বন্ধ করেন।
  • (৯) তিনি হিন্দুদের সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেন।
  • (১০) তিনি অনেক নতুন মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পুরাতন মসজিদ সংস্কার করেন।

ঔরঙ্গজেবের আদেশে মন্দির ধ্বংস

কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির, গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, মথুরার কেশব মন্দির, বৃন্দাবনের গোবিন্দ জিউয়ের মন্দির তার আদেশে ধ্বংস হয় ।

ঔরঙ্গজেবের আমলে সাহিত্য

ঔরঙ্গজেব নিজে ছিলেন একজন বিদ্ধান ও বিদ্যোৎসাহী শাসক। তিনি ফার্সি ভাষায় যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং হিন্দি ও তুর্কি ভাষা -য় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। কোরআন তার কন্ঠস্থ ছিল। তার রচিত প্রায় দুই হাজার গ্রন্থ রয়েছে। তার বিখ্যাত আইন গ্রন্থ হল ফতোয়া- ই- আলমগীরী।

ঔরঙ্গজেবের আমলে স্থাপত্য

  • (১) ঔরঙ্গজেব দিল্লির লালকেল্লার ভিতরে মোতি মসজিদ নামে একটি মার্বেল পাথরের মসজিদ তৈরি করেছিলেন।
  • (২) তিনি লাহোরে বাদশাহী মসজিদ নির্মাণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বারাণসীতেও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
  • (৩) তাঁর সময়ে শ্রীনগরে যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় মসজিদ।
  • (৪) ঔরঙ্গজেবের প্রথম স্ত্রী দিলরাস বেগম বা রাবিয়া উদদুরানি -এর নামে ঔরঙ্গবাদে বিবি কা মকবারা নির্মিত হয়। প্রতীয়মান হয় যে তাজমহল -এর নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই স্মৃতিসৌধটি তৈরি করা হয়েছিল।

ঔরঙ্গজেবের আমলে মুদ্রা

তাঁর আমলে মুদ্রার একপিঠে মুদ্রার প্রচলনের সাল এবং অপর পিঠে একটি দ্বিপদী কবিতা থাকত।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু

অবশেষে ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম বৃহত্তর সাম্রজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ঔরঙ্গজেব ১৭০৭ খ্রি. ৩ মার্চ ৯০ বছর বয়সে দাক্ষিণাত্যের আহমদনগরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃতদেহ দৌলতাবাদে আনা হয় এবং সেখানে বিখ্যাত মুসলিম সাধক বুরহান উদ্দীননের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়।

উপসংহার :- ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে সবচেয়ে বড় ত্রুটি ছিল তিনি কাউকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি রাষ্টীয় সকল ক্ষমতা নিজ হাতে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। তাই মন্ত্রীরা স্বাধীনভাবে কোনো কর্ম সম্পাদন করতেন পারতেন না। ফলে তারা স্বাভাবিক উদ্যম হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘকাল যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকার ফলে সেনাবাহিনীর সামরিক দক্ষতাও হ্রাস পায়। ফলশ্রুতিতে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পূর্বেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে।


প্রিয় পাঠক/পাঠিকা আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় করে আমাদের এই “ঔরঙ্গজেব” পোস্টটি পড়ার জন্য। এই ভাবেই adhunikitihas.com ওয়েবসাইটের পাশে থাকুন। যেকোনো প্রশ্ন উত্তর জানতে এই ওয়েবসাইট টি ফলো করুণ এবং নিজেকে  তথ্য সমৃদ্ধ করে তুলুন।

সবশেষে আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ যদি এই পোস্টটি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে Comment ও Share করে দিবেন, (ধন্যবাদ)।

(FAQ) সম্রাট ঔরঙ্গজেব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঔরঙ্গজেবের সময় মুর্শিদ কুলি খান কে ছিলেন?

বাংলার দেওয়ান।

২. ঔরঙ্গজেব কখন জিজিয়া কর চালু করেন?

১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে।

৩. ঔরঙ্গজেব কখন মারা যান?

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে।

৪. ঔরঙ্গজেবের আমলে একজন রাজপুত নেতার নাম লেখ।

রাণা রাজসিংহ।

৫. ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকাল উল্লেখ কর।

১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment