নিহিলিস্ট আন্দোলন

জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারের সময়কালে রাশিয়ায় সংঘটিত নিহিলিস্ট আন্দোলন প্রসঙ্গে নামকরণ, নিহিলিস্ট মতাদর্শের মূর্ত প্রতীক, নিহিলিস্ট মতাদর্শ, সর্বাত্মক ধ্বংস, আন্দোলনের প্রথম পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায়, তৃতীয় পর্যায়, আন্দোলনের সমর্থক, নেতাদের উপলব্ধি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ, নারোদনিক আন্দোলন, প্রচার অভিযান, সন্ত্রাসবাদ দমন নীতি, আন্দোলনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা সম্পর্কে জানবো।

নিহিলিস্ট আন্দোলন

সময়কাল১৮৬২-১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ
স্থানরাশিয়া
রাজাদ্বিতীয় আলেকজান্ডার
ফলাফলব্যর্থতা
নিহিলিস্ট আন্দোলন

ভূমিকা:- জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের স্বৈরাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের বিরুদ্ধে রাশিয়াতে নিহিলিজম’ (Nihilism) বা নৈরাজ্যবাদ’ নামে এক জনপ্রিয় আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু গুপ্ত সমিতি স্থাপিত হয়।

নিহিলিস্ট নামকরণ

বিশিষ্ট রুশ সাহিত্যিক তুর্গেনেভ (Turgenev) তাঁর লেখা ‘Fathers and Sons’ (১৮৬২ খ্রিঃ) উপন্যাসে সর্বপ্রথম বিপ্লবীদের ‘নিহিলিস্ট’ নামে অভিহিত করেন।

নিহিলিস্ট মতাদর্শের মূর্ত প্রতীক

তুর্গেনেভের উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাজারভ-কে নিহিলিস্ট মতাদর্শের মূর্ত প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, এবং তার মুখ দিয়েই নিহিলিস্ট মতবাদের আদর্শ ও লক্ষ্য প্রকাশ করা হয়।

নিহিলিস্ট মতাদর্শ

তুর্গেনেভের মতে নিহিলিস্ট কখনও কোনও কর্তৃত্বের কাছে মাথা নত করে না, কোনও আদর্শকে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে না এবং শিল্প, সংসদীয় ব্যবস্থা ও জুরিপ্রথার উপর সে প্রবল বীতশ্রদ্ধ হয়।

সর্বাত্মক ধ্বংস

উপন্যাসের নায়ক বাজারভের মুখ দিয়ে রাশিয়ায় প্রচলিত সর্বপ্রকার সামাজিক ও পারিবারিক সংগঠনের সর্বাত্মক ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে।

আন্দোলনের পর্যায়

নিহিলিস্ট আন্দোলন তিনটি পর্যায়ে পরিচালিত হয়। যথা –

(ক) প্রথম পর্যায়

প্রথম পর্যায়ের সময়-সীমা ছিল ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই পর্যায়ের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) এই পর্বের আন্দোলন ছিল দার্শনিক তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মূল সুর ছিল ‘বুদ্ধিবৃত্তির মুক্তি’। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন মানুষ তৈরি করা যারা কর্তৃত্বের কাছে মাথা নত করবে না। এই মতবাদের মূল কথা হল নিরঙ্কুশ ব্যক্তিত্ববাদ।
  • (২) তারা প্রচলিত রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, পরিবার – সব কিছুকে অস্বীকার করার আহ্বান জানায়। তাদের লক্ষ্য ছিল পুরাতনতন্ত্রের ধ্বংসসাধন। তারা মনে করত যে, এই ধ্বংসের মধ্য দিয়েই নতুনের জন্ম হবে।
  • (৩) তারা ছিল চরম বস্তুবাদী। তারা মনে করত যে, একজন চর্মকার বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী রাফায়েল-এর তুলনায় অনেক বড়ো, কারণ একজন চর্মকার জুতো তৈরি করে সমাজের যে উপকার করে, একজন শিল্পী তা করে না।

(খ) দ্বিতীয় পর্যায়

এর দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয় ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে। এই সময় এই আন্দোলন দার্শনিক তত্ত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিপ্লবী ও জঙ্গি আন্দোলনে পরিণত হয়। এই পর্যায়ের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিহিলিস্টরা জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যার চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হয় এবং রুশ সরকার বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। রাশিয়ায় ‘শ্বেত সন্ত্রাস’ (‘White Terror”) শুরু হয়।
  • (২) প্রশাসনের এই সন্ত্রাস নিহিলিস্টদের জঙ্গি বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে আরও আকৃষ্ট করে। এছাড়া ছিল বিদেশি প্রভাব।
  • (৩) ‘প্যারিস কমিউনের’ ঘটনা রাশিয়ার শিক্ষিত মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
  • (৪) এছাড়া জুরিখে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল’ (‘International’) নামক সমাজবাদী সংস্থার প্রভাবও ছিল ব্যাপক। রাশিয়ার বহু মানুষ এই সমাজবাদী সংস্থায় যোগ দেয় এবং রাশিয়ায় ফিরে গিয়ে তারা সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির কথা প্রচার করতে থাকে। এই প্রচারের ফল ছিল ব্যাপক।
  • (৫) এই সময় নিহিলিস্টদের মধ্যে দুটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের উদ্ভব হয় – সমাজতন্ত্রবাদ (Socialism) এবং নৈরাজ্যবাদ (Anarchism)। সমাজতন্ত্রবাদের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন ল্যাভরফ (Lavroff)। তিনি কৃষকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ প্রচার চালিয়ে তাদের সচেতন করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতেন— জাতীয়তাবাদ নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। ম্যাৎসিনির অনুগামীদের মতো তারা গ্রামাঞ্চলে ‘মানুষের মধ্যে গিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতেন।
  • (৬) নৈরাজ্যবাদীদের নেতা ছিলেন মিখায়েল বাকুনিন (Mikhail Bakunin)। তাঁকে বলা হত ‘বিপ্লবের প্রতিভা’ (‘genius of revolution)। তাঁর লক্ষ্য ছিল ধ্বংসাত্মক। তিনি কৃষকদের ধ্বংসাত্মক বিপ্লবের জন্য আহ্বান জানান। তাঁর আদর্শ ছিল ধর্ম, সম্পত্তি, পরিবার এবং সর্বপ্রকার বন্ধন ও মোহ থেকে মুক্তি।
  • (৭) ১৮৭১ – ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমাজবাদী আন্দোলন খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শহরের মজুর ও গ্রামের কৃষকদের মধ্যে জোর প্রচার চলে। সরকার কঠোর দমননীতি অবলম্বন করে এবং এই সময় প্রায় দেড় লক্ষ সমাজতন্ত্রীকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়।

(গ) তৃতীয় পর্যায়

আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

  • (১) প্রকাশ্য আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গেলে নিহিলিস্ট আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী রূপ ধারণ করে। তাদের লক্ষ্য হয় ‘হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা’, ‘শক্তির বিরুদ্ধে শক্তি’। ১৮৭৬-১৮৭৮ কালপর্বে রাশিয়ায় বহু বিক্ষোভ, মিছিল ও পথে-ঘাটে সশস্ত্র সংঘর্ষ সংঘটিত হতে থাকে।
  • (২) বিপ্লবীদের প্রয়াস ব্যর্থ হয় এবং এইসব ব্যর্থতার ফলে তাদের মনে এই ধারণাই দৃঢ় হয় যে, প্যারিসের বিপ্লবের ধাঁচে রাশিয়ায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। এই সময় সরকারি দমননীতিও কঠোর রূপ ধারণ করে।
  • (৩) নানাভাবে বিপ্লবীদের দমন করা হতে থাকে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে আটক চলতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জেলা পরিষদ (জেমস্টভো) ও জেলা আদালতগুলির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কঠোরতর করা হয়।
  • (৪) রাশিয়াতে মিল, স্পেনসার, লেকি প্রমুখের রচনাবলীর প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়। প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় নিহিলিস্টরা সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসবাদীতে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি গঠন করে গোপন হত্যার পথ ধরে। রাশিয়ার
  • (৫) অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। তাদের লক্ষ্য ছিল স্বৈরতন্ত্রের অবসান, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার। ১৮৭৯ এবং ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে পরপর সাতবার জারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। অবশেষে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চ সেন্ট পিটার্সবার্গে বিপ্লবীদের ছোঁড়া বোমায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।

সমর্থক

জারের হত্যাকান্ডের পূর্ব পর্যন্ত নিহিলিস্টদের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল। তাদের কর্মপদ্ধতিকে সমর্থন না করলেও তাদের মতাদর্শের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন ছিল।

নেতাদের উপলব্ধি

‘মুক্তিদাতা জারের হত্যাকাণ্ড রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষই সমর্থন করতে পারে নি। এর প্রতিক্রিয়াও ছিল ভয়াবহ। বহু নিহিলিস্টকে হত্যা করা হয়। নেতারাও উপলব্ধি করেন যে, গুপ্তহত্যার মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রকে ধ্বংস করা যায় না বা দেশের সমস্যার সমাধান হয় না।

ব্যর্থতার কারণ

লিপসন বলেন যে, এই আন্দোলন ব্যর্থ হয় কারণ এই আন্দোলনে একমাত্র নেতারাই ছিলেন, তাদের অনুগামী ছিল না এবং এই আন্দোলনের কোনও গণভিত্তি ছিল না।

নারোদনিক আন্দোলন

নিহিলিস্ট আন্দোলন কেবলমাত্র দার্শনিক মতবাদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল গণ-সংযোগ, জনগণের কাছে যাওয়া। তখন এর নাম হয় ‘নারোদনিক আন্দোলন’ বা ‘জনতাবাদী আন্দোলন’। রুশ ভাষায় ‘নারোদ’ কথার অর্থ হল জনগণ। এভাবেই এর এই নামকরণ হয়।

প্রচার অভিযান

  • (১) কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী ভাবধারা প্রচার করে তাদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা দলে দলে গ্রামে কৃষকদের কাছে যাত্রা শুরু করল। জনগণের কাছে যাওয়ার এই নীতি থেকেই তাদের নামকরণ হল পপুলিস্ট বা নারোদনিক আন্দোলন।
  • (২) তাদের মধ্যে ধর্মপ্রচারকের মতো নিষ্ঠা ছিল ঠিকই, কিন্তু কৃষকদের মনে শ্রেণি-সচেতনতা ছিল না, ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের গুরুত্ব তারা বুঝত না। সমাজবাদী আদর্শ সম্পর্কে তাদের কোনও ধারণা ছিল না। এর ফলে আন্দোলনকারীদের উৎসাহ ও উদ্যম ব্যর্থ হয়।

সন্ত্রাসবাদ

ক্রমে তারা প্রচারাভিযানের পথ ছেড়ে সন্ত্রাসের পথ ধরে এবং এই আন্দোলন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়।

দমননীতি

সরকারি দমননীতি কঠোরতর রূপ ধারণ করে, বিশেষত জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর। এই দমননীতির পরিপ্রেক্ষিতে ‘নারোদনায়া-ভল্যা’ বা ‘জনগণের ইচ্ছা নামক গুপ্ত সমিতি জারের কাছে নির্যাতনমূলক বিধি-ব্যবস্থা প্রত্যাহার ও গণপরিষদ আহ্বানের আবেদন জানায় এবং এর বিনিময়ে সর্বপ্রকার সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আন্দোলনের ব্যর্থতা

জার তৃতীয় আলেকজান্ডার এই আবেদনে সাড়া না দিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকেন। বহু নারোদনিককে কঠোর দণ্ড দেওয়া হয়। লেনিনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আলেকজান্ডার উলিয়ানভ প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

উপসংহার:- ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই আন্দোলনের গুরুত্বকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না। আন্দোলন এই সত্যই প্রমাণ করে যে, বিপ্লবীদের প্রভূত ত্যাগ ও প্রবল নিষ্ঠা সত্ত্বেও কেবলমাত্র ব্যক্তিহত্যা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনও আন্দোলন সফল হতে পারে না। এইজন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব এবং জনগণকে আন্দোলনে সামিল করার মতো গঠনমূলক কর্মসূচি। এই শিক্ষা রুশ বিপ্লবীদের ভবিষ্যতের দিশা নির্ধারণে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।

(FAQ) নিহিলিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. নিহিলিস্ট আন্দোলন কোথায় সংঘটিত হয়?

রাশিয়ায়।

২. নিহিলিস্ট আন্দোলনের সময় রাশিয়ার জার কে ছিলেন?

দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

৩. নিহিলিস্ট আন্দোলন অন্য কি নামে পরিচিত?

নারোদনিক আন্দোলন।

Leave a Reply

Translate »