মুর্শিদাবাদ

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা প্রসঙ্গে অবস্থান ও আকৃতি, সীমা, আয়তন ও জনসংখ্যা, নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ, নামকরণ, ইতিহাস, জলবায়ু, প্রশাসনিক অঞ্চল, ভাষা, দর্শনীয় স্থান, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসা বাণিজ্য সম্পর্কে জানবো।

মুর্শিদাবাদ

জেলা মুর্শিদাবাদ
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
দেশ ভারত
বিশিষ্ট ব্যক্তি মুর্শিদ কুলি খান, সিরাজদ্দৌলা
ঐতিহাসিক স্থান হাজার দুয়ারি
মুর্শিদাবাদ

ভূমিকা :- পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদা বিভাগের একটি জেলা মুর্শিদাবাদ। ভাগীরথী নদী এই জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জেলাকে দুভাগে ভাগ করেছে। ভাগীরথী নদীর পশ্চিমের অংশ রাঢ় অঞ্চল ও পূর্বের অংশ বাগড়ি অঞ্চল নামে পরিচিত।

অবস্থান ও আকৃতি

মুর্শিদাবাদ জেলা ২৩º৪৩’ উত্তর ও ২৪º৫২’ উত্ত অক্ষাংশ এবং ৮৭º৪৯’ পূর্ব ও ৮৮º৪৪’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের মধ‍্যভাগে অবস্থিত এই জেলাটি অনেকটা ত্রিভূজের অনুরূপ আকৃতিবিশিষ্ট।

সীমা

মুর্শিদাবাদ জেলার উত্তরে মালদহ জেলা ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা, উত্তর-পূর্বে বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা, দক্ষিণে নদীয়া জেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে পূর্ব বর্ধমান জেলা, পশ্চিমে বীরভূম জেলা এবং উত্তর-পশ্চিমে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় জেলা অবস্থিত৷

আয়তন ও জনসংখ্যা

মুর্শিদাবাদ জেলার আয়তন ৫.৩১৪ বর্গ কিমি বা ২,০৬২ বর্গ মাইল এবং জনসংখ্যা ৭০ লক্ষেরও বেশি। ভারতের ৬৪১টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ ভারতের নবমতম জনবহুল জেলা। বহরমপুর এই জেলার সদর দপ্তর।

নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ

নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ সুবা বাংলার বা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও বাংলাদেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।

নামকরণ

  • (১) বাংলার নবাব মুর্শিদ কুলি খানের নাম অনুসারে মুর্শিদাবাদ শহর এবং জেলার নামকরণ করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদ শহর, যা এই জেলারও নাম, এর প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদকুলি খানের নামানুসারে হয়েছে। ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেব কর্তৃক মহম্মদ হাদী বাংলা সুবার দেওয়ান নিযুক্ত হন।
  • (২) ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার রাজধানী ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে মুর্শিদকুলি খান উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন এবং তার নতুন শিরোনাম অধিগ্রহণের পরে ১৭০৪ সালে এই শহরটির নাম মুর্শিদাবাদ রাখার অনুমতি মঞ্জুর করেন।

ইতিহাস

  • (১) প্রাচীন যুগে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসূবর্ণ অঞ্চলে। বাংলার অন্যতম পাল রাজা মহিপালের রাজধানী শহরও ছিল সম্ভবত এই জেলায়।
  • (২) আঠারো শতকের গোড়ার দিকে এই জেলাটির বর্তমান নাম এবং আঠারো শতকের শেষার্ধে এর বর্তমান আকারটি পাওয়া যায়। নবাব মুর্শিদকুলি খান মুর্শিদাবাদকে সুবা বাংলার (বর্তমান বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) রাজধানী করেন। পলাশীর যুদ্ধের পরে বহু বছর ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখান থেকে রাজত্ব করেছিল।
  • (৩) ১৯১২ সালে ব্রজ ভূষণ গুপ্তের সভাপতিত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটি গঠিত হয়েছিল। স্বদেশী আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন এই জেলাতেও সক্রিয় ছিল।
  • (৪) ১৫ ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ কার্যকর হয় এবং পরবর্তী দুই দিনের জন্য মুর্শিদাবাদ জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল।
  • (৫) হুগলি নদী পুরোপুরি ভারতের অভ্যন্তর নিশ্চিত করার জন্য ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট রাডক্লিফ কমিশন চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণের সময় মুর্শিদাবাদকে ভারতীয় বিভাগে স্থানান্তরিত করে।

জলবায়ু

মুর্শিদাবাদ জেলায় উষ্ণ আর্দ্র ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু বিরাজ করে। গ্রীষ্মকালে সর্বাধিক উষ্ণতা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন উষ্ণতা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মকালে প্রবল কালবৈশাখীর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

উল্লেখযোগ্য নদ-নদী ও খালবিল

গঙ্গা, পদ্মা, ভাগীরথী, ময়ূরাক্ষী, জলঙ্গী প্রভৃতি নদী এবং ভাণ্ডারদহ বিল, ডুমনী বিল, পাতবিল, দাদপুর বাঁওড়, বসিয়া বিল ও খয়রামারী বিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

প্রশাসনিক অঞ্চল

মুর্শিদাবাদ জেলা পাঁচটি মহকুমা নিয়ে গঠিত। পৌরসভা এলাকা বাদে প্রতিটি মহকুমায় একাধিক সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক রয়েছে যা আবার গ্রামীণ এলাকা এবং আদমশুমারি শহরে বিভক্ত। মুর্শিদাবাদ জেলায় মোট ৮টি পৌরসভা ও ২৬টি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক রয়েছে। যথা –

(১) বহরমপুর সদর মহকুমার পৌরসভা ও ব্লক

বহরমপুর ও বেলডাঙ্গা পৌরসভা, বহরমপুর, বেলডাঙ্গা- ১, বেলডাঙ্গা- ২, হরিহরপাড়া ও নওদা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

(২) ডোমকল মহকুমার পৌরসভা ও ব্লক

ডোমকল পৌরসভা, ডোমকল, রাণীনগর- ১, রাণীনগর- ২ ও জলঙ্গী সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

(৩) লালবাগ মহকুমার পৌরসভা ও ব্লক

মুর্শিদাবাদ ও জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পৌরসভা, মুর্শিদাবাদ-জিয়াগঞ্জ, ভগবানগোলা- ১, ভগবানগোলা- ২, লালগোলা ও নবগ্রাম সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

(৪) কান্দি মহকুমার পৌরসভা ও ব্লক

কান্দি পৌরসভা, কান্দি, খড়গ্রাম, বড়ঞা, ভরতপুর- ১ ও ভারতপুর- ২ সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

(৫) জঙ্গীপুর মহকুমার পৌরসভা ও ব্লক

জঙ্গীপুর ও ধুলিয়ান পৌরসভা, সাগরদিঘী, রঘুনাথগঞ্জ-১, রঘুনাথগঞ্জ- ২, সুতি- ১, সুতি-২, সামশেরগঞ্জ ও ফারাক্কা সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক।

ভাষা

মুর্শিদাবাদ জেলার বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী বাংলাভাষায় কথা বলে। কথ্য রাঢ়ি উপভাষাটি কম-বেশি দক্ষিণ বঙ্গের মতো, তবে কিছুটা আঞ্চলিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও, বাংলা ভাষার দ্বারা প্রভাবিত হিন্দি-উর্দু ভাষার একটি কথ্যভাষা খোট্টা জেলার উত্তরাংশের কিছু এলাকায় (বিশেষত ফারাক্কা, সামসেরগঞ্জ, সুতি, জঙ্গীপুর এলাকায়) ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত।

দর্শনীয় স্থান

মুর্শিদাবাদ জেলার দর্শনীয় স্থান গুলি হল –

দাদপুর নীলকুঠি, মুনির মহল জঙ্গিপুর, হাজার দুয়ারী রাজপ্রাসাদ, নিজামত ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল, কিরীটেশ্বরী মন্দির, কাঠগোলা বাগান, জাহানকোষা, ব্যারাক স্কোয়ার, বাবুলবোনা সমাধি, মীর মদনের সমাধি, লালদিঘি, সাগরদীঘি, পাতালেশ্বর শিবমন্দির, ভট্টমাটি শিবমন্দির, শেখদিঘি, শ্রীপুর রাজপ্রাসাদ, ছোট রাজবাড়ী কাশিমবাজার, ফারাক্কা ব্যারেজ, জগদ্বন্ধু ধাম, সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন, ত্রিপোলিয়া তোরণ, নিউ প্যালেস, ফুটি মসজিদ, খোসবাগ, নসিপুর, রাজবাড়ী, চারবাংলা মন্দির, কপিলেশ্বর শিবমন্দির, রোশনিবাগ, ডুমনী মায়ের মন্দির, নিমতিতা জমিদার বাড়ি, সোনারুন্দি বনোওয়ারীবাদ রাজবাড়ী, দোহালিয়া কালী মন্দির, সুভাষ দ্বীপ, ডাচ সমাধিক্ষেত্র, আর্মেনিয়ান গীর্জা, ব্যাসপুর শিবমন্দির, ভোলনার শিবমন্দির প্রভৃতি।

মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ

মুর্শিদাবাদ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নবাব মুর্শিদ কুলি খান, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, চিত্রশিল্পী ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার, রাজা কৃষ্ণনাথ রায়, বিশিষ্ট বাঙ্গালী ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক মণীশ ঘটক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক রেজাউল করিম, বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক বাবর আলী, খ্যাতনামা কীর্তন-গায়ক ফটিক চৌধুরী, বিখ্যাত গায়ক অরিজিৎ সিং, বিখ্যাত গায়িকা শ্রেয়া ঘোষাল, বিখ্যাত গায়িকা, বিখ্যাত পদকর্তা গোবিন্দদাস, রাজনীতিবিদ অধীর রঞ্জন চৌধুরী প্রমুখ।

ব্যবসা বাণিজ্য

বিশ্ব নগরী হিসেবে এই জেলা সমগ্র বাংলায় খ্যাতি অর্জন করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ ইউরোপীয় সংস্থাগুলি এই মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করেই ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে।

শিল্প

  • (১) মুর্শিদাবাদ একসময়ে রেশম শিল্প, হাতির দাঁত, হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত এবং মুঘল চিত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। পাটের তৈরী নানা দ্রব্যাদি বিশেষ করে পাটের পুতুল এখানকার হস্ত শিল্পের মূল আকর্ষণ।
  • (২) নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় আর একটি হস্ত শিল্পের সমৃদ্ধি ঘটেছে এই জেলায় সেটি হল কাঠের তৈরী নানা প্রকার ঘর সাজানোর সরঞ্জাম। মুর্শিদাবাদে তৈরী সিল্ক এবং রেশমের কাপড় জগৎ বিখ্যাত।
  • (৩) কেবল স্থানীয় নয় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকগুলির চাহিদা প্রচুর বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের বালুচর শহরে বিখ্যাত বালুচরি শাড়ি খ্যাতি লাভ করেছে

পলাশির যুদ্ধ

১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী করা হয় মুর্শিদাবাদকে। এই সময়ে মুর্শিদাবাদের নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা। ১৭৫৭ সালের ২৫ জুন পলাশির প্রান্তরে সিরাজউদ্দৌলা ও তাঁর সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর যে মরণপণ যুদ্ধ হয়েছিল তা কেবল বাংলাই নয়, সমগ্র ভারতের ভবিষ্যত রচনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত পলাশির যুদ্ধে হেরে যান বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ।

উপসংহার :- একটি নতুন প্রশাসনিক এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার উত্থানে মুর্শিদাবাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। নবাবের ক্ষমতা ও কার্যকলাপ হ্রাস পাওয়ায় এবং অভিজাতদের নিঃস্বতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তার কেন্দ্র হিসেবে মুর্শিদাবাদের অবনতি ঘটে। বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা, করণিক, ভৃত্য, ব্যাংকার এবং বণিকদের জন্য একটি লাভজনক বাজার হিসেবে এর সমাপ্তি ঘটে এবং ক্রমান্বয়ে এটি একটি জেলা শহরের রূপ ধারণ করে।

(FAQ) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কার নাম অনুসারে মুর্শিদাবাদ নাম হয়?

নবাব মুর্শিদ কুলি খান।

২. ঐতিহাসিক জাদুঘর হাজার দুয়ারি কোথায় অবস্থিত?

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়।

৩. কলকাতার পূর্বে বাংলার রাজধানী কোথায় ছিল?

মুর্শিদাবাদ।

৪. মুর্শিদাবাদকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে কোন নদী?

ভাগীরথী নদী।

Leave a Reply

Translate »