গুপ্তবংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান

গুপ্ত বংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান প্রসঙ্গে জাট বংশীয়, ধারণ গোত্র, ভিন্ন মত, রায়চৌধুরীর অভিমত, ব্রাহ্মণ বংশ সম্পর্কে মত, মগধের আদি বাসস্থান, ডঃ গাঙ্গুলির মত, ডঃ মজুমদারের অভিমত, ডঃ চ্যাটার্জীর অভিমত ও ডঃ গয়ালের অভিমত সম্পর্কে জানবো।

গুপ্তবংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান

বিষয় গুপ্তবংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান
সাম্রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত
ভারতের নেপোলিয়ন সমুদ্রগুপ্ত
শকারি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
গুপ্তবংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান

ভূমিকা :- গুপ্তবংশ সম্পর্কে যে সকল ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া যায় তা থেকে গুপ্তবংশের উৎপত্তি ও তাদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না।

জাট বংশীয়

কে. পি. জয়সওয়াল বৈয়াকরনিক চন্দ্রগোমিনের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে সর্বপ্রথম এই অভিমত দেন যে, গুপ্ত সম্রাটরা ছিলেন জাট বংশীয়।

ধারণ গোত্র

কোনো কোনো ঐতিহাসিক এই মত অনুসরণ করে আরও প্রমাণ যোগাড় করেন। তাঁরা বলেন যে, গুপ্ত সম্রাটরা ছিলেন ‘ধারণ’ গোত্রের লোক। এই ‘ধারণা’ গোত্র সম্ভবত জাঠদের গোত্র ‘ধারী’র শুদ্ধ সংস্কৃত নাম। পাঞ্জাবের জাঠদের সঙ্গেই গুপ্ত সম্রাটরা সম্পর্কিত ছিলেন।

ভিন্ন মত

  • (১) কিন্তু এই মতের দুর্বলতা হল এই যে, পাঞ্চোভ তাপ্রলিপিতে গুপ্ত রাজারা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিয়েছেন। গুপ্ত বংশের সঙ্গে যে সকল রাজবংশের বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়, যথা লিচ্ছবি, বাকাটক বা নাগ তারা হয় ব্রাহ্মণ নয় ক্ষত্রিয় ছিলেন।
  • (২) শূদ্র জাটদের সঙ্গে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন এটা ভাবা যায় য় না। গুপ্তদের বংশ পরিচয় সম্পর্কে অন্য তত্ত্ব পাওয়া যায়। গুপ্তবংশের আদি বাসস্থান কারও মতে ছিল বাংলায়, কারও মতে মগধে। পাঞ্জাবে তাদের আদি বাসস্থান ছিল এমন কোন প্রমাণ নেই।

ডঃ রায়চৌধুরীর অভিমত

ডঃ এইচ সি. রায়চৌধুরী বলেছেন যে, গুপ্তদের গোত্র ছিল ‘ধারণ’। শুঙ্গ রাজা অগ্নিমিত্রের পত্নী ধারিনীর সঙ্গে হয়ত এর সম্পর্ক আছে। এই অর্থে গুপ্তরা ব্রাহ্মণ হতে পারেন। কারণ শুঙ্গ রাজারা ব্রাহ্মণ বংশীয় ছিলেন।

ডঃ গুপ্তর অভিমত

ডঃ পি এল গুপ্ত এই মতের সমালোচনা করে বলেছেন যে, শুঙ্গ যুগের রাণী ধারিনীর সঙ্গে গুপ্তদের ব্যবধান বহু শতকের। শুধুমাত্র নামের সাদৃশ্য দেখে গোত্র ও বংশ পরিচয় স্থির করা নির্ভরযোগ্য নয়।

ব্রাহ্মণ বংশ সম্পর্কে মত

  • (১) ডঃ গয়াল গুপ্ত সম্রাটদের ব্রাহ্মণ বংশ পরিচয় সম্পর্কে বলেন যে গুপ্তবংশের সঙ্গে যে সকল বিবাহ সম্পর্কের কথা জানা যায় তার অধিকাংশ বিবাহ ব্রাহ্মণ বংশের সঙ্গে হয়। যথা – দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতী গুপ্তের বিবাহ হয় রুদ্রসেন বাকাটকের সঙ্গে। ইনি ছিলেন ব্রাহ্মণ।
  • (২) নরসিংহ গুপ্ত তাঁর ভগ্নীকে এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিবাহ দেন। তবে এই পরোক্ষ প্রমাণ ছাড়া আর কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। এদিকে গুপ্ত সম্রাটরা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবী করতেন। বেশীর ভাগ পণ্ডিতের মতে, গুপ্তরা ছিলেন বৈশ্য বংশীয়। তাঁদের গুপ্ত উপাধি একথা প্রমাণ করছে। তাঁরা রাজা ছিলেন বলে ক্ষত্রিয়ত্ব দাবী করেন।

আদি বাসস্থান

গুপ্তদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে ডঃ কে. পি. জয়সোয়ালের অভিমত এই যে, প্রয়াগ বা এলাহাবাদ অঞ্চলেই গুপ্তদের আদি বাস ছিল। কারণ পূরাণে দেখা যাচ্ছে যে, প্রথম গুপ্ত রাজাদের নাম প্রয়াগ ও গঙ্গা উপত্যকার সঙ্গে সংযুক্ত। এই অঞ্চলে তাঁরা নাগ রাজাদের সামন্ত ছিলেন, পরে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

মগধে আদি বাসস্থান

এ্যালান প্রমুখ গবেষক মগধকেই গুপ্ত সম্রাটদের আদি বাসস্থান বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এই মতের দুর্বলতা এই যে, গুপ্তযুগের আদি মুদ্রাগুলি মগধ অঞ্চলে পাওয়া যায় নি।

ডঃ গাঙ্গুলীর অভিমত

  • (১) ডঃ ডি সি-গাঙ্গুলী তার একটি বিখ্যাত প্রবন্ধে বলেছেন যে, ৬৭৫-৯৫ খ্রিস্টাব্দে চীনা পর্যাটক ই-সিং ভারত পরিভ্রমণ করে তাঁর ৫০০ বছর আগে থেকে প্রচলিত এক কিংবদন্তী লিপিবদ্ধ করেন। তাতে বলা হয়েছে চীনা পর্যটকদের জন্য শ্রীগুপ্ত মি-লি-কিয়া-সি-কিয়া-পো-নো নামক স্থানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। ডঃ গাঙ্গুলী এই স্থানটিকে মৃগশিখাবনের চীনা নাম বলে সনাক্ত করেন।
  • (২) এই স্থানটির অবস্থান সম্পর্কে ই-সিং বলেছেন যে, নালন্দার পূর্বদিকে গঙ্গার খাত ধরে ৪০ যোজন বা ২৪০ মাইল দূরে অবস্থিত। ই-সিং বলেছেন যে, শ্রীগুপ্ত এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। এই শ্রীগুপ্তকে গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। ডঃ গাঙ্গুলীর মতে, নালন্দা থেকে ২৪০ মাইল দূরে মুর্শিদাবাদ জেলা। এখানেই ছিল মৃগশিখাবন মন্দির এবং শ্রীগুপ্তের বাসস্থান।

ডঃ মজুমদারের অভিমত

ডঃ আর. সি. মজুমদার কেমব্রিজের পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষিত কয়েকটি চিত্রে বারেন্দ্রীর মৃগস্থাপন স্তূপের চিত্র দেখেছেন। সুতরাং ডঃ মজুমদারের মত হল মৃগস্থাপন বা মৃগশিখাবন একই স্তূপ। এটি বারেন্দ্রী বা মালদহে অবস্থিত ছিল। কিন্তু ই-সিং-এর বর্ণনা অনুসারে নালন্দার ২৪০ মাইল দূরে মুর্শিদাবাদ হয়। কিন্তু মুর্শিদাবাদ বারেন্দ্রীতে অবস্থিত নয়।

ডঃ চ্যাটার্জীর অভিমত

ডঃ এস চ্যাটার্জী এই সমস্যার সমাধান করে বলেছেন যে, ই-সিং গঙ্গার তীর ধরে ২৪০ মাইল। সুতরাং নালন্দা থেকে গঙ্গা তীরে এসে, গঙ্গার তীর ধরে ১৪০ মাইল দূরে মালদহ পড়বে। সুতরাং গুপ্ত সম্রাটদের আদি বাসস্থান মালদহ।

মৃগশিখাবন

কিন্তু ই-সিং-এর রচনার অনুবাদ থেকে বোঝা যায় যে, সারনাথ অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশের পূর্ব অংশ গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল। মি-লি-কিয়া-সি-কিয়া-পো- নো-এর অর্থ মৃগশিখাবন, মৃগ স্থাপন হবে না। মৃগশিখাবন নালন্দার পূর্বে অবস্থিত বৌদ্ধদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান।

ডঃ গয়ালের অভিমত

ডঃ গয়াল নামে গবেষক তাঁর হিস্ট্রি অফ ইমপিরিয়েল গুপ্তজ গ্রন্থে বলেছেন যে, গুপ্ত স্বর্ণমুদ্রার বেশীর ভাগ উত্তরপ্রদেশে পাওয়া গেছে, মগধে ও বাংলায় তুলনামূলকভাবে খুবই কম মুদ্রা পাওয়া গেছে। গুপ্ত শিলালিপির বেশীরভাগ উত্তর প্রদেশে পাওয়া গেছে। এর থেকে বুঝা যায় উত্তরপ্রদেশই ছিল গুপ্ত সম্রাটদের আদি বাসস্থান।

উপসংহার :- সুতরাং বিভিন্ন বিরোধী মতের আবর্তে এখনও পর্যন্ত গুপ্ত সম্রাটদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত মীমাংসায় আসা সম্ভব হয়নি। নতুন কোনো ইঙ্গিতবহ শিলালিপি আবিষ্কৃত হলে একমাত্র এই প্রশ্নের প্রকৃত সমাধান সম্ভব হবে।

(FAQ) গুপ্ত বংশ পরিচয় ও আদি বাসস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?

শ্রীগুপ্ত।

২. গুপ্ত যুগে কোন ধাতুর মুদ্রা প্রচলিত ছিল?

সোনা, রূপা, তামা।

৩. গুপ্তযুগের মুদ্রায় কোন দেবীর মূর্তি খোদাই থাকত?

পদ্মাসনা লক্ষ্মী।

৪. গুপ্তযুগে কোন চীনা পর্যটক ভারতে আসেন?

ফা হিয়েন।

৫. দেবীচন্দ্রগুপ্তম নাটকটি কে রচনা করেন?

বিশাখদত্ত।

Leave a Reply

Translate »