রাজা শশাঙ্ক

রাজা শশাঙ্ক -এর পরিচিতি, রাজনৈতিক জীবন, ক্ষমতা লাভ, রাজত্বকাল, হর্ষবর্ধনের সাথে দ্বন্দ্ব, রাজ্যের প্রসার, ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানবো।

গৌড়রাজ শশাঙ্ক

রাজত্বআনুমানিক ৬০৬-৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ
রাজধানীকর্ণসুবর্ণ
পূর্বসূরিমহাসেনগুপ্ত
উত্তরসূরিমানব
রাজা শশাঙ্ক

ভূমিকা :- বাংলার শাসক শশাঙ্ক গৌড়রাজ শশাঙ্ক নামেই সর্বাধিক পরিচিত। বস্তুত বাংলার প্রথম সার্বভৌম শাসক হিসাবেই তিনি সুবিদিত। বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম শাসক যাঁর রাজ্যসীমা বাংলার ভৌগোলিক এলাকার বাইরে প্রসারিত হয়েছিল।

উৎস

শশাঙ্কের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে থাকে সে সমস্ত উপাদান সেগুলি হল –

  • (১) শশাঙ্কের রাজত্বের অষ্টম বর্ষে উৎকীর্ণ মেদিনীপুর তাম্রশাসন।
  • (২) তাঁর উনিশ রাজ্যাঙ্কবর্ষের মেদিনীপুর তাম্রশাসন।
  • (৩) তারিখবিহীন এগরা (মেদিনীপুর জেলা) তাম্রশাসন এবং ৬১১ খ্রিস্টাব্দের গঞ্জাম তাম্রশাসন।
  • (৪) রোটাসগড়ের পার্বত্য দুর্গে প্রাপ্ত একটি সিল তাঁর প্রারম্ভিক জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
  • (৫) সাহিত্যিক উপাদানের মধ্যে দুটি বিশেষ উপাদান হল- বাণভট্ট রচিত ‘হর্ষচরিত’ এবং হিউয়েন সাঙ রচিত বিবরণমূলক গ্রন্থ ‘সি-ইউ-কি’।

পরিচিতি

শশাঙ্কের বংশ বা পূর্ব পরিচয় এবং ক্ষমতা লাভ সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না।

রাজনৈতিক জীবন

বিহারের সাসারাম জেলার রোটাসগড় গিরিদুর্গে উৎকীর্ণ একটি সিলের ছাঁচে ‘শ্রী মহাসামন্ত শশাঙ্ক’ নামের উল্লেখ থেকে মনে হয় যে শশাঙ্কের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল মহাসামন্তরূপে।

ক্ষমতা লাভ

৬০৬ খ্রিস্টাব্দে পুষ্যভূতিরাজ হর্ষবর্ধন -এর সিংহাসনে আরোহণের কিছুকাল আগে (সম্ভবত ৬০০-৬০৫ খ্রিস্টাব্দে মধ্যে) শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা হিসাবে অধিষ্ঠিত হন।

রাজধানী

তাঁর রাজধানী ছিল ‘কর্ণসুবর্ণ”। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের নিকটস্থ রাঙামাটির সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করা হয়।

রাজত্বকাল

আনুমানিক ৬০৬-৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের কিছুকাল আগে পর্যন্ত শশাঙ্ক সগৌরবে রাজত্ব করেছিলেন।

আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে যোগদান

শশাঙ্কের শাসনকালে উত্তর ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি (মালব, কনৌজ, থানেশ্বর, কামরূপ, গৌড় প্রভৃতি) নিজ নিজ স্বার্থে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা মৈত্রীর সম্পর্ক বজায় রাখত। শশাঙ্ক সেই দ্বন্দ্বে অংশ নেন।

রাজ্যের প্রসার

উত্তর-পশ্চিম বারাণসী পর্যন্ত তাঁর রাজত্ব প্রসারিত হয়েছিল। শশাঙ্ক সমগ্র গৌড় দেশ, মগধ, বুদ্ধগয়া অঞ্চল এবং উড়িষ্যার একাংশ নিজের অধিকারে আনতে পেরেছিলেন।

গৌড়ের মর্যাদা বৃদ্ধি

উত্তর ভারতের ক্ষমতাধর রাজ্যগুলির সঙ্গে লড়াই করে শশাঙ্ক গৌড়ের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পেরেছিলেন। এই ঘটনা তাঁর বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয়।

হর্ষবর্ধনের সাথে দ্বন্দ্ব

শশাঙ্কের রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশীয় শাসক হর্ষবর্ধনের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব। ‘সকলোত্তরপথনাথ’ উপাধিধারী হর্ষবর্ধন শশাঙ্ককে হারাতে পারেননি।

ধর্মীয় বিশ্বাস

শশাঙ্ক ধর্মীয় বিশ্বাসে ছিলেন শৈব বা শিবের উপাসক।

  • (১) আর্যমশ্রীমূলকল্প নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে এবং হিউয়েন সাঙ -এর ভ্রমণ বিবরণীতে তাঁকে ‘বৌদ্ধবিদ্বেষী’ বলা হয়েছে।
  • (২) শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের হত্যা করেছিলেন এবং বৌদ্ধদের পবিত্র ধর্মীয় স্মারক ধ্বংস করেছিলেন।
  • (৩) হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের রচনা ‘হর্ষচরিত’-এ শশাঙ্ককে নিন্দা করা হয়েছে।
  • (৪) অন্যদিকে শশাঙ্কের শাসনকালের কয়েক বছর পরে হিউয়েন সাঙ কর্ণসুবর্ণ নগরের উপকণ্ঠে রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহারের সমৃদ্ধি লক্ষ করেছিলেন।
  • (৫) শশাঙ্কের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পর চীনা পর্যটক ই-ৎ সিঙ-এরও নজরে পড়েছিল বাংলায় বৌদ্ধধর্মের উন্নতি।
  • (৬) শশাঙ্ক নির্বিচারে বৌদ্ধবিদ্বেষী হলে তা হত না। বলা যায় যে, শশাঙ্কের প্রতি সব লেখকরা পুরোপুরি বিদ্বেষমুক্ত ছিলেন না। সুতরাং শশাঙ্ক সম্পর্কে তাদের মতামত কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল বলে মনে করা যেতে পারে।

গৌড়তন্ত্র

শশাঙ্কের শাসনকালে গৌড়ে যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তাকে বলা হয় গৌড়তন্ত্র। এই ব্যবস্থায় রাজ্যের কর্মচারী বা আমলারা একটা নির্দিষ্ট শাসন প্রণালী গড়ে তুলেছিল।

কেন্দ্রীয় ভাবে পরিচালনা

পূর্বে যা ছিল গ্রামের স্থানীয় লোকের কাজ, শশাঙ্কের সময় সেই কাজে প্রশাসনও হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, ওই আমলের গৌড় রাজ্যে কেন্দ্রীয় ভাবে সরকার পরিচালনা করা হত।

মুদ্রা

শশাঙ্কের আমলে সোনার মুদ্রা প্রচলিত ছিল। কিন্তু তার মান পড়ে গিয়েছিল। নকল সোনার মুদ্রাও দেখা যেত। রূপার মুদ্রা ছিল না।

বাণিজ্য

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই যুগে সম্ভবত মন্দা দেখা দিয়েছিল। সমাজে জমির চাহিদা বাড়তে থাকে। অর্থনীতি হয়ে পড়ে কৃষিনির্ভর। বাণিজ্যের গুরুত্ব কমে যাওয়ার ফলে নগরের গুরুত্ব করতে শুরু করে।

কৃষি

এই সময় কৃষির গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় সমাজ ক্রমশ গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। সমাজে মহত্তর বা স্থানীয় প্রধানদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। শ্রেষ্ঠী বা বণিকদের গুরুত্ব ও ক্ষমতা আগেকার যুগের থেকে কমে এসেছিল। স্থানীয় প্রধানরা এ যুগে শ্রেষ্ঠীদের মতো ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল।

ধর্মের বিকাশ

এই যুগে বঙ্গ এবং সমতটের শাসকরা প্রায় সকলেই ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুরাগী। বিষ্ণু, কৃষ্ণ এবং শিব পুজোর প্রথা ছিল।

বৌদ্ধ ধর্মের অবনতি

খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকের অধিকাংশ সময় জুড়ে বৌদ্ধধর্ম বাংলার রাজাদের সমর্থন পায়নি। পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় অষ্টম নবম শতকে পাল আমলে বৌদ্ধধর্ম আবার রাজার সমর্থন পেয়েছিল।

স্থায়ী রাজবংশ

শশাঙ্ক কোনো স্থায়ী রাজবংশ তৈরি করে যেতে পারেননি। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর গৌড়ের ক্ষমতা নষ্ট হয়। বাংলায় নানা বিশৃঙ্খলা শুরু হয়।

বাংলায় বিশৃঙ্খলা

শশাঙ্কের মৃত্যুর দশ বছর পর হর্ষবর্ধনও মারা যান। বাংলার নানা অংশ প্রথমে কামরূপের রাজা এবং পরে নাগ সম্প্রদায়ের জয়নাগ এবং তিব্বতের শাসকরা অধিকার করেন। অষ্টম শতকে কনৌজ এবং কাশ্মীরের শাসকরা বাংলা আক্রমণ করেছিলেন। বাংলার ইতিহাসে এই বিশৃঙ্খল সময়কে বলা হয় মাৎস্যন্যায়ের যুগ।

মাৎস্যন্যায়

মাৎস্যন্যায় বলতে দেশে অরাজকতা বা স্থায়ী রাজার অভাবকে বোঝানো হয়। পুকুরের বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছকে খেয়ে ফেলে, অরাজকতার সময়ে তেমনি শক্তিশালী লোক দুর্বল লোকের ওপর অত্যাচার করে।

পরিবর্তনের যুগ

শশাঙ্কের মৃত্যুর পরে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের মধ্যভাগ থেকে অষ্টম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত একশো বছর ছিল বাংলার ইতিহাসে একটা পরিবর্তনের যুগ। এই সময় প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, সম্ভ্রান্ত লোক, ব্রাহ্মণ এবং বণিক ইচ্ছামতো নিজের নিজের এলাকা শাসন করত। বাংলায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না।

উপসংহার :- বছরের পর বছর এই অবস্থা চলার পরে বাংলার প্রভাবশালী লোকেরা মিলে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে গোপাল নামে একজনকে রাজা নির্বাচন করে (আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)। ওই সময় থেকে বাংলায় পাল বংশের রাজত্ব শুরু হয়।

(FAQ) রাজা শশাঙ্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. রাজা শশাঙ্কের উপাধি কী ছিল?

মহাসামন্ত।

২. রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কোথায় ছিল?

কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা।

৩. শশাঙ্ক কোন ধর্মের উপাসক ছিলেন?

শৈব।

Leave a Reply

Translate »