গুপ্তবংশের ঐতিহাসিক উপাদান

গুপ্ত বংশের ঐতিহাসিক উপাদান প্রসঙ্গে শিলালিপি, মুদ্রা, স্থাপত্য, সাহিত্যিক উপাদান ও বৈদেশিক পর্যটকের বিবরণ সম্পর্কে জানবো।

গুপ্তবংশের ঐতিহাসিক উপাদান

বিষয় গুপ্তবংশের ঐতিহাসিক উপাদান
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
ভারতের নেপোলিয়ন সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্তবংশের ঐতিহাসিক উপাদান

ভূমিকা :- গুপ্ত শাসন প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শেষ এবং চতুর্থ শতকের প্রথমদিকে সম্ভবত প্রথম চন্দ্রগুপ্ত বা সমুদ্রগুপ্তের মাধ্যমে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্প্রসারিত হয়।

ঐতিহাসিক উপাদান

গুপ্তযুগের ঐতিহাসিক উপাদানের প্রাচুর্য দেখা যায়। শিলালিপি, প্রশস্তিলিপি, তাম্রশাসন, মুদ্রা, সাহিত্যিক উপকরণ এবং বিদেশিদের বর্ণনা থেকে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

শিলালিপি

  • (১) শিলালিপি ও অন্যান্য লেখগুলির সংখ্যা গুপ্তযুগের উপাদান হিসেবে কম নয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৪২টি লিপি বা লেখ শুধুমাত্র গুপ্তযুগের জন্যই পাওয়া গেছে। গুপ্তযুগের বিভিন্ন লিপিগুলির মধ্যে সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ বিরচিত এলাহাবাদ প্রশস্তি বিখ্যাত। এতে সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য জয়, বৈদেশিক সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে বহু তথ্য পাওয়া যায়।
  • (২) সমুদ্রগুপ্তের এরান, নালন্দা ও গয়া লিপি থেকেও বহু তথ্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মথুরালিপি উল্লেখ্য। দিল্লীর মেহরৌলীর লৌহস্তস্তে চন্দ্র রাজার লিপিকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল সম্পর্কিত বলে অনেকে মনে করেন।
  • (৩) প্রথম কুমারগুপ্তের দামোদরপুর, মান্দাসর লিপি গুরুত্বপূর্ণ। স্কন্দগুপ্তের সিংহাসনারোহণ বিষয়ে ভিটারি লিপি গুরুত্বপূর্ণ। বুধগুপ্তের সারনাথ লিপি, পাহাড়পুর ও বৈন্যায়গুপ্তের গুনাইগড় লিপি বিখ্যাত।

মুদ্রা

  • (১) গুপ্তযুগের মুদ্রাগুলি থেকে মূল্যবান ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া যায়। এল্যান গুপ্ত মুদ্রাগুলিকে কালানুক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে তার টীকা তৈরি করেছেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রার ওপর কুষাণ স্বর্ণমুদ্রার প্রভাব দেখা যায়। বিভিন্ন গুপ্ত সম্রাটের স্বর্ণ মুদ্রায় বিভিন্ন প্রকার সোনার পরিমাণ থাকত।
  • (২) গুপ্তবংশের রাজত্বের শেষের দিকে মুদ্রায় সোনার পরিমাণ কমতে থাকে। এর থেকে গুপ্তদের ক্ষমতা হ্রাসের কথা জানা যায়। গুপ্ত মুদ্রাগুলিতে নানাপ্রকার বৈচিত্র্য দেখা যায়। পদ্মাসনা লক্ষ্মী, রাজা-রাণীর যৌথমূর্তি, সিংহ, মকর মূর্তি ছাড়াও রাজার তীরন্দাজ মূর্তি বেশীর ভাগ দেখা যায়।
  • (৩) গুপ্ত মুদ্রা ছিল সোনা, রূপা ও তামার। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সর্বপ্রথম রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন। অনুমান করা হয় যে, শক যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি এই মুদ্রা প্রচলন করেন। কারণ এই মুদ্রায় শকদের প্রতীক চিহ্ন চৈত্য ও অর্দ্ধচন্দ্র আছে। গুপ্তযুগের তাম্রমুদ্রা বিরল। গুপ্ত মুদ্রাগুলি উত্তর ভারত, বাংলা ও উড়িষ্যায় পাওয়া গেছে।

স্থাপত্য

গুপ্তযুগের সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে নালন্দা, মথুরা, বারাণসীর ধ্বংসাবশেষ এবং দেওগড়, আইহোল, ভিটারগাওয়ের মন্দিরগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সাহিত্যিক উপাদান

  • (১) গুপ্তযুগের সাহিত্য থেকে এই যুগের ইতিহাসের বহু তথ্য পাওয়া যায়। পুরাণগুলি থেকে গুপ্তবংশের তালিকা পাওয়া যায়। বায়ু, মৎস, বিষ্ণু, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ এই বিষয়ে বিশেষ উল্লেখ্য। স্মৃতিশাস্ত্র বিশেষত নারদ, বৃহস্পতি স্মৃতি থেকে বহু তথ্য পাওয়া যায়। কামন্দকের নীতিসার গ্রন্থ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
  • (২) বজ্জিকা নামে এক বিদুষী মহিলা কৌমুদী মহোৎসব নামে এক নাটক রচনা করেন। এই নাটকে গুপ্ত যুগের গোড়ার দিকের রাজনৈতিক ইতিহাস পাওয়া যায়। বিশাখদত্তের দেবীচন্দ্রগুপ্তম নাটকে রামগুপ্ত সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া কবুলয়মালা, কালিদাসের কাব্যে গুপ্তযুগ সম্পর্কে বিক্ষিপ্ত তথ্য পাওয়া যায়।

বৈদেশিক পর্যাটকের বিবরণ

চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন, ইৎ-সিং প্রমু গুপ্তযুগে ভারতে আসেন। যদিও ফা-হিয়েন ছিলেন মূলত বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী, তবুও সমকালীন ভারতীয় সমাজ, সভ্যতা, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বহু তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন।

উপসংহার :- গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে বাংলা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত যুগ সামগ্রিকভাবে ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে খ্যাত। এই সময়ে প্রজাহিতৈষী কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় যে শান্তি, সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রকাশ ঘটে সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বাংলা তার সুফল ভোগ করে।

(FAQ) গুপ্ত বংশের ঐতিহাসিক উপাদান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত যুগে কোন ধাতুর মুদ্রা প্রচলিত ছিল?

সোনা, রূপা, তামা।

২. গুপ্তযুগের মুদ্রায় কোন দেবীর মূর্তি খোদাই থাকত?

পদ্মাসনা লক্ষ্মী।

৩. গুপ্তযুগে কোন চীনা পর্যটক ভারতে আসেন?

ফা হিয়েন।

৪. দেবীচন্দ্রগুপ্তম নাটকটি কে রচনা করেন?

বিশাখদত্ত।

Leave a Reply

Translate »