কবি জয়দেব

সংস্কৃত পন্ডিত কবি জয়দেব -এর জন্ম, পিতা-মাতা, জন্মস্থান বিতর্ক, শিক্ষা, গীতগোবিন্দ রচনা, গীতগোবিন্দ গান গাওয়া, গুরু নানকের উপর প্রভাব পূজা ও মেলা, রাধা বিনোদ মন্দির স্থাপন, পঞ্চরত্ন ও পৌরাণিক গল্প সম্পর্কে জানবো।

কবি জয়দেব

জন্ম বীরভূমের কেন্দুলি গ্রাম
পরিচিতি সংস্কৃত পণ্ডিত
কীর্তি গীতগোবিন্দ রচনা
সভাকবি রাজা লক্ষ্মণসেন
স্মৃতি মেলা জয়দেব মেলা
জয়দেব

ভূমিকা:- সংস্কৃত সাহিত্যের একজন মধ্যযুগীয় অন্যতম প্রসিদ্ধ কবি জয়দেব গোস্বামী। তিনি গীতগোবিন্দ কাব্যের রচয়িতা। সংস্কৃত কাব্য গীতগোবিন্দের অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর প্রভাব রয়েছে। ভক্তি বিজয়ের রচয়িতা সন্ত মহীপতির মতে জয়দেব হলেন বেদব্যাসের অবতার।

জন্ম

ভারত -এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূমের কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে কবি জয়দেবের জন্ম। তার নামে সেখানে প্রতি বছর মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কিছু মন্দির ও আশ্রম পরিবেষ্টিত এই গ্রামটি একটি ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

পিতামাতা

তার পিতার নাম ভোজদেব গোস্বামী ও মাতার নাম রামাদেবী। বাংলা, উড়িষ্যা ও দাক্ষিণাত্যর সংস্কৃৃতিতে জয়দেবের প্রভাব অনস্বীকার্য৷

জন্মস্থান বিতর্ক

  • (১) জয়দেবের জন্মের তারিখ ও স্থান অনিশ্চিত‌। গীতগোবিন্দ থেকে জানা যায় যে তিনি কেন্দুবিল্ব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। উড়িষ্যা, বাংলা এবং মিথিলার পণ্ডিতরা বিভিন্নভাবে এই স্থানটিকে তাদের নিজস্ব অঞ্চলের একটি বর্তমান গ্রামের সাথে চিহ্নিত করেছেন।
  • (২) এর মধ্যে রয়েছে ওডিশার পুরীর কাছে কেন্দুলি সাসান, বীরভূম জেলার জয়দেব কেন্দুলি। পশ্চিমবঙ্গে, এবং মিথিলার (বিহার) ঝাঁঝাড়পুরের কাছে কেন্দুলি গ্রাম। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখায় যে পণ্ডিতরা এখনও এই বিষয়ে একমত নন।
  • (৩) জয়দেব একজন পরিভ্রমণকারী, সম্ভবত কোনো এক সময়ে পুরীতে এসেছিলেন। ঐতিহ্য অনুসারে ওড়িশায় তিনি পদ্মাবতী নামে একজন নর্তকীকে বিয়ে করেছিলেন। যদিও এটি প্রাথমিক ভাষ্যকার এবং আধুনিক পণ্ডিতদের দ্বারা সমর্থিত নয়।

শিক্ষা

মন্দিরের শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, জয়দেব ওডিশার কোনার্কের কাছে চিহ্নিত কুর্মাপাটক নামক স্থান থেকে সংস্কৃত কাব্যে শিক্ষা লাভ করেন।

ওড়িয়ায় কবিতা প্রকাশ

প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় লেখা জয়দেবের কয়েকটি কবিতা ওডিয়া অধিদপ্তর দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে সংস্কৃতি, ওড়িশা। এগুলি রাধা-কৃষ্ণের রোমান্স বর্ণনা করে এবং গীতা গোবিন্দে ব্যবহৃত ধারণাগুলির সাথে খুব মিল রয়েছে।

গীতগোবিন্দ গান গাওয়া

  • (১) জয়দেবকে ওড়িশি সঙ্গীতের প্রথম দিকের সঙ্গীতজ্ঞদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি রাতে বাদাসিংহরা বা পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শেষ আচারের সময় ঐতিহ্যবাহী ওড়িশি রাগ ও তালে জয়দেবের গীতগোবিন্দ গাওয়া হয়।
  • (২) এই প্রথাটি জয়দেবের সময় থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে, যিনি নিজে মন্দিরে গান করতেন। কবির সময়ের পরে, খাঁটি ওড়িশি রাগ ও তাল অনুসারে গীতগোবিন্দ গাওয়াকে মন্দিরে বাধ্যতামূলক সেবা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। মহরি বা দেবদাসীরা এই গান করতেন।

গীতগোবিন্দ

জয়দেবের বিখ্যাত রচনা গীতগোবিন্দ। এটি একটি  সংস্কৃত গীতিকাব্য। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা এর মুখ্য বিষয়। ২৮৬টি শ্লোক এবং ২৪টি গীতের সমন্বয়ে ১২ সর্গে এটি রচিত। বর্ণিত বিষয়ের তত্ত্বনির্দেশক বারোটি ভিন্ন ভিন্ন নামে সর্গগুলির নামকরণ করা হয়েছে। যথা – সামোদ-দামোদর, অক্লেশ-কেশব, মুগ্ধ-মধুসূদন, স্নিগ্ধ-মধুসূদন, সাকাঙ্ক্ষ-পুণ্ডরীকাক্ষ, ধৃষ্ট-বৈকুণ্ঠ, নাগর-নারায়ণ, বিলক্ষ-লক্ষ্মীপতি, মুগ্ধ-মুকুন্দ, মুগ্ধ-মাধব, সানন্দ-গোবিন্দ এবং সুপ্রীত-পীতাম্বর। কাব্যের নায়ক ও নায়িকা রাধা ও কৃষ্ণ।

বৈষ্ণব পদাবলির সূচনা

বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির সূচনা জয়দেবের গীতগোবিন্দের পদাবলি থেকেই বলে ধারণা করা হয়।

গুরু নানকের উপর প্রভাব

জয়দেবের দুটি স্তোত্র, শিখ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গুরু গ্রন্থ সাহেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্তোত্রগুলি সংস্কৃত এবং পূর্ব অপভ্রংশের মিশ্রণে লেখা হয়েছে। পুরী সফরের সময় গুরু নানকের উপর জয়দেবের কাজ কীভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়।

পূজা ও মেলা

প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে এই স্থানে বাউল মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই গ্রামে জয়দেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাধামাধবের মূর্তির পুজো করা হয়ে থাকে এবং যে আসনে বসে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে মনে করা হয়, তা সংরক্ষণ করা রয়েছে। এই গ্রামের যুগলকিশোর মুখোপাধ্যায় বর্ধমান রাজদরবারের সভাকবি ছিলেন।

রাধা বিনোদ মন্দির স্থাপন

মনে করা হয়ে থাকে যে, জয়দেবের অনুরোধে বর্ধমানের মহারাণী ব্রজকিশোরী ১৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে এই গ্রামে জয়দেবের জন্মভিটেয় রাধাবিনোদ মন্দির স্থাপন করেন।

নির্বাক আশ্রম প্রতিষ্ঠা

১৮৬০-এর দশকে নির্বাক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের রাধারমণ ব্রজবাসী এই গ্রামে তাদের কুলগুরু জয়দেবের জন্মভিটেয় নির্বাক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রাধাবল্লভ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

পঞ্চরত্ন

জয়দেব ছিলেন সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণসেনের (১১৭৮-১২০৬) রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম একজন। অপর চারজন হলেন গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ী ও উমাপতি ধর।

পৌরাণিক গল্প

  • (১) লক্ষ্মণসেনের সভায় জয়দেবের আগমন নিয়ে এক পৌরাণিক গল্প আছে। একদিন লক্ষ্ণণসেনের সভায় একজন বিখ্যাত সঙ্গীতনিপুণ কলাবিদ এসে নিজেকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে জাহির করলেন। রাজা তার দাবি স্বীকার করে নিয়ে জয়পত্র লিখে দিতে চাইলেন।
  • (২) এই খবর পেয়ে জয়দেব পত্নী পদ্মাবতী রাজসভায় এসে অনুরোধ করলেন তার স্বামীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে যেন তাকে জয়পত্র না দেওয়া হয়। রাজসভায় জয়দেবকে নিয়ে যাওয়া হল।
  • (৩) তথাকথিত সঙ্গীতনিপুণ কলাবিদের গানে গাছের সব পাতা ঝরে গেল। সবাই সঙ্গীতনিপুণ কলাবিদকে ধন্য ধন্য করতে লাগল। জয়দেব বললেন এ আর এমন কী! গাছে আবার পাতা গজিয়ে দেখাও। সঙ্গীতনিপুণ কলাবিদ অপারগতা প্রকাশ করলেন। তখন জয়দেব গান ধরলেন, আর সাথে সাথে গাছের পাতা গজিয়ে উঠল। সকলে জয়দেবের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করল।

আনন্দমঠ উপন্যাসে উল্লেখ

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ সালে তার আনন্দমঠ উপন্যাসে জয়দেবের কেন্দুলি মেলার কথা উল্লেখ করেছেন।

উপসংহার:- বীরভূমের কেন্দুবিল্ব বা কেন্দুলি গ্ৰামে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে কবি জয়দেবের স্মৃতিতে জয়দেব উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা ‘জয়দেব মেলা’ নামে পরিচিত। এই মেলায় এখন বাউলদের সমাবেশ এবং বাউল আখড়াসমূহ বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

(FAQ) কবি জয়দেব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জয়দেব কোন রাজার সভাকবি ছিলেন?

সেন রাজা লক্ষ্মণসেন।

২. জয়দেবের লেখা গ্ৰন্থের নাম কি?

গীতগোবিন্দ।

৩. জয়দেব কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

বীরভূমের কেন্দুবিল্ব বা কেন্দুলি গ্ৰামে।

৪. জয়দেবের স্ত্রীর নাম কি?

পদ্মাবতী।

Leave a Reply

Translate »