প্রথম বাহাদুর শাহ

প্রথম বাহাদুর শাহ প্রসঙ্গে তার সিংহাসনে আরোহণ, ব্যক্তিত্ব, হিন্দুদের প্রতি ব্যবহার, মারাঠাদের সাথে নীতি, শিখদের সাথে বিরোধ, শাসন ব্যবস্থার অবনতি, অর্থসংকট ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

প্রথম বাহাদুর শাহ

ঐতিহাসিক চরিত্রপ্রথম বাহাদুর শাহ
পরিচিতিমোগল সম্রাট
রাজত্বকাল১৭০৭-১৭১২ খ্রি:
পূর্বসূরিঔরঙ্গজেব
উত্তরসূরিজাহান্দার শাহ
প্রথম বাহাদুর শাহ

ভূমিকা :- ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় শাসনকালেই মুঘল সাম্রাজ্যের ঐক্য ও স্থায়িত্বের ভিত্তি কেঁপে উঠেছিল। তার শাসন পদ্ধতিতে ক্ষতিকর দিকগুলিও বেশ প্রকট ছিল এবং সত্ত্বেও ১৭০৭ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুকালেও মুঘল শাসনব্যবস্থা ও সামরিক শক্তি যথেষ্ট দৃঢ় ছিল।

বাহাদুর শাহর সিংহাসনে আরোহণ

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর তিন পুত্র সিংহাসনের দাবি নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে পঞ্চ-ষষ্টি বৎসর বয়স্ক বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন।

বাহাদুর শাহর ব্যক্তিত্ব

তিনি বিজ্ঞান, আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন ও দক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। রাজ্যশাসন ব্যাপারে তিনি যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার নীতি মেনে চলতেন তার প্রমাণ এই যে সম্রাট ঔরঙ্গজেব প্রবর্তিত পক্ষপাতমূলক কিছু শাসননীতি ও আইনকানুন তিনি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

হিন্দুদের প্রতি বাহাদুর শাহর ব্যবহার

হিন্দু রাজা ও হিন্দু প্রধানদের প্রতি ব্যবহারে তাঁর সহনশীলতা ও উদারতার পরিচর পাওয়া যেত। তাঁর রাজত্বকালে কোন হিন্দু মন্দির ধ্বংসের ঘটনা ঘটেনি।

অম্বর ও মাড়োয়ার রাজ্যের উপর বাহাদুর শাহর অধিকতর কর্তৃত্ব লাভের চেষ্টা

  • (১) রাজত্বকালের প্রথম দিকে বাহাদুর শাহ, রাজপুতানার অম্বর ও মাড়োয়ার (যোধপুর) রাজ্য দুটির উপর অধিকতর কর্তৃত্বলাভের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি অম্বররাজ জয়সিংহকে অপসারিত করে তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিজয় সিংহকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার চেষ্টা করেন।
  • (২) মাড়োয়ার রাজ অজিত সিংহকে মুঘল শক্তির নিকট নতিস্বীকার করাতেও তিনি সচেষ্ট হন। এই উদ্দেশ্যে অম্বর ও যোধপুর শহর দুটি তিনি সৈন্যবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এই অবরোধের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রামও চলেছিল।
  • (৩) হয়ত এই প্রতিরোধ বাহাদুর শাহের জ্ঞান চক্ষু খুলে দিতে সাহায্য করেছিল, কারণ এর পরই তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে এই দুটি রাজ্যের সঙ্গে আপোষ-মীমাংসার ব্যবস্থা করেছিলেন। অবশ্য এর শর্তগুলিও যে খুব উদার ছিল তা নয়।
  • (৪) রাজা জয়সিংহ ও অজিত সিংহকে তাদের নিজ নিজ রাজ্যে রাজত্ব করার অধিকারও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা উচ্চমানের মনসব (পদমর্যাদা) ও গুজরাট ও মাড়োয়ার মত বিশিষ্ট প্রদেশের সুবাদার পদের যে দাবি উপস্থিত করেছিলেন, তা তাঁদের দেওয়া হয়নি।

মারাঠাদের প্রতি বাহাদুর শাহর নীতি

  • (১) বাহাদুর শাহ, মারাঠা সর্দারদের সম্বন্ধে যে আপোষমূলক নীতি গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যেও বেশ আন্তরিকতার অভাব ছিল। বাহাদুর শাহ্, মারাঠা সর্দারদের দাক্ষিণাত্যের ‘সরদেশমুখী’ত্ব মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের ‘চৌথ মঞ্জুর করেননি।
  • (২) কাজেই মারাঠা সর্দারদের তিনি ভালভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেন নি। শাহুকে তিনি ন্যায়সঙ্গত মারাঠা-নৃপতিরূপে স্বীকৃতি দেন নি। এর ফলে মারাঠা রাজ্যের অধিকার নিয়ে শাহু ও তারাবাঈ-এর মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে গিয়েছিল।
  • (৩) বাহাদুর শাহের অস্বীকৃতির কারণে শাহু ও মারাঠা সর্দারেরা অশান্ত হয়ে উঠেন এবং এর পরিণামে দাক্ষিণাত্য অঞ্চলও অশান্তি গ্রস্ত হয়। কখনও মারাঠা সর্দারগণ নিজেদের মধ্যে লড়াই করে যাচ্ছিলেন, কখনও বা মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছিলেন, কাজেই ঐ অঞ্চলে শান্তি ও শৃঙ্খলার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত হয়ে উঠেছিল।

শিখদের সাথে বাহাদুর শাহর বিরোধ

  • (১) গুরু গোবিন্দ সিংকে উচ্চমর্যাদা (মনসব) দিয়ে এবং তাঁর সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে বাহাদুর শাহ বিদ্রোহী শিখদের সঙ্গে একটা আপোষ মীমাংসার জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু গুরু গোবিন্দ সিং-এর মৃত্যুর পরেই শিখরা আবার বান্দা বাহাদুরের নেতৃত্বে পাঞ্জাব অঞ্চলে বিদ্রোহের ধ্বজা উত্তোলন করেছিল।
  • (২) সম্রাট শিখ বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে স্বয়ং একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে শতদ্রু ও যমুনার মধ্যবর্তী প্রায় সমগ্র ভূ-ভাগ বিদ্রোহীদের উপদ্রবমুক্ত করে অধিকার করেন। এই অঞ্চলটি প্রায় দিল্লীর কোলঘেঁষা।
  • (৩) শুধু তাই নয়, আম্বালার উত্তর-পূর্বে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত গুরু গোবিন্দ সিং নির্মিত লোগড় দুর্গসহ শিখদের অন্যান্য দৃঢ় কয়েকটি ঘাঁটিওতিনি জয় করতে সমর্থ হন।
  • (৪) এতৎসত্ত্বেও তিনি শিখ বিদ্রোহ দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৭১২ খ্রিষ্টাব্দে শিখরা লোগড় দুর্গ পুনরুদ্ধার করে নিয়েছিল।

বুন্দেলা নায়কের সাথে বাহাদুর শাহর মিত্রতা

বাহাদুর শাহ, বুন্দেলা নায়ক ছত্রসালের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। ছত্রসাল তাঁর অনুগত মিত্র রাজা রূপে পরিগণিত হয়েছিলেন।

বাহাদুর শাহর সঙ্গে জাঠদের মিত্রতা

জাঠ-প্রধান চূড়ামনের সঙ্গেও বাহাদুর শাহের অনুরূপ মিত্রতা স্থাপিত হয়েছিল। বান্দা বাহাদুরের বিরুদ্ধে অভিযানে চূড়ামন বাহাদুর শাহকে সাহায্য করেছিলেন।

বাহাদুর শাহর শাসন ব্যবস্থার অবনতি

বাহাদুর শাহের রাজত্বকালে শাসনব্যবস্থার অবনতি ঘটেছিল। যথেচ্ছ জায়গির দান ও অনুগতদের পদোন্নতির কারণে রাজকোষের অবস্থা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে এসেছিল।

বাহাদুর শাহর শাসনকালে অর্থ সংকট

১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজকোষের মজুত ১৩ কোটি টাকা বাহাদুর শাহের রাজত্বকালের মধ্যেই নিঃশেষিত হয়ে এসেছিল।

সমস্যা সমাধানে অসমর্থ বাহাদুর শাহ

বাহাদুর শাহ, তার সাম্রাজ্যের সমস্যাগুলি সমাধানের উপায় উদ্ভাবনের জন্য অবশ্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সময় পেলে হয়ত তিনি সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারতেন।

বাহাদুর শাহর মৃত্যু

দুর্ভাগ্যবশতঃ, ১৭১২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল গৃহযুদ্ধ, যা সাম্রাজ্যকে গ্রাস করে ফেলেছিল।

উপসংহার :- বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হল তাতে সম্রাটের অযোগ্য এক পুত্র জাহান্দার শাহ জয় লাভ করে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন।

(FAQ) প্রথম বাহাদুর শাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঔরঙ্গজেবের পর কে মুঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন?

বাহাদুর শাহ।

২. বাহাদুর শাহর রাজত্বকাল কত?

১৭০৭-১৭১২ খ্রিস্টাব্দ।

৩. বাহাদুর শাহর সময় অম্বরের রাজা কে ছিলেন?

জয়সিংহ।

৪. বাহাদুর শাহর সময় কার নেতৃত্বে শিখরা বিদ্রোহ করে?

বান্দা বাহাদুর।

Leave a Comment