মুখ্যমন্ত্রী

ভারতের অঙ্গরাজ্যের প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী -র ক্ষমতা, যোগ্যতা, নিয়োগ, মেয়াদ, বিধানসভার নেতা হিসেবে ভূমিকা, রাজ্যপালের পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব, মন্ত্রীসভার নেতা হিসেবে দায়িত্ব, দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব, জনগণের নেতা হিসেবে দায়িত্ব, কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভূমিকা, আইনসভার নেতা হিসেবে দায়িত্ব ও তার পদমর্যাদা সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

মুখ্যমন্ত্রী

পদের বৈশিষ্ট্যরাজ্যের প্রকৃত শাসক
নিয়োগকর্তাসংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল
মেয়াদপাঁচ বছর
মুখ্যমন্ত্রী

ভূমিকা :- একটি দেশের কোনো প্রদেশ বা একটি রাজ্যের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি একজন নির্বাচিত বা নিযুক্ত সরকারপ্রধান।

যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা

ভারতবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দু – প্রকার সরকারের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কেন্দ্রের সংসদীয় গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যটি রাজ্যের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়।

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থায় একজন প্রকৃত শাসক অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির পাশাপাশি একজন নিয়মতান্ত্রিক শাসকপ্রধানের অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ঘটেছে।

রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা

কেন্দ্রের মতো রাজ্যের শাসন ব্যবস্থায় প্রকৃত শাসক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতির পাশাপাশি একজন নিয়মতান্ত্রিক শাসক হিসাবে রাজ্যপালের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা

কেন্দ্রের শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যেরূপ ক্ষমতা ভােগ করে থাকেন রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় কোনাে মুখ্যমন্ত্রী সেরূপ ক্ষমতা ভােগ করতে পারেন না। কারণ, কেন্দ্রের নিয়মতান্ত্রিক শাসক হিসাবে রাষ্ট্রপতির কোনাে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নেই ও সংবিধান -এর ৪২ তম সংশােধন অনুসারে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভার পরামর্শ মতাে কাজ করতে বাধ্য থাকেন।

মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা

রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকৃত শাসক হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল তার স্বেচ্ছাধীন বিশেষ ক্ষমতা প্রয়ােগ করে মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীপরিষদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন ও মুখ্যমন্ত্রীর সাহায্য ও পরামর্শ ছাড়াই কার্য সম্পাদন করতে পারেন। এরূপ ক্ষেত্রে প্রকৃত শাসক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও পদমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়ে থাকে।

যোগ্যতা

কোনাে অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে হলে তাকে রাজ্য আইনসভার সদস্য হতে হয়। তবে রাজ্য আইনসভার সদস্য না হয়েও ছ-মাস মুখ্যমন্ত্রী পদে তিনি বহাল থাকতে পারেন।

নিয়োগ

সাধারনত বিধানসভার সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতাকে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন । তবে অনেকক্ষেত্রে রাজ্যের বিধানসভায় কোনাে দল বা জোট যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে তাহলে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ােগ সংক্রান্ত ব্যাপারে রাজ্যপাল তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়ােগ করতে পারেন।

মেয়াদ

মুখ্যমন্ত্রীর কার্যকালের স্থায়িত্ব ৫ বছর অর্থাৎ তার কার্যকালের মেয়াদ বিধানসভার মেয়াদেরই সমান।

ক্ষমতা ও কার্যাবলী

সংবিধানে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য রাজ্যের রাজ্যপাল, মন্ত্রীসভা, বিধানসভা, নিজ দল ও জনগণের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্ক আলােচনা করা দরকার।

(১) বিধানসভার নেতা বা নেত্রী হিসেবে ভূমিকা

মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্য বিধানসভার নেতা বা নেত্রী। রাজ্য আইনসভার কার্যতালিকা তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তিনি রাজ্যপালের মাধ্যমে রাজ্য আইনসভার অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত এবং প্রয়োজন বোধে ভেঙে দিতে পারেন।

(২) রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা

রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা মুখ্যমন্ত্রী। সংবিধানের ১৬৩ নং ধারায় উল্লেখ আছে যে, মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত রাজ্য মন্ত্রিসভার শাসনকার্য পরিচালনায় রাজ্যপালকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দান করবে। সংবিধানের ১৬৭ নং ধারা অনুসারে রাজ্য মন্ত্রিসভার গৃহীত সিদ্ধান্ত রাজ্যপালকে জানাতে হবে।

(৩) মন্ত্রিসভার নেতা

মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে রাজ্যের মন্ত্রীদের নিয়োগ করা হয়। কোনো মন্ত্রী  সংঙ্কট বা সমস্যার মুখোমুখি হলে মুখ্যমন্ত্রী তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁকে সমমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রগণ্য বলে অভিহিত করা হয়।

(৪) দলের নেতা

গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থ হল দল ব্যবস্থা রাজ্য সরকার গুলিতে কোনো না কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠ লাভ করে এবং সেই দলই রাজ্য সরকার গঠন করে। আর সেই দলের নেতা বা নেত্রী হলেন মুখ্যমন্ত্রী।

(৫) রাজ্য জনগণের নেতা

যদি মুখ্যমন্ত্রী ব্যাপক অংশের জনগণের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন তাহলে সেই মুখ্যমন্ত্রী সাফল্যের শীর্ষে অতি সহজেই নিজেকে উপস্থাপিত করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ -এর মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এবং জ্যোতি বসুর নাম উল্লেখযোগ্য।

(৬) সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা

আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রভাবশালী নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। পরিবর্তে তার কাজের যোগ্য নেতৃত্ব এবং দলীয় প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ আশা করে দল তাঁর পেছনে সমর্থন যোগায়। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার উপর দলের শক্তি ও জনপ্রিয়তা নির্ভরশীল।

(৭) শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়

মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রী সভায় শাসন ও আইন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কাজ করেন। রাষ্ট্রের প্রধান কার্যশক্তি হিসাবে ক্যাবিনেট শাসন ও আইন বিভাগ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একই নীতি পরীচালিত করেন ।

(৮) আইন সভার নেতা

মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আইন সভার সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট। তিনি সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতা। বিধান সভার আহ্ববান করা, স্থগিত রাখা, প্রয়োজনে তা ভেঙে দেওয়া, আবার অধিকাংশ আইনের খসড়া ক্যাবিনেটে মন্ত্রীদের নির্দেশ অনুসারে প্রস্তুত হয়। মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে পরামর্শ দেয়। আবার, বিরোধীদের সমালোচনার জবাবও দেন।

(৯) কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভূমিকা

মুখ্যমন্ত্রীর মাধ্যমেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রীর রুটিনমাফিক কাজগুলির মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযােগ্য হল রাজ্যের আর্থিক পরিকল্পনা রূপায়ণ থেকে শুরু করে বন্যা, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মােকাবিলা করা পর্যন্ত যে বাড়তি অর্থের প্রয়ােজন দেখা যায়, সেই প্রয়ােজনের মােকাবিলার দরুন কেন্দ্রের উপর চাপ সৃষ্টি করা।

পদমর্যাদা

মুখ্যমন্ত্রীদের ক্ষমতার পরিধি ও পদমর্যাদার প্রকৃতি আলােচনা প্রসঙ্গে অধ্যাপক জোহারি তিন ধরনের মন্তব্য করেছেন। –

(১) কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের একদলীয় মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী

কেন্দ্রীয় সরকার এবং দলীয় নেতাদের সমর্থন, রাজ্যপাল ও বিধানসভার দলীয় সদস্যদের সহযােগিতা প্রথম শ্রেণির মুখ্যমন্ত্রীগণ লাভ করে থাকেন। এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন যদি পদাধিকারীগণ দক্ষ, বিজ্ঞান ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হন। ড. বিধানচন্দ্র রায়, গােবিন্দবল্লভ পন্থ প্রমুখ মুখ্যমন্ত্রীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

(২) কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নয় এমন কোনো দলের একদলীয় মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী

কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত দ্বিতীয় শ্রেণির মুখ্যমন্ত্রীগণ রাজ্যপালের বিরােধিতার সম্মুখীন হন।

(৩) কোয়ালিশন মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী

কোয়ালিশন মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রীগণ তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতা থেকে অনেকসময়ই বঞ্চিত হয়ে পড়েন, যদিও এই মন্ত্রীসভা তাদের শরিকদের সঙ্গে আলাপ-আলােচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে এবং সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।

মূল্যায়ন

সর্বোপরি পদাধিকারীর ব্যক্তিত্ব, কার্যদক্ষতা ও গুণগত যােগ্যতার উপর মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বহুলাংশে নির্ভরশীল। পদাধিকারী যদি যােগ্য, বিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশাসক হন তাহলে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ব্যাপক ক্ষমতা ও প্রভূত মর্যাদার অধিকারী হবেন।

উপসংহার :- শুধু সাংবিধানিক দিক থেকে বিচার করলে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ছাড়া আইন সভার কোনো উপায় থাকে না। যদিও মুখ্যমন্ত্রীর চরিত্র হবে  সৎ-চরিত্রবান এবং গুণসম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি জনগনের প্রকৃত শাসক হয়ে উঠতে পারবেন।

(FAQ) মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মুখ্যমন্ত্রীকে কে নিয়োগ করেন?

সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল।

২. মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান প্রশাসনিক পরামর্শদাতা কে?

মুখ্য সচিব।

৩. কাকে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বিতীয় সত্তা বলা হয়?

মুখ্য সচিব।

৪. পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর নাম কি?

প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ।

৫. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের কততম মুখ্যমন্ত্রী?

২৮ তম। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে অষ্টম।

Leave a Reply

Translate »