ইলবার্ট বিল

ইলবার্ট বিল প্রসঙ্গে ভারতের শাসনকার্যের অসুবিধা, ইলবার্ট বিল, শ্বেতাঙ্গমহলে ইলবার্ট বিলের বিরোধিতা, হাচিনসনের মন্তব্য, শ্বেতাঙ্গমহলে প্রতিক্রিয়া, বাকল্যাণ্ডের মন্তব্য, ভারতের শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠীর একতা, ভারত সভার দুর্বল আন্দোলন ও ইলবার্ট বিল প্রত্যাহার সম্পর্কে জানবো।

ইলবার্ট বিল

ঐতিহাসিক ঘটনাইলবার্ট বিল
প্রণয়ন১৮৮৩ খ্রি:
প্রণেতাস্যার সি. পি. ইলবার্ট
গভর্নর জেনারেললর্ড রিপন
ভারত সভাসুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ইলবার্ট বিল

ভূমিকা :- ইংরেজ শাসকগণ ভারতবর্ষ জয় করার সঙ্গে সঙ্গেই বিজয়ী ও বিজিতদের মধ্যে বৈষম্য এবং বিজয়ী শাসকগোষ্ঠীর বিশেষ অধিকার নানাভাবে প্রয়োগ করতে থাকে। এই বৈষম্য ও বিশেষ অধিকারসূচক আইনসমূহের মধ্যে একটি ছিল কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গ-বিচারকদের দ্বারা শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা। এই আইন অনুসারে, শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের অপরাধ যতই গুরুতর হোক না কেন, তাদের বিচারের ক্ষমতা কোনো দেশীয় বিচারকের ছিল না।

ভারতের শাসনকার্যের অসুবিধা

জনসাধারণের মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে এই বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে একটা তীব্র বিক্ষোভ দেখা দেয়। এই বৈষম্যমূলক আইনের ফলে এমন কি শাসনকার্যেও বিশেষ অসুবিধা সৃষ্টি হতে থাকে।

ইলবার্ট বিল

শাসন-কার্যের এই অসুবিধা দূর করার উদ্দেশ্যে এবং দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ শান্ত করার চেষ্টা হিসাবে ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে শাসকগণ একটি আইনের খসড়া তৈরী করেন। তৎকালীন বড়লাট লর্ড রিপনের আইন সচিব স্যার সি. পি. ইলবার্ট-এর নামানুসারে এই আইনের খসড়াটি ‘ইলবার্ট বিল’ নামে খ্যাত।

শ্বেতাঙ্গমহলে ইলবার্ট বিলের বিরোধিতা

এই আইনের খসড়াটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে এর বিরুদ্ধে ভারতের শ্বেতাঙ্গমহল হতে তীব্র বিরোধিতা দেখা দেয়, এর বিরুদ্ধে সকল শ্বেতাঙ্গ দলবদ্ধ হয়ে এক প্রবল আন্দোলন আরম্ভ করে।

ইলবার্ট বিল সম্পর্কে হাচিনসনের মন্তব্য

লেস্টার হাচিনসন লিখেছেন, “( বিচার ঘটিত) অসংগতি দূর করবার সামান্য চেষ্টাস্বরূপ এই আইনের খসড়াটির বিরুদ্ধে ভারতের সকল শ্বেতাঙ্গ সাহেবের তীব্র আক্রমণ শুরু হয়, দেখতে না দেখতে একটা ‘ইউরোপীয় আত্মরক্ষা সমিতি’ গঠিত হয় এবং বিজয়ী শেতাঙ্গদের বিশেষ অধিকার অব্যাহত রাখিবার ও কৃষ্ণাঙ্গ বিচারকদের বিচার হইতে শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদের রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে দেড়লক্ষ টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়।”

শ্বেতাঙ্গদের ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া

  • (১) শ্বেতাঙ্গ আন্দোলনকারীরা যা খুশি প্রচার করতে থাকে। বড়লাট লর্ড রিপন ও তাঁর আইন সচিব সি. পি. ইলবার্ট এবং সাধারণভাবে সকল ভারতীয় বিচারকদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য ভাষায় জঘন্যতম কুৎসা বর্ধিত হতে থাকে।
  • (২) তারা এমনকি এও প্রচার করে যে, যদি ভারতীয় বিচারকদের হাতে এই প্রকারের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তাঁরা তাঁদের বিচার ক্ষমতার অপব্যবহার করে শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের দ্বারা তাদের হারেমে (অন্তঃপুর ) ভরে ফেলবেন।

ইলবার্ট বিলের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বাকল্যাণ্ডের মন্তব্য

সরকারী ইতিহাস প্রণেতা বাকল্যাণ্ড লিখেছেন, “কলিকাতার একদল শ্বেতাঙ্গ স্থির করে যে, সরকার যদি তাদের প্রস্তাবিত আইন পাশ করে তবে তারা বড়লাটের বাড়ির পাহারাদার সিপাহিদের পরাজিত করে বড়লাটকে (লর্ড রিপনকে) চাঁদপাল ঘাঁট হতে স্টীমারে চাপিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপের পথে ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়ে দেবে। এই ষড়যন্ত্রের কথা (বাংলার) লেফটনান্ট গভর্নরের অজ্ঞাত ছিল না।”

ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে ভারতের শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠীর একতা

‘ইলবার্ট বিল’-এর বিরুদ্ধে সারা ভারতের শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠী ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়। তাদের আন্দোলনে ভারত সরকার ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে।

ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের জোরালো প্রচার নেই

কিন্তু ভারতীয়দের দিক হতে এই বিলের স্বপক্ষে কোনো জোর প্রচার ও আন্দোলন হল না। ইংরেজ শাসকগণের বিচার-সংক্রান্ত এই বৈষম্য ভারতীয় শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে যথেষ্ট বিক্ষোভ সৃষ্টি করলেও সেই বিক্ষোভ এতদিন কোনো সাংগঠনিক রূপ গ্রহণ করে নি।

ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে ভারত সভার দুর্বল আন্দোলন

  • (১) এর পূর্বে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, লালমোহন ঘোষ প্রমুখ নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে গঠিত ‘ইণ্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ বা ভারত সভা এতদিন ভারতীয়দের বিভিন্ন অধিকারের কথা বললেও এই সংগঠন এপর্যন্ত কোনো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয় নি।
  • (২) এইবার ‘ইলবার্ট বিল’ উপলক্ষে শ্বেতাঙ্গদের বিরোধিতা ও তার ভয়ংকর রূপ দেখে ‘ইণ্ডিয়ান এসোসিয়েশন’-এর নেতৃবৃন্দ ভয়ে পশ্চাৎপদ হন। শক্তিশালী শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠীর বাধার বিরুদ্ধে ও বিলের স্বপক্ষে তাঁরা কোন কার্যকরী আন্দোলন গড়ে তুলিতে সক্ষম হলেন না। তাঁদের এই অক্ষমতা দেশের জাগ্রত যুবশক্তির নিকট ‘ইণ্ডিয়ান এসোসিয়েশন’-এর দুর্বলতা ও ভীরুতা স্পষ্ট করে তোলে।

ইলবার্ট বিল প্রত্যাহার

শ্বেতাঙ্গদের আন্দোলনের ফলে ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গগোষ্ঠীর তীব্র বিরোধিতার নিকট মাথা নত করে বিলটি তুলে নেয়।

ইলবার্ট বিলে ভারতীয়দের পরাজয়

  • (১) ‘ইলবার্ট বিল’-এর পরাজয়ের ফলে ভারতের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মন জাতীয় অপমানের গ্লানিতে ভরে যায়। বিজয়ী শাসক-জাতি বলিয়া শেতাঙ্গদের দম্ভ ও ঔদ্ধত্য তাদের নিকট অসহ্য হয়ে উঠে। ‘ইলবার্ট বিল’-এর পরাজয়কে তারা চরম জাতীয় অপমান বলে গ্রহণ করে।
  • (২) তারা এও উপলব্ধি করে যে, ভারতবাসীরা যতদিন নিজেদের শক্তিদ্বারা তাদের দাবি পূর্ণ করতে না পারবে, তারা যতদিন শাসকদের সদাশয়তার উপর নির্ভর করবে, ততদিন তাদের পরাধীনতার গ্লানি ও দুঃখ-দুর্দশার অবসান তো দূরের কথা, বরং তা প্রতিদিন বেড়েই চলিবে। এই জাতীয় অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তাদের মধ্যে এক দুর্জয় বিদ্রোহী মনোভাব দ্রুত গড়ে উঠতে থাকে।

উপসংহার :- সরকারী ইতিহাস-প্রণেতা বাকল্যাণ্ডও তার গ্রন্থে দুঃখ করে বলেছেন, “ইলবার্ট বিল’-এর শিক্ষা কোনো ভারতবাসীই কোনো দিন ভুলে নি।”

(FAQ) ইলবার্ট বিল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইলবার্ট বিল প্রণয়ন করেন কে?

লর্ড রিপন।

২. ইলবার্ট বিলের খসড়া প্রস্তুত করেন কে?

লর্ড রিপনের আইন সচিব স্যার সি. পি. ইলবার্ট।

৩. ইলবার্ট বিল কখন পেশ করা হয়?

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment