পেশোয়া বালাজি বাজিরাও

মারাঠা পেশোয়া বালাজি বাজিরাও এর জন্ম, পেশোয়া পদ লাভ, বিলাসী ও আরামপ্রিয়, রাজধানী স্থানান্তর, লক্ষ্য, সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ও চরম বিপর্যয়, পূর্ববর্তী নীতি থেকে বিচ্যুতি, রাজ্যজয়, আবদালির আক্রমণ, পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ, বালাজি বাজিরাও এর মৃত্যু, মারাঠা শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব, গ্রান্ট ডাফের অভিমত ও বালাজি বাজিরাও এর ত্রুটি সম্পর্কে জানবো।

পেশোয়া বালাজি বাজিরাও (১৭৪০-৬১ খ্রিঃ)

জন্ম৮ ডিসেম্বর, ১৭২০ খ্রিষ্টাব্দ
পরিচিতিমারাঠা পেশোয়া
পূর্বসূরিপ্রথম বাজিরাও
মৃত্যু২৩ জুন, ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দ
পেশোয়া বালাজি বাজিরাও

ভূমিকা :- ভারতের মারাঠা সাম্রাজ্যের একজন পেশোয়া ছিলেন বালাজী বাজী রাও।তার সময়ে ‘ছত্রপতি’ (মারাঠা রাজা) কেবল একজন আনুষ্ঠানিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁর সময়ে মারাঠা সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করে।

জন্ম

প্রথম বাজিরাও-এর পুত্র বালাজি রাও ১৭২০ সালের ৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নানা সাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন।

পেশোয়া পদ লাভ

প্রথম বাজিরাও -এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বালাজি বাজিরাও মাত্র আঠারো বছর বয়সে পেশোয়া পদ লাভ করেন।

বিলাসী ও আরাম প্রিয়

পিতার মহৎ গুণাবলী তাঁর ছিল না। তিনি কিছুটা বিলাসী ও আরামপ্রিয় ছিলেন। পিতার সামরিক প্রতিভাও তাঁর ছিল না। তিনি নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারতেন না। যুদ্ধকালে তিনি অসহায়ভাবে সামন্ত প্রভুদের ওপর নির্ভর করতেন।

রাজধানী স্থানান্তর

রাজা শাহুর জীবদ্দশাতেই তিনি রাজ্যের রাজধানী সাতারা থেকে পুণাতে স্থানান্তরিত করেন। এর ফলে শাসনব্যবস্থায় তাঁর কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পায়।

পেশোয়া পদের আইনগত স্বীকৃতি

১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বে শাহু মারাঠা রাজ্যের সকল কর্তৃত্ব পেশোয়াকেই অর্পণ করে যান। এর ফলে বংশানুক্রমিক পেশোয়া পদ আইনগত বৈধতা পায়।

লক্ষ্য

বালাজি বাজিরাও ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন, কিন্তু পিতার মতো রণনিপুণ ও কূটকৌশলী ছিলেন না। তিনি ঘোষণা করেন যে, “দক্ষিণে কটক থেকে উত্তর-পশ্চিমে আটক পর্যন্ত মারাঠা পতাকা উড্ডীন” করাই তাঁর লক্ষ্য।

সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ও চরম বিপর্যয়

তাঁর আমলে মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে এবং তাঁর আমলেই মারাঠা সাম্রাজ্যের চরম বিপর্যয় সংঘটিত হয়।

পূর্ববর্তী নীতি থেকে বিচ্যুতি

পিতার অনুসৃত নীতি থেকে তিনি দু’ভাবে বিচ্যুত হন। যেমন –

  • (১) বালাজি বাজিরাও ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহি’ নীতি ত্যাগ করে হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং তাদের কাছ থেকেও চৌথ ও সরদেশমুখি আদায় করতে থাকেন। এর ফলে বহু হিন্দু রাজা তাঁর বিরুদ্ধবাদী হয়ে পড়ে।
  • (২) মারাঠা বাহিনীতে অ-হিন্দু ও বিদেশি সৈনিক গ্রহণ করে তিনি মারাঠা বাহিনীর জাতীয় সংহতি বিপন্ন করেন। তাঁর আমলে যুদ্ধের গেরিলা পদ্ধতিও পরিত্যক্ত হয়। একদল সেনাকে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে শিক্ষিত করে তোলা শুরু হয়। গোলন্দাজ বাহিনীও গঠিত হয়।

রাজ্য জয়

  • (১) বালাজি বাজিরাও-এর আমলে মারাঠারা মহীশূর-এর কিছু অংশ ও কর্ণাটক দখল করে। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে উদগিরের যুদ্ধে মারাঠা বাহিনী নিজাম-কে পরাজিত করে এবং নিজাম বিজাপুর, দৌলতাবাদ ও আসিরগড় প্রভৃতি স্থান মারাঠাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
  • (২) মারাঠা সেনাপতি রঘুজি ভোসলে বারংবার বাংলা আক্রমণ করেন (১৭৪২-৫১ খ্রিঃ) এবং শেষ পর্যন্ত এক সন্ধির মাধ্যমে (১৭৫১ খ্রিঃ) বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ মারাঠাদের উড়িষ্যা ছেড়ে দিতে এবং তাদের বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা চৌথ দেবার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হন।
  • (৩) মারাঠা সেনাদল আফগানিস্তানের আমির আহম্মদ শাহ আবদালি-র প্রতিনিধি নাজিবউদ্দৌলাকে বিতাড়িত করে দিল্লি দখল করে (১৭৫৭ খ্রিঃ) এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে। মোগল সম্রাট মারাঠাদের হাতের পুতুলে পরিণত হন।
  • (৪) অতঃপর মারাঠারা পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হয় এবং লাহোর (১৭৫৮ খ্রিঃ) ও সিন্ধুনদের তীরে দুর্ভেদ্য আটক দখল করে। পাঞ্জাবের একাংশ তখন আহম্মদ শাহ আবদালির অধীনস্থ ছিল।
  • (৫) পাঞ্জাবের শাসনকর্তা আবদালির পুত্র তৈমুরকে পরাজিত করে রঘুনাথ রাও পাঞ্জাব দখল করেন (১৭৫৮ খ্রিঃ)। এইভাবে সিন্ধুনদ থেকে দাক্ষিণাত্যের সীমান্ত পর্যন্ত মারাঠা অধিকার বিস্তৃত হয়।

আবদালির আক্রমণ

মারাঠারা পাঞ্জাব দখল করলে আহম্মদ শাহ আবদালি পুনরায় ভারত আক্রমণ করেন এবং পাঞ্জাব দখল করে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। পেশোয়ার জ্ঞাতিভ্রাতা সদাশিব রাও এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বাস রাও-এর নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী আবদালিকে বাধা দিতে অগ্রসর হয়।

মারাঠাদের বিরুদ্ধে আফগান পক্ষে যোগদান

মারাঠাদের শক্তি বিস্তারে আতঙ্কিত অযোধ্যার নবাব সুজাউদৌল্লা ও রোহিলা সর্দার নজির খাঁ আবদালির পক্ষে যোগ দেন। মারাঠা কর্তৃক উৎপীড়িত রাজপুত, জাঠ—এমনকী মারাঠা দলপতি রঘুজি ভোঁসলে নিরপেক্ষ থাকেন।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ

১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জানুয়ারি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হয়।সদাশিব রাও ও বিশ্বাস রাও ছাড়াও ২২ জন প্রথম শ্রেণীর সেনাপতি এবং ২০ হাজার মারাঠা সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হয়। মারাঠাদের বহু ধন-রত্ন, উট, হাতি ও ঘোড়া আহম্মদ শাহ আবদালি দখল করেন।

বালাজি বাজিরাও এর মৃত্যু

পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে পেশোয়া বালাজি বাজিরাও ভগ্ন হৃদয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন(২৩শে জুন, ১৭৬১ খ্রিঃ)।

মারাঠা শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব

এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও বা বালাজি বাজিরাওএর আমলে মারাঠা শক্তি ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছিল এবং পেশোয়া বিপুল শক্তির অধিকারী হয়েছিলেন। এই সময় মারাঠা জনগণের আর্থিক উন্নতি এবং দেশের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।

গ্রান্ট ডাফের অভিমত

ঐতিহাসিক গ্রান্ট ডাফ বলেন যে, “বালাজি বাজিরাও তাঁর ষড়যন্ত্র-প্রবণতা ও প্রতারণামূলক নীতির জন্য মিত্র শক্তিগুলির আস্থা হারান।”

ত্রুটি

পেশোয়া বালাজি বাজিরাও -এর ত্রুটি গুলি হল –

  • (১) তিনি ‘হিন্দু-পাদ-পাদশাহি’ -র আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন।তাঁর অধীনস্থ মারাঠা সর্দারদের তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন। রঘুজি ভোঁসলে, সিন্ধিয়া প্রমুখ তাঁর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে।
  • (২) দিল্লির দরবারে হস্তক্ষেপ করে তিনি মুসলিম শাসকদের বিরাগ ভাজন হন।
  • (৩) পাঞ্জাবে হস্তক্ষেপ করে তিনি আহম্মদ শাহ আবদালির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।

উপসংহার :- সর্বপ্রকার ত্রুটি ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও তিনি সমগ্ৰ ভারতে মারাঠা আধিপত্য বিস্তৃত করেন এবং এই জন্যই তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

(FAQ) পেশোয়া বালাজি বাজিরাও সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন পেশোয়া হিন্দু-পাদ-পাদশাহি নীতি থেকে বিচ্যুত হন?

বালাজি বাজিরাও।

২. কাদের মধ্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ হয়?

পেশোয়া বালাজি বাজিরাও -এর মারাঠা বাহিনী ও আফগান শাসক আহম্মদ শাহ আবদালির আফগান বাহিনীর মধ্যে।

৩. পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ কখন হয়?

১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জানুয়ারি।

৪. পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের সময় পেশোয়া কে ছিলেন?

বালাজি বাজিরাও।

Leave a Reply

Translate »