দেবপাল

বাংলার রাজা দেবপাল প্রসঙ্গে উত্তরাপথ স্বামীন-এর আদর্শ, সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির সংগঠক, রাজ্য জয়, কম্বোজ জয়, ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব, দ্রাবিড়দের পরাজয়, সাম্রাজ্য সীমা, গ্ৰাম দান ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি তার অনুরাগ সম্পর্কে জানবো।

দেবপাল

রাজা দেবপাল
রাজত্ব ৮১২-৮৫০ খ্রি:
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
পূর্বসূরি ধর্মপাল
উত্তরসূরি বিগ্ৰহপাল
দেবপাল

ভূমিকা :- ধর্মপালের রাষ্ট্রকূটবংশীয় পত্নী রন্নাদেবীর গর্ভে দেবপালের জন্ম হয়। অনেকে তাকে পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বলেন। বাদল স্তম্ভলিপিতে তাঁকে উত্তর ভারতের সর্বাধিপতি বলা হয়েছে।

উত্তরাপথ স্বামীন-এর আদর্শ

দেবপালের আমলে পাল সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। পাল যুগের সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য ছিল উত্তর ভারতের আধিপতা। দক্ষিণ ভারত জয়ের লক্ষ্য হর্ষবর্ধনের যুগ থেকে পরিত্যক্ত হয়েছিল। সুতরাং “উত্তরাপথ স্বামীন” হওয়াই ছিল পাল সম্রাটদের আদর্শ। দেবপাল এই আদর্শ পূরণের জন্য চেষ্টা করেন। বাদল স্তম্ভলিপি থেকে দেবপালের সাফল্যের কথা জানা যায়।

সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির সংগঠক

দেবপালের ব্রাহ্মণ মন্ত্রী দর্ভপাণি এবং তাঁর পৌত্র কেদার মিশ্র ছিলেন দেবপালের সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির সংগঠক। বাদল স্তম্ভলিপি থেকে জানা যায় যে, পাল রাজাদের বংশানুক্রমিক ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ছিলেন দর্ভপাণি ও কেদার মিশ্র। সম্রাটের কৃতিত্বের পাশে তাঁরা নিজ কৃতিত্ব জাহির করতে কুণ্ঠা বোধ করেন নি।

রাজ্য জয়

মন্ত্রী দর্ভপাণির কূটনীতর প্রভাবে দেবপাল উৎকল, হূণ, দ্রাবিড়, গুর্জর ও প্রাগজ্যোতিষদের পরাস্ত করেন। যদিও ডঃ আব্দুল মোমিন চৌধুরী বলেন যে, এই বর্ণনায় উত্তর ভারতীয় রাজাদের চিরাচরিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং এই বর্ণনা বিশ্বাস্য নয় তবুও অন্যান্য পণ্ডিতেরা বলেন যে, বাদল স্তম্ভলিপিতে যে সকল অঞ্চল জয়ের কথা বলা হয়েছে তা স্বাভাবিক ও নির্ভরযোগ্য। কারণ, এই রাজ্যগুলি পাল সাম্রাজ্যের সীমান্তে।

প্রাগজ্যোতিষ

কামরূপ রাজ্য বা প্রাগজ্যোতিষ হয় দেবপালের বশ্যতামূলক মিত্রতা গ্রহণ করে নতুবা দেবপাল এই রাজ্য জয় করেন। এরপর তিনি ওড্র বা উৎকল দেশ আক্রমণ করে তার রাজা শিবকরকে পরাস্ত করেন।

কম্বোজ জয়

তারপর তিনি হূণ রাজ্য জয় করে কম্বোজ আক্রমণ করেন। সুদূর উত্তর-পশ্চিমে কম্বোজ উপজাতিকে জয় করা দেবপালের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে কোনো কোনো আধুনিক গবেষক যথা ডঃ আব্দুল মোমিন চৌধুরী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ধর্মপাল গান্ধার অঞ্চল পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেন একথা মনে রাখলে দেবপালের দাবী অসঙ্গত মনে হয় না। মুঙ্গের লিপি থেকে জানা যায় যে, দেবপাল খস্ বা গাড়োয়াল অঞ্চলও জয় করেন।

ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব

  • (১) দেবপালের প্রধান কৃতিত্ব ছিল ত্রিশক্তি দ্বন্দ্বে তাঁর ভূমিকা। ধর্মপালের আমল হতে এই ত্রিশক্তি দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। দেবপাল তা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। দেবপালের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রামভদ্র প্রতিহার। দেবপাল তাঁকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করলে কিছুদিন প্রতিহার শক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
  • (২) পরে প্রতিহার সিংহাসনে প্রথম ভোজ বা মিহির ভোজ বসলে পুনরায় পাল-প্রতিহার দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। গোয়ালিয়র প্রশস্তিতে মিহির ভোজ বা প্রতিহার রাজা ভোজের পাল যুদ্ধে জয়লাভের কথা আছে। সম্ভবত গোড়ার দিকে ভোজ জয়লাভ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি দেবপালের কাছে পরাস্ত হন।
  • (৩) বাদল স্তম্ভলিপিতে যে গুর্জরদের কথা বলা হয়েছে সম্ভবত তাঁরা ছিল গুর্জর প্রতিহার, যাদের রাজা ছিলেন ভোজ। ডঃ নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন যে, এই গুর্জররা ছিল প্রতিহারদের থেকে স্বতন্ত্র। যাই হোক, দেবপালের মন্ত্রী কেদার মিশ্রের বুদ্ধিবলে গুর্জর প্রতিহার শক্তির পতন ঘটে।

দ্রাবিড়দের পরাজয়

এছাড়া দেবপাল দ্রাবিড়দেরও পরাস্ত করেন। এই দ্রাবিড় কারা ছিল? সাধারণত মনে করা হয় যে, রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রকূট শক্তি তার পূর্ব গৌরব হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রকূট রাজা প্রথম অমোঘবর্ষ বেশ দুর্বল ছিলেন। দেবপাল তাঁকে পরাস্ত করেন। এখানে রাষ্ট্রকূটদেরই দ্রাবিড় বলা হয়েছে।

ডঃ মজুমদারের অভিমত

ডঃ মজুমদার উপরের এই মতের বিরোধিতা করে বলেছেন যে, দ্রাবিড় বলতে তামিল জাতি বুঝায়। রাষ্ট্রকূটরা তামিল ছিল না। সুতরাং যে দ্রাবিড়দের দেবপাল পরাস্ত করেন তারা ছিল পাণ্ড্য এবং তাদের রাজা ছিলেন শ্রীমার শ্রীবল্লভ।

ডঃ রায়ের অভিমত

ডঃ নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ ঐতিহাসিক ডঃ মজুমদারের এই ব্যাখ্যা অসঙ্গত মনে করেন। কারণ, দেবপাল সুদূর দক্ষিণে রাজ্য বিস্তার করেন বলে মনে করা যায় না। যদিও মুঙ্গের লিপিতে রামেশ্বরকে তাঁর রাজ্যসীমা বলা হয়েছে তা আলঙ্কারিক অর্থে গ্রহণ করা যায়।

সাম্রাজ্য সীমা

  • (১) দক্ষিণের কিছু অংশ দেবপালের বশ্যতা স্বীকার করে এতে সন্দেহ নেই। সুতরাং রাজ্যসীমার দিক থেকে বিচার করলে দেবপালকে পাল বংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতি বলা যায়। সুদূর উত্তর-পশ্চিম থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত সকল অঞ্চল তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে।
  • (২) তবে তিনি স্থানীয় রাজাদের বশ্যতা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট থাকেন। এই সকল অঞ্চলে প্রত্যক্ষ শাসন স্থাপনে বিরত হন। তিনিই ছিলেন প্রকৃত অর্থে কেবলমাত্র “উত্তরাপথ স্বামীন, দক্ষিণাপথেরও কিছু অংশের অধিপতি।

গ্ৰাম দান

দেবপালের খ্যাতি, প্রতিপত্তির কথা ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। শৈলেন্দ্ররাজা বলপুত্রদেব নালন্দায় একটি বিহার নির্মাণের অনুমতির জন্য তাঁর কাছে দূত পাঠান। দেবপাল বলপুত্রদেবের অনুরোধ রক্ষা করে তার বিহারের জন্য পাঁচ খানি গ্রাম দান করেন।

বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী

দেবপাল ছিলেন নালন্দার পৃষ্ঠপোষক। তাঁর আমলে নগরহারের (জালালাবাদ) বৌদ্ধ স্থবির বীরদেব নালন্দা মঠের অধ্যক্ষ ছিলেন। দেবপাল বৌদ্ধধর্মের অনুরাগী ছিলেন। তার ভূমিপট্টলীতে ধর্মচক্র ও বুদ্ধের আবাহন মন্ত্র দেখা যায়।

উপসংহার :- আরবীয় পর্যটক সুলেমান দেবপালের সামরিক শক্তির প্রশংসা করেছেন। ডঃ মজুমদারের মতে, “ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকাল বাংলার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা মহান যুখ।”

(FAQ) বাংলার রাজা দেবপাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ধর্মপালের পর কে সিংহাসনে আরোহণ করেন?

দেড়টার।

২. পাল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?

দেড়টার।

৩. দেবপাল কোন ধর্মের অনুরাগী ছিলেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৪. দেবপালের সময় প্রতিহার রাজা কে ছিলেন?

প্রথম ভোজ বা মিহির ভোজ।

৫. কোন লিপি থেকে দেবপাল সম্বন্ধে তথ্য পাওয়া যায়?

বাদল স্তম্ভলিপি।

Leave a Reply

Translate »