স্কন্দগুপ্ত

গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্ত প্রসঙ্গে ঘটোৎকচ গুপ্ত ও স্কন্দগুপ্ত, সিংহাসন লাভের সমস্যা, ভ্রাতৃযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের সুরক্ষা, হূণ আক্রমণ, হূণ যুদ্ধ, অক্ষুণ্ন শাসন ব্যবস্থা, কৃষির উন্নতি, বৌদ্ধ ধর্মে অনুরাগী ও তার যোগ্য কর্মচারি সম্পর্কে জানবো।

স্কন্দগুপ্ত

রাজা স্কন্দগুপ্ত
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
পূর্বসূরি কুমারগুপ্ত
উত্তরসূরি পু্রুগুপ্ত
স্কন্দগুপ্ত

ভূমিকা :- ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে কুমারগুপ্তের মৃত্যু হলে তার সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে তার পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধে বলে ডঃ মজুমদার প্রমুখ পণ্ডিত মনে করেন। কুমারগুপ্তের অন্যতমা রাণী অনন্তদেবীর পুত্র পুরুগুপ্ত তার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা স্কন্দগুপ্তের সিংহাসন লাভের বিরোধিতা করেন বলে ডঃ মজুমদার বলেছেন।

ঘটোৎকচ গুপ্ত

অধুনা অনেকে মনে করেন যে, কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর ঘটোৎকচ গুপ্ত নামে এক ব্যক্তি স্বল্পকাল রাজত্ব করেন। তুমাইন শিলালিপিতে এই ঘটোৎকচ গুপ্তের নাম পাওয়া যায়। একটি মুদ্রায় ঘটোৎকচ গুপ্তের নাম ও ‘ক্রমাদিত্য’ উপাধি পাওয়া যায়। বায়নার মুদ্রা ভাণ্ডারে ছত্র প্রতীক যুক্ত ক্রমাদিত্য নামের মুদ্রা পাওয়া গেছে।

স্কন্দগুপ্ত ও ঘটোৎকচ গুপ্ত

এখন স্কন্দগুপ্তেরও ক্রমাদিত্য উপাধি ছিল। স্কন্দগুপ্ত ও ঘটোৎকচ গুপ্ত একই লোক নন বলে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন। কারণ উভয়ের মুদ্রার প্রতীক ও ওজনের পার্থক্য দেখা যায়। যাই হোক, যদি ইনি প্রকৃতই কুমারগুপ্তের পরে সিংহাসনে বসে থাকেন তবে তার বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। কারণ ঘটোৎকচ অত্যন্ত অল্পকাল সিংহাসনে ছিলেন।

সিংহাসন লাভে সমস্যা

  • (১) স্কন্দগুপ্ত দ্বারা খোদিত ভিটারি গুপ্তলিপিতে স্কন্দগুপ্ত তার পূর্ববর্তী সকল গুপ্ত সম্রাট ও তাদের প্রধানা মহিষীদের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি নিজ মাতার নাম উল্লেখ করেননি। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, তার মাতা হয়ত প্রধানা মহিষী ছিলেন না।
  • (২) সাধারণত প্রধানা মহিষীর পুত্রই সিংহাসন পেতেন, যদি না পূর্ববর্তী সম্রাট অন্য কোনো পুত্রকে নির্বাচন না করতেন। কুমারগুপ্তের প্রধানা মহিষী ছিলেন অনন্তদেবী। তার পুত্র পুরু ছিলেন সম্ভবত বৈধ উত্তরাধিকারী।
  • (৩) স্কন্দগুপ্ত ছিলেন যোগ্যতর এবং সেনাদলের প্রিয়পাত্র, শাসন ও যুদ্ধে অভিজ্ঞ। এজন্য দুই ভ্রাতার মধ্যে যুদ্ধ বাধে বলে ডঃ মজুমদার অভিমত দিয়েছেন।

ভ্রাতৃযুদ্ধ

  • (১) পাহাড় লিপিতে বলা হয়েছে যে, “লক্ষ্মী স্বেচ্ছায় স্কন্দগুপ্তকে অন্য রাজপুত্রদের ত্যাগ করে বরণ করেন।” ডঃ মজুমদারের মতে, এই বাক্যটির মধ্যে স্কন্দগুপ্তের নিজ চেষ্টায় সিংহাসন পান তার ইঙ্গিত দেওয়া আছে।
  • (৩) ভিটারি স্তম্ভলিপিতে পাওয়া যায় যে, স্কন্দগুপ্ত যখন তাঁর বিজয় অভিযান (পুষ্যমিত্র যুদ্ধ) থেকে ফিরে আসেন তখন তাঁর পিতা গত হয়েছেন এবং তার মাতা দুর্দশাগ্রস্তা ও ক্রন্দনরতা ছিলেন। ডঃ মজুমদারের মতে, সম্ভবত স্কন্দের অনুপস্থিতির সুযোগে পুরুগুপ্ত সিংহাসন দখল করে স্কন্দের মাতাকে কারারুদ্ধ করেন।
  • (৪) গুপ্ত সম্রাটরা বিনা বাধায় পিতার সিংহাসনে বসলে “তৎপাদানুধ্যাতা” অর্থাৎ পিতার দ্বারা পিতার পদে মনোনীত একথা ব্যবহার করতেন। স্কন্দগুপ্তের ভিতারি স্তম্ভলিপিতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি।
  • (৫) ভিতারি ও অন্যান্য লিপিতে স্কন্দগুপ্ত নিজেকে “গুপ্ত বংশীয় বীর” বলে জাহির করেছেন। এ কথা বিশেষভাবে বলার উদ্দেশ্য সম্ভবত তাঁর মাতার পরিচয়হীনতাকে অগ্রাহ্য করে তাঁর পিতা কুমারগুপ্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা।

ডঃ রায়চৌধুরীর

ডঃ রায়চৌধুরী এই ভ্রাতৃযুদ্ধের তত্ত্বকে অস্বীকার করেছেন। ভিটারি স্তম্ভ লিপিতে স্কন্দের মাতার নামের অনুল্লেখ কিছুই প্রমাণ করে না। ভিটারি স্তম্ভ-লিপিতে ভ্রাতৃযুদ্ধের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। স্কন্দগুপ্ত তাঁর ভ্রাতাকে হত্যা করেননি। তাঁর “অম্লানাত্মা” নাম সার্থক। যাই হোক, বেশীর ভাগ পণ্ডিত মনে করেন যে, স্কন্দগুপ্ত পিতার মৃত্যুর পর বিনা বাধায় সিংহাসনে বসতে পারেননি। তাঁকে বাহুবলে সিংহাসন জয় করতে হয়।

সাম্রাজ্যের সুরক্ষা

  • (১) স্কন্দগুপ্ত ইতিহাসে ‘ক্রমাদিত্য’ নামেও খ্যাত। তিনি ৪৫৭-৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি তার পিতার রাজত্বের শেষ দিকে অথবা তার নিজ রাজত্বের গোড়ার দিকে বাকাটক-পুষ্যমিত্র জোটের আক্রমণ সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করে সাম্রাজ্যের ঐক্য রক্ষা করেন।
  • (২) জুনাগড় শিলালিপিতে তিনি উদ্যত ফণা সাপেদের মত শত্রুদের দমন করেন বলা হয়েছে। সম্ভবতঃ এই শত্রু বলতে তিনি বাকাটক-বর্মণ জোটকে বুঝাচ্ছেন। এই জোটকে পরাস্ত করে স্কন্দগুপ্ত সাম্রাজ্যকে সুরক্ষিত করেন।

হূণ আক্রমণ

  • (১) জুনাগড় শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে, ম্লেচ্ছ রাজা তার কাছে মাথা নীচু করতে বাধ্য হন। এই ম্লেচ্ছ বলতে কাদের বলা হচ্ছে তা ঠিক বোঝা যায়নি। কারও কারও মতে, এঁরা ছিলেন “কিদার কুষাণ।” বেশীর ভাগ পণ্ডিত মনে করেন যে, এর দ্বারা স্কন্দগুপ্ত হুণদের বিরুদ্ধে তার বিজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
  • (২) এই হুণরা ছিল এ্যাপথালাইট বা শ্বেত হুণ। এরা মধ্য এশিয়া থেকে এসে প্রথমে কিদার কুষাণদের রাজ্য দখল করে নেয়। পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এরা বিধ্বস্ত করে ফেলে। হুণদের অপর শাখা ইউরোপে, ধ্বংসলীলা চালিয়ে রোমের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর থেকেই হূণ আক্রমণের গুরুত্ব সহজেই বুঝা যায়।

হূনদের ভারতে প্রবেশ

উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে সুরক্ষিত করে সাম্রাজ্যে বৈদেশিক আক্রমণ বন্ধ করার জন্য কোনো নিয়মিত চেষ্টা গুপ্ত সম্রাটরা করেননি। উত্তর-পশ্চিমের পথ খোলা পেলে আক্রমণকারী গঙ্গা যমুনা উপত্যকায় ঢুকে পড়তে পারে এই ভৌগোলিক সত্য সম্পর্কে গুপ্ত-সম্রাটরা নজর দেননি। ফলে হূণ জাতি ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

হূণ যুদ্ধ

  • (১) ভিটারি স্তম্ভলিপিতে স্কন্দগুপ্তের হূণ যুদ্ধের তারিখ দেওয়া নেই। যাই হোক, স্কন্দগুপ্ত আনুমানিক ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে হুনদের পরাস্ত করে পাঞ্জাব ও কাশ্মীরকে আপাতত রক্ষা করেন। হুণরা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে হূণরা ভারতের দিকে আর মুখ ফেরাতে সাহস করেনি।
  • (২) ডঃ মজুমদার দুর্ধর্ষ হূণদের হাত থেকে স্কন্দগুপ্তকে “ভারতের রক্ষাকারী” (Savior of India) বলে অভিহিত করেছেন। সর্দার কে. এম. পানিক্করের মতে, গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্ত ও চীন সম্রাটের প্রবল বাধার জন্যই হুণরা এশিয়া থেকে ইউরোপের দিকে চলে যায়।

হূণ আক্রমণের

  • (১) বর্তমানে অনেকেই হূণ আক্রমণের বিরুদ্ধে স্কন্দগুপ্তের বিজয়কে কিছুটা সীমাবদ্ধ ভাবে বিচার করেন। তারা বলেন যে, হুণদের প্রধান শক্তি রোম ও পারস্য দেশ জয়ে নিযুক্ত হয়। ভারতে হূণদের চাপ ছিল অপেক্ষাকৃত কম।
  • (২) ভারতের সীমান্তবর্তী পর্বতমালা হুণদের বেশীর ভাগ প্রতিহত করেছিল। এই প্রাকৃতিক বাধা পার হতে গিয়ে হুণরা দুর্বল হয়ে যায়। স্কন্দের আমলে বারংবার হূণ আক্রমণ হয়েছিল একথা সত্য নয়।
  • (৩) পূর্ববর্তী গুপ্ত সম্রাটরা যেভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে দীর্ঘকাল অবহেলা করেন তার পটভূমিকায় স্তন্দগুপ্তের হূণ যুদ্ধে সাফল্য ছিল তাঁর বিরাট কৃতিত্বের পরিচয় এতে সন্দেহ নেই। এদিক থেকে সমুদ্রগুপ্তের পর স্কন্দগুপ্তের তুল্য যোদ্ধা সম্রাট গুপ্ত সিংহাসনে বসেননি, একথা বলা বোধ হয় যুক্তিযুক্ত।

অক্ষুন্ন শাসন ব্যবস্থা

স্কন্দগুপ্ত যেমন অসির ব্যবহারে নিপুণ ছিলেন, তেমনই রাজ্য শাসনের জন্য মসীর উপযুক্ত ব্যবহার জানতেন। কুমারগুপ্তের আমলের শাসনব্যবস্থাকে তিনি বৈদেশিক আক্রমণ সত্ত্বেও মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখেন।

কৃষির উন্নতি

কৃষির উন্নতির জন্য জলসেচের দিকে তিনি সতর্ক দৃষ্টি দিতেন। সৌরাষ্ট্রের সুদর্শন হ্রদের বাঁধ ঝড়ে ভেঙে গেলে তাঁর কর্মচারী পরাণ দত্ত তা মেরামত করেন বলে জুনাগড় লিপি থেকে জানা যায়।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত

হিউয়েন সাঙের মতে, তিনি নালন্দায় একটি বিহার স্থাপন করেন। হয়ত তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যুক্ত ছিলেন।

অর্থনীতি

অনেকে বলেন যে, নিরন্তর যুদ্ধের ফলে তাঁর আমলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ক্ষয় পায়। তাঁর মুদ্রাগুলিতে খাদের ভাগ বেশী দেখা যায়। অধুনা একথা বলা হচ্ছে যে, স্কন্দগুপ্তের মুদ্রা সম্পর্কে আগের ধারণা ভুল। তাঁর মুদ্রায় সোনার পরিমাণ বরং বেশী ছিল।

যোগ্য কর্মচারি

স্কন্দগুপ্ত কয়েকজন যোগ্য কর্মচারী ও সেনাপতির সাহায্যে শেষ জীবন পর্যন্ত সাম্রাজ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা রাখতে সক্ষম হন। দোয়াবে সর্বনাগ, সৌরাষ্ট্রে পরাণ দত্ত, কোশাম্বীতে ভীম বর্মন প্রভৃতি কর্মচারী তার ডান হাতের মতই ছিলেন।

উপসংহার :- স্কন্দগুপ্তকে শেষ প্রধান গুপ্ত সম্রাট বলা চলে। ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। তবে তার আমলে সৌরাষ্ট্র ও মালবে গুপ্ত অধিকার অনেকাংশে শিথিল হয়ে পড়ে।

(FAQ) স্কন্দগুপ্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভিটারি লেখ কে উৎকীর্ণ করান?

স্কন্দগুপ্ত।

২. কে, কাকে ভারতের রক্ষাকারী বলে অভিহিত করেছেন?

রমেশচন্দ্র মজুমদার স্কন্দগুপ্তকে।

৩. কোন গুপ্ত সম্রাট হূণ আক্রমণ প্রতিরোধ করেন?

স্কন্দগুপ্ত।

৪. স্কন্দগুপ্তের সময় সুদর্শন হ্রদ কে মেরামত করেন?

পরাণ দত্ত।

Leave a Reply

Translate »