কনৌজ

আজ আমরা ঐতিহাসিক স্থান কনৌজ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কনৌজের বিভিন্ন নাম, প্রাচীন শহর হিসেবে – বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে কনৌজ, ধর্মপালের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা প্রভৃতি সম্পর্কে তুলে ধরলাম ।

Table of Contents

কনৌজ

অবস্থানউত্তরপ্রদেশের কনৌজ জেলা
পরিচিতিমহানগর
প্রাচীন নামকান্যকুব্জ
আয়তন ৮৫০০০ বর্গ কিলোমিটার
কনৌজ

ভূমিকা :- ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের কনৌজ জেলার একটি মহানগর, প্রশাসনিক প্রধান কার্যালয় ও একটি নগর পালিকা পরিষদ হল কনৌজ।

কনৌজের বিভিন্ন নাম

কনৌজ শহরের নামটি ধ্রুপদি সংস্কৃত নাম কান্যকুব্জ (কুব্জা রমণীগণের নগরী) নামটির আধুনিক রূপ। মিহির ভোজের রাজত্বকালে এই শহরটি মহোদয় নামেও পরিচিত ছিল।

প্রাচীন শহর কনৌজ

কনৌজ একটি প্রাচীন শহর। প্রাচীনকালে এটি হর্ষবর্ধন -এর সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।

ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস

কথিত আছে, কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস ছিল কনৌজ।

বাণিজ্য কেন্দ্র কনৌজ

কনৌজ সুগন্ধী উৎপাদন এবং তামাক, সুগন্ধী ও গোলাপ জলের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

সুগন্ধি রাজ্য কনৌজ

সুগন্ধি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিখ্যাত কানৌজ ভারতের সুগন্ধি রাজধানী হিসেবে পরিচিত। কনৌজ শহর তার ঐতিহ্যবাহী কানৌজ পারফিউম জন্য বিখ্যাত।

প্রাচ্যের গ্রেসি

ভারতের এই কনৌজ শহরকে প্রাচ্যের গ্রেসি বলেও উল্লেখ করা হয়।

কনৌজে হিউয়েন সাঙ

রাজা হর্ষবর্ধনের আমন্ত্রণে হিউয়েন সাঙ কনৌজ-এ আসেন।

কনৌজের গুরুত্ব

হর্ষবর্ধনের পরবর্তীকালে উত্তর-ভারতের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থাপনই উচ্চাকাঙ্ক্ষী নরপতিদের লক্ষ্যে পর্যবসিত হয়েছিল এবং উত্তর-ভারতের কর্তৃত্বের প্রশ্নে কনৌজের ওপর অধিকার স্থাপন করা ছিল মর্যাদার প্রতীক।

ত্রিপাক্ষিক সংগ্রাম

খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে কনৌজ ছিল গুর্জর-প্রতিহার, পাল ও রাষ্ট্রকূট রাজবংশের মধ্যে সংঘর্ষের প্রধান কেন্দ্র। অনেক ইতিহাসবিদ তিন রাজবংশের মধ্যে এই সংঘর্ষকে ত্রিপাক্ষিক সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনটি সাম্রাজ্যের লক্ষ্যস্থল কনৌজ

দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট, মালবের গুর্জর-প্রতিহার এবং বাংলার পাল সাম্রাজ্যের লক্ষ্যস্থল ছিল কনৌজ।

কনৌজ অধিকার

কনৌজকে কেন্দ্র করে তিনটি সাম্রাজ্যের মধ্যে ঘোরতর সংঘাত চলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুর্জর-প্রতিহারেরাই এই শহরটি নিজ অধিকারে রাখতে সক্ষম হয়।

প্রতিহারদের শাসন

গুর্জর-প্রতিহারেরা অবন্তী (উজ্জয়িনী ভিত্তিক) থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তাদের রাজ্যসীমার দক্ষিণ দিকে ছিল রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য এবং পূর্ব দিকে ছিল পাল সাম্রাজ্য।

ত্রিপাক্ষিক সংগ্রামের সূচনা

গুর্জর-প্রতিহার শাসক বৎসরাজার হাতে ইন্দ্রায়ুধের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে কনৌজকে কেন্দ্র করে ত্রিপাক্ষিক সংঘাতের সূচনা ঘটে।

ধর্মপাল ও কনৌজ

পাল সম্রাট ধর্মপালও কনৌজে নিয়ন্ত্রণ স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। এর ফলে বৎসরাজা ও ধর্মপালের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। যদিও ধর্মপাল এই যুদ্ধে পরাজিত হন।

রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব

এই অস্থির অবস্থার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রকূট শাসক ধ্রুব উত্তর দিকে ধাবিত হন। তিনি বৎসরাজাকে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। উল্লেখ্য, দক্ষিণ ভারতীয় শাসকদের মধ্যে তিনিই ভারতের উত্তর দিকে সর্বাধিক অগ্রসর হতে পেরেছিলেন।

ধর্মপালের কনৌজ দখল

ধ্রুব দক্ষিণ ভারতে ফিরে গেলে ধর্মপাল কিছুকাল কনৌজ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। উত্তর ভারতের পাল ও প্রতিহার রাজবংশের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে।

প্রতিহারদের কনৌজ দখল

ধর্মপাল নিযুক্ত শাসক চক্রায়ুধকে প্রতিহার শাসক দ্বিতীয় নাগভট্ট পরাজিত করেন এবং কনৌজে পুনরায় গুর্জর-প্রতিহার আধিপত্য স্থাপিত হয়।

ধর্মপালের কনৌজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা

এরপর ধর্মপাল কনৌজ দখল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুঙ্গেরের যুদ্ধে গুর্জর-প্রতিহার বাহিনীর হাতে বিশ্রীভাবে পরাজিত হন।

রাষ্ট্রকূটদের দখলে কনৌজ

কিছুকাল পরেই যদিও দ্বিতীয় নাগভট্ট উত্তর ভারত-আক্রমণকারী রাষ্ট্রকূট শাসক তৃতীয় গোবিন্দের হাতে পরাজিত হন।

উৎস হিসেবে লিপি

একটি উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় যে, চক্রায়ুধ ও ধর্মপাল তৃতীয় গোবিন্দকে গুর্জর-প্রতিহারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও তারা দুজনেই তৃতীয় গোবিন্দের সহানুভূতি অর্জনের জন্য তার বশ্যতা স্বীকার করেন।

প্রতিহারদের রাজধানী কনৌজ

ধর্মপালের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় নাগভট্ট কনৌজ পুনরায় দখল করেন এবং এটিকে গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্যের রাজধানী ঘোষণা করেন।

ক্ষমতাশালী প্রতিহার সাম্রাজ্য

এই সময় রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল। তাই তারা কনৌজের দিকে নজর দেননি। পালরাও আর কনৌজের দিকে তাকায়নি। তাই কনৌজ দখল করে গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্যই উত্তর ভারতের সর্বাধিক ক্ষমতাধর সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

মামুদের কনৌজ দখল

১০১৮ সালে গজনির মামুদ কনৌজ দখল করেন।

গৌরবশালী কনৌজ

১০৯০ সালে চন্দ্রদেব গাহড়বাল রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার পৌত্র গোবিন্দচন্দ্র “কনৌজকে অতুলনীয় গৌরবশালী করে তোলেন”।

মুহাম্মদ ঘোরি ও কনৌজ

মুহাম্মদ ঘোরি এই শহরের দিকে অগ্রসর হন এবং ১১৯৩ সালে জয়চন্দ্রকে পরাজিত করেন।

কনৌজ সাম্রাজ্যের গৌরবের পরিসমাপ্তি

ইলতুৎমিস কনৌজ দখল করলে কনৌজ সাম্রাজ্যের গৌরব চিরতরে লুপ্ত হয়।

উপসংহার :- কনৌজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ভারতীয় রাজাদের কনৌজ দখলে প্ররোচিত করেছিল। কনৌজ যার দখলে থাকবে তার পক্ষে গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চলের উর্বর ভূমির সম্পদ আহরণ করা সহজসাধ্য হবে। এইসব কারণে অষ্টম শতকে কনৌজ দখলের প্রশ্নে এক দীর্ঘস্থায়ী ত্রি-শক্তি সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল।

(FAQ) ঐতিহাসিক স্থান কনৌজ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. কনৌজের যুদ্ধ কবে হয়েছিল ?

১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ ও হুমায়ুনের মধ্যে।

২. কনৌজ কার রাজধানী ছিল ?

হর্ষবর্ধন।

Leave a Reply

Translate »