মুর্শিদকুলি খাঁ

মুর্শিদকুলি খাঁ -র জন্ম, পারস্য গমন, দিল্লি প্রত্যাবর্তন, বেরার প্রদেশের দেওয়ান পদ গ্রহণ, হায়দ্রাবাদের দেওয়ান নিযুক্ত, মুর্শিদকুলি খাঁ উপাধি লাভ, মোগল বাদশাহকে সাহায্য প্রদান, দেওয়ানি বিভাগ স্থানান্তর, দাক্ষিণাত্যে বদলি, পুনরায় বাংলার দেওয়ান পদ গ্রহণ, বাংলার সুবাদার নিযুক্ত, বাংলায় স্বাধীন নবাবির পত্তন, সুশাসন, শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, গুণাবলী ও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে জানবো।

মুর্শিদকুলি খাঁ (১৭০০-২৭)

জন্মআনুমানিক ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ
রাজত্ব১৭১৭–১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ
রাজ্যাভিষেক১৭১৭ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু৩০ জুন, ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ
সমাধিকাটরা মসজিদ, মুর্শিদাবাদ
মুর্শিদকুলি খাঁ

ভূমিকা :- অষ্টাদশশতকেরবাংলারইতিহাসেমুর্শিদকুলিখাঁবিশিষ্টস্থানেরঅধিকারী।অতিসাধারণভাবেজীবনশুরুকরেওকেবলমাত্রনিজবুদ্ধি,বিচক্ষণতা,দক্ষতাওচারিত্রিকদৃঢ়তারমাধ্যমেতিনিএকটি’সুবা’-রশীর্ষেআরোহণকরেসেখানেএকটিস্বাধীননবাবিরপ্রতিষ্ঠাকরেন।

জন্ম

বাংলায় স্বাধীন নবাবি বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদকুলি খাঁ-র জন্ম দক্ষিণ ভারতের একব্রাহ্মণ পরিবারে। বাল্যকালে তাঁকে হাজি শাফি ইস্পাহানি নামে জনৈক মুসলিমের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং তাঁর নাম হয় মহম্মদ হাদি।

পারস্য গমন

হাজি শাফিইস্পাহানি তাঁকে পুত্রস্নেহে লালন-পালন করেন এবং পারস্যে নিয়ে যান। পারস্যে অবস্থান-কালে তিনি পারসিক শিক্ষা-সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হন।

দিল্লি প্রত্যাবর্তন

হাজি শাফি ইস্পাহানি ভারতে ফিরে এসে দিল্লি দরবারে ‘দেওয়ান-ই-তান’ পদ লাভ করেন। পালক-প্রভুর সান্নিধ্যে মহম্মদ হাদি দেওয়ানি-সংক্রান্ত বিষয়ে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

বেরার প্রদেশের দেওয়ান

হাজি সাফি ইস্পাহানির মৃত্যুর পর তিনি দাক্ষিণাত্যের বেরার প্রদেশের ‘দেওয়ান’ আবদুল্লা খোরাসানি-র অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন।

হায়দ্রাবাদের দেওয়ান

এই সময় দেওয়ানি-সংক্রান্ত কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পরিচয় পেয়ে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে হায়দ্রাবাদের ‘দেওয়ান’ নিযুক্ত করেন (১৫৯৬ খ্রিঃ)। সেখানে অচিরেই তিনি সৎ ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং ঔরঙ্গজেবের নির্ভরযোগ্য পাত্রে পরিণত হন।

মুর্শিদকুলি খাঁ উপাধি লাভ

১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেব তাঁর ওপর বাংলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করে তাঁকে দেওয়ান’ হিসেবে বাংলায় পাঠান। বাংলার ‘দেওয়ান’ হিসেবে কৃতিত্ব প্রদর্শন করার জন্য ঔরঙ্গজেব পরবর্তীকালে তাঁকে ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধি দেন।

দেওয়ান পদে ইস্তফা

মুর্শিদকুলি খাঁ ‘দেওয়ান’ হিসেবে কাজে যোগ দিলে সুবাদার আজিম-উস্-শানের সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাঁধে। অবস্থা এমনই দাঁড়ায় যে, এক সময় মুর্শিদকুলি খাঁ চাকুরিতে ইস্তফা দিতে অগ্রসর হন। বাদশাহ তাঁর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেন নি। আসলে তাঁর প্রতি বাদশাহেরঅগাধ আস্থা ছিল।

মোগল বাদশাহকে সাহায্য প্রদান

সাম্রাজ্যের ঘোরতর দুর্দিনে দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধরত ও অর্থক্লিষ্ট বাদশাহকে একমাত্র তিনিই রাজস্ব হিসেবে বছরে এক কোটি টাকা পাঠাতেন। এই কারণে বাদশাহ রাজস্ব-সংক্রান্ত ব্যাপারে তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন।

দেওয়ানি বিভাগ স্থানান্তর

আজিম-উস-শান তাকে হত্যার চক্রান্ত করলে বাদশাহের অনুমতি নিয়ে তিনি দেওয়ানি বিভাগ ঢাকা থেকে মোঙ্গদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। পরবর্তীকালে তাঁর নাম অনুসারে মোঙ্গদাবাদের নাম হয় মুর্শিদাবাদ।

দাক্ষিণাত্যে বদলি

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে জয়লাভ করে প্রথম বাহাদুর শাহ দিল্লির সিংহাসনে বসেন। পুত্র আজিম-উস-শানের পরামর্শে নতুন বাদশা মুর্শিদকুলি খাঁ-কে দাক্ষিণাত্যে বদলি করেন। প্রায় দু’বছর (১৭০৮-১৭০৯ খ্রিঃ) তিনি সেখানে ছিলেন।

পুনরায় বাংলার দেওয়ান

১৭১০ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় তিনি ‘দেওয়ান’ হিসেবে বাংলায় ফিরে আসেন। ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে ফারুখশিয়র দিল্লির সিংহাসনে বসে মুর্শিদকুলিকে ‘দেওয়ান’ ছাড়াও বাংলার নায়েব সুবাদার পদে নিয়োগ করেন (১৭১৩ খ্রিঃ)।

বাংলার সুবাদার

১৭১৭খ্রিস্টাব্দেমুর্শিদকুলিখাঁবাংলারসুবাদারনিযুক্তহলেমুর্শিদাবাদবাংলাররাজধানীতেপরিণতহয়।এইভাবে তিনি একই সঙ্গে বাংলার সুবাদারও ‘দেওয়ান’ এবং উড়িষ্যার সুবাদার’ নিযুক্ত হন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।

স্বাধীন নবাব পত্তন

‘সুবাদার’ হয়ে তিনি মুর্শিদাবাদে তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেন এবং মোগল সাম্রাজ্যের চরম বিশৃঙ্খলার দিনে দিল্লির প্রতি ‘নামেমাত্র’ আনুগত্য প্রদর্শন করে তিনি বাংলায় এক স্বাধীন নবাবির পত্তন করেন।

সুশাসন ও শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা

বাংলায় সুশাসন ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক উন্নয়ন-সাধন তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব।

গুণাবলী

উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী মুর্শিদকুলি খাঁ সমকালীন সকল চারিত্রিক ত্রুটি থেকে মুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ, ধর্মভীরু, গোঁড়া এবং সর্বপ্রকার বিলাসিতা-মুক্ত।

সাধারণ জীবনযাপন

ঔরঙ্গজেবের মতোই তিনি আড়ম্বরহীন সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি কোরান পাঠ ও নকল করতেন।

বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষক

তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত।

শোষণের হাত থেকে মুক্তি

বাংলার ‘সুবাদার’ হয়ে সারা দেশে তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। জনগণ রাজকর্মচারীদের শোষণের হাত থেকে মুক্তি পায়। তাঁর প্রবর্তিত ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা প্রজাদের মঙ্গলসাধন করে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনে ভূমিকা

পরবর্তীকালে লর্ড কর্ণওয়ালিস এই ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই বাংলায়চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এই সময় ব্যবসা-বাণিজ্যেও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।

শিক্ষা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক

মুর্শিদকুলি খাঁ শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে পারসিক পণ্ডিতগণ বাংলায় আসার কৃতিত্ব থাকেন এবং বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে উল্লেখযোগ্য সংযোগ সাধন করেন।

উপসংহার :- স্যার যদুনাথ তাঁর কৃতিত্বের মূল্যায়ন করে বলেছেনযে, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ অসামরিক প্রশাসক, কিন্তু দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতিজ্ঞ ছিলেননা।

(FAQ) মুর্শিদকুলি খাঁ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন কবে?

১৭০০ খ্রিস্টাব্দে।

২. ঔরঙ্গজেব কাকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন?

মুর্শিদকুলি খাঁ কে।

৩. মুর্শিদকুলি খাঁর প্রকৃত নাম কী?

মহম্মদ হাদী।

৪. মহম্মদ হাদীকে মুর্শিদকুলি খাঁ উপাধি প্রদান করেন কে?

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব।

Leave a Reply

Translate »