জাহান্দার শাহ

মোগল সম্রাট জাহান্দার শাহ প্রসঙ্গে তাঁর সিংহাসনে আরোহণ, সাফল্যের কারণ, দুর্বল চিত্ত, উজির, ঔরঙ্গজেবের বিপরীত নীতি অবলম্বন, জাহান্দার শাহর সময় শাহুর সঙ্গে চুক্তির প্রকাশ্য স্বীকৃতি, জাঠদের মিত্রতা, মনসবদারি ব্যবস্থা ও ইজারা প্রথার প্রতি প্রশ্রয় দান সম্পর্কে জানবো।

মোগল সম্রাট জাহান্দার শাহ

ঐতিহাসিক চরিত্রজাহান্দার শাহ
রাজত্বকাল১৭১২-১৭১৩ খ্রি:
উজিরজুলফিকার খান
পূর্বসূরিপ্রথম বাহাদুর শাহ
উত্তরসূরিফারুখসিয়র
মোগল সম্রাট জাহান্দার শাহ

ভূমিকা :- প্রথম বাহাদুর শাহর মৃত্যুর পর মুঘল রাজনীতি মঞ্চে সিংহাসনের দাবি নিয়ে একটি নুতন ব্যাপার দেখা দিয়েছিল। এ পর্যন্ত যে কোনো সম্রাটের মৃত্যুর পর সিংহাসনের জন্য লড়াই বাধত মৃত সম্রাটের পুত্র-পৌত্রদের মধ্যে। রাজদরবারে প্রতিপত্তিশালী আমীরওমরাহেরা এক বা অন্য দাবিদারের পক্ষে যোগ দিতেন, তারা নিজেরা সিংহাসন দখল করতে চাইতেন না।

জাহান্দার শাহর সিংহাসনে আরোহণ

প্রথম বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় তাতে সম্রাটের অযোগ্য এক পুত্র জাহান্দার শাহ জয় লাভ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

জাহান্দার শাহর সাফল্যের কারণ

তার এই সাফল্যের মূলে ছিলেন জুলফিকার খান নামে সর্বাধিক প্রভাবশালী এক ওমরাহের সাহায্য।

দুর্বলচিত্ত জাহান্দার শাহ

জাহান্দার শাহ ছিলেন দুর্বলচিত্ত ও কুক্রিয়াসক্ত। ইনি বিলাস-ব্যসনেই মত্ত থাকা পছন্দ করতেন। সুরুচি এবং আত্মসম্মানবোধ তার ছিল না। এর আদব কায়দাও আপত্তিজনক ছিল।

বাদশাহ জাহান্দার শাহর উজীর জুলফিকার খান

জাহান্দার শাহের রাজত্বকালে রাজ্যশাসনভার কার্যতঃ ছিল জুলফিকার খানের হাতে, ইনি নামেই ছিলেন বাদশাহের উজীর। জুলফিকার অবশ্য বেশ কর্মদক্ষ ও উদ্যমশীল ব্যক্তি ছিলেন।

জাহান্দার শাহর উজিরের বিশ্বাস

জুলফিকারের বিশ্বাস ছিল এই যে, সাম্রাজ্যের স্বার্থে রাজপুত রাজা ও মারাঠা সর্দারদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন বিশেষ প্রয়োজনীয়।

ঔরঙ্গজেবের বিপরীত নীতি অবলম্বন

  • (১) জুলফিকার মনে করতেন যে শুধু রাজপুত ও মারাঠা-প্রধান নয়, সাধারণভাবে সব হিন্দু-প্রধানদের সঙ্গে আপোষ ও বোঝাপড়ার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে এবং এটাই হবে যুগপৎ তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি ও সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বিধানের উপায়।
  • (২) এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে জুলফিকার শাসনব্যবস্থায় অতিদ্রুত ঔরঙ্গজেবের শাসননীতির বিপরীত নীতি অবলম্বন করলেন। ঘৃণিত জিজিয়া কর আদায় ব্যবস্থা তিনি তুলে দেন।

জয়সিংহকে খেতাব প্রদান

অম্বরপতি জয়সিংহকে মির্জা রাজা সোয়াই খেতাব দিয়ে মালোয়ার গভর্নর (সুবাদার) নিযুক্ত করা হল।

অজিত সিংহকে খেতাব প্রদান

মাড়োয়ার-পতি অজিত সিংহকে ‘মহারাজা’ খেতাবে ভূষিত করে গুজরাটের গভর্নর পদ দেওয়া হল।

জাহান্দার শাহর সময় শাহুর সঙ্গে চুক্তির প্রকাশ্য স্বীকৃতি

  • (১) ইতিপূর্বে দাক্ষিণাত্যে জুলফাকারের সহকারী প্রতিনিধি দাউদ খান পান্নি ১৭১১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠারাজ শাহুর সঙ্গে এক গোপনীয় চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই চুক্তির শর্ত এই ছিল যে মারাঠা নৃপতি দাক্ষিণাত্যে ‘সরদেশমুখী’ ও চোথের অধিকারী হবেন।
  • (২) তবে এগুলির আদায়ের ভার থাকবে মুঘল দরবারের কর্মচারীদের উপর। এরা ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী’ সংগ্রহ করে সেটা মারাঠা নৃপতির হাতে তুলে দেবেন। ক্ষমতা হাতে পেয়ে জুলফিকর এই চুক্তিটিকে প্রকাশ্যভাবে স্বীকৃতি দিলেন।

জাঠ ও বুন্দেলাদের সাথে জাহান্দার শাহর মিত্রতা

জুলফিকর জাঠ-নেতা চূড়ামন ও ছত্রসাল বুন্দেলার সঙ্গেও আপোষ-মীমাংসার দ্বারা মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

জাহান্দার শাহর সময়ে শিখদের উপর দমননীতি অব্যাহত

বান্দা ও শিখদের উপর পূর্বাচরিত দমন নীতিই অবশ্য বজায় রাখা হয়েছিল।

জাহান্দার শাহর সময়ে আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা

নিত্য নতুন জায়গীর অথবা সরকারী পদ সৃষ্টির বাড়াবাড়ি সংযত করে জুলফিকার খান সাম্রাজ্যের আর্থিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেছিলেন।

জাহান্দার শাহর সময়ে মনসবদারি ব্যবস্থা

তিনি চেষ্টা করেছিলেন যেন প্রতিটি মনসবদার তাঁদের অধীনে যত সংখ্যক সৈন্য থাকার কথা ঠিক তত সংখ্যক সৈন্য পোষণের দায়িত্ব পালন করেন।

জাহান্দার শাহর সময়ে ইজারা প্রথার প্রতি প্রশ্রয়

  • (১) ‘ইজারা’র মত একটি কুপ্রথাকে জুলফিকার অবশ্য প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। টোডরমলের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থানুযায়ী এ যাবৎ প্রজার কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের খাজনা সংগ্রহের যে রীতি এ যাবৎ প্রচলিত ছিল, জুলফিকারের আমলে তা পরিবর্তিত হয়েছিল।
  • (২)  তাঁর আমলে মধ্যস্বত্বের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। বৃহৎ চাষী অথবা অন্য কোনো বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ডের পরিবর্তে রাজস্ব স্বরূপ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণের চুক্তি শুরু করা হয়েছিল।
  • (৩) এই ব্যবস্থার ফলে যার সঙ্গে চুক্তি করা হল তাকে কৃষকদের কাছ থেকে তার ইচ্ছামত যে কোনো পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের উপর অবিচার ও শোষণের পথ খুলে গিয়েছিল।

উজিরের উপর জাহান্দার শাহর আস্থাহীনতা

  • (১) ঈর্ষাপরায়ণ বহু ওমরাহ জুলফিকার খানের বিরুদ্ধে আসরে নেমেছিলেন। জুলফিকারের পক্ষে এটাও দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হয়েছিল এই যে স্বয়ং সম্রাটও তাঁর উপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করেন নি, সব সময়ে তিনি সহযোগিতার সুযোগও দেননি।
  • (২) সম্রাটের অনুগ্রহভাজন বিবেকবর্জিত বহু অনুচর জুলফিকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করত, যাকে বলে ‘কান ভাঙানি’। এরা সম্রাটকে বলত যে তাঁর উজীর জুলফিকার এতই প্রভাবশালী ও উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠছে যে স্বয়ং সম্রাটকে সে সিংহাসনচ্যুত করে নিজেই একদিন সিংহাসনে বসতে পারে।
  • (৩) কাপুরুষ সম্রাট তাঁর শক্তিধর উজীরকে প্রকাশ্যে বরখাস্ত করার সাহস না পেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্র-জাল বিস্তার একটা সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার সম্পূর্ণ পরিপন্থী হয়ে উঠেছিল।

উপসংহার :- জাহান্দার শাহের কলঙ্কময় স্বল্পস্থায়ী রাজত্বকালের অবসান ঘটেছিল ১৭১৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে। আগ্রার যুদ্ধে জাহান্দারকে পরাজিত করে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ফারুখসিয়র সিংহাসন অধিকার করেন।

(FAQ) মোগল সম্রাট জাহান্দার শাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম বাহাদুর শাহর পর কে মোঘল সিংহাসনে আরোহণ করেন?

জাহান্দার শাহ।

২. জাহান্দার শাহর উজির কে ছিলেন?

জুলফিকার খান।

৩. জাহান্দার শাহর রাজত্বকাল কত?

১৭১২-১৩ খ্রিস্টাব্দ

৪. জাহান্দার শাহর পরে কে মোঘল সম্রাট হয়েছিলেন?

ফারুখসিয়র।

Leave a Comment