মধ্য এশিয়া

ঐতিহাসিক স্থান মধ্য এশিয়া প্রসঙ্গে ভারতীয় সভ্যতা, খোটান শহরের প্রতিষ্ঠা, প্রাকৃত ভাষা, খোটানে ভারতীয় সভ্যতা, খোটানে ধর্ম ও সাহিত্যের ভাষা, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার, হিউয়েন সাঙের বিবরণ ও এখানকার শিল্পকলা সম্পর্কে জানবো।

ঐতিহাসিক স্থান মধ্য এশিয়া

ঐতিহাসিক স্থানমধ্য এশিয়া
শহরখোটান, কুচা, তুরফান
ধর্ম ও সাহিত্যের ভাষাসংস্কৃত
বৌদ্ধ ও সংস্কৃতকেন্দ্রকুচা
চিত্রশিল্পহাজার বুদ্ধের গুহা
ঐতিহাসিক স্থান মধ্য এশিয়া

ভূমিকা :- এশিয়া মহাদেশের একটি বিশাল ভূ-বেষ্টিত অঞ্চল হল মধ্য এশিয়া। অঞ্চলটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জাতি, দ্রব্য ও সাংস্কৃতিক ধারণাসমূহের আদানপ্রদানের অঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় সভ্যতা

এক সময়ে সমস্ত মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল। তার মধ্যে খোটান, কুচা ও তুরফান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মধ্য এশিয়ায় খোটান শহরের প্রতিষ্ঠা

প্রবাদমতে সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে একদল ভারতবাসী উত্তর-পশ্চিম ভারত (সম্ভবত কাশ্মীর অঞ্চল) থেকে গিয়ে খোটান শহর প্রতিষ্ঠা করে।

মধ্য এশিয়ায় প্রাকৃত ভাষা

উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রচলিত প্রাকৃতভাষা খোটান ও পার্শ্ববর্তী স্থানগুলিতে খ্রিস্টীয় কয়েক শতাব্দী ধরে কথ্যভাষা ছিল। শাসন-ব্যবস্থার জন্যও ঐ প্রকৃতভাষাই ব্যবহৃত হত।

মধ্য এশিয়ার খোটানে ভারতীয় সভ্যতা

সেই যুগে ভারতীয় নামধারী ‘বিজিত’ উপাধি সম্পন্ন রাজারা রাজত্ব করতেন। অতএব খোটান খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে কয়েকশ বছর ভারতীয় উপনিবেশ ছিল।

মধ্য এশিয়ার খোটানে ধর্ম ও সাহিত্যের ভাষা

  • (১) ফরাসী পণ্ডিত রেনে গ্রুসের মতে খোটানের ধর্ম ও সাহিত্যের ভাষা ছিল সংস্কৃত। কিন্তু খোটানে প্রাপ্ত প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপি প্রাকৃত ভাষায় খরোষ্ঠী লিপিতে লিখিত ধম্মপদ।
  • (২) জনসাধারণের ভাষা ছিল প্রাকৃত, তাদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের মহৎভাব প্রচারের জন্যই ঐ ভাষায় ধম্মপদ লিখিত হয়েছিল। খোটানে সংস্কৃত, প্রাকৃত ও খোটানী ভাষায় লিখিত অনেক পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে।
  • (৩) ঐ সব পুস্তক থেকে ভারতীয় সভ্যতার সর্বাঙ্গীন প্রভাব বেশ উপলব্ধি করা যায়। খোটানে প্রথমে খরোষ্ট্রীলিপিই ছিল, পরে পঞ্চম শতাব্দীতে ব্রাহ্মীলিপিও প্রবর্তিত হয়।

মধ্য এশিয়ার খোটানে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার

মনে হয় এখানেও হিন্দুধর্ম প্রথমে প্রভাব বিস্তার করে, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মই আপামর জনসাধারণের ধর্ম হয়ে ওঠে। হিন্দুধর্মের নিদর্শন খুব কমই পাওয়া গিয়েছে।

মধ্য এশিয়ার খোটানে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপকতার নিদর্শন

শীলমোহরে কুবেরের মূর্তি প্রাপ্তি থেকে মনে হয় এক সময় সেখানে কুবেবের উপাসনা প্রচলিত ছিল। এ ছাড়া গণেশের চিত্রও রয়েছে। রামায়ণেরও এক সংস্করণ মধ্য-এশিয়ায় পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রাপ্ত অধিকাংশ চিত্র ও ভাস্কর্য এবং পুস্তক বৌদ্ধধর্মের ব্যাপকতার নিদর্শন।

মধ্য এশিয়ার খোটানে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠা

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে বৌদ্ধধর্ম খোটানে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বৌদ্ধ শ্রমণ বৈরোচন তৎকালীন রাজা বিজয়সম্ভবকে বৌদ্ধমতাবলম্বী করেন এবং তার সহায়তার প্রথম বৌদ্ধবিহার তৈরি।

মধ্য এশিয়ার খোটানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ম্লান

পঞ্চম শতাব্দীতে পূর্ব তিব্বতীয় এক জাতির আক্রমণ ও ধ্বংসলীলার ফলে কিছুদিনের জন্য খোটানে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব স্নান হয়। পুনরায় কাসগর থেকে অনেক ভিক্ষু এসে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করেন।

মধ্য এশিয়া সম্পর্কে হিউয়েন সাঙের বিবরণ

হিউয়েন সাঙ মধ্য এশিয়ার পথে চীন থেকে ভারতে এসেছিলেন, ফিরেছিলেনও মধ্য-এশিয়া হয়ে। তাঁর বিবরণ থেকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বেশ জানা যায়। তিনি ফিরবার পথে খোটানে যান। সে সময় খোটানে একশত বৌদ্ধবিহার এবং পাঁচহাজার ভিক্ষু ছিল।

মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব ম্লান

১০০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি মুসলমান বিজয়ের ফলে খোটানে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব ম্লান হয়।

বহির্ভারতের অংশবিশেষ মধ্য এশিয়ার কুচা

ধর্ম, সাহিত্য ও শিল্পকলা এই তিন দিক দিয়ে কুচা সম্পূর্ণরূপে বহির্ভারতের অংশবিশেষ ছিল। কুচা বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতচর্চার এক বড় কেন্দ্র ছিল।

মধ্য এশিয়ার কুচার বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী

  • (১) বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কুমারজীব (৩৪৪-৪১৩ খ্রি) কুচার অধিবাসী। তাঁর পিতা ছিলেন কুচার এক ভারতীয় বাসিন্দা এবং মা ছিলেন ঐ দেশের এক রাজকন্যা।
  • (২) তিনি বেদ থেকে আরম্ভ করে বৌদ্ধ ধর্মপুস্তকসমূহ কাশ্মীরে অধ্যয়ন করেন। তিনি কুচায় এবং চীন দেশে সদধর্মপুণ্ডরীক ও অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মপুস্তক অনুবাদ করে বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারে অশেষ সাহায্য করেন।
  • (৩) সিলভাঁ লেভির মতে যে সমস্ত অনুবাদক ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের ভাবধারা চীনদেশে প্রচার করেছেন তাদের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ। হিউয়েন সাঙের মতে তিনি এই কাজেই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। কুচার মাধ্যমে বহু সংস্কৃত পুস্তক পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করেছে।

হিউয়েন সাঙের আগমনকালে মধ্য এশিয়ার কুচার রাজা

হিউয়েন সাঙ যখন কুচা হয়ে আসেন তখন সুবর্ণদেব (স্থানীয় টোখারী ভাষায় স্বর্ণ-টেপ) সেখানকার রাজা ছিলেন। তাঁর পিতা এবং পূর্ববর্তী রাজা ছিলেন সুবর্ণপুষ্প। গোবী অঞ্চলের অন্যান্য টোখারী রাজার মতো সুবর্ণদেবও একজন নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ ছিলেন।

হিউয়েন সাঙের আগমনকালে মধ্য এশিয়ার কুচার রাজগুরু

সে সময় কুচায় ভিক্ষু সংখ্যা পাঁচহাজারের কম ছিল না, তাদের মধ্যে স্থবির মোক্ষগুপ্ত ছিলেন রাজগুরু।

মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রস্থল তুরফান

তুরফানও বৌদ্ধধর্মের এক বড় কেন্দ্রস্থল ছিল। অশ্বঘোষের নাটক ‘সারিপুত্র প্রকরণ’, কুমারলাতের গল্পপুস্তক ‘কল্পনামণ্ডিতিকা’র অংশবিশেষ, আরো অন্যান্য পুস্তক এবং বহু উচ্চাঙ্গের চিত্র তুরফানে আবিষ্কৃত হয়েছে।

মধ্য এশিয়ার তুরফানে হিউয়েন সাঙের আগমন

হিউয়েন সাঙ যখন ভারতে আসবার পথে তুরফান যান তখন সেখানকার বৌদ্ধরাজা তাঁকে বৌদ্ধবিহারসমূহের প্রধান করে রাখতে চান। তিনি সম্মত না হলে ভয় দেখিয়েও রাখবার চেষ্টা করেন। অবশেষে হিউয়েন সাঙ চারদিন উপবাসী থাকার ফলে রাজা ভীত হয়ে তাঁকে আসবার অনুমতি দেন।

মধ্য এশিয়ার কারাসার

কুচা ও তুরফানের মধ্যবর্তী কিন্তু কতকটা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত কারাসারও (প্রাচীন নাম অগ্নিদেশ) বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্র ছিল। কারাসারের রাজাদের মধ্যে ইন্দ্রার্জুন, চন্দ্রার্জুন প্রভৃতি নাম পাওয়া যায়।

হিউয়েন সাঙের বিবরণে মধ্য এশিয়ায় বৌদ্ধ রাজ্যের নাম

  • (১) হিউয়েন সাঙ মধ্য এশিয়ার অনেক রাজ্যের নাম করেছেন যেখানে বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ছিল, তার মধ্যে তুর্কীজাতীয় খানের রাজত্ব ও বহুলীক উল্লেখযোগ্য।
  • (২) বহুলীক সেই সময় নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ মতাবলম্বী ছিল। তখন সেখানে একশ বৌদ্ধবিহার ও তিন হাজার সন্ন্যাসী ছিল। সম্রাট অশোকের সময়েই  বহুলীকে ভিক্ষুরা বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। সম্ভবত বহুলীক থেকে প্রাচীনকালেই বৌদ্ধধর্ম সগদিয়ানায় প্রবর্তিত হয়।

মধ্য এশিয়ার রাজা খান টোপো

রাজা খান টোপো ৫৮০ খ্রিস্টাব্দে গান্ধারদেশীয় সন্ন্যাসী জীনগুপ্তের প্রভাবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর রাজত্ব একদিকে চীনদেশের সিনকিয়াং প্রদেশ থেকে অপরদিকে বর্তমান সোভিয়েত রাশিয়ার সেমিরিয়াচিনক্ষে পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

মধ্য এশিয়ার শিল্পকলা

শিল্পকলার দিক দিয়ে পূর্ব-চীনী-তুর্কীস্থানের টুনহুয়াঙ্গে অবস্থিত প্রাচীন ‘হাজার বুদ্ধের গুহা’ থেকে আবিষ্কৃত চিত্রশিল্প বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ভারতবর্ষের পক্ষে অজন্তা যেমন, চীনের পক্ষেও ঐ স্থান তেমনি চিত্রশিল্পের জন্য গৌরবময়। বৌদ্ধধর্মই এই শিল্পের উৎস।

সভ্যতার এক উচ্চস্তরে মধ্য এশিয়ার অবস্থান

মোটকথা এক সময় সমস্ত মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় ধর্ম, সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রভাব ব্যাপক ছিল এবং ঐ অঞ্চল সভ্যতার এক উচ্চস্তরে অবস্থিত ছিল।

উপসংহার :- দুর্ভাগ্যের বিষয় প্রকৃতির নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপে মধ্য এশিয়ার অনেক স্থানই আজ জনমানবশূন্য অনুর্বর প্রদেশে পরিণত হয়েছে। অবশিষ্ট স্থানগুলিও বর্তমান জগতের ইতিহাসে কোনো স্থান অধিকার করে না – শুধু অতীত স্মৃতিচিহ্ন বক্ষে ধারণ করে আছে।

(FAQ) মধ্য এশিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মধ্য এশিয়ার প্রধান তিনটি অঞ্চল কি কি ছিল?

খোটান, কুচা ও তুরফান।

২. মধ্য এশিয়ার প্রধান সংস্কৃত ও বৌদ্ধ কেন্দ্র কোথায় ছিল?

খোটান।

৩. মধ্য এশিয়ার পথে ভারতে আসেন আবার ফিরে যান কোন চীনা পর্যটক?

হিউয়েন সাঙ।

৪. মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত শিল্পকলার নিদর্শন কোনটি?

হাজার বুদ্ধের গুহা।

Leave a Comment