পাল সাম্রাজ্য

পাল সাম্রাজ্য প্রসঙ্গে মাৎস্যন্যায়, গোপাল, গোপালের কৃতিত্ব, ধর্মপাল, ধর্মপালের রাজ্য বিস্তার, দেবপাল, যোগ্য শাসকের অভাব, নারায়ণ পাল, মহেন্দ্রপাল ও পাল সাম্রাজ্যের পতন সম্পর্কে জানবো।

পাল সাম্রাজ্য

বিষয় পাল সাম্রাজ্য
রাজধানী মগধ
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম
পাল সাম্রাজ্য

ভূমিকা :- ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এক শতক ব্যাপী এক প্রচণ্ড অরাজকতা চলতে থাকে। এর সঙ্গে বৈদেশিক আক্রমণ বাঙালীদের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।

মাৎস্যন্যায়

লামা তারানাথের বর্ণনা ও অন্যান্য বৌদ্ধ গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, এই সময় বাংলায় ‘মাৎস্যন্যায় দেখা দেয়। মানুষ যখন মাছের মত আচরণ করে তখন মাৎস্যন্যায় বলা হয়। মৎস্য জগতে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলে। মনুষ্য সমাজে যখন প্রবল, দুর্বলকে পীড়ন করে তাকে “মাৎসান্যায়” বলা হয়।

গোপাল

বাংলার এই সর্বনাশা অবস্থা উপলব্ধি করে বাংলার “প্রকৃতিপুঞ্জ” বাংলার সিংহাসনে গোপালকে নির্বাচন করে বলে খলিমপুর তাম্রপট্ট লিপি থেকে জানা যায়। এরপর শুরু হয় পাল সাম্রাজ্য।

গোপালের আধিপত্য ও রাজ্য বিস্তার

গোপাল সিংহাসনে বসার পর কিভাবে রাজ্য বিস্তার করেন তা জানা যায় নি। তাঁর পৈত্রিক রাজ্য ছিল বরেন্দ্রী। তবে গোপাল তাঁর মৃত্যুর আগেই সমগ্র বাংলায় আধিপত্য স্থাপন করেন বলে মনে করা হয়। দেবপালের মুঙ্গের লিপি থেকে জানা যায়, যে, তিনি সমুদ্র তীর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন।

গোপালের প্রধান কৃতিত্ব

গোপালের প্রধান কৃতিত্ব ছিল যে, তিনি বাংলাকে স্বৈরাচারী ও “কামাকারী” অর্থাৎ অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করেন।

গোপালের মৃত্যু

৭৭০ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে গোপালের মৃত্যু হয়। গোপালের বৌদ্ধধর্মে অনুরক্তির জন্য তিনি ‘পরম সৌগত’ বলে খলিমপুর লিপিতে অভিহিত হন।

ধর্মপাল

গোপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল বাংলার সিংহাসনে বসেন। পাল বংশের আঞ্চলিক রাজ্যকে এক সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যে তিনি পরিণত করেন। প্রাচীন যুগের বাংলায় যে সকল রাজার নাম পাওয়া যায় তাঁদের মধ্যে ধর্মপাল শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারেন।

ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব

ধর্মপালের সিংহাসনে বসার সময় উত্তর ভারতে রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। এই ত্রিশক্তির মধ্যে বাংলার পাল শক্তি ছিল অন্যতম। মালব বা রাজপুতানা থেকে প্রতিহার শক্তি পূর্ব দিকে রাজ্য বিস্তার করে কনৌজ অধিকার করার চেষ্টা করে। পূর্ব ভারত বা মগধ থেকে ধর্মপাল প্রতিহার শক্তিকে দমিয়ে কনৌজ নিজ অধিকারে রাখার চেষ্টা করেন।

ধর্মপালের রাজ্য বিস্তার

  • (১) খলিমপুর তাম্রলিপি, মুঙ্গের লিপি প্রভৃতি থেকে জানা যায় যে, রাষ্ট্রকূট ও প্রতিহার উভয় শক্তির সামরিক দুর্বলতার সুযোগে ধর্মপাল উত্তর ভারতের বহু স্থান অধিকার করেন। নারায়ণ পালের ভাগলপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, ধর্মপাল কনৌজের সিংহাসন থেকে ইন্দ্রায়ুধকে বিতাড়িত করে চক্রায়ুধকে নিজের হাতের পুতুল হিসেবে বসান। ধর্মপালের সামন্ত রাজা হিসেবে চক্রায়ুধ রাজত্ব করতে থাকেন।
  • (২) ধর্মপাল দূরবর্তী অঞ্চলে অধীনস্থ সামন্তের দ্বারা শাসনের নীতি গ্রহণ করেন। বাংলা ও বিহার ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ শাসনে। বাংলা-বিহার ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ড। কনৌজ তাঁর প্রত্যক্ষ শাসনে না হলেও তাঁর বিশেষ এক্তিয়ারে ছিল। তার বাইরে পাঞ্জাব পর্যন্ত ও মালব-রাজপুতানা পর্যন্ত তাঁর সামন্ত রাজ্য ছিল। এই সামন্ত রাজারা তাঁর প্রতি আনুগত্য জানাতেন।

ধর্মপালের কৃতিত্ব

ধর্মপাল বাংলার একটি প্রাদেশিক রাজ্যকে এক উত্তর ভারতীয় সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। ডঃ মজুমদারের মতে, “ধর্মপালের রাজত্বকে বাঙালী জীবনের সুপ্রভাত” বলা চলে।

দেবপাল

ধর্মপালের রাষ্ট্রকূটবংশীয় পত্নী রন্নাদেবীর গর্ভে দেবপালের জন্ম হয়। অনেকে তাকে পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বলেন। বাদল স্তম্ভলিপিতে তাঁকে উত্তর ভারতের সর্বাধিপতি বলা হয়েছে।

রাজ্য জয়

মন্ত্রী দর্ভপাণির কূটনীতর প্রভাবে দেবপাল উৎকল, হূণ, দ্রাবিড়, গুর্জর ও প্রাগজ্যোতিষদের পরাস্ত করেন। যদিও ডঃ আব্দুল মোমিন চৌধুরী বলেন যে, এই বর্ণনায় উত্তর ভারতীয় রাজাদের চিরাচরিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং এই বর্ণনা বিশ্বাস্য নয় তবুও অন্যান্য পণ্ডিতেরা বলেন যে, বাদল স্তম্ভলিপিতে যে সকল অঞ্চল জয়ের কথা বলা হয়েছে তা স্বাভাবিক ও নির্ভরযোগ্য। কারণ, এই রাজ্যগুলি পাল সাম্রাজ্যের সীমান্তে।

যোগ্য শাসকের অভাব

দেবপালের মৃত্যুর পর পাল সিংহাসনে কিছুকাল যোগ্য শাসকের অভাব ঘটে। প্রথম বিগ্রহপাল স্বল্পকাল রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন অযোগ্য শাসকদের অন্যতম একজন।

নারায়ণ পাল

  • (১) এরপর নারায়ণ পাল ৮৬০-৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক ও নির্বিরোধী লোক। তাঁর আমলের গয়া লিপিতে “পুরুষোত্তমে”র বন্দনা করা হয়েছে। এই পুরুষোত্তম ছিলেন সম্ভবত বিষ্ণু।
  • (২) ৮৬০ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রকূট শক্তি তাকে পরাস্ত করে হতমান করে। এর পর প্রতিহার প্রথম ভোজ পাল সাম্রাজ্যের কিছু অংশ দখল করে মগধ বা উত্তর বাংলা পর্যন্ত সীমানা বিস্তার করেন।

মহেন্দ্রপাল

মহেন্দ্রপাল প্রতিহার রাজশাহী জেলার কিছু অংশ দখল করে বলে পাহাড়পুর লিপি থেকে জানা যায়। কামরূপ ও উড়িষ্যা পাল সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হয়।

পাল সাম্রাজ্যের পতন

রাজ্যপাল, দ্বিতীয় বিগ্রহ পালের আমলে পাল শক্তির আরও পতন ঘটে। এই সুযোগে চান্দেল্ল, কলচুরি, কম্বোজ প্রভৃতি শক্তি আক্রমণ চালায়। রাঢ় ও অঙ্গ বা পূর্ব বিহার চান্দেল্ল অধিকারে চলে যায়। দশম শতকের শেষ দিকে পাল শক্তির পূর্ণ পতন ঘটে।

উপসংহার :- দশম শতকের শেষ দিকে বাংলা ও মগধের ওপর তিনটি রাজ্য গড়ে ওঠে। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় চন্দ্রবংশ, উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় কম্বোজ বংশ এবং মগধে পালবংশের অবশিষ্ট অধিকার স্তিমিত হয়ে থাকে।

(FAQ) পাল সাম্রাজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে?

গোপাল।

২. গোপালের পর কে সিংহাসনে আরোহণ করেন?

ধর্মপাল।

৩. কোন পাল রাজার সময় ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব শুরু হয়?

ধর্মপাল।

৪. পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দেবপাল।

Leave a Reply

Translate »