গুপ্ত সাম্রাজ্য

গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রসঙ্গে শ্রীগুপ্ত, ঘটোৎকচ গুপ্ত, প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত, রামগুপ্ত, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, কুমার গুপ্ত, স্কন্দগুপ্ত, পুরুগুপ্ত, দ্বিতীয় কুমার গুপ্ত, বুধগুপ্ত, সাম্রাজ্যে ভাঙনের চিহ্ন, স্বাধীন রাজ্য স্থাপন ও হূণ আক্রমণ সম্পর্কে জানবো।

গুপ্ত সাম্রাজ্য

বিষয় গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
শ্রেষ্ঠ রাজা সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
ভারতের নেপোলিয়ন সমুদ্রগুপ্ত
গুপ্ত সাম্রাজ্য

ভূমিকা :- ইতিহাসের ধারা প্রবহমান হলেও, কতকগুলি কার্যকারণের জন্য তাতে পরিবর্তনের স্রোত দেখা যায়। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতের রাজনীতিতে যে বিচ্ছিন্নতা, আঞ্চলিকতার প্রকাশ ও বৈদেশিক শক্তিগুলির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল তাতে ছেদ পড়ে এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।

শ্রীগুপ্ত

গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা শ্রীগুপ্ত সর্বপ্রথম তাঁর স্বাধীন অধিকার স্থাপন করেন। ডঃ জয়সোয়াল বলেছেন যে, যেহেতু শ্রীগুপ্ত এবং তার উত্তরাধিকারী ঘটোৎকচ গুপ্তের উপাধি ছিল মহারাজা, সেহেতু তাঁরা সামন্ত রাজা ছিলেন। গুপ্তবংশের তৃতীয় রাজা চন্দ্রগুপ্ত মহারাজাধিরাজ উপাধি নিলে তবেই গুপ্তবংশ সার্বভৌম ক্ষমতা পায়।

ঘটোৎকচ গুপ্ত

ঘটোৎকচ গুপ্ত সম্পর্কে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ডঃ এস চ্যাটার্জীর মতে, যে সকল গুপ্ত মুদ্রায় “কচ” নাম আছে তা ঘটোৎকচ নামেরই অপভ্রংশ। তবে এ সম্পর্কে বিতর্ক আছে।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত

এ্যালান গুপ্ত মুদ্রার কালানুক্রম ধরে এবং পুরাণের বংশলিপি থেকে প্রমাণ করেছেন যে, ঘটোৎকচ গুপ্তের পর তাঁর পুত্র প্রথম চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তাঁর সময় থেকেই প্রকৃতপক্ষে গুপ্ত বংশের সাম্রাজ্য বিস্তার আরম্ভ হয়। প্রাশিয়ার ইতিহাসে গ্রেট ইলেক্টর ফ্রেডারিক উইলিয়ামের মত গুপ্ত রাজ্য যা ছিল একটি নিতান্তই আঞ্চলিক রাজ্য, তাকে এক সাম্রাজ্যের দ্বারদেশে তিনি পৌঁছে দেন।

সমুদ্রগুপ্ত

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে অসাধারণ প্রতিভাবান বিজেতা হিসেবে সমুদ্রগুপ্তের পরিচয় স্বীকৃত। তিনি নিজ বাহুবলে গাঙ্গেয় উপত্যকার একটি আঞ্চলিক রাজ্যকে সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। উত্তর-ভারতের প্রবল নাগশক্তিকে পরাজিত করে তিনি যেমন গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় আধিপত্য রাখেন, দাক্ষিণাত্য অভিযানে তিনি তা অপেক্ষা অনেক বেশী পারদর্শিতা দেখান। দক্ষিণের যুদ্ধে প্রবল পল্লব শক্তিকে পরাস্ত করা তার কৃতিত্বের পরিচয় দেয় সন্দেহ নেই।

রামগুপ্ত

একদা মনে করা হত যে, সমুদ্রগুপ্তের পরেই তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মগধের সিংহাসনে বসেন। কিন্তু বিশাখদত্তের নাটক দেবীচন্দ্রগুপ্তমের আবিষ্কারের পর এই নাটকের তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে যে, সমুদ্রগুপ্তের পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র রামগুপ্ত কিছুকাল সিংহাসনে বসেন। নাট্যদর্পণ নামক গ্রন্থেও রামগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর ফলে এখন অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন যে, সমুদ্রগুপ্তের পর রামগুপ্ত সিংহাসনে বসেন।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত

গুপ্তবংশে যে কয়জন শ্রেষ্ঠ রাজা গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্থাপন, বিস্তার ও সংগঠনের জন্য কাজ করেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রগুপ্তকে যদি গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তার কর্তা বলা যায় তবে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে এই সাম্রাজ্যের সংগঠক বলা চলে।

কুমারগুপ্ত

তিনি পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাম্রাজ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখেন, তিনি এই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি। যদিও তিনি একটি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন, এই যজ্ঞ কোনো রাজ্য বিজয়ের পর অনুষ্ঠিত হয় কিনা তা জানা যায়নি। প্রথম কুমারগুপ্তের মুদ্রায় “ব্যাঘ্রবল পরাক্রম” উপাধি থাকার জন্যে ডঃ রায়চৌধুরী অভিমত দিয়েছেন যে, তিনি ব্যাঘ্র শঙ্কুল নর্মদা অঞ্চল জয় করেন। এজন্য তিনি এই উপাধি নেন।

স্কন্দগুপ্ত

স্কন্দগুপ্ত ইতিহাসে ‘ক্রমাদিত্য’ নামেও খ্যাত। তিনি ৪৫৭-৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ভিটারি লেখ থেকে তার রাজত্বকালের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি সফলতার সঙ্গে হূণ আক্রমণ প্রতিরোধ করেন বলে ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাকে ভারতের রক্ষাকারী বলে অভিহিত করেছেন।

পুরুগুপ্ত

  • (১) কুমারগুপ্তের পত্নী অনন্তদেবীর গর্ভে পুরুগুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্কন্দগুপ্তের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। ভিটারি শিলালিপিতে গুপ্তবংশের যে তালিকা পাওয়া যায় তাতে কুমারগুপ্তের পরেই পুরুগুপ্তের নাম দেখা যায়। পুরুগুপ্ত ইচ্ছা করেই স্কন্দগুপ্তের নাম বাদ দেন। স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর যখন পুরুগুপ্ত সিংহাসনে বসেন তখন গুপ্ত সাম্রাজ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছিল।
  • (২) গুপ্ত উপাধিকারী কয়েকজন রাজাকে পুরু গুপ্তের আমলে একই সঙ্গে রাজত্ব করতে দেখা যায়। সৌরাষ্ট্র ও পশ্চিম মালবের ওপর গুপ্তবংশের অধিকার নষ্ট হয়ে যায়। স্কন্দগুপ্তের পর এই অঞ্চলে কোনো গুপ্ত সম্রাটের লিপি বা মুদ্রা পাওয়া যায় নি।

দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত

পুরুগুপ্তের পর সম্ভবত দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত কিছুকাল সিংহাসনে বসেন। যদিও ভিটারি শিলালিপিতে নরসিংহগুপ্তকে পুরুগুপ্তের পুত্র এবং দ্বিতীয় কুমারগুপ্তকে পৌত্র বলা হয়েছে, তবুও সারনাথের বুদ্ধমূর্তির গায়ে যে লিপি পাওয়া যায় তাতে দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের কাল ৪৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দ হচ্ছে। তিনি সম্ভবত তিন বছর কাল রাজত্ব করেন। তিনি নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ছিলেন বলে জানা যায়।

বুধগুপ্ত

দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের পর বুধগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। ভিটারি শিলালিপিতে যদিও বুধগুপ্তের সঠিক সন তারিখ পাওয়া যায় নি। নালন্দা শিলা হতে ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দকে বুধগুপ্তের সিংহাসনে বসার সন বলে জানা যায়। বুধগুপ্তকে শেষ শক্তিশালী গুপ্ত সম্রাট বলা যায়। দামোদরপুর, এরাণ, সারনাথ প্রভৃতি নানাস্থানে তাঁর শিলালিপি পাওয়া গেছে।

সাম্রাজ্যে ভাঙনের চিহ্ন

বুধগুপ্ত যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও সাম্রাজ্যের ভাঙন পুরো রোধ করতে পারেননি। ডঃ মজুমদার বলেছেন যে, “অদূরবর্তী দিনে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বার অশুভ সঙ্কেত তার আমলে দেখা যায়। যথা –

  • (১) কাথিয়াবাড়ে মৈত্রক বংশ বলভিতে বংশানুক্রমিক অধিকার স্থাপন করে। দ্রোণ সিংহ মহারাজা উপাধি নেন।
  • (২) বুন্দেলখণ্ডে পরিব্রাজক মহারাজা হস্তিনের ভূমিদান পটে দেখা যায় তিনি প্রথামত তাঁর প্রভু গুপ্ত সম্রাটের নাম না করেই ভূমিদান করেছেন।
  • (৩) উচ্চ কল্পের রাজা জয়নাথ একই কাজ করেন।
  • (৪) বুন্দেল খণ্ডের পান্ডুবংশীয় রাজারা বহু উচ্চ সার্বভৌম উপাধি নেন।
  • (৫) জয়পুরের মহারাজা লক্ষ্মণ এবং নর্মদা উপত্যকায় সুবন্ধুও সার্বভৌম ক্ষমতা দাবী করেন।
  • (৬) উত্তর বাংলার শাসনকর্তারা ‘উপারিক’ উপাধির পরিবর্তে উপারিক মহারাজা উপাধি নেন। এই প্রমাণগুলি থেকে বুঝা যায়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্দিন ঘনিয়ে আসছিল।

বুধগুপ্তের সাম্রাজ্য

বুধগুপ্তের সাম্রাজ্য সীমায় বাংলা তখনও ছিল। দামোদর পুর তাম্র শাসন থেকে তা প্রমাণ হয়। সারনাথ লিপি প্রমাণ করছে, বারাণসী অঞ্চলও তাঁর অধিকারে ছিল। এরাণ লিপি থেকে জানা যায়, মধ্যপ্রদেশের অনেকটা তার অধিকারে ছিল। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে যখন বুধগুপ্ত দেহত্যাগ করেন তখন গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বার্ধক্যের দ্বারে উপনীত হয়েছিল।

নরসিংহ গুপ্ত

বুধগুপ্তের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন নরসিংহ গুপ্ত। যদিও ভিটারি শিলালিপিতে নরসিংহগুপ্ত তাঁর ভ্রাতা বুধগুপ্তের পর সিংহাসনে বসেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তথাপি চীনা সূত্র থেকে জানা যায় যে বুধগুপ্তের পর কিছুকাল তথাগত গুপ্ত রাজত্ব করেন। তারপর নরসিংহ গুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তার আমলে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রকৃতপক্ষে ভেঙে পড়ে।

স্বাধীন রাজ্য স্থাপন

সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে গুপ্ত বংশের রাজপুত্ররা স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। বাংলায় বৈন্য গুপ্ত ও মালবে ভানুগুপ্তের নাম এই প্রসঙ্গে পাওয়া যায়।

হূণ আক্রমণ

এদিকে হূণরা সুযোগ বুঝে পুনরায় আক্রমণ চালায়। হূণরাজ তোরমান পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশ হয়ে, মালব ও সৌরাষ্ট্র অধিকার করেন। তোরমানের পুত্র মিহিরকুল মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন।

পশ্চিম ভারতে গুপ্ত অধিকার একেবারেই ধ্বংস হয়। এই সুযোগে মালবে গুপ্ত সামস্ত রাজা যশোবর্মন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব আরম্ভ করেন (৫৩০-৫৪০ খ্রীঃ)।

উপসংহার :- যশোবর্মনের অনুকরণে অন্যান্য সামন্তরাও স্বাধীনতা ঘোষণা করলে গুপ্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। নরসিংহ গুপ্তের পর বিষ্ণুগুপ্ত প্রমুখ সীমিত অঞ্চলে কিছুকাল রাজত্ব করেন। ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মগধ গুপ্তদের হস্তচ্যূত হয়।

(FAQ) গুপ্ত সাম্রাজ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

শ্রীগুপ্ত।

২. গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম সার্বভৌম রাজা কে ছিলেন?

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।

৩. গুপ্ত সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সম্রাট কে ছিলেন?

সমুদ্রগুপ্ত।

৪. লিচ্ছবি দৌহিত্র এবং ভারতের নেপোলিয়ন কাকে বলা হয়?

সমুদ্রগুপ্ত।

৫. শকারি কে ছিলেন?

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত।

Leave a Reply

Translate »