ভারতের কৃষি সংকট

ভারতের কৃষি সংকট প্রসঙ্গে উনিশ শতকের শেষার্ধের কৃষির ভয়ঙ্কর চিত্র, ভারতের কৃষকদের উপর বিভিন্ন কর আরোপ, ভারতের কৃষি সংকট সম্পর্কে উইলিয়াম ডিগবীর মন্তব্য, হান্টারের মন্তব্য, ইলিয়টের মন্তব্য, লোকক্ষয়, দুর্ভিক্ষ ও কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে জানবো।

ভারতের কৃষি সংকট

ঐতিহাসিক ঘটনাভারতে কৃষি সংকট
উনিশ শতকের শেষার্ধকৃষির ভয়ঙ্কর চিত্র
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত১৭৯৩ খ্রি:
পাঞ্জাব অধিকার১৮৪৮ খ্রি:
কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাঅক্টাভিয়ান হিউম
ভারতের কৃষি সংকট

ভূমিকা :- ভারতে ব্রিটিশ শাসনের আরম্ভকাল হতে যে কৃষি-সংকট দেখা দিয়েছিল তা মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ৩ বছরে চরম আকার ধারণ করে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ ভারতব্যাপী এক কৃষি-বিপ্লবের অবস্থা ক্রমশ আত্মপ্রকাশ করতে থাকে।

উনিশ শতকের শেষার্ধের কৃষির ভয়ঙ্কর চিত্র

  • (১) বিভিন্ন সরকারী তথ্য থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের কৃষির যে ভয়ঙ্কর চিত্র উদ্ঘাটিত হয় তার সংক্ষিপ্ত হল ‘ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী’র শাসনকালের প্রথম যুগে বোম্বাই প্রদেশের কৃষকদের মোট রাজস্ব দিতে হত ৮০ লক্ষ টাকা।
  • (২) মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে, ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে এই রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২ কোটি ৩ লক্ষ টাকা। এই রাজস্বের অর্থ সংগ্রহ করবার জন্ম কৃষক জনসাধারণকে মারোয়াড়ী, গুজরাটী ও সাউকার মহাজনদের নিকট চিরদাসত্ব বরণ করতে হত।
  • (৩) ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালে মাদ্রাজ অঞ্চলে যে ভূমি রাজস্ব আদায় হত, মহারানীর শাসনকালে তা অপেক্ষা দশলক্ষাধিক টাকা অধিক ভূমি রাজস্ব আদায় করা হয়। এর ফলে মাদ্রাজে দুর্ভিক্ষের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
  • (৪) ১৮৮৯-১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বাকি খাজনার দায়ে মাদ্রাজ সরকার ৮,৪০,৭১৩ জন কৃষকের ১৯ লক্ষ ৬০ হাজার ৩৬৪ বিঘা জমি নিলামে বিক্রি করেছিল। এছাড়া আরও ১২ লক্ষ বিঘা জমি ক্রেতার অভাবে মাদ্রাজ সরকারকেই  কিনতে হয়েছিল।
  • (৫) মধ্যপ্রদেশের সকল জেলার শতকরা ১০২-১০৫ টাকা হারে কৃষকের রাজস্ব বৃদ্ধি করা হয়। তার ফলে কৃষকের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে। ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দে পাঞ্জাব প্ৰদেশ অধিকৃত হবার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের ভূমি রাজস্ব প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে পাঞ্জাবের অধিকাংশ স্থানের কৃষিজীবীদের প্রায় অর্ধাংশ সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।
  • (৬) সরকারী বিবরণ হতে জানা যায়, অযোধ্যা প্রদেশের শতকরা ৭৫ জন কৃষকের ঘরে খাদ্য নেই, শীতের জন্য লেপ বা কম্বল নাই। এই অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকের উপবাস ও অর্ধাহার অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়ায়। বিহার প্রদেশে প্রায় ৩ লক্ষ কৃষকের প্রতিজনকে মাত্র ১৭ টাকায় সারা বছর জীবন ধারণ করতে হয়।
  • (৭) এরূপ লক্ষ লক্ষ কৃষক আছে যারা কেবল দুই বিঘা করে জমি চাষ করে বেঁচে থাকে। শতকরা দশবারো জন কৃষকের কোনো জমিজমা নেই, তারা কেবল দিন মজুরি করে দিন কাটায়। শ্রমজীবীরাও বছরের মধ্যে আট মাসের অধিক কাজ পায় না। মজঃফরপুর, সারণ, চাম্পারণ ও দ্বারভাঙ্গা জেলার অনেক অংশে শ্রমজীবীদেরকে অর্ধভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়।

ভারতের কৃষকদের উপর বিভিন্ন কর আরোপ

বঙ্গদেশে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ ফলে সরকার ইচ্ছামত কৃষকের ভূমি-রাজস্ব বৃদ্ধি করতে না পারলেও ‘পথকর’ ‘চৌকিদারী কর, ‘ ‘পূর্তকর’ প্রভৃতি নানাবিধ কর বসিয়ে জমিদারী শোষণের উপর সরকারী শোষণের বিপুল ভার চাপিয়ে দিয়েছিল।

ভারতের কৃষি সংকট সম্পর্কে উইলিয়াম ডিগবীর মন্তব্য

উইলিয়াম ডিগবী দেখিয়েছেন, “বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর লোকের বার্ষিক গড় আয় পনের টাকা তিন আনা মাত্র। অর্থাভাবে বঙ্গদেশের অনেক স্থানেই সুপানীয়ের অভাব ঘটেছে। ফলে ম্যালেরিয়া ও কলেরায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের মৃত্যুসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুখাদ্যের অভাবে ও শিশুদের যকৃতের রোগে বহু মৃত্যু ঘটছে।”

ভারতের কৃষি সংকট সম্পর্কে হান্টারের মন্তব্য

১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজ ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার ইংল্যাণ্ডে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, ভারতবর্ষের কুড়ি কোটি মানুষের মধ্যে চার কোটিরও অধিক মানুষ অর্ধাশনে দিন যাপন করে।

ভারতের কৃষি সংকট সম্পর্কে ইলিয়টের মন্তব্য

বঙ্গদেশের ছোটলাট চার্লস ইলিয়ট ভারতের কৃষকদের অবস্থা পর্যালোচনা করে বলেছিলেন, “আামি মুহূর্তমাত্র ইতস্তত না করে বলতে পারি, ব্রিটিশ ভারতের কৃষিজীবী প্রজার অর্ধাংশ সারা বছরের মধ্যে একদিনও পেট ভরে খেতে পায় না। ক্ষুধার সম্পূর্ণ নিবৃত্তিতে যে কি সুখ, তা এরা কখনও জানতে পারে না।”

ভারতের কৃষি সংকটের ফলে লোকক্ষয়

  • (১) ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের, বিশেষত শেষ ত্রিশ বছরের এই অতি ভয়ঙ্কর কৃষক-শোষণের অনিবার্য পরিণতি ঘটেছে সাধারণ লোকক্ষয়ে এবং লোকক্ষয়কারী মহাদুর্ভিক্ষে।
  • (২) উনবিংশ শতাব্দীর অষ্টম ও নবম দশকে বেরার প্রদেশে ৬ লক্ষ ৮০ হাজার, পাঞ্জাব প্রদেশে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার, মধ্যপ্রদেশে ১৩ লক্ষ ৭০ হাজার, এবং এলাহাবাদে, গোরক্ষপুরে ও বারাণসী জেলার ১২ লক্ষ ৪৪ হাজার লোকক্ষয় হয়।
  • (৩) সমগ্র ভারতবর্ষে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ৩১ লক্ষ ২৮ হাজার ৬ শ ৩১ জনের এবং ১৮৯১ খ্রীষ্টাব্দে ৮০ লক্ষ ৩৪ হাজার ১ শ ৫৫ জনের মৃত্যু ঘটেছিল।

ভারতে দুর্ভিক্ষ

  • (১) ব্রিটিশ শাসনকালের প্রথম হতেই ভারতবর্ষ স্থায়ী দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ বছরে দুর্ভিক্ষের অবস্থা চরম আকার ধারণ করে। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম ভাগে ১৮০১-১৮২৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে দুর্ভিক্ষে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।
  • (২) ১৮৩০-১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ পৰ্যন্ত ১৬ বছরে ভারতবর্ষে ৬ বার ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছিল এবং ৫ লক্ষাধিক ভারতবাসী মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল মাত্র ৭ বার এবং তাতে মোট ১২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।
  • (৩) ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ২৪ বার এবং তার ফলে মৃত্যু ঘটেছিল ২ কোটি ২৫ লক্ষ মানুষের। এই ২৪টি দুর্ভিক্ষের ১৮টি দেখা দিয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ২৫ বছরে।

ভারতের দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে হান্টারের মন্তব্য

ঐতিহাসিক হান্টার লিখেছেন, “প্রকৃত দুর্ভিক্ষের সময় সরকার বহু কষ্টে অনশন পীড়িত মানুষের প্রাণরক্ষার চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু নিত্য-অনশনক্লিষ্ট প্রজাসমূহ যে প্রতিবছসর বিভিন্ন রোগের আক্রমণে অসময়ে ইহলোক ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে, তার কোনো প্রতিকার করতে সরকার অসমর্থ।

ভারতে কৃষি সংকটের ফলে কৃষক বিদ্রোহ

কৃষি ও কৃষক-সম্প্রদায়ের এই চরম বিপর্যয় অনিবার্যভাবেই ভারতব্যাপী কৃষক-বিদ্রোহ আসন্ন করে তোলে। ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তের ‘পাবনা (সিরাজগঞ্জ) বিদ্রোহ’ এবং অপর প্রান্তে ‘দাক্ষিণাত্য-বিদ্রোহ’ ভারতবর্ষব্যাপী কৃষকের সেই মহাবিদ্রোহের অগ্নিময় ইঙ্গিত বহন করে আনে। ভারতের ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী সেই ভয়ঙ্কর ইঙ্গিতে দিশাহারা হয়ে পড়ে।

উপসংহার :- ব্রিটিশ শাসন আর ভারতীয় শোসকগোষ্ঠীকে রক্ষা করবার উদ্দেশ্যেই “একটা কিছু” করবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম কর্তৃক ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণই ছিল সেই “একটা কিছু” করবার শশব্যস্ত প্রয়াস।

(FAQ) ভারতের কৃষি সংকট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতের কৃষির ভয়ঙ্কর চিত্র লক্ষ্য করা যায় কখন?

উনিশ শতকের শেষ দিকে।

২. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কে কখন প্রবর্তন করেন?

লর্ড কর্ণওয়ালিশ।

৩. ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় কোন ইংরেজ ব্যক্তই?

এ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম।

Leave a Comment