উপনিবেশ দখলে কাড়াকাড়ি

উপনিবেশ দখলে কাড়াকাড়ি প্রসঙ্গে উপনিবেশের বিলুপ্তি, উপনিবেশ দখল সম্পর্কে অ্যাডাম স্মিথের মন্তব্য, নয়া সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশ দখলে ফ্রান্স, উপনিবেশ দখলে ইংল্যান্ড, উপনিবেশ দখলে রাশিয়া, উপনিবেশ দখলে ইতালি, উপনিবেশ দখলে বেলজিয়াম ও উপনিবেশ দখলে জার্মানির উদ্যোগ সম্পর্কে জানবো।

উপনিবেশ দখলে কাড়াকাড়ি

ঐতিহাসিক ঘটনাউপনিবেশ দখলে কাড়াকাড়ি
আমেরিকার স্বাধীনতা১৭৮৩ খ্রি
নয়া সাম্রাজ্যবাদ১৮৭০-১৯১৪ খ্রি
অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশআফ্রিকা
রুশ-জাপান যুদ্ধ১৯০৪-০৫ খ্রি
Realpolitikবিসমার্ক
ইথিওপিয়া জয়মুসোলিনি
উপনিবেশ দখলে কাড়াকাড়ি

ভূমিকা :- ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে কিছুকাল উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলি ও জনমত কিছুটা বিরূপ ছিল। এই সময়ে ইউরোপের বহু ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে।

উপনিবেশের বিলুপ্তি

১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় ব্রিটিশ উপনিবেশ ইংল্যান্ডের অধীনতা পাশ থেকে মুক্ত হয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফ্রান্স তার আমেরিকাস্থিত উপনিবেশগুলি হারায়। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে স্পেন হারায় তার দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশসমূহ, ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ব্রাজিল পোর্তুগালের অধীনতা থেকে মুক্তি লাভ করে।

উপনিবেশ দখল সম্পর্কে অ্যাডাম স্মিথের মন্তব্য

অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ মন্তব্য করেছিলেন উপনিবেশগুলি থেকে যা লাভ হয়, তার তুলনায় উপনিবেশগুলির ব্যয় বেশি। তাই দেখা যায় ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স তার উপনিবেশগুলি উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

নয়া সাম্রাজ্যবাদ

ব্লাডস্টোনের বিশ্বাস ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ভেঙে যাবে। কিন্তু মাত্র অর্ধশতক বিরতির পর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের সেডানের যুদ্ধের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী প্রয়াস ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে উত্তাল করে তুলেছিল। তাই ১৮৭০-১৯১৪ কালপর্বের সম্প্রসারণবাদ ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে পরিচিত।

উপনিবেশ দখলে ফ্রান্স

  • (১) ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দূরপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতে সাম্রাজ্যবাদের প্রসার ঘটে। ১৮৫৮ সাল থেকেই দূরপ্রাচ্যে আনাম, কোচিন-চিন, টংকিং ও কম্বোডিয়ার ওপর ফরাসি আধিপত্য স্থাপিত হয়েছিল। এই চারটি রাজ্যের সমন্বয়ে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয় ফরাসি-ইন্দোচিন। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে এর সাথে যুক্ত হয় লাওস। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে টিউনিসিয়াতেও ফরাসি উপনিবেশ স্থাপিত হয়।
  • (২) ইন্দোচিন ফ্রান্সের কাছে রবার উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে যথেষ্ট লাভজনক ও মর্যাদাকর ছিল। এখানকার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো উন্নতির কাজে অর্থলগ্নি করে ফরাসি ব্যাঙ্কার ও বণিকরা প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। আলজেরিয়ায় ইতিপূর্বেই ফরাসি বসতি স্থাপন করেছিল। ১৯১২ সালে তারা মরক্কো দখল করে।
  • (৩) ১৮৯০-এর দশকে মধ্য আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইঙ্গ-ফরাসি বিরোধ তীব্রতর হয়। ফরাসিরা উপনিবেশগুলির জনগণকে ফরাসিকরণের চেষ্টা করলে উপনিবেশগুলিতে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়।

উপনিবেশ দখলে ইংল্যান্ড

  • (১) অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ আফ্রিকা ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত ইউরোপীয়দের কাছে অজ্ঞাত ছিল। উত্তর উপকূলে তুর্কী, ট্রান্সভালে ব্রিটিশ ও আলজেরিয়ায় ফরাসিদের উপনিবেশ ছিল। মিশরে পাশা মহম্মদ আলির মৃত্যুর পর দুর্বল উত্তরাধিকারীদের অপদার্থতার সুযোগে ব্রিটিশরা মিশরে আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হয়।
  • (২) ১৮৭৬ সালে সুয়েজ খাল এলাকায় ইঙ্গ-ফরাসি যৌথ নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হয়। তবে ১৮৮২ সালে এককভাবে ইংল্যান্ড মিশর দখল করে এবং খেদিভের নেতৃত্বে একটি পুতুল সরকার গঠন করে মিশর ও সুয়েজ খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এই কর্তৃত্ব ইংরেজরা ধরে রেখেছিল।
  • (৩) সুদানেও ব্রিটিশরা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে জনৈক মহম্মদ আমেদ নিজেকে ‘মাহদি’ বা ‘ত্রাণকর্তা’ রূপে ঘোষণা করে শ্বেতাঙ্গবিরোধী আন্দোলন করে রাজধানী খার্টুম দখল করে নেন। কিন্তু ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড কিচেনারের নেতৃত্বে ইংরেজরা ক্ষমতা পুনঃস্থাপন করে।
  • (৪) পশ্চিম আফ্রিকা, উগাণ্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ইংরেজরা আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে অরেঞ্জ কলোনি ও ট্রান্সভালের বুয়র রাজ্য দুটি ইংরেজরা দখল করে। এর ফলে বুয়র যুদ্ধ শুরু হয়। তবে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা ট্রান্সভাল এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট’-এর স্বাধীনতা মেনে নেয়। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সংঘাতের পর বুয়র প্রজাতন্ত্রগুলিকে ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকার অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করে ইংরেজরা।

উপনিবেশ দখলে রাশিয়া

  • (১) সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে রাশিয়া তার সাম্রাজ্য স্থলভূমিকে কেন্দ্র করেই বিস্তার করেছিল। গোটা ঊনবিংশ শতক ধরে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়া অঞ্চলে তার উপনিবেশ বিস্তার করেছিল। ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে এই অঞ্চলে শাসন ব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়।
  • (২) ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া উত্তর চিনের উপকূলে পোর্ট আর্থার দখল করে। এই বন্দরটি বরফমুক্ত হওয়ায় রাশিয়া সারা বছর প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়। এরপর কোরিয়ার দিকে দৃষ্টি দিলে রুশ-জাপান যুদ্ধ (১৯০৪-০৫ খ্রি.) হয়। এতে জাপানের কাছে পরাজিত রাশিয়ার পক্ষে বৃহত্তর রুশ সাম্রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়।

উপনিবেশ দখলে ইতালি

  • (১) ইতালির কাছে প্রাথমিকভাবে সাম্রাজ্য ছিল জাতীয় গৌরব ও মর্যাদার প্রতীক। ইতালির লক্ষ্য ছিল উত্তর আফ্রিকায় সাম্রাজ্য বিস্তার। কিন্তু ফ্রান্সের টিউনিসিয়া দখল তাকে হতাশ করে। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে ইতালি প্রথম লোহিত সাগর অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। এরপর ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে মাসোয়া এবং ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ইরিত্রিয়া দখল করে।
  • (২) সোমালিল্যান্ডের একাংশে ইতালির শাসন প্রবর্তিত হয়। কিন্তু ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ইথিওপিয়া দখলে ব্যর্থ হয়, যা তার জাতীয় মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে লিবিয়া জয় করে এবং ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনি ইথিওপিয়া জয় করে পূর্ব পরাজয়ের প্রতিশোধ নেন।

উপনিবেশ দখলে বেলজিয়াম

  • (১) বেলজিয়াম রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের উদ্যোগে স্ট্যানলি, লিভিং স্টোন প্রমুখ অভিযাত্রী আফ্রিকার ‘আবরণ উন্মোচনে’ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন।
  • (২) ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ‘আন্তর্জাতিক আফ্রিকা সংঘ’ গঠন করা হয় এবং স্ট্যানলির নেতৃত্বে এই সমিতি নাইজার নদীর উপত্যকায় কঙ্গোর খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিতে বেলজিয়ামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে গঠিত ‘Congo Free State’-এ প্রকৃতপক্ষে বেলজিয়ামের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়।
  • (৩) ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের বার্লিন সমাবেশের মাধ্যমে কঙ্গোর বৃহত্তর অংশে বেলজিয়ামের আধিপত্য স্বীকৃত হয় এবং আফ্রিকাকে বৃহৎ শক্তিগুলি ভাগ-বাঁটোয়ারা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

উপনিবেশ দখলে জার্মানি

  • (১) জার্মানির ঐক্য দেরিতে সম্পূর্ণ হওয়ায় তারা সভ্যতার অভিযানে দেরিতে যোগ দিয়েছিল। তাদের ঔপনিবেশিকতাবাদের মুখ্য উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি ছিল না, জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধি ছিল।
  • (২) ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে ও বিংশ শতকের সূচনালগ্নে জার্মানি দ্রুতগতিতে দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা, টাঙ্গানিকা, ক্যামেরুন, লুসিয়া উপসাগরীয় অঞ্চল ইত্যাদি অধিকার করে। তবে জাতীয় মর্যাদার প্রতীক এই অঞ্চলগুলি অর্থনৈতিক দিক থেকে তেমন লাভজনক ছিল না।
  • (৩) বিসমার্কের ‘Realpolitik’-এর পরিবর্তে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের ‘Weltpolitik’ নীতি গ্রহণ জার্মানিকে ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সঙ্গে ভবিষ্যত সংঘাতের দিকে অগ্রসর করে।

উপসংহার :- প্রথমদিকে নতুন দেশগুলি থেকে সম্পদ সংগ্রহ, বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জন প্রভৃতি মূল উদ্দেশ্য হলেও ক্রমে নতুন দেশগুলি দখল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় দেশগুলি সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে ধীরে ধীরে নতুন দেশগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের ওপর নিজেদের শাসন চাপিয়ে দেয়। এভাবে বিজিত সেইসব দেশগুলি শক্তিশালী এবং বিজয়ী ইউরোপীয় দেশগুলির উপনিবেশে পরিণত হয়।

(FAQ) বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কোন সময়কে নয়া সাম্রাজ্যবাদের যুগ বলা হয়?

১৮৭০-১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ।

২. অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ কাকে বলা হয়?

আফ্রিকা।

৩. রুশ জাপান যুদ্ধ কখন হয়?

১৯০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে।

৪. কত খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা ইংল্যান্ডের নিকট স্বাধীনতা লাভ করে?

১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment