রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ

রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ প্রসঙ্গে রাশিয়ার ভূমিদাস, ভূমিদাসদের মুক্তি ঘোষণা, ভূমিদাস প্রথার অপ্রয়োজনীয়তা, ক্রমিক কৃষক বিদ্রোহ, হ্যাজেনের মন্তব্য, বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন, জারের উদ্দেশ্য, জারের ঘোষণা, মুক্তির ঘোষণাপত্র, মুক্তিদাতা জার, চারটি মৌলিক নীতি, মুক্তির আইনে ঘোষিত ব্যবস্থাসমূহ, ভূমিদাসদের মুক্তির সুফল ও কুফল সম্পর্কে জানবো।

রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ

সময়কাল ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ
বিলোপ ঘটান জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার
মুক্তিদাতা জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার
ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ
রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ

ভূমিকা:- দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংস্কার হল ভূমিদাস প্রথার অবসান। ভূমিদাস প্রথা ছিল রাশিয়ার একটি বহু প্রাচীন প্রথা এবং রুশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি বা মেরুদণ্ড।

রাশিয়ার ভূমিদাস

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় ভূমিদাসদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি। এর মধ্যে ২ কোটির কিছু কম ভূমিদাস ছিল জারের অধীন, ২ কোটির কিছু বেশি ছিল অভিজাতদের অধীন এবং অবশিষ্ট অর্ধ-কোটি ছিল গির্জার অধীন বা গৃহভৃত্য। এইসব ভূমিদাসদের অবস্থা ছিল অতি শোচনীয়।

ভূমিদাসদের মুক্তি ঘোষণা

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার এক ঘোষণা দ্বারা ভূমিদাসদের মুক্তি ঘোষণা করেন।

ভূমিদাস প্রথার অপ্রয়োজনীয়তা

ভূমিদাসদের মুক্তি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। উনিশ শতকের সূচনা থেকে রাশিয়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এমন কিছু নতুন প্রবণতার উন্মেষ ঘটছিল, যার ফলে ভূমিদাস প্রথার অপ্রয়োজনীয়তা সর্বসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন –

(১) শিল্পায়ন

উনিশ শতকের সূচনা থেকে রাশিয়ায় শিল্পায়ন ঘটতে থাকে এবং দেশের নানা অংশে কলকারখানা ও রেলপথ নির্মাণ শুরু হয়। বিকাশশীল শিল্পের জন্য দক্ষ ও স্বাধীন শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। জমির সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক ভূমিদাসের পক্ষে জমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কলকারখানায় যোগ দেওয়া সম্ভব ছিল না।

(২) স্বাধীন শ্রমিক

কলকারখানায় শ্রমিক হিসেবে ভূমিদাসদের নিয়োগ করা হলেও শ্রমিক হিসেবে তারা ছিল অনুপযুক্ত ও অলাভজনক। শিল্প-শ্রমিকের দক্ষতা তাদের ছিল না। তাই কলকারখানার মালিকরাও চাইছিল ভূমিদাসের পরিবর্তে স্বাধীন শ্রমিক নিয়োগ করতে।

(৩) বাণিজ্য

শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্বাণিজ্য গড়ে ওঠে। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ভূমিদাসরা জমিদারদের কাছে বাঁধা থাকায় তাদের পক্ষে শিল্প-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। এইভাবে ভূমিদাস প্রথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে একটি বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে দেশের উদীয়মান বণিক ও শিল্পপতিরা এই কুপ্রথা উচ্ছেদের পক্ষে মতামত প্রকাশ করতে থাকে।

(৪) কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি

ইতিমধ্যে কৃষিক্ষেত্রেও নানা উন্নততর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রচলন হওয়ায় জমির সঙ্গে যুক্ত ভূমিদাসরা অচল ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। যুগ যুগ ধরে জমিদারের অত্যাচারে ভূমিদাসরা মুমূর্ষু, অকর্মণ্য ও উদ্যমহীন হয়ে পড়েছিল। তাদের দ্বারা বিশেষ কোনও কাজ হচ্ছিল না।

(৫) ভাড়াটিয়া মজুর

স্বাধীন ভাড়াটিয়া মজুরদের দিয়ে কৃষিক্ষেত্রে অনেক বেশি উৎপাদন হচ্ছিল। দক্ষিণ রাশিয়ায় খেতমালিকরা দেখেছিল যে, ভূমিদাস দিয়ে চাষ করালে উৎপন্ন শস্যের দাম বেশি পড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপন্ন শস্য বিক্রি করে তেমন লাভ হয় না বরং ভাড়াটে শ্রমিক দিয়ে অল্প খরচে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন হয়। এর ফলে ভূমিদাসরা জমিদারদের কাছে বোঝা হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অধিক উৎপাদনের তাগিদে ভূমিদাস প্রথার অবসান অপরিহার্য হরে পড়ে।

(৬) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ -এ (১৮৫৪-১৮৫৬ খ্রিঃ) রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয় ভূমিদাস প্রথা অবসানের একটি বড়ো কারণ। এই যুদ্ধে পরাজয় ভূমিদাস প্রথার অপ্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। মূলত ভূমিদাসদের দিয়েই রুশ সেনাদল গঠিত হত। ভূমিদাসরা ছিল উদ্যমহীন, জয়-পরাজয় সম্পর্কে উদাসীন, শারীরিক দিক থেকে দুর্বল এবং আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারে অক্ষম। এই ধরনের সেনাদলের সাহায্যে যে যুদ্ধজয় সম্ভব নয়, তা জারেরা সম্যক উপলব্ধি করেন।

ক্রমিক কৃষক বিদ্রোহ

  • (১) স্বৈরাচারী জার-শাসনাধীন রাশিয়ায় নির্যাতিত ভূমিদাসদের ঘন ঘন বিদ্রোহ জার সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। জার প্রথম নিকোলাসের (১৮২৫-১৮৫৫ খ্রিঃ) প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের বিরুদ্ধে রুশ জাতীয়তাবাদীরা একাধিক গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলে।
  • (২) ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর গুপ্ত সমিতির সদস্যরা এক বিদ্রোহ সংঘটিত করে। ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয় বলে এই বিদ্রোহ ডিসেমব্রিস্ট বা ডেকাব্রিস্ট বিদ্রোহ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহীরা ছিল ইউরোপ -এর উদারনৈতিক ভাবধারায় অনুপ্রাণিত অভিজাত ও জমিদার সম্প্রদায়ভুক্ত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জারের স্বৈরতন্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে পরিণত করা এবং ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ।
  • (৩) কেবল এই নয় জার প্রথম নিকোলাস -এর রাজত্বকালের শেষ দশ বছরে (১৮৪৫-১৮৫৫ খ্রিঃ) অন্তত চারশোটি কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং তাঁর রাজত্বকালের কুড়ি বছরের (১৮৩৫-১৮৫৫ খ্রিঃ) মধ্যে অন্তত ২৩০ জন ভূস্বামী বা তাদের কর্মচারী ভূমিদাসদের হাতে নিহত হয়।
  • (৪) পরবর্তী জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বের প্রথম ছয় বছরে (১৮৫৫-১৮৬০ খ্রিঃ) অন্তত চারশোটি কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বিদ্রোহের সংখ্যা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য থাকলেও, এইসব বিদ্রোহগুলি দেশে এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
  • (৫) লেনিন এই কারণেই ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পরবর্তীকালীন পরিস্থিতিকে ‘বিপ্লবী পরিস্থিতি’ বলে অভিহিত করেছেন। বলা বাহুল্য, এইসব কৃষক বিদ্রোহই ভূমিদাসদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে অনিবার্য করে তোলে।

হ্যাজেনের মন্তব্য

ঐতিহাসিক হ্যাজেন বলেন যে, রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা অবসানের পশ্চাতে কৃষক-অভ্যুত্থানের ভীতি বহুলাংশে কার্যকর ছিল।

বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন

  • (১) ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদে রুশ বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ ও সাংবাদিকদের ভূমিকাও কম নয়। জার শাসনের তীব্র ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে রুশ বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
  • (২) বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই কু-প্রথার অবসানের দাবি উঠতে থাকে। পুশকিন ও লারমন্টভ-এর কবিতা, টলস্টয় ও তুর্গেনিভ-এর উপন্যাস, গোগোল-এর গল্প এবং মিনকা-র সঙ্গীতে এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে হার্জেন ও চার্নিশেভস্কি-র রচনাও উল্লেখের দাবি রাখে।

জারের উদ্দেশ্য

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সব দিক বিবেচনা করে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ভূমিদাস প্রথা বিলোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। জারের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। যেমন –

  • (১) পেক্রোভিক গাসেভ, নাউমোভ প্রমুখ রুশ ঐতিহাসিক বলেন যে, রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা আর লাভজনক ছিল না। এইজন্য জারতন্ত্রের সমর্থক অভিজাত সম্প্রদায়ের স্বার্থে এই প্রথা উচ্ছেদ করে তাদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়া হয়।
  • (২) বলা বাহুল্য, এই মত সর্বসম্মত নয়। এই প্রথা উচ্ছেদের ফলে জমিদার শ্রেণি, বিশেষত রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের জমিদাররা যথার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তর রাশিয়ার জমি ছিল অনুর্বর। এই কারণে এই অঞ্চলে ভূমিদাসদের কারখানার কাজে লাগানো হত এবং এজন্য তাদের কোনও বেতন দিতে হত না।
  • (৩) ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদের ফলে এই অঞ্চলের জমিদাররা বিনা বেতনের শ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয়।

জারের ঘোষণা

  • (১) দ্বিতীয় আলেকজান্ডার উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই প্রথা যুগের অনুপযোগী এবং তা উচ্ছেদ করা একান্ত প্রয়োজন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মস্কোয় অনুষ্ঠিত অভিজাতদের এক সভায় তিনি বলেন, “নিচুতলা থেকে কবে দাসত্ব বিলোপের প্রচেষ্টা শুরু হবে তার জন্য অপেক্ষা না করে উপরতলা থেকে তা বিলোপ করাই শ্রেয়”।
  • (২) তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, কৃষকদের চাপে পড়ে ভূমিদাস প্রথা বাতিল করা অপেক্ষা সরকারি উদ্যোগে এই প্রথা উচ্ছেদ করাই ভালো। এই ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা ও নীতি-নির্ধারণের জন্য ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি কমিশন গঠন করেন।
  • (৩) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ডিসেম্বর এক নির্দেশনামায় তিনি লিথুয়ানিয়া প্রদেশের সব ভূমিদাসকে মুক্তি দেন। জমিদাররা এর প্রবল বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি চাপের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য হয়।

মুক্তির ঘোষণাপত্র

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে ফেব্রুয়ারি (নতুন বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৯ই মার্চ) তিনি বিখ্যাত ‘মুক্তির আইন’ বা ‘মুক্তির ঘোষণাপত্র’-তে স্বাক্ষর করেন এবং এর ফলে সমগ্র রাশিয়া থেকে ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ হয়। এই নির্দেশনামায় ২২টি ধারা ছিল এবং এব আয়তন ছিল বিপুল, ৩০০ পাতারও বেশি।

মুক্তিদাতা জার

যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত ভূমিদাসদের দাসত্ববন্ধন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ইতিহাসে ‘মুক্তিদাতা জার’ নামে পরিচিত হন।

চারটি মৌলিক নীতি

চারটি মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে এই ঘোষণাপত্রটি রচিত হয়েছিল। যথা –

  • (১) ভূমিদাসদের মুক্ত ও স্বাধীন নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ তাদের উপর মালিকদের কোনও অধিকার ও কর্তৃত্ব থাকবে না।
  • (২) ভূমিদাসদের জীবিকার জন্য জমি দিতে হবে।
  • (৩) সমগ্র ব্যবস্থাটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিচালিত হবে।
  • (৪) অভিজাত বা সামন্তদের আর্থিক ক্ষতি না করে ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ করা হবে। অর্থাৎ তারা ক্ষতিপূরণ পাবে।

‘মুক্তির আইন’-এ ঘোষিত ব্যবস্থাসমূহ

নতুন এই আইন অনুসারে স্থির হয় যে,

  • (১) ভূমিদাসরা সামন্তপ্রভুদের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করে স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার লাভ করবে।
  • (২) মুক্ত ভূমিদাসদের উপর জমিদারদের আর কোনও অধিকার থাকবে না। তারা রাশিয়ার স্বাধীন নাগরিকদের মতো সকল রাজনৈতিক ও অন্যান্য অধিকার ভোগ করবে।
  • (৩) ভূমিদাস পূর্বে প্রভুর যে জমি চাষ করত তার অর্ধেক তাকে দেওয়া হবে এবং বাকি অর্ধেক থাকবে প্রভুরই অধীনে।
  • (৪) জমিদার তার জমির অর্ধেক মুক্ত ভূমিদাসকে দেওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে। এই ক্ষতিপূরণ আপাতত সরকার থেকে দেওয়া হবে।
  • (৫) ‘ল্যান্ড ম্যাজিস্ট্রেট’ নামক সরকারি কর্মচারীরা সমস্তপ্রভু ও মুক্ত ভূমিদাসদের মধ্যে জমি বণ্টন এবং জমিদারের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ধার্য করবেন।
  • (৬) জমিদারের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমির উপর কিন্তু মুক্তিপ্রাপ্ত ভূমিদাসদের মালিকানা স্বীকৃত হবে না। এই জমিগুলির মালিকানা ও পরিচালন-ভার অর্পিত হবে ‘কমিউন’ বা ‘মির’ নামক গ্রাম্য সমিতির উপর। কৃষকেরা এই জমি কেবলমাত্র চাষ-আবাদ করবে।
  • (৭) আপাতত সরকার জমিদারদের ক্ষতিপূরণের অর্থ মিটিয়ে দেবেন।
  • (৮) মুক্ত ভূমিদাসরা ৪৯ বছরের কিস্তিতে বার্ষিক ৬.৫% সুদে ওই অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে।
  • (৯) কয়েকটি ‘মির’ একত্রিত হয়ে গঠিত হবে ‘ক্যান্টন’ এবং ‘ক্যান্টন’ আদালতে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা হবে।
  • (১০) গ্রাম্য ‘মির’ কর আদায়, সরকারে সেই কর জমা দেওয়া, সেনা সংগ্রহ, জমি বণ্টন প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করবে।

সুফল

‘মুক্তির ঘোষণাপত্র’ বা ভূমিদাসদের মুক্তি রাশিয়ার ইতিহাসে এক অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই আইনের কতকগুলি সুফল লক্ষ্য করা যায়। যথা –

  • (১) রুশ ইতিহাসের এক অতি কলঙ্কময় ও মধ্যযুগীয় কুপ্রথার অবসান ঘটে, রাশিয়ায় আধুনিক ইতিহাসের যুগ -এর সূচনা হয় এবং রাশিয়াতে বেশ কিছু প্রগতিশীল সংস্কারের পথে খুলে যায়। ভূমিদাসদের উপর থেকে সামন্তপ্রভু বা জমিদারদের কর্তৃত্বের অবসান হয় এবং তারা মুক্ত ও স্বাধীন নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করে।
  • (২) তারা ইচ্ছামতো স্থানান্তর গমন, চুক্তি সম্পাদন, জীবিকা পরিবর্তন এবং অন্যান্য অধিকার অর্জন করে। ডেভিড টমসন-এর মতে, এই মহান ঘটনা আধুনিক রুশ ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর মতে, এই ঘটনা রাশিয়াতে এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করে এবং রুশ জনজীবনে ব্যাপক পাশ্চাত্যকরণের দরজা খুলে দেয়।
  • (৩) লিপসন এই ঘটনাকে আলেকজান্ডারের সর্বাপেক্ষা ‘স্মরণীয় অবদান’ বলে অভিহিত করেছেন। কোচান-এর মতে, এই আইনটি রাশিয়ার আধুনিক ইতিহাস -এ এক নব যুগের সূচনা করে।
  • (৪) রাশিয়ায় কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি ঘটে, কৃষির সম্প্রসারণ হয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, জমির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, রাজস্ব খাতে সরকারের আয় বৃদ্ধি পায় এবং বহির্বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
  • (৫) এই প্রথার অবসানের ফলে রাশিয়ায় শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। ‘মির’-গুলির নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মুক্ত ভূমিদাসরা শ্রমিক হিসেবে কলকারখানা, খনি, যানবাহন প্রভৃতি শিল্পে নিযুক্ত হতে থাকে। এর ফলে রাশিয়ায় পুঁজিবাদের সূচনা হয়, কায়িক শ্রম-নির্ভরতার স্থলে যান্ত্রিক শ্রম-নির্ভরতা দেখা দেয় এবং রাশিয়ায় সংঘবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণির উন্মেষ ঘটে।
  • (৬) এখানে মনে রাখা দরকার যে, রাশিয়ায় এই কুপ্রথার অবসান ঘটেছিল একমাত্র দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের ব্যক্তিগত চেষ্টায়, কোনও বৈপ্লবিক ঘটনার জন্য নয়। সুতরাং তাঁকে ‘মুক্তিদাতা জার’ হিসেবে অভিহিত করা অযৌক্তিক নয়।

কুফল

  • (১) উপরোক্ত সুফলগুলি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক নানাভাবে এই আইনের সমালোচনা করেছেন। ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেন, “এই আইনের ফলে রুশ ভূমিদাসরা আইনগত স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পায় নি।”
  • (২) ঐতিহাসিক লিপসন বলেন যে, এই আইনের কিছু আইনগত গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল থাকলেও এর দ্বারা কিন্তু রুশ কৃষকদের কোনও দুর্দশা মোচন হয় নি।” কোচান-এর মতে, এই মুক্তি একটি জালিয়াতি ছাড়া অন্য কিছু নয়। ঐতিহাসিক জে. এ. এস. গ্রেনভিল এই আইনকে ‘নিষ্ঠুর পরিহাস’ বলে অভিহিত করেছেন। বহু ত্রুটির কারণে এই সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
  • (৩) মুক্ত ভূমিদাসদের যে জমি দেওয়া হয় এবং তার জন্য যে অর্থ ধার্য করা হয়, তা জমির ন্যায্য মূল্য অপেক্ষা অনেক বেশি ছিল। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে যে জমির দাম ছিল ৫৪৪ মিলিয়ন রুবল, সেই জমির জন্য মুক্ত ভূমিদাসদের দিতে হয় ৮৬৭ মিলিয়ন রুবল।
  • (৪) ঐতিহাসিক সেটন-ওয়াটসন বলেন যে, ভূমিদাসদের যে জমি দেওয়া হয় তার মোট মূল্য কখনোই ২৮৪ মিলিয়ন রুবলের বেশি ছিল না, অথচ কেবল উত্তর রাশিয়া থেকেই ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায় করা হয়েছিল ৩৪১ মিলিয়ন রুবল।
  • (৫) মুক্ত ভূমিদাসদের উপর নানা রকম করের বোঝা চাপানো হয়, যা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। জমিদারের কাছ থেকে প্রাপ্য জমির জন্য তাদের বার্ষিক কিস্তিতে ক্ষতিপূরণের টাকা সুদ-সহ পরিশোধ করতে হত এবং সেই সঙ্গে মেটাতে হত নানা ধরনের সরকারি কর।
  • (৬) জমি বণ্টনের সময় সেচের সুবিধাযুক্ত ভালো উর্বর জমিগুলি জমিদারের ভাগে পড়ে। সেখানে পুকুর, গো-চারণক্ষেত্র, নিকাশি নালা সব কিছুরই সুবিধা ছিল। অপরপক্ষে, ভূমিদাসদের ভাগে পড়ে অনুর্বর, বন্ধ্যা, বালুকাময় ও জলাজমি, যেখানে ফসল উৎপন্ন হত খুবই কম।
  • (৭) জমি বণ্টন এমনভাবে করা হয়েছিল যার ফলে জমিদারের জমির জল, নিকাশি নালা বা গোচারণক্ষেত্র ব্যতীত ভূমিদাসের পক্ষে জুম চাষ করা কখনোই সম্ভব ছিল না। এইসব সুবিধা পাওয়ার জন্য ভূমিদাস জমিদারকে উচ্চহারে কর দিতে বাধ্য ছিল।

উপসংহার:- অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, ভূমিদাসদের মুক্তি তাদের কাছে অবিমিশ্র আশীর্বাদ না হলেও ভূস্বামীদের কাছে এই সংস্কার স্বাগত ছিল। এই সংস্কারের ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ আবাদি জমি ভূস্বামীরা লাভ করেছিল, ভূমিদাসদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থেকে তারা অব্যাহতি লাভ করেছিল এবং মানবসম্পদের মালিকানার পরিবর্তে তারা প্রচুর ক্ষতিপুরণ পায়। এই পরিবর্তনে অভিজাত সম্প্রদায় দুর্বল হয় নি, বরং শক্তিশালীই হয়।

(FAQ) রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. রাশিয়ার ভূমিদাস প্রথার বিলোপ সাধন করেন কে?

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

২. রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ বা মুক্তির ঘোষণাপত্র কবে জারি করা হয়?

১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে।

৩. মুক্তিদাতা জার কাকে বলা হয়?

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার।

Leave a Reply

Translate »