সেন বংশ

বাংলার সেন বংশ প্রসঙ্গে আদি বাসস্থান, উৎপত্তি, সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীন সেন রাজ্য প্রতিষ্ঠা, বিজয় সেন, বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন, লক্ষ্মণ সেন, তুর্কি আক্রমণ ও সেন বংশের গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

সেন বংশ

বিষয় সেন বংশ
প্রতিষ্ঠাতা সামন্ত সেন
শ্রেষ্ঠ রাজা বল্লাল সেন
শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন
সেন বংশ

ভূমিকা :- সেন বংশ  একশ বছরের বেশি (১০৯৭-১২২৫ খ্রি) সময় বাংলা শাসন করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এগারো শতকের অন্তিমলগ্নে পাল বংশের অবসান ঘটিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আদি বাসস্থান

সেন রাজারা বাংলার আদিবাসী ছিলেন অথবা তারা বাইরে থেকে বাংলায় বসবাস করতে আসেন এ সম্পর্কে বিতর্ক আছে।

উৎপত্তি

  • (১) বেশীর ভাগ ঐতিহাসিক অবশ্য এই মতে বিশ্বাস করেন যে, দাক্ষিণাত্যের চালুক্য রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য এবং তৃতীয় সোমেশ্বরের আমলে চালুক্য বাহিনীর সঙ্গে সেন বংশ বাংলায় আসেন। সেই থেকে তাঁরা বাংলায় বসবাস করতেন। চালুক্য বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা কর্ণাটক থেকে বাংলায় এসেছিলেন।
  • (২) অপর দিকে অনেকে মনে করেন যে, রাজেন্দ্র চোল বাংলা অভিযানের জন্য যে বাহিনী পাঠান সেন বংশের পূর্বপুরুষ তার সঙ্গেই বাংলায় আসেন। সেন রাজবংশের দক্ষিণ ভারতীয় উৎপত্তি অধিকাংশ ঐতিহাসিক গ্রহণ করেছেন।

সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা

সেন বংশের প্রথম বিখ্যাত পুরুষ এবং সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন। তিনি রাঢ় বা বর্ধমান অঞ্চলে বসবাস করতেন। তাঁর কোনো রাজ উপাধি ছিল না।

স্বাধীন সেন রাজ্য প্রতিষ্ঠা

সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন প্রথম মহারাজাধিরাজ উপাধি দেন। পাল বংশের দুর্বলতার সুযোগে তিনি রাঢ় অঞ্চলে এর স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজয় সেন

হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন রাঢ়দেশের একটি ক্ষুদ্র রাজ্যকে নিজ যোগ্যতায় এক সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। বিক্রমপুর তাম্রপট ও দেওপাড়া লিপি থেকে তার সম্পর্কে জানা যায়। পাল বংশের সভাকবি উমাপতি ধর দেওপাড়া লিপি রচনা করেন।

বল্লাল সেন

বিজয় সেনের মৃত্যুর পর ১১৫৮ খ্রিস্টাব্দে বল্লাল সেন পিতার সিংহাসনে বসেন। সম্ভবত পিতার রাজত্বকালে তার রাজ্য জয়ে তিনি সাহায্য করেন।

কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তন

বল্লাল সেন হিন্দু সমাজের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থের মধ্যে কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তন করেন বলে কিংবদন্তী আছে। ডঃ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, বল্লাল সেন ছিলেন ঘোর রক্ষণশীল। তিনি সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে কৌলিনা প্রথা প্রবর্তন করে জাতিভেদ প্রথাকে তীব্র করেন।

লক্ষ্মণ সেন

লক্ষ্মণ সেন তাঁর পিতার মৃত্যুর পর পরিণত বয়সে, অর্থাৎ প্রায় ৬০ বছর বয়সে বাংলার সিংহাসনে বসেন। তিনি সমগ্র বাংলায় তার আধিপত্যকে সম্পূর্ণ করে ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধি নেন। তাছাড়া ক্ষমতা প্রকাশের জন্য তিনি ‘অরি-রাজ-মর্দন শঙ্কর’ নামে এক গালভরা উপাধি নেন।

তুর্কী আক্রমণ

লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালের সর্বপ্রধান ঘটনা ছিল তুর্কী সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বক্তিয়ার খলজীর বাংলা অভিযান। মিনহাজ উদ-দ্দিন সিরাজের তরকাৎ-ই-নাসিরী এবং ইসামীর রচনা ফুতুহ-উস-সালাতিন থেকে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

ইতিহাসে ধিকৃত

লক্ষ্মণ সেন তাঁর রাজ্য রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য ইতিহাসে ধিকৃত হয়েছেন। কিন্তু তুর্কী আক্রমণের বিরুদ্ধে উত্তর ভারতের বহু রাজপুত রাজারাও ব্যর্থ হন। তবে লক্ষ্মণ সেন যেভাবে বিনা যুদ্ধে রাজ্য ছেড়ে যান তার তুলনা পাওয়া যায় না। লক্ষ্মণ সেনের ব্যর্থতা ছিল একটি system বা প্রথার ব্যর্থতা।

সেন বংশের রাজনৈতিক গুরুত্ব

রাজনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে সেন যুগের গোড়ার দিক ছিল পাল যুগের অনুবর্তী। পাল যুগে যেরূপ বাংলার সীমানা উত্তরে মগধ ছাড়িয়ে উত্তর প্রদেশে, পূর্বে কামরূপে ও দক্ষিণে কলিঙ্গে বিস্তৃত হয়; বিজয় সেন ও বল্লাল সেনও বাংলার সীমান্তকে একই অঞ্চলে স্থাপন করেন।

সংস্কৃত ভাষার চর্চা

সেন যুগের সভ্যতা ও সংস্কৃতির কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। সেন যুগে সংস্কৃত ভাষার চর্চায় বিশেষ অগ্রগতি দেখা যায়। সেন যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জয়দেব। তিনি রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে অবলম্বন করে বিখ্যাত গীতগোবিন্দম্ রচনা করেন। গীতগোবিন্দের সুললিত কাব্য-বিন্যাস পাঠকের মনোহরণ করে।

নৈতিক শৈথিল্য

সেন যুগের সমাজে নৈতিক শিথিলতাও দেখা যায়। গোবর্ধনের আর্য সপ্তশতিতে বহু কামোদ্দীপক অশ্লীল পদ দেখা যায়। জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ কাব্য ধর্মের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ হলেও, বিষয়বস্তু অনেক সময় অশ্লীলতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। জোলক, বসন্তোৎসব প্রভৃতি দ্বারা সামাজিক শৈথিল্য প্রকাশিত হত। কুল-বিবেক গ্রন্থে এই সকল আচারকে প্রশংসা করা হয়েছে।

পতন

তুর্কী আক্রমণের ফলে কার্যত সেন বংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। লক্ষ্মণ সেনের পর বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন কিছুকাল পূর্ব বাংলায় রাজত্ব করেন। এরপর সেন বংশের পতন ঘটে।

উপসংহার :- ডক্টর রমেশ চন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছেন যে, “বাংলার ইতিহাসে সেন যুগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।”

(FAQ) সেন বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

সামন্ত সেন।

২. প্রথম স্বাধীন সার্বভৌম সেন রাজা কে ছিলেন?

বিজয় সেন।

৩. কৌলিন্য প্রথা চালু করেন কে?

বল্লাল সেন।

৪. সেন বংশের শেষ রাজা কে ছিলেন?

লক্ষ্মণ সেন।

Leave a Reply

Translate »