প্রথম মহীপাল

পাল রাজা প্রথম মহীপাল প্রসঙ্গে সুনিপুণ যোদ্ধা, রাজ্য জয়, বাংলায় চোল অভিযান, সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখা, জনপ্রিয় রাজা, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

প্রথম মহীপাল

রাজা প্রথম মহীপাল
রাজত্ব ৯৭৭-১০২৭ খ্রি.
সাম্রাজ্য পাল সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা গোপাল
শ্রেষ্ঠ রাজা দেবপাল
প্রথম মহীপাল

ভূমিকা :- পাল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লেও দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপাল এই সাম্রাজ্যের হৃত-গৌরব অনেকটা পুনঃস্থাপন করেন। এই কারণে তাকে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

সুনিপুণ যোদ্ধা

মহীপাল তাঁর পূর্বপুরুষ ধর্মপাল ও দেবপালের মত সুনিপুণ যোদ্ধা ছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে কেবলমাত্র মগধের সিংহাসন পান। কিন্তু বাহুবলে এই রাজ্যের সীমাকে চারদিকে বৃদ্ধি করেন।

মহীপালের রাজ্য জয়

  • (১) বানগড় ও ত্রিপুরা লিপি থেকে জানা যায় যে, মহীপাল চন্দ্রবংশীয় উপাধিধারী রাজাদের হঠিয়ে গৌড় বা উত্তর বাংলা এবং পূর্ব বাংলা অধিকার করেন। রাঢ় দেশের দক্ষিণ বা হাওড়া, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলা সম্ভবত এই সময় চোল অধিকারে ছিল।
  • (২) মহীপাল উত্তর বিহার অধিকার করে তার পৈত্রিক রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। নালন্দা লিপি থেকে এই কথা জানা যায়। সারনাথ লিপি থেকে জানা যায় যে, বারাণসী ও সারনাথ পর্যন্ত মহীপাল তাঁর অধিকার বিস্তার করেন। সুতরাং গাঙ্গেয় উপত্যকা তিনি নিজ অধিকারে আনেন।

বাংলায় চোল অভিযান

  • (১) প্রথম মহীপালের রাজত্বকালে দক্ষিণের বিখ্যাত চোল সম্রাট রাজেন্দ্ৰ চোল (১০২১-১০২৩) অভিযান চালান। চোল শক্তি ছিল অত্যন্ত পরাক্রমশালী ও আগ্রাসী। উৎকল জয় করে চোল শক্তি বাংলার দিকে এগিয়ে আসে।
  • (২) চোল লিপিতে জানা যায় যে, গঙ্গা অথবা গাঙ্গেয় উপত্যকায় আধিপত্য স্থাপন ছিল চোল আক্রমণের লক্ষ্য। দক্ষিণ মেদিনীপুরের দণ্ডভুক্তি বা দাঁতনের পথে চোল সেনা বাংলায় ঢুকে পড়ে। দণ্ডভুক্তির শাসক ধর্মপাল চোল সেনার কাছে পরাস্ত হন। দক্ষিণ রাঢ়ের রাজা রণশূর ও বাংলার গোবিন্দচন্দ্রও পরাস্ত হন।
  • (৩) এই সকল সামন্ত রাজার ঊর্ধ্বতন রাজা প্রথম মহীপাল চোল শক্তির প্রভাবে ভীত হয়ে বিনাযুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। চোল সেনা বহু ধনরত্ন লুঠ করে। বাংলার পরাজিত রাজন্যবর্গ মাথায় করে গঙ্গা জলের কলস নিয়ে চোল দেশে যেতে বাধ্য হন।
  • (৪) রাজেন্দ্র চোল সেই জলে তার নতুন রাজধানী ও হ্রদের অভিষেক করেন। তিনি উপাধি নেন। “গঙ্গাইকোণ্ড” অর্থাৎ গঙ্গা-বিজেতা এবং তার রাজধানীর নাম হয় গঙ্গাইকোণ্ড চোলপুরম।

চোল অভিযানের গুরুত্ব

  • (১) বাংলায় চোল অভিযানের গুরুত্ব সম্পর্কে ডঃ নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী বলেছেন যে, “একটি বিশাল পরিসর দেশে চোল অভিযান ছিল একটি দ্রুতগামী ঝটিকা আক্রমণ মাত্র”। এর ফলে বাংলার সার্বভৌম অধিকার চোল সম্রাটের হাতে যায়নি এবং চোল আক্রমণের কোনো স্থায়ী ফল ছিল না।
  • (২) একমাত্র পরোক্ষ ফল এই ছিল যে, চোল সেনার সঙ্গে আগত কিছু কর্ণাটী সামন্ত বাংলায় স্থায়ী বসবাস করেন। এদের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতে সেন রাজবংশের উদ্ভব হয়। দক্ষিণ রাঢ়দেশ কিছুকাল চোল অধিকারে থাকে।
  • (৩) মহীপালের রাজত্বের শেষ দিকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় কলচুরী আক্রমণ হয়। গাঙ্গেয়দেব কলচুরীর আক্রমণে মহীপালের রাজ্যের কিছু অংশ হাতছাড়া হয়।

সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ন রাখা

পাল বংশের ধর্মপাল ও দেবপালের পরেই প্রথম মহীপালকে খ্যাতনামা বলা হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত পাল শক্তিকে তিনি পুনর্জীবন দেন। চোল ও কলচুরী প্রভৃতি শক্তিগুলির বিরুদ্ধে তিনি তাঁর সাম্রাজ্য মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখেন।

জনপ্রিয় রাজা

মহীপাল বেশ জনপ্রিয় রাজা ছিলেন মনে করা যায়। উত্তর বাংলায় “মহীপালের গীত” নামে এক প্রকার ব্যালাড বা লোকগাথার কথা জানা যায়।

সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

  • (১) মহীপালের রাজত্বকালে উত্তর ভারতে তুর্কী আক্রমণ আরম্ভ হয়। সুলতান মামুদ তখন বারে বারে অভিযান চালিয়ে উত্তর ভারত কাঁপিয়ে দেন। সুলতান মামুদের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবের শাহী রাজবংশ ভারতীয় রাজাদের এক শক্তিজোট গড়ার চেষ্টা করেন।
  • (২) মহীপাল এই জাতীয় স্বার্থের কাজে যোগ দেননি। এজন্য আধুনিক ঐতিহাসিকরা তাঁর প্রাদেশিক, সঙ্কীর্ণ দৃষ্টির নিন্দা করেছেন। তবে মহীপাল চোল ও কলচুরী আক্রমণ নিয়ে এতই বিব্রত ছিলেন যে, তার পক্ষে এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
  • (৩) অনেকে বলেন যে, তাঁর বৌদ্ধ চিন্তা ও অহিংসা মার্গের প্রতি আসক্তির জন্যেই তিনি নিষ্ক্রিয় থাকেন। অনেকের মতে, হিন্দু রাজাদের প্রতি তার অসহিষ্ণুতা তাকে নিষ্ক্রিয় রেখেছিল। সম্ভবত মহীপাল ভেবেছিলেন যে, ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে তুর্কী আক্রমণের ব্যাস হতে তিনি পূর্ব ভারত বা বাংলায় দূরে আছেন।
  • (৪) সুতরাং তার কোনো বিপদ নেই। ভারত মহাসাগর ও ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্য আরবরা অধিকার করার জন্য ভারত তথা বাংলার বাণিজ্য ধ্বংস হচ্ছিল এ কথা তিনি বুঝেন নি।

ডঃ রায়ের অভিমত

ডঃ রায়ের মতে, “ইতিহাসের অনিবার্য নিয়ম অনুযায়ী উত্তর ভারতের নিরাপত্তা বিপন্ন হলে বাংলার রাজার পক্ষে উদাসীন থাকা চলে না। ইতিহাসের নির্দিষ্ট এই কর্তব্য তিনি পালন করতে ব্যর্থ হন।”

ডঃ মজুমদারের অভিমত

ডঃ মজুমদার প্রথম মহীপালকে সমর্থন করে বলেছেন যে, চোল ও কলচুরী আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যস্ত থাকায় তার পক্ষে তুর্কী আক্রমণের বিরুদ্ধে যোগ দেওয়া আদপেই সম্ভব ছিল না।

জাতীয় স্বার্থের বিরোধী

ডঃ মজুমদারের মতে যুক্তি থাকলেও এ কথা স্বীকার্য যে, মহীপাল স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকেই তার প্রধান কর্তব্য বলে মনে করেন। সর্ব ভারতীয় স্বার্থের এবং ভারতের নিরাপত্তার মূল প্রশ্ন সম্পর্কে তিনি উদাসীন ছিলেন। এই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় স্বার্থের বিরোধী। দক্ষিণের রাষ্ট্রকুট ও চোলরাও এই দোষে দোষী ছিলেন।

পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা

মহীপাল ঐতিহাসিকদের দ্বারা সমালোচিত হলেও জনচিত্তে সুশাসক রূপে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাকে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

বৌদ্ধ ধর্মের উন্নতি

তিনি কেবলমাত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত পাল সাম্রাজ্যের পুনঃ-প্রতিষ্ঠা করেননি, তিনি বৌদ্ধধর্মকে হৃত মর্যাদা দেন। তিনি বহু গন্ধকূটী বিহার, বৌদ্ধমূর্তি নির্মাণ করেন এবং তার লিপিতে ধর্মচক্র ও আবাহন মন্ত্র ব্যবহার করেন। তার আমলে বহু বৌদ্ধ পণ্ডিত বাংলায় আসেন। এঁদের মধ্যে জ্ঞানশ্রী মিত্রের নাম করা যায়।

বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা বৃদ্ধি

তিব্বতের সঙ্গে বাংলার সাংস্কৃতিক যোগ তার আমলে ঘনিষ্ঠ হয়। বহু তিব্বতীয় তীর্থযাত্রী বাংলায় আসেন। প্রথম মহীপালের আমলে বাঙালী জাতি তার আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা ফিরে পায়। কৃতজ্ঞ জাতি এজন্য তাকে নানাভাবে স্মরণ করেছে। বাংলার বহু হ্রদ সরোবর নগর তার নাম বহন করছে। সারনাথ ও নালন্দায় তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার চিহ্ন শিলালিপির আকারে দেখা যায়।

উপসংহার :- প্রথম মহীপাল পাল বংশের যে গৌরব পুনঃ-প্রতিষ্ঠা করেন তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। দীপ নিভে যাওয়ার আগে জ্বলে ওঠার মত প্রথম মহীপালের আমলে তা পাল গৌরবের প্রদীপ শিখা জ্বলে ওঠে। তার মৃত্যুর পর পাল সাম্রাজ্যের ভাঙন দেখা দেয়।

(FAQ) প্রথম মহীপাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

প্রথম মহীপাল।

২. কোন পাল রাজার আমলে রাজেন্দ্র চোল বাংলা অভিযান করেন?

প্রথম মহীপাল।

৩. কোন পাল রাজার আমলে বাঙালী জাতি আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদা ফিরে পায়?

প্রথম মহীপাল।

Leave a Reply

Translate »