গোপাল

পাল রাজা গোপাল প্রসঙ্গে মাৎস্যন্যায়, বৈদেশিক আক্রমণ, অর্থনৈতিক দুর্গতি, গোপালের নির্বাচন, নির্বাচনের দৃষ্টান্ত, গোপালের পূর্ব জীবন, আধিপত্য ও রাজ্য বিস্তার এবং তার প্রধান কৃতিত্ব সম্পর্কে জানবো।

পাল রাজা গোপাল

রাজা গোপাল
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম
উপাধি পরম সৌগত
রাজত্বকাল ৭৫০-৭৭০ (মতান্তরে ৭৭৫) খ্রিস্টাব্দ
পাল রাজা গোপাল

ভূমিকা :- ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এক শতক ব্যাপী এক প্রচণ্ড অরাজকতা চলতে থাকে। এই সঙ্গে বৈদেশিক আক্রমণ বাঙালীদের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।

মাৎস্যন্যায়

লামা তারানাথের বর্ণনা ও অন্যান্য বৌদ্ধ গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, এই সময় বাংলায় ‘মাৎস্যন্যায় দেখা দেয়। মানুষ যখন মাছের মত আচরণ করে তখন মাৎস্যন্যায় বলা হয়। মৎস্য জগতে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে ফেলে। মনুষ্য সমাজে যখন প্রবল, দুর্বলকে পীড়ন করে তাকে “মাৎসান্যায়” বলা হয়।

বৈদেশিক আক্রমণ

এর সঙ্গে বৈদেশিক আক্রমণের ফলে বাংলার জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। এদিকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য যে যেখানে সম্ভব নিজ নিজ অধিকার স্থাপন করে।

অর্থনৈতিক দুর্গতি

এই যুগে বাংলার এমন অর্থনৈতিক দুর্গতি হয় যে, সমকালীন কোনো রৌপ্যমুদ্রা এখনও পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। সম্ভবত বাংলায় রৌপ্যমুদ্রার সংখ্যা অত্যন্ত হ্রাস পায়। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়। তাম্রলিপ্ত বন্দর এই যুগে ধ্বংস হয়ে যায়। বাংলা বাণিজ্য লক্ষ্মীর প্রসাদ হতে বঞ্চিত হয়।

গোপালের নির্বাচন

বাংলার এই সর্বনাশা অবস্থা উপলব্ধি করে বাংলার “প্রকৃতিপুঞ্জ” বাংলার সিংহাসনে গোপালকে নির্বাচন করে বলে খলিমপুর তাম্রপট্ট লিপি থেকে জানা যায়।

নির্বাচন অসম্ভব

গোপাল ছিলেন বাংলার সামন্ত রাজাদের অন্যতম। কীলহর্ণ খলিমপুর লিপির ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, গোপালকে “প্রকৃতিপুঞ্জ” অর্থাৎ জনসাধারণ নির্বাচন করেছিল। আধুনিক পণ্ডিতেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার জনসাধারণের পক্ষে সংগঠিত হয়ে গোপালকে নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

ডঃ মোমিন চৌধুরীর অভিমত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ আব্দুল মোমিন চৌধুরী তাঁর ডাইন্যাস্টিক হিট্টি অফ বেঙ্গলে খালিমপুর লিপি অনুযায়ী প্রজাপুঞ্জের দ্বারা গোপালের নির্বাচনের কাহিনীকে কাল্পনিক ও অবিশ্বাস্য (fantastic and unreliable) বলেছেন।

নির্বাচনের দৃষ্টান্ত

তবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এরূপ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। কাশ্মীরে জলৌকা, বাংলায় সমাচারদেবের নির্বাচনের কথা জানা যায়।

ডঃ মুখার্জির অভিমত

ডঃ বি এন মুখার্জ্জী এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকার এক প্রবন্ধে বলেছেন যে, “অর্থশাস্ত্রে প্রকৃতি বলতে রাজ্যের মন্ত্রী, সভাসদ ও সামন্তদের এবং অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, সেনা, মিত্র প্রভৃতিকে বোঝানো হয়েছে। মাৎস্যন্যায়ের সময় মন্ত্রী, কর্মচারীরাই নির্বাচনের কাজ করতে পারেন।”

সামন্ত শ্রেণীর উদ্ভব

দামোদরপুর, মল্লরসুল, জয়নগর লিপি থেকে বাংলায় সামন্ত শ্রেণীর উদ্ভবের কথা জানা যায়। এই সামন্তশ্রেণী তাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা ছেড়ে মাৎস্যন্যায় দূর করার জন্য স্ব ইচ্ছায় ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গোপালকে নির্বাচন করে বলে মনে করা হয়।

গোপালের পূর্ব জীবন

গোপালের পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি। পাল বংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। গোপালের পিতার নাম ছিল বপ্যাট ও পিতামহ ছিলেন দয়িতবিষ্ণু। তাঁদের নামের আগে কোনো রাজকীয় উপাধি দেখা যায় নি। দয়িতবিষ্ণু সম্পর্কে শুধুমাত্র উল্লেখ আছে যে, তিনি “সর্ববিদ্যা বিশুদ্ধ” ছিলেন।

হরিভদ্রের বর্ণনা

কবি হরিভদ্রের মতে, খড়্গ রাজবংশের রাজভট বা রাজভট্টের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তা ছিল। গোপালের পত্নী রানী দেদ্দাদেবী ছিলেন ভদ্র রাজবংশের কন্যা। খলিমপুর লিপিতে তাকে “ভদ্রাত্মজা” বলা হয়েছে।

রাজবংশ সম্পর্কে সন্দেহ

পালবংশের আত্মীয়রা যদিও রাজবংশের লোক ছিল, পাল বংশ ক্ষত্রিয় এবং আদিতে রাজবংশ ছিল কিনা তা সঠিক জানা যায়নি। সন্ধ্যাকর নন্দী পাল রাজাদের “সমুদ্রকুলোদ্ভব” বা সমুদ্র হতে উদ্ভূত বলেছেন। পাল রাজারা নিজেদের “সূর্য বংশীয়” বলে দাবী করতেন। এই পৌরাণিক বংশে জন্মগ্রহণ করার জন্য পাল রাজাদের দাবীর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

ক্ষত্রিয়ত্ব দাবি

লামা তারানাথের মতে, পাল রাজারা ক্ষত্রিয় ছিলেন। আর্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্পে বলা হয়েছে পাল রাজারা ছিল “দাসজীবিণঃ” অর্থাৎ দাস বংশীয় শূদ্র। সম্ভবত পাল রাজারা পরে ক্ষত্রিয়ত্ব দাবী করেন, আদিতে তারা প্রকৃত ক্ষত্রিয় বংশসম্ভূত ছিলেন না।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আসক্তি

পাল রাজাদের বৌদ্ধধর্মের প্রতি আসক্তি প্রমাণ করে যে, তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না। গোপাল সিংহাসনে বসার পর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন অথবা বৌদ্ধ বংশে তাঁর জন্ম হয় তা সঠিক জানা যায় নি।

আদি বাসস্থান

  • (১) পাল রাজাদের রাজধানী মগধে হলেও, ডঃ মজুমদারের মতে, পাল রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল “বরেন্দ্রী”। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে বারেন্দ্রীকেই পাল রাজাদের বাসভূমি বলা হয়েছে। কোনো কোনো পণ্ডিত মগধে পালদের আদি বাসস্থান ছিল বলেন, কারণ তাঁদের বেশীর ভাগ লিপি এখানে পাওয়া যায়।
  • (২) কিন্তু এই মত প্রমাণ ও যুক্তিসহ নয়। কারণ, রামচরিতে বারেন্দ্রীকেই পাল রাজাদের জন্মভূমি বলা হয়েছে। নাগভট্ট প্রতিহারের গোয়ালিয়র লিপিতেও পাল রাজাদের বঙ্গপতি বলা হয়েছে।

আধিপত্য ও রাজ্য বিস্তার

গোপাল সিংহাসনে বসার পর কিভাবে রাজ্য বিস্তার করেন তা জানা যায় নি। তাঁর পৈত্রিক রাজ্য ছিল বরেন্দ্রী। তবে গোপাল তাঁর মৃত্যুর আগেই সমগ্র বাংলায় আধিপত্য স্থাপন করেন বলে মনে করা হয়। দেবপালের মুঙ্গের লিপি থেকে জানা যায়, যে, তিনি সমুদ্র তীর পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন।

প্রধান কৃতিত্ব

গোপালের প্রধান কৃতিত্ব ছিল যে, তিনি বাংলাকে স্বৈরাচারী ও “কামাকারী” অর্থাৎ অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করেন।

উপসংহার :- ৭৭০ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে গোপালের মৃত্যু হয়। গোপালের বৌদ্ধধর্মে অনুরক্তির জন্য তিনি ‘পরম সৌগত’ বলে খলিমপুর লিপিতে অভিহিত হন।

(FAQ) পাল রাজা গোপাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন কে?

গোপাল।

২. গোপাল কিভাবে বাংলার রাজা হয়েছিলেন?

বাংলার প্রকৃতপুঞ্জের নির্বাচনে।

৩. গোপাল কোন ধর্ম গ্ৰহণ করেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৪. গোপালের উপাধি কি ছিল?

পরম সৌগত।

Leave a Reply

Translate »