ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ

জার প্রথম নিকোলাসের শাসনকালে রাশিয়ায় সংঘটিত ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বিদ্রোহের নামকরণ, বিদ্রোহের কারণ হিসেবে দেশপ্রেমিকদের প্রচেষ্টা, উদারতন্ত্র ও সাংবিধানিক আদর্শ, গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠা, বিদ্রোহের নেতৃত্ব কর্নেল পেস্টেলের ভূমিকা, বিদ্রোহের ব্যর্থতা, বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ, বিদ্রোহের গুরুত্ব হিসেবে রাশিয়ার জাগরণের প্রভাতী সঙ্গীত, মুক্তির বীজে জলসিঞ্চন ও অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানবো।

ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ

সময়কাল ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ
স্থান রাশিয়া
রাজা জার প্রথম নিকোলাস
ফলাফল ব্যর্থতা
ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ

ভূমিকা:- জার প্রথম নিকোলাসের আমলে রাশিয়ায় ডিসেম্বর বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহের মূল সংগঠক ছিল রুশ সেনাবাহিনীর কিছু পদস্থ অফিসার। তাদের সঙ্গে হাত মেলায় কিছু উদারপন্থী দেশপ্রেমিক।

নামকরণ

১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর এই বিদ্রোহের সূচনা হয়। ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত হওয়ায় এই বিদ্রোহ ডিসেমব্রিস্ট বা ডেকাব্রিস্ট বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

বিদ্রোহের কারণ

আপাতদৃষ্টিতে নিকোলাস-কর্তৃক জারের পদলাভ এবং এর প্রতিবাদে এই বিদ্রোহ শুরু হলেও, এই বিদ্রোহের মূলে আরও কিছু গভীর কারণ ছিল। যেমন –

(১) দেশপ্রেমিকদের প্রচেষ্টা

বহু রুশ দেশপ্রেমিক রাশিয়ায় জারের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে সাংবিধানিক শাসন প্রবর্তনে সচেষ্ট ছিলেন। এই বিদ্রোহের পশ্চাতে তাঁদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

(২) উদারতন্ত্র ও সাংবিধানিক আদর্শ

নেপোলিয়ন -এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বেশ কিছু রুশ সেনাপতি পশ্চিম ইউরোপে যান এবং সেখানকার উদারতন্ত্র ও সাংবিধানিক আদর্শ তাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁরা স্বদেশে ওইসব আদর্শ প্রবর্তনে উদ্যোগী হন। বহু উদারপন্থী দেশপ্রেমিক ও অভিজাত তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন।

(৩) গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠা

সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় বেশ কিছু গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যেমন –

(ক) ইউনিয়ন অব স্যালভেসন

১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে ইউনিয়ন অব স্যালভেসন নামে একটি গুপ্ত, সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল ভূমিদাস প্রথার অবসান এবং সাংবিধানিক সংস্কার। এই সমিতি দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।

(খ) ‘ইউনিয়ন অব পাবলিক উইল

এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইউনিয়ন অব পাবলিক উইল’ নামে একটি সংস্থা। এর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন সেনাবাহিনীর লোক এবং এর উদ্দেশ্য ছিল বলপূর্বক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই সমিতিও দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।

(গ) ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে নরদার্ন সোসাইটি’। ইতিমধ্যে কর্নেল পেস্টেল-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘সাউদার্ন সোসাইটি’।

বিদ্রোহের নেতৃত্ব

এই বিদ্রোহের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পেস্টেল, ট্রুবেটস্কি, মুরাভিয়ভ প্রমুখ।

কর্নেল পেস্টেল

আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পেস্টেল। ড্রেসডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কর্নেল পেস্টেল ফরাসি বিপ্লব -এর আদর্শের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল রাশিয়া থেকে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান, জনগণের ভোটে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ভূমিদাস প্রথার বিলোপ সাধন।

বিদ্রোহের ব্যর্থতা

এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। চরম নিষ্ঠুরতার সাহায্যে জার এই বিদ্রোহ দমন করেন। মস্কো রেজিমেন্ট আত্মসমর্পণ করে। একটি তদন্তকারী কমিশন ৬০০ জন বিদ্রোহীকে জেরা করে বিদ্রোহের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে। বিদ্রোহীরা অপরাধ স্বীকার করে। পেস্টেল ও কবি কনরাড-সহ পাঁচজনের প্রাণদণ্ড হয়। একশো জনেরও বেশি বিদ্রোহীকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়।

ব্যর্থতার কারণ

বিদ্রোহের ব্যর্থতার জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করা যায়। যথা –

  • (১) বিদ্রোহীদের মধ্যে সুস্পষ্ট নীতি ও লক্ষ্যের অভাব ছিল। তাঁদের মধ্যে কোনও ঐকমত্য ছিল না।
  • (২) বিদ্রোহীরা অষ্টাদশ শতকের মতাদর্শ ও পদ্ধতির সঙ্গে উনিশ শতকের বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে যুক্ত করতে পারেন নি।
  • (৩) এই আন্দোলন ছিল আকস্মিক। সাধারণ রুশ জনতার মধ্যে বিদ্রোহীদের আদর্শ যথাযথভাবে প্রচারিত হয় নি। শহরভিত্তিক ও সেনাবাহিনীর লোকদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন জনমনে কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি।
  • (৪) এছাড়া বিদ্রোহীদের অনেকের বিশ্বাসঘাতকতা, নেতৃবৃন্দের মনোবলের অভাব এবং তাঁদের রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাব বিদ্রোহের ব্যর্থতাকে অনিবার্য করে তোলে।
  • (৫) বিদ্রোহীদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব ছিল। তাঁরা বড়ো তাড়াহুড়ো করেছিলেন। বন্দি অবস্থায় প্রাণদণ্ডের আগে পেস্টেল বলেন যে, “আমার ভুল ছিল এটাই যে, বীজবপনের আগেই আমি ফল পেতে চেয়েছিলাম।”

গুরুত্ব

ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই বিদ্রোহের গুরুত্ব ছিল অনস্বীকার্য। যেমন –

(১) রাশিয়ার জাগরণের প্রভাতী সঙ্গীত

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বিদ্রোহ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই বিপ্লব ছিল উনিশ শতকে রাশিয়ার জাগরণের প্রভাতী সঙ্গীত।

(২) মুক্তির বীজে জলসিঞ্চন

লিপসন বলেন যে, এই আন্দোলন ব্যর্থ হলেও বিপ্লবীদের আত্মদান একেবারে নিষ্ফল হয় নি। তাঁদের রক্তই রাশিয়াতে মুক্তির বীজে জলসিঞ্চনের কাজ করে এবং তারাই ভবিষ্যৎ দেশপ্রেমিকদের কাছে স্বদেশের পুনরুজ্জীবনের জন্য রক্তদানের এক মহান ঐতিহ্য রেখে যান।

(৩) অনুপ্রেরণা

ঐতিহাসিক লাওনেল কোচান বলেন যে, এই বিদ্রোহের কাহিনি সকল ভবিষ্যৎ বিপ্লবীকে সরকারি অনাচারের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করেছে।

উপসংহার:- চল্লিশের দশকের বুদ্ধিজীবী, ষাটের দশকের নিহিলিস্ট, সত্তরের দশকের পপুলিস্ট ও নৈরাজ্যবাদী এবং আশির দশকের মার্কসবাদী – সকলেরই অনুপ্রেরণার উৎস হল এই ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ।

(FAQ) ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কখন কোথায় ডিসেমব্রিস্ট বিদ্রোহ সংঘটিত হয়?

১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায়।

২. ডিসেমব্রিস্ট আন্দোলনের সময় রাশিয়ার জার কে ছিলেন?

প্রথম নিকোলাস।

৩. ডিসেমব্রিস্ট আন্দোলনের দুজন নেতার নাম লেখ।

কর্নেল পেস্টেল, ট্রুবেটস্কি মুরাভিয়ভ প্রমুখ।

Leave a Reply

Translate »