হুমায়ুন

মুঘল সম্রাট হুমায়ুনে -এর জন্ম, শিক্ষা, সিংহাসনে আরোহণ, কালিঞ্জর দুর্গ অভিযান, আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, চুনার দুর্গ অবরোধ, বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, দাদরার যুদ্ধ, চৌসার যুদ্ধ, কনৌজের যুদ্ধ, তাঁর পলায়ন ও পুনরায় দিল্লি দখল এবং তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

নাসিরউদ্দিন মহম্মদ হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৩৯ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬ খ্রিঃ)

পুরো নাম মির্জা নাসির-উদ-দীন মহম্মদ হুমায়ুন
জন্ম১৫০৮ খ্রিস্টাব্দ
পিতাবাবর
মাতামাহাম বেগম
পরিচিতিদ্বিতীয় মুঘল সম্রাট
রাজত্ব১৫৩০-১৫৪০ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ
পূর্ব সূরি শেরশাহ (শূর বংশ), বাবর (মুঘল বংশ)
উত্তরসূরিআকবর
হুমায়ুন

ভূমিকা :- দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পুএ এবং মহান আকবরের পিতা।

জন্ম

বাবরের জ্যেষ্ঠপুত্র হুমায়ুনের জন্ম হয় ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর মাতার নাম মহম সুলতানা। হুমায়ুন কথার অর্থ ভাগ্যবান।

শিক্ষা

শৈশবে তিনি আরবি, তুর্কি এবং ফার্সি ভাষা শেখেন প্রাসাদের গৃহ শিক্ষকদের কাছে। এছাড়া অঙ্ক, জ্যোতিষশাস্ত্র, দর্শনও শেখেন বিভিন্ন পণ্ডিতদের কাছে

উৎস গ্ৰন্থ

‘হুমায়ুননামা’ গ্ৰন্থ থেকে তার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন হুমায়ুনের ভগিনী গুলবদন বেগম। হুমায়ুনের বন্ধু জহর আফতাচি হুমায়ুনকে নিয়ে লেখেন “তারিখ-ই-হুমায়ুনি”।

যুদ্ধে অংশগ্ৰহণ

তিনি বাবরের সাথে পানিপথের প্রথম যুদ্ধখানুয়ার যুদ্ধ -এ অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পিতার কাছ থেকে সম্ভল জেলার জায়গির পান।

সিংহাসনে আরোহণ

২০ বছর বয়সে তিনি বাদাকশানের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। বাবরের মৃত্যুর পর ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর হুমায়ুন আগ্রা ও দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

সমসাময়িক অন্যান্য রাজা

হুমায়ুনের সমসাময়িক ছিলেন বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মামুদ শাহ, বিহারের চুনার দুর্গের অধিপতি শের খান এবং গুজরাতে বাহাদুর শাহ।

ভাইদের নিয়োগ

হুমায়ূন ভাই কামরানকে কাবুল ও কান্দাহার, আসকরিকে সম্বল, হিন্দালকে আলওয়ার ও মেওয়াটের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কামরান কাবুল ও কান্দাহার পাওয়ার পর পাঞ্জাব জয় করে নেন।

কালিঞ্জর দুর্গ অভিযান

হুমায়ুন সিংহাসন লাভের ছয় মাস পর বুন্দেলখণ্ডের কালিঞ্জর দুর্গের হিন্দু অধিপতি প্রতাপরুদ্র-এর বিরুদ্ধে অভিযান করেন।

আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

হুমায়ূন ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে দৌরুয়া বা দাদরার যুদ্ধে মামুদ লোদির নেতৃত্বাধীন আফগান শক্তি জোটকে পরাজিত করেন।

চুনার দুর্গ অবরোধ

হুমায়ুন চুনার দুর্গটি চারমাস অবরোধ করার পর শের খান হুমায়ুনের মৌখিক আনুগত্য স্বীকার করে নেন।

বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

  • (১) গুজরাতের বাহাদুর শাহ চিতোর দুর্গ অবরোধ করলে রানা সঙ্গের বিধবা পত্নী হুমায়ূনকে ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসাবে রাখী পাঠিয়ে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন।
  • (২) বাহাদুর শাহ আফগান নেতা তাতার খানকে আগ্রা আক্রমণে প্ররোচিত করলে হুমায়ুন তাতার খানকে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু রুমি খানের নেতৃত্বে গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে বাহাদুর শাহ চিতোর অধিকার করে নেন।
  • (৩) হুমায়ুন গুজরাতের উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রা করলে বাহাদুর শাহ মাণ্ডু নগরী থেকে পালিয়ে যান। চম্পানীর দুর্গ হুমায়ুনের অধিকারে আসে।
  • (৪) মালব ও গুজরাত রাজা হুমায়ুনের হস্তগত হয়। হুমায়ুন কনিষ্ঠ ভ্রাতা আসকরিকে গুজরাতের শাসনভার অর্পণ করেন।

শের খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

  • (১) শের খান বাংলার অধিপতি মামুদ শাহকে পরাস্ত করে ১৩ লক্ষ দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা লাভ করেন।
  • (২) হুমায়ুন ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে চুনার দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গটি অধিকার করতে মুঘল বাহিনীর প্রায় ছয় মাস সময় লাগে।
  • (৩) শের খান পার্বত্য দুর্গ ব্রোটাস অধিকার করেন এবং বাংলার রাজধানী গৌড় অধিকার করেন। হুমায়ুন যখন চুনার দুর্গ অবরোধে ব্যস্ত তখন শের খান বাংলায় চলে আসেন।
  • (৪) হুমায়ুন বাংলায় প্রায় ৮/৯ মাস অতিবাহিত করেন। শের খান হুমায়ুনের দিল্লি ফিরে আসার পথ বন্ধ করে দেন।
  • (৫) হুমায়ুন গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে আগ্রা ফিরতে চেষ্টা করলে বক্সারের কাছে চৌসা গ্রামে ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে শের খান হুমায়ুনের পথ অবরোধ করেন। এটি চৌসার যুদ্ধ নামে পরিচিত।
  • (৬) হুমায়ুন গঙ্গা নদী পার হয়ে প্রাণ বাঁচান ও আগ্রায় ফিরে যান। চৌসার যুদ্ধে জয়লাভের ফলে আফগান শক্তির পুনরায় অভ্যুদয় ঘটে।
  • (৭) চৌসার যুদ্ধে জয়লাভ করে বাংলা, বিহার, জৌনপুর ও কনৌজ শের খানের হস্তগত হয়। শের খান ‘শেরশাহ’ উপাধি ধারণ করে নিজ নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রবর্তন করেন এবং খুৎবা পাঠ করান।
  • (৮) ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধে শেরশাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করেন। হুমায়ূন পরাজিত হন ও ভারত ত্যাগ করে চলে যান।
  • (৯) কনৌজের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে দিল্লির সিংহাসন মুঘলদের হাত থেকে আফগানদের হাতে চলে যায়। শেরশাহ দিল্লির সিংহাসনে বসেন।
  • (১০) কনৌজের যুদ্ধের ফলে মুঘল রাজত্বের সাময়িক অবসান ঘটে এবং শূর বংশের ইতিহাস শুরু হয়। ভারতে পুনরায় আফগান প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। শেরশাহ দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

 ‘কালিঞ্জর’ দুর্গ জয়

১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন বুন্দেলখন্ডের ‘কালিঞ্জর’ দুর্গ জয় করেন প্রতাপ রুদ্রকে হারিয়ে।

দাদরার যুদ্ধ

১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে ইব্রাহিম লোদীর ভাই মামুদ লোদী, গুজরাটের শাসক বাহাদুর শাহ ও বিহারের আফগান নেতা শের খাঁ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে দাদারার যুদ্ধে সম্মুখীন হন এবং হুমায়ুন আফগানদের পরাস্ত করেন।

চিতোর জয়

১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন চিতোর জয় করেন। চিতোরের রানা বিক্রমাদিত্যের মা কর্ণবতী হুমায়ুনকে একটি রাখি পাঠিয়ে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন।

চম্পানীর দুর্গ অধিকার

১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের শাসক বাহাদুর শাহকে হুমায়ুন পরাজিত করে চম্পানীর দুর্গ অধিকার করেন। হুমায়ুন তার ভাই আশকরি কে গুজরাটের শাসক নিয়োগ করেন।

চুনার দুর্গ জয়

১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চুনার দুর্গ জয় করেন। শের খাঁ হুমায়ুনের বশ্যতা মেনে নিয়েছিল।

চৌসার যুদ্ধ

হুমায়ুনের বাংলাদেশে অবস্থানকালে শের খাঁ গৌড় ত্যাগ করে বারাণসী, জৌনপুর ও কনৌজ দখল করেন। হুমায়ুন শের খাঁ কে বাধা দেওয়ার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বক্সারের কাছে চৌসার যুদ্ধে ১৫৩৯ খ্রিঃ ২৬ জুন অংশগ্রহণ করেন এবং হুমায়ুন পরাজিত হয়ে কোনরকমে আগ্রায় ফিরে আসেন।

কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ

পরের বছর অর্থাৎ ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মে মোঘল সম্রাট হুমায়ুন আফগান নেতা শের খাঁ’র বিরুদ্ধে কনৌজের যুদ্ধে শামিল হন। কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ুন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে সস্ত্রীক পারস্যে পালিয়ে যায়।

হুমায়ুনের পলায়ন

  • (১) ভাগ্য বিড়ম্বিত হুমায়ুন হুমায়ুন প্রায় ১৫ বছর ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন করেন। প্রথমে তিনি লাহোরে আশ্রয় লাভের চেষ্টা করেন। কিন্তু কামরান তাকে হত্যার চেষ্টা করলে হুমায়ুন লাহোর থেকে সিন্ধুপ্রদেশে চলে যান।
  • (২) অমরকোটের রাজা বীরশাল হুমায়ুনকে কিছুকাল আশ্রয় দেন। অমরকোটে হুমায়ুনের পত্নী হামিদাবানু বেগমের গর্ভে ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন পুত্র আকবরের জন্ম হয়।
  • (৩) হুমায়ুন ভারত ছেড়ে পারস্যের শাহ তহমাম্পের কাছে আশ্রয় নেয়। পারস্যের শাহ ছিলেন সিয়া মতাবলম্বী। হুমায়ুন সিয়া ধর্মমত গ্রহণ করতে ও কান্দাহার পারস্যের শাহকে প্রদান করতে স্বীকৃত হলে তহমাস্প হুমায়ুনকে সেনা দিয়ে সাহায্য করেন।
  • (৪) হুমায়ুন পারস্যের সাহায্য নিয়ে ১৫৫৩-১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে কাবুল ও কান্দাহার জয় করেন। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি লাহোর জয় করেন।

দিল্লি ও আগ্রা পুনরুদ্ধার

ইতিমধ্যে শেরশাহের মৃত্যু হলে (১৫৪৫ খ্রিঃ) আফগান শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিরহিন্দের যুদ্ধে হুমায়ুন শেরশাহের বংশধর সিকান্দর শাহ শূরকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা পুনরুদ্ধার করেন।

মৃত্যু

১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে দিল্লি দুর্গের ‘শের-ই-মণ্ডল’ পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে হুমায়ুনের মৃত্যু হয়।

সমাধি

দিল্লিতে হুমায়ুনের সমাধিস্থল অবস্থিত। বর্তমানে এটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

পতনের কারণ

‘তারিখ-ই-রশিদা’ গ্রন্থে মির্জা হায়দার হুমায়ুনকে অহিফেন আসক্ত হিসাবে বর্ণনা করেছেন ও এটিই ছিল তাঁর পতনের কারণ।

ধর্ম

হুমায়ুন সুফি মতবাদের অনুরাগী ছিলেন। তিনি নিজে সুন্নি হলেও তাঁর পত্নী হামিদাবানু, বন্ধু বৈরাম খান, পারস্যরাজ শাহ তহমাস্প সকলেই শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন।

সাহিত্য

হুমায়ুন ছিলেন সুশিক্ষিত। ‘দিওয়ান-ই-হুমায়ুন’ কাব্যগ্রন্থ তাঁর রচনা, হুমায়ুনের রাজসভায় বহু পণ্ডিত উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে খুদামীর, সাহাবউদ্দিন কাকা, জৌহর বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

আবুল ফজলের মন্তব্য

ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের মতে- “হুমায়ুন আলেকজান্ডার -এর মতো উদ্যমী ও অ্যারিস্টটল -এর মতো জ্ঞানী ছিলেন।”  

কোহিনুর মণি দখল

হুমায়ুন গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের কাছ থেকে বিখ্যাত কোহিনুর মণিটি দখল করেন।

স্থাপত্য

হুমায়ুনের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন তেমন পাওয়া না গেলেও আগ্রা ও ফতেবাদে দুটি মসজিদ নির্মাণ তাঁর স্থাপত্য শিল্পের পরিচয় বহন করে। হুমায়ুন দিল্লির কাছে ‘দীনপনাহ’ নামে নতুন নগরী স্থাপন করেন।

চিত্রশিল্প

তিনি চিত্র শিল্পের সমঝদার ব্যক্তি ছিলেন। চিত্র শিল্পের প্রসারের জন্য তিনি ইরান থেকে আবদুস সামাদ ও মীর সৈয়দ আলীকে ভারতে নিয়ে আসেন।

উপসংহার :- হুমায়ুনের  সাম্রাজ্যবাদী জীবনের নানা উথাল পাথাল ঘটনা এবং তাঁর একাগ্রতা ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান দান করেছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

(FAQ) মুঘল সম্রাট হুমায়ুন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হুমায়ুন কথার অর্থ কী?

ভাগ্যবান।

২. হুমায়ুন কীভাবে মারা যান?

শের-ই-মণ্ডল’ পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে

৩. হুমায়ুনের সমাধি অবস্থিত?

দিল্লিতে যমুনা নদীর তীরে।

৪. কোন যুদ্ধে হুমায়ুন সিংহাসন হারিয়ে ফেলেন?

কনৌজ বিলগ্রামের যুদ্ধে (১৫৪০)।

৫. কোন যুদ্ধে হুমায়ুন সিংহাসন ফিরে পান?

সিরহিন্দের যুদ্ধে (১৫৫৫)।

Leave a Reply

Translate »