মালিক অম্বর

আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বর প্রসঙ্গে দাস কর্মচারী, মুঘলদের ক্ষতি, মনসবদারের পদ, মুঘলদের সাথে সন্ধি, শাসন সংস্কার, রাজস্ব সংস্কার, কঠোর শৃঙ্খলা নীতি, গেরিলা যুদ্ধনীতি, মেবার দখল ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বর

ঐতিহাসিক চরিত্রমালিক অম্বর
পরিচিতিআহমদ নগরের উজীর
মুঘল সম্রাটজাহাঙ্গীর
জাবতি প্রথাটোডরমল
খুররমশাহজাহান
আহমদ নগরের উজির মালিক অম্ব

ভূমিকা :- আহমদনগরের বিখ্যাত উজীর ও সেনাপতি মালিক অম্বর। তাকে ভারত -এ গেরিলা যুদ্ধ নীতির প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্ৰাম করেন।

দাস কর্মচারী মালিক অম্বর

মালিক অম্বর ছিলেন এক দাস কর্মচারী। পশ্চিম এশিয়ার বাগদাদের দাস বাজারে তাকে ক্রয় করা হয় এবং আহমদ নগরে তাকে আনা হয়।

মালিক অম্বরের মনসবদারের পদ লাভ

তিনি আহমদ নগরে নিজ যোগ্যতার পুরস্কার স্বরূপ এক ক্ষুদ্র মনসবদারের পদ পান।

মালিক অম্বর কর্তৃক মুঘলদের ক্ষতি

আকবর -এর আমলে আহমদনগর আক্রান্ত হলে মালিক অম্বর তেলেঙ্গানা অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে মুঘলের বহু ক্ষতি করেন।

মুঘলদের সাথে মালিক অম্বরের সন্ধি

আহমদনগরের একাংশ সম্রাট আকবরের দখলে এলেও, মালিক অম্বর মুঘলের বিরোধিতা চালিয়ে যান। মুঘল সেনাপতি খান-ই-খানানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মালিক অম্বর আহত হন। তিনি শেষ পর্যন্ত আহমদনগরের নিজামশাহী সুলতান আদিল শাহের পক্ষ নিয়ে মুঘলের সঙ্গে সন্ধি করেন।

মালিক অম্বরের শাসন সংস্কার

সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বের গোড়ার দিকে তিনি খসরু শাহ -এর বিদ্রোহ ও অন্যান্য সমস্যার জন্য দক্ষিণে নজর দিতে পারেন নি। মালিক অম্বর এই সুযোগে আহমদনগরে শাসন সংস্কার দ্বারা এই রাজাকে বিশেষ শক্তিশালী করেন।

মালিক অম্বরের রাজস্ব সংস্কার

  • (১) তিনি টোডরমলের জাবতি প্রথার অনুকরণে জমি জরিপ করে ফসলের সরকারি রাজস্ব হিসেবে ধার্য করেন। কৃষকদের নগদ টাকায় রাজস্ব আদায় দিতে বলা হয়। তিনি জমি ইজারা দানের প্রথা রদ করেন এবং বিভিন্ন প্রকার অতিরিক্ত কর রদ করেন।
  • (২) তিনি জমি জরিপ করে রাজস্ব ধার্য করেন। হিন্দুদের রাজস্ব সংগ্রাহকের পদে বসান হয়। উর্দ্ধতন মুসলিম কর্মচারীরা তাদের কাজের তদারকি করতেন।
  • (৩) তাঁর ভূমি রাজস্ব নীতির ফলে একদিকে কৃষকদের স্বচ্ছলতা বাড়ে অপরদিকে সরকারি রাজকোষে প্রচুর অর্থ জমা হয়। এই অর্থ সামরিক সংস্কারের কাজে ব্যয় করা হয়।

মালিক অম্বরের কঠোর শৃঙ্খলা নীতি

তিনি সরকারি কর্মচারীদের ওপর কঠোর শৃঙ্খলা স্থাপন করেন এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করেন। মালিক অম্বর মারাঠা হাল্কা অশ্বারোহী বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়ান।

আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বরের গেরিলা যুদ্ধ নীতি

  • (১) মালিক অম্বর তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেন যে প্রতাপশালী মুঘল সেনাদলের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভের আশা কম। এজন্য তিনি আহমদনগরের বাহিনীকে গেরিলা যুদ্ধে শিক্ষা দেন।
  • (২) মালিক অম্বর জানতেন যে মেবার, বুন্দেলখণ্ড ও উত্তর-পশ্চিমের পার্বত্য অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধের দ্বারা মুঘলকে প্রতিহত করা গেছে। তিনিও আহমদনগর বাহিনীকে বিশেষত মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখান।
  • (৩) ডাঃ ঈশ্বরী প্রসাদের মতে, “তিনিই প্রথম মারাঠা জাতিকে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখান, পরে মারাঠারা নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করে এবং যার আঘাতে মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়”। তাঁরই শিক্ষার ফলে মারাঠারা অতর্কিত আক্রমণে পটুত্ব পায়।

মালিক অম্বরের কর্তৃক নৌ বাণিজ্যের সমৃদ্ধি

  • (১) মালিক অম্বর আহমদনগরের নৌ বাণিজ্যকে সমৃদ্ধিশালী করেন। তিনি পারস্যের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করেন। এজন্য তিনি আহমদনগরের উপকূলে জিঞ্জিরা দ্বীপে নৌঘাঁটি স্থাপন করেন।
  • (২) তিনি হাবসি ও আরব নাবিকদের দ্বারা নৌবাহিনী সাজান। পরে এই সকল আরব বংশোদ্ভূত হাবসিরা সৈয়দ বা সিদ্ধি নামে পরিচিত হয়। পরে মারাঠা ও ব্রিটিশ যুগে সিদ্ধি নৌ যোদ্ধাদের দমন করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।

মালিক অম্বর ও মোগলদের মধ্যে বুরহানপুরের সন্ধি

আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বর উপরোক্ত প্রস্তুতির পর মুঘলের হাত থেকে আহমদনগরের হস্তান্তরিত অংশ পুনর্দখলের লক্ষ্য নেন। তিনি মুঘল সেনাপতি খান-ই-খানান ও যুবরাজ পারভেজের যুগ্ম আক্রমণকে প্রতিহত করেন। মালিক অম্বরের গেরিলা আক্রমণে বিব্রত হয়ে বুরহানপুরের অসম্মানজনক সন্ধি তিনি স্বাক্ষর করেন।

মালিক অম্বর কর্তৃক মুঘলদের পরাজয়

এরপর নতুন মুঘল সেনাপতি খান-ই-জাহান লোদী ও আবদুল্লা খান দুদিক থেকে আহমদনগর আক্রমণের চেষ্টা করলে মালিক অম্বরের গেরিলা বাহিনী আবদুল্লা খানকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। এরপর মীর্জা আজিজ কোকাও পরাজয় বরণ করেন।

মেবার যুদ্ধে জাহাঙ্গীর

ইতিমধ্যে মেবার যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় জাহাঙ্গীর সাময়িকভাবে দক্ষিণ থেকে হাত গুটিয়ে নেন। মেবার অভিযান শেষ হলে জাহাঙ্গীর পুনরায় খান-ই-খানানের নেতৃত্বে অভিযান পাঠান।

মালিক অম্বরের আত্মরক্ষা

মালিক অম্বরের নেতৃত্বে আহমদনগর, বিজাপুর ও গোলকুন্ডার ৪০ হাজার সেনা রোনান মান্ড-এর যুদ্ধে (১৬১৫ খ্রি) মুঘল কামানের গোলায় বিধ্বস্ত হয়। মালিক অম্বরের রসদপত্র, গোলাবারুদ মুঘল অধিকার করে। মালিক অম্বর দৌলতাবাদ দুর্গে আত্মরক্ষা করেন।

মাণ্ডুতে জাহাঙ্গীরের শিবির

ইতিমধ্যে খান-ই-খানান ও যুবরাজ পারভেজের মধ্যে মত পার্থক্যের ফলে মুঘলের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়। জাহাঙ্গীর পারভেজকে বদলী করে যুবরাজ খুররমকে দক্ষিণে পাঠান। জাহাঙ্গীর নিজে মাণ্ডুতে (Mandu) এসে শিবির স্থাপন করেন।

আসন্ন আক্রমণ থেকে মালিক অম্বরের রক্ষা

এই বিপদের সম্মুখীন হয়ে মালিক অম্বর আপাতত পিছু হঠেন। তিনি মুঘলের হাতে বালাঘাট ও আমদনগরের একাংশ ছেড়ে দেন। আপাতত মুঘলের আসন্ন আক্রমণ থেকে তিনি রক্ষা পান।

মালিক অম্বরের মেবার দখল

আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বর জাহাঙ্গীরের কাশ্মীর অভিযানের সুযোগে আহমদনগরের হস্তান্তরিত অংশ এবং মেবার দখল করেন।

মালিক অম্বরের বিরুদ্ধে খুররমের অভিযান

গোটা দক্ষিণাত্যে মুঘলের অধিকার বিপন্ন হলে জাহাঙ্গীর যুবরাজ খুররমকে বিশাল বাহিনীসহ দক্ষিণে পাঠান। মুঘল সেনা খিড়কি অধিকার করে আহমদনগর আক্রমণ করায় মালিক অম্বর আপাতত যুদ্ধ বিরতির জন্য সন্ধি স্থাপন করেন। মুঘলের প্রাপ্য আহমদনগরের অংশ ছাড়া ২৭ মাইল চওড়া অবশিষ্ট আহমদনগরের অঞ্চল ও ১৮ লক্ষ টাকা মুঘলকে দিতে হয়।

মালিক অম্বরের ভাতুরীর যুদ্ধ

মালিক অম্বর ছিলেন ধূর্ত। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যুবরাজ খুররমের বিদ্রোহের সুযোগে তিনি মুঘলের মিত্র বিজাপুর ও মুঘল সেনাকে ভাতুরীর যুদ্ধে পরাস্ত করেন। তিনি শোলাপুর অধিকার করেন এবং মুঘল ঘাঁটি বুরহানপুর অবরোধ করেন। কিন্তু মুঘল সেনাপতি মহাবৎ খাঁ ও যুবরাজ শাহরিয়ার বুরহানপুর অবরোধ মুক্ত করেন।

আহমদ নগরের নিজাম শাহী বংশের পতন

জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহজাহান সম্রাট পদে বসে আহমদনগর দখল করেন। নিজাম শাহী বংশের পতন হয়।

মালিক অম্বরের মৃত্যু

মালিক অম্বর কিছুকাল শাহজী ভোঁসলের সঙ্গে যোগ দিয়ে মুঘলের বিরোধিতা করেন। ১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়।

উপসংহার :- ঈশ্বরী প্রসাদের মতে, “যুদ্ধ বিগ্রহ, রাষ্ট্র পরিচালনা, দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শাসন দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য মালিক অম্বরের সমতুল্য কোনো প্রশাসক তাঁর আমলে ছিল না।”

(FAQ) আহমদ নগরের উজির মালিক অম্বর সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মালিক অম্বর কে ছিলেন?

আহমদনগরের বিখ্যাত উজীর ও সেনাপতি।

২. মালিক অম্বরকে দাস হিসেবে কোথায় কেনা হয়?

বাগদাদের দাস বাজারে।

৩. ভারতে গেরিলা যুদ্ধ নীতির সূচনা করেন কে?

মালিক অম্বর।

৪. মালিক অম্বরের মৃত্যু হয় কখন?

১৬২৬ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment