জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার

রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার -এর সিংহাসনে আরোহণ, জারতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতা, লিপসনের মন্তব্য, জারের চরিত্র, দমননীতি প্রত্যাহার, জারের ঘোষণা, প্রাথমিক সংস্কার, নবযুগের সূচনা, ভূমিদাস প্রথার বিলোপ, স্বায়ত্তশাসন দানে উদ্যোগী, জেমোস্টভো আইন, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা সংস্কার, শিল্পায়ন, সংস্কারের ব্যর্থতা, জারের বিদেশ নীতি, নিহিলিস্ট আন্দোলন ও জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার

সময়কাল ১৮৫৫-১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরি জার প্রথম নিকোলাস
উত্তরসূরি জার তৃতীয় আলেকজান্ডার
উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিহিলিস্ট আন্দোলন
উল্লেখযোগ্য কীর্তি ভূমিদাস প্রথার বিলোপ
জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার

সূচনা:- ক্রিমিয়ার যুদ্ধ -এর শেষলগ্নে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে জার প্রথম নিকোলাসের মৃত্যু হলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন। এই সময় দমন-পীড়নের উপর প্রতিষ্ঠিত মধ্যযুগীয়, সামন্ততান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী জারের শাসনে স্বাধীনতার লেশমাত্র ছিল না।

ভিনোগ্রেডফের মন্তব্য

রাশিয়ার তৎকালীন অবস্থা প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ভিনোগ্রেডফ বলেন যে, “রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষ ছিল দাসপ্রথা ও অজ্ঞানতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয়, দেশে আদর্শবাদের অভাব ছিল এবং শাসনক্ষমতা ছিল বৃহৎ জমিদার শ্রেণির হাতে আবদ্ধ।”

জারতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতা

এতদিন ধরে জারের স্বৈরাচার, অকর্মণ্যতা এবং শ্বাসরোধকারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেনও উল্লেখযোগ্য প্রকাশ্য আন্দোলন হয় নি। এই অবস্থায় ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যর্থতা জারতন্ত্রের অন্তঃসারশূন্যতাকে সর্বসমক্ষে প্রকট তবে তোলে এবং জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে।

লিপসনের মন্তব্য

অধ্যাপক লিপসন বলেন যে, বিগত অর্ধশতক ধরে নেপোলিয়ন -এর ‘মহতী সেনাদলকে’ বিধ্বস্ত করার গৌরবগাথা রুশবাসীকে জারতন্ত্রের স্বৈরাচার মেনে নিতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু ক্রিমিয়ার ব্যর্থতা একধাক্কায় সেই রূপকথার রাজ্য থেকে জনমতকে সরিয়ে আনে।

সেটন-ওয়াটসনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক সেটন-ওয়াটসন বলেন যে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে রুশ রাষ্ট্রব্যবস্থার পচনশীল অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং নতুন জার সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে প্রয়াসী হন।

চরিত্র

দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ছিলেন দয়াপ্রবণ, কর্তব্যনিষ্ঠ, জনকল্যাণকামী ও বাস্তববাদী শাসক। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন। স্বৈরতন্ত্রের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। পিতা নিকোলাসের মতো সামরিক শক্তি তাঁর ছিল না, বা তিনি প্রথম আলেকজান্ডার -এর মতো অবাস্তববাদী এবং ভাবপ্রবণও ছিলেন না। গনতন্ত্র ও উদারনীতিকে তিনি ঘৃণা করতেন। তা সত্ত্বেও প্রয়োজনে তিনি গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক সংস্কার প্রবর্তনে পশ্চাৎপদ হতেন না।

দমননীতি প্রত্যাহার

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে রাশিয়ায় যে সংকট ও গণ-বিক্ষোভ দেখা দেয়, তা প্রশমনের জন্য তিনি বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্টই উপলব্ধি করেন যে, ইউরোপ ও রাশিয়ায় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। পুরোনো ব্যবস্থাকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যুগ-প্রয়োজনে নতুন সংস্কার অবশ্যম্ভাবী। পিটার দি গ্রেট ছাড়া অন্য কোনও জার তাঁর মতো এত ব্যাপক সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করেন নি।

জারের ঘোষণা

প্যারিসের সন্ধি (১৮৫৬ খ্রিঃ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই তিনি ঘোষণা করেন যে, “অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাদির উন্নতি সাধন করা হবে, বিচারালয়ে ন্যায়বিচার ও ক্ষমা প্রদর্শিত হবে এবং শিক্ষার বিস্তার করা হবে।”

প্রাথমিক সংস্কার

তিনি রাশিয়ার আভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেমন –

  • (১) নির্বাসিত ডেকাব্রিস্ট বিদ্রোহীদের মধ্যে তখনও যারা জীবিত ছিল, দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর তিনি তাদের দেশে ফিরিয়ে আনেন।
  • (২) পিতার আমলে প্রবর্তিত ‘থার্ড সেকশন’ নামক গুপ্ত পলিশ বাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়।
  • (৩) বোর্ড অব সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণ পরিষদ উঠিয়ে দেওয়া হয়।
  • (৪) সংবাদপত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়।
  • (৫) বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হয়।
  • (৬) বিদেশ ভ্রমণের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়।

নবযুগের সূচনা

এইভাবে রাশিয়াতে এক নব যুগের সূচনা হয়। বিখ্যাত নৈরাজ্যবাদী দার্শনিক ক্রপটকিন লিখছেন যে, এইভাবে রাশিয়া যেন “গভীর সুষুপ্তি ও ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠল।” লিপসন বলেন যে, “পূর্বতন শাসনের কঠোর শৈত্যপ্রবাহ থেকে বর্তমান শাসনের উদারতা বসন্তের আগমনবার্তা বয়ে এনেছিল।”

ভূমিদাস প্রথার বিলোপ

দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল ভূমিদাস প্রথার অবসান। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার এক ঘোষণা দ্বারা ভূমিদাসদের মুক্তি ঘোষণা করেন। ফলে রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ ঘটে।

স্বায়ত্তশাসন দানে উদ্যোগী

দ্বিতীয় আলেকজান্ডার জারতন্ত্রকে রাশিয়ার ঐক্যের প্রতীক বলে মনে করতেন। তিনি মনে করতেন যে, জারতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে রাশিয়ার ঐক্য বিনষ্ট হবে। তাই তিনি জারতন্ত্রের ক্ষমতা খর্ব না করে জনসাধারণকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দানে উদ্যোগী হন।

জেমস্টভো আইন

জনসাধারণকে কিছুটা স্বায়ত্তসন দানের উদ্দেশ্যে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে জেমস্টভো আইন বিধিবদ্ধ হয়। এই আইন দ্বারা,

  • (১) তিনি অভিজাত ও কৃষকদের জন্য স্বতন্ত্র সভার বিলোপ ঘটিয়ে একই সভায় সব শ্রেণির সদস্য গ্রহণের নিয়ম চালু করেন।
  • (২) সর্বসাধারণের ভোটে জেলা পরিষদ বা ভোলোস্টের সদস্যদের নির্বাচিত করার নিয়ম প্রবর্তিত হয়। সর্বসাধারণ বলতে তিন শ্রেণির সদস্যদের কথা বলা হয় – (ক) নগরবাসী, (খ) জমির ব্যক্তিগত মালিকানা যুক্ত কৃষক এবং (গ) গ্রামীণ কমিউন। এইভাবে গঠিত হত ভোলোস্ট।
  • (৩) ভোলোস্ট বা জেলা পরিষদের ভোটে প্রাদেশিক সভা বা ‘জেমস্টভো’ নির্বাচিত হত। এইভাবে সমগ্র রাশিয়ায় ৩৬০টি জেলা পরিষদ এবং ৩৪টি প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদগুলির হাতে রাস্তাঘাট নির্মাণ, সেতু সংরক্ষণ, প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ, কৃষির উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় কর নির্ণয় প্রভৃতির দায়িত্ব অর্পিত ছিল।
  • (৪) স্থির ছিল বছরে অন্তত একবার এই সমিতিগুলির অধিবেশন বসবে। প্রাদেশিক পরিষদে বাজেট ও নীতি নির্ধারিত হত। সেই নীতি অনুসারে জেলাস্তরে কাজকর্ম চলত। বলা বাহুল্য, এই সমিতিগুলিকে নানা অসুবিধার মধ্যে কাজ করতে হত।
  • (৫) প্রাদেশিক সমিতিগুলির হাতে কর আদায়ের কোনও ক্ষমতা না থাকায় ব্যয়নির্বাহের জন্য তারা কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী ছিল। অর্থের অপ্রতুলতার জন্য তারা সঠিকভাবে কাজ করতে পারত না। সরকারি আমলারা জেলা ও প্রাদেশিক সমিতিগুলির কাজে হস্তক্ষেপ করে নানা অসুবিধার সৃষ্টি করত।
  • (৬) প্রাদেশিক গভর্নররা এই সমিতিগুলির সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারত। তাছাড়া এই সমিতিগুলিতে ধনী কৃষক ও বিত্তশালী অভিজাত শ্রেণিরই প্রাধান্য ছিল। সুতরাং সাধারণ মানুষ অপেক্ষা বিত্তবানদের স্বার্থই সেখানে রক্ষিত হত।
  • (৭) জেলাস্তরের নীচে স্বায়ত্তশাসনের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে গ্রামগুলির প্রয়োজন বুঝে কাজ করা সম্ভব হত না। রাশিয়ার উদারনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা চাইছিলেন পশ্চিম ইউরোপের মতো নির্বাচিত কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও দায়িত্বশীল মন্ত্রিসভা। এর পরিবর্তে জার প্রদেশ স্তরে স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করেন, যা বুদ্ধিজীবীদের খুশি করে নি।
  • (৮) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে অপর একটি আইন পাস করে শহরের করদাতাদের ভোটে শহরে পুরসভা বা মিউনিসিপ্যালিটি গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। পুরসভার হাতে শহরের রাস্তাঘাট, জনস্বাস্থ্য, জল-সরবরাহ প্রভৃতির দায়িত্বভার অর্পিত হয়।
  • (৯) রুশ বুদ্ধিজীবীরা এইসব সংস্কারে সন্তুষ্ট না হলেও বলা যায় যে, দ্বিতীয় আলেকজান্ডার এইভাবে রাশিয়ায় দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

বিচারব্যবস্থা

  • (১) বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য সংস্কার প্রবর্তন করেন। আগে বিচারব্যবস্থা ছিল পক্ষপাতদুষ্ট ও জনস্বার্থ-বিরোধী। বিচারব্যবস্থাকে পশ্চিমী আদর্শে ঢেলে সাজাবার উদ্দেশ্যে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে নতুন আইন প্রবর্তিত হয়। এই আইন অনুসারে দেশে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়।
  • (২) বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়। সারা দেশে একই ধরনের বিচারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন সংশোধিত হয় এবং জুরি প্রথা, প্রকাশ্য বিচার, আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দান, মৃত্যুদণ্ড রদ প্রভৃতির ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৩) বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ আপিল আদালত ছিল সিনেট। এর নীচের স্তরে ছিল কেন্দ্র, প্রাদেশিক ও জেলাস্তর। বিচারকরা যাতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারেন, সেজন্য বিচারকদের সম্মানজনক বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৪) ছোটোখাটো বিচার পরিচালনার জন্য ‘জাস্টিস অব পিস’ নামে অবৈতনিক বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়। এর ফলে বিচারব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়। তবে এ কথা ঠিকই যে, যথেষ্ট সংখ্যক আইনজ্ঞের অভাবে বিচারব্যবস্থা যথেষ্ট সফল হয় নি।

শিক্ষাসংস্কার

  • (১) তিনি শিক্ষাসংস্কারেও উদ্যোগী হন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে সচেষ্ট হন এবং সারা দেশে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয়গুলির দায়িত্ব ছিল জেমস্টভো-গুলির উপর।
  • (২) তিনি মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্যও উন্মুক্ত করে দেন। শিক্ষামন্ত্রী দিমিত্রি তলস্তয় মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যসূচি সংশোধন করেন। ছাত্রীদের জন্য পৃথক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৩) মাধ্যমিক স্তরে তিনি গ্রিক ভাষা ও গণিত শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। বিজ্ঞান শিক্ষায় তাঁর কোনও আগ্রহ ছিল না। আধুনিক বিষয়ে জ্ঞানলাভকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর আমলে আটটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয়। পঠন-পাঠন সম্পর্কে অধ্যাপকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
  • (৪) উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাত্রা ও বিদেশি পুস্তক-পুস্তিকার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তিদানের ব্যবস্থা করা হয়। শতকরা ১৩.৮% শিশু বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুযোগ পায় এবং ৩.৫% বালিকা স্বাক্ষরতা লাভ করে। যাই হোক, তাঁর শিক্ষানীতির ফলে রাশিয়ায় শিক্ষার প্রসার ঘটে।

শিল্পায়ন

  • (১) শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজত্বকাল স্মরণীয়। ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদের ফলে গ্রাম থেকে বহু কৃষক শহরে এসে শিল্প-শ্রমিকে পরিণত হয়। এই সময় রেলপথের সম্প্রসারণ ঘটে। ১৮৬১ থেকে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নতুন ২০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ স্থাপিত হয়।
  • (২) ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রেলশিল্পকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর আমলে বস্ত্র, কয়লা ও খনিজ শিল্পের প্রসার ঘটে। শিল্পায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বিদেশি মূলধনেরও অনুপ্রবেশ হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যও বৃদ্ধি পায়।

সামরিক শক্তি

সামরিক ও নৌবিভাগেও তিনি নানা সংস্কার প্রবর্তন করেন। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে সামরিক বিভাগে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়। তিনি বেশ কিছু সামরিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্যান্য দিক

তিনি কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপন, রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিয়মিত রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসেব অর্থাৎ বাজেট তৈরির ব্যবস্থা করেন।

ব্যর্থতা

দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সংস্কারগুলি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। আসলে তিনি মনে-প্রাণে সংস্কারক ছিলেন না, প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি নিজেকে বিবিধ সংস্কারকার্যে নিয়োগ করেছিলেন। এই ব্যর্থতার বিভিন্ন কারণ গুলি হল –

  • (১) তার সংস্কারগুলি বাস্তবায়িত করার মতো যোগ্য কর্মচারী ছিল না। অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী ছিল অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত।
  • (২) তাঁর শাসনকালের সূচনা পর্বে এইসব সংস্কার প্রবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু কালক্রমে মাত্র দশ বছরের মধ্যেই তিনি প্রতিক্রিয়াশীলতার পথ অবলম্বনে বাধ্য হন।
  • (৩) তাঁর ভূমিদাস প্রথা বিলোপ ভূমিদাসদের খুশি করতে পারে নি। তারা ক্রমান্বয়ে বিদ্রোহ করতে থাকে।
  • (৪) পোল্যান্ডবাসী তাদের সীমাবদ্ধ স্বায়ত্তশাসনে সন্তুষ্ট ছিল না তাদের লক্ষ্য ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা।
  • (৫) সন্ত্রাসবাদী নিহিলিস্টরা তাঁকে হত্যার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এইসব কারণে বিরক্ত দ্বিতীয় আলেকজান্ডার প্রতিক্রিয়াশীলতার পথ ধরেন। এইভাবে তাঁর সংস্কারগুলি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

বিদেশ নীতি

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের বিদেশ নীতি তার অভ্যন্তরীন নীতির মতো চমকপ্রদ ছিল না ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি রাশিয়ার লুপ্ত গৌরব বহুলাংশে পুনরুদ্ধার করেন।

নিহিলিস্ট আন্দোলন

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের স্বৈরাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের বিরুদ্ধে রাশিয়াতে নিহিলিস্ট আন্দোলন শুরু হয়।

মৃত্যু

১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ সেন্ট পিটার্সবার্গে নিহিলিস্ট বিপ্লবীদের ছোড়া বোমায় জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু ঘটে।

উপসংহার:- জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারের ভূমিদাস প্রথার বিলোপ রাশিয়ায় সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সূচনা করে। এর ফলে রাশিয়ায় পুঁজিবাদের সূচনা হয়, শিল্পায়ন গতি পায় এবং শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে, যা ইতিহাসের নিয়ামকে পরিণত হয়। তাঁর শিক্ষা-সংস্কারের ফলে রাশিয়ায় শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায় এবং আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। এক কথায়, তাঁর শাসনকালে রাশিয়ার ইতিহাসে এক পরিবর্তনের সূচনা হয়।

(FAQ) জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মুক্তিদাতা জার কাকে বলা হয়?

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

২. কে কবে রাশিয়ার ভূমিদাস প্রথার বিলোপ সাধন করেন?

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে।

৩. কোন জারের আমলে নিহিলিস্ট আন্দোলন সংঘটিত হয়?

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

Leave a Reply

Translate »