মতিঝিল

মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক নিদর্শন মতিঝিল প্রসঙ্গে প্রাসাদ নির্মাণ, কালো অধ্যায়, ষড়যন্ত্র, প্রাসাদের বেগম, সত্য উদ্ঘাটিত, সত্য ও ন্যায়, হ্রদ, প্রকৃতি তীর্থ পার্ক, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ভাষ্কর্য, বিনোদন কেন্দ্র ও তীর্থক্ষেত্র, হোলি উৎসব পালন সম্পর্কে জানবো।

মতিঝিল

স্থান মতিঝিল
অবস্থান মুর্শিদাবাদ
রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ
দেশ ভারত
পরিচিতি ঐতিহাসিক নিদর্শন
মতিঝিল

ভূমিকা :- প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো ইতিহাস উসকে দেওয়ার অপেক্ষায় মতিঝিল পর্যটন কেন্দ্র। ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে খোলা আকাশের নীচে আসার প্রতীক্ষায় সিরাজউদ্দৌলা, মুর্শিদকুলি খাঁ, আলিবর্দি খাঁ, ঘসেটি বেগম, লর্ড ক্লাইভ, মির জাফর, ওয়াটসন, জগৎ শেঠ, ওয়ারেন হেস্টিংস।

প্রাসাদ নির্মাণ

১৭৫০-৫১ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি খাঁয়ের জ্যেষ্ঠ জামাতা তথা ঘসেটি বেগমের (মেহেরুন্নেসা) স্বামী নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ সুদৃশ্য মতিঝিল এবং সেই ঝিলের পাড়ে ‘সাংহী দালান’ বা শাহী দালান নামে এক প্রাসাদ নির্মাণ করেন।

আজান ও আরতির ধ্বনি

স্থানীয় ইতিহাসবিদ সায়ন্তন মজুমদার বলেন, “প্রকৃতি ও ইতিহাস মিলেমিশে যাওয়াটাই মতিঝিলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যার এক দিকে মতিঝিল মসজিদ এবং অন্য দিকে রাধামাধব মন্দির। আজান আর আরতির ধ্বনি একে অন্যের সঙ্গে মিলে যাবে।”

কালো অধ্যায়

বাংলার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের নাম মুর্শিদাবাদের মতিঝিল। এই মতিঝিল প্রাসাদ থেকেই বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল।

ষড়যন্ত্র

ইংরেজদের কাসিমবাজার কুঠি ও মতিঝিলের ঘসেটি বেগমের প্রাসাদেই বাংলার স্বাধীন নবাবকে হটিয়ে ইংরেজদের অধীনস্থ মীরজাফরকে মসনদে বসানোর ষড়যন্ত্র হয়। সে ষড়যন্ত্র সফলও হয়। ইংরেজদের হাত ধরে মীরজাফর মসনদে বসেন।

প্রাসাদের বেগম

পলাশীর ষড়যন্ত্রকারীদের শেষ রক্ষা হয়নি। কথিত আছে যে, মতিঝিল প্রাসাদের বেগমকে নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। সেই মতিঝিল আজও আছে, নেই শুধু সেদিনের সেই প্রাসাদ।

লজ্জার মুখ লুকানো

দামী পাথরের প্রাসাদ আজ মাটির সঙ্গে মিশে একাকার। মতিঝিলের সেই ষড়যন্ত্র প্রাসাদ যেন আজ লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে মাটির গভীরে। 

সত্য উদ্ঘাটিত

ঘসেটি বেগমের প্রাসাদটি যেখানে ছিল সেখানেই বর্তমানে একটি মঞ্চ বানিয়ে পলাশীর ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’ হয়। আজকের প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে এই মতিঝিল থেকেই। একটি মঞ্চে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দর্শকদের জন্য এই শো হয়। যেখানে একদিন ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সেখানেই আজ সত্য উদ্ঘাটিত।

সত্য ও ন্যায়

ঘসেটি আর মীরজাফর কী জানতেন, ষড়যন্ত্রের অপর নাম ঘসেটি আর বিশ্বাসঘাতকতার অপর নাম একদিন মীরজাফর হবে? মানুষ, প্রাসাদ, ষড়যন্ত্র কিছুই স্থায়ী নয়, থাকে শুধু সত্য ও ন্যায়।

হ্রদ

মতিঝিলের বর্তমান আয়তন এক হাজার ৫০ বিঘা। এর আশপাশের অনেক জায়গাই আজ বেদখল হয়ে গেছে। মতিঝিল মূলত একটি বিশাল হ্রদ। এর মাঝখানে রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড আর তিনদিকেই জল।

প্রকৃতি তীর্থ পার্ক

মতিঝিলের মাঝখানের ভূখণ্ডে বর্তমানে একটি পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র করা হয়েছে। এটি মুর্শিদাবাদের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় পার্ক। ২০১৫ সালের ১ জুলাই পার্কটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করেন। মতিঝিল পার্কের বর্তমান নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রকৃতি তীর্থ’। বিশাল এই পার্কে রয়েছে একাধিক উন্মুক্ত মঞ্চ যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতেই থাকে।

ঐতিহাসিক নিদর্শন

ঐতিহাসিক নিদর্শন বলতে এখানে রয়েছে একটি মসজিদ, সমাধিক্ষেত্র ও মতিঝিল হ্রদ। ঘসেটির প্রাসাদ আজ নিশ্চিহ্ন। তবে মীরমর্দনের কামানের একটি অংশবিশেষ এখানে রাখা আছে। মূল কামানটি আছে হাজার দুয়ারি প্রাসাদে। 

ভাষ্কর্য

বাংলার প্রধান তিনজন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ, আলীবর্দি খাঁ ও সিরাজ-উদ-দৌলার তিনটি ভাষ্কর্য আছে এই পার্কে। 

মতিঝিল থেকে খোশবাগ

মতিঝিলের মূল ফটকটি আজও রয়েছে, তবে তা ভগ্নপ্রায়। পাশেই নতুন করে গেট তৈরি করা হয়েছে। কথিত আছে যে, মতিঝিল থেকে একসময় খোশবাগ দেখা যেত। 

বিনোদন কেন্দ্র ও তীর্থক্ষেত্র

বর্তমানে মতিঝিল শুধু একটি পার্কই নয়, মুর্শিদাবাদের বড় বিনোদন কেন্দ্রও বটে। বিকাল থেকেই নাচ, গান আবৃত্তি, নাটকসহ নানা আয়োজনে মুখর থাকে মতিঝিল। মতিঝিল আজ বাংলা সংস্কৃতির প্রধান তীর্থক্ষেত্র। মতিঝিল যেন একখণ্ড বাংলাদেশ।

হোলি উৎসব পালন

স্থানীয় ইতিহাসবিদ খাজিম আহমেদ বলেন, “সিরাজউদ্দৌলাকে মসনদ থেকে হটানোর জন্য তৎকালীন নবাব-বিরোধী শক্তি অসংখ্য বার বৈঠকে মিলিত হন। ঘসেটি তাঁদের অন্যতম। ফলে ওই সাংহী দালানে পলাশি যুদ্ধের ষড়ষন্ত্রের চিত্রনাট্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রাসাদ লাগোয়া মতিঝিলের বাগানে সাত দিন ধরে জাঁকজমকের সঙ্গে হোলি উৎসব পালনের ইতিহাসও রয়েছে।”

মঞ্চ ও ঝরনা

প্রায় ২৫৫ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল রেলিং দিয়ে ঘেরার কাজ চলছে। ওয়াচ টাওয়ার তৈরি হচ্ছে। লোকগান ও লোকনৃত্য পরিবেশনের জন্য খোলা আকাশের নিতে মুক্তমঞ্চ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ন’টি বিলাসবহুল কটেজ। ফুড কোর্টের পাশাপাশি থাকছে ক্যাফেটেরিয়াও। জেলাশাসকের দাবি, “মিউজিক্যাল ফাউন্টেন নামে প্রায় ৮০ ফুট উঁচু নৃত্যরত ঝরনা তৈরি হয়েছে, যা রাজ্যে আর কোথাও নেই।”

মতিঝিল ও হাজার দুয়ারি

লালবাগ ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, “এই পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে যে কর্মকাণ্ড হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে হাজারদুয়ারির সঙ্গেও মতিঝিলের নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে।”

রাস্তা নির্মাণ

পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ভাগীরথীর পাড় বরাবর বহরমপুর কাজি নজরুল ইসলাম সরণী থেকে এই পর্যটন কেন্দ্রের প্রবেশপথ পর্যন্ত ঝকঝকে রাস্তা তৈরি করেছে জেলা পরিষদ। ওই পথে বহরমপুরের দিকে বিশাল তোরণও করা হয়েছে।

জেলাশাসকের মন্তব্য

জেলাশাসক ওয়াই রত্নাকর রাও বলেন, “ওই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি দফতর যৌথ ভাবে কাজ করছে। তার মধ্যে রয়েছে উদ্যানপালন দফতর, সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতর, জনস্বাস্থ্য ও কারিগরি দফতর এবং পূর্ত দফতর।

উপসংহার :- একদিন যে প্রাসাদে বসে বাংলার বিরুদ্ধে, সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তারই ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে এই প্রজন্ম জানতে পারছে সেই ইতিহাস। মাঝে কেটে গেছে ২৬০ বছর। মহাকালের নিয়মে এ তেমন বেশি কিছু নয়, হাজার বছর পরে হলেও ইতিহাস তো ফিরে আসবেই।

(FAQ) মতিঝিল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয় কোন প্রাসাদে?

মতিঝিল প্রাসাদে।

২. মতিঝিল প্রাসাদ কোথায় অবস্থিত?

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ।

৩. মতিঝিল প্রাসাদ নির্মাণ করেন কে?

নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ।

৪. মতিঝিল প্রাসাদে কে থাকতেন?

ঘষেটি বেগম।

Leave a Reply

Translate »