নাৎসি দলের সাফল্য

হিটলারের নাৎসি দলের সাফল্য প্রসঙ্গে ভার্সাই সন্ধি, কমিউনিস্ট ভীতি, অর্থনৈতিক সংকট, ইহুদি বিদ্বেষ, রাজনৈতিক দলগুলির দুর্বলতা, বিভিন্ন দিক থেকে সাহায্য ও হিটলারের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানবো।

হিটলারের নাৎসি দলের সাফল্য

ঐতিহাসিক ঘটনা হিটলার বা নাৎসি দলের সাফল্য
স্থান জার্মানি
সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কাল
পতন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ কালে
হিটলার বা নাৎসি দলের সাফল্য

ভূমিকা:- নাৎসি দল তথা হিটলারের সাফল্য ছিল অতি দ্রুত ও চমকপ্রদ। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আত্মজীবনী প্রকাশের মাত্র নয় বছরের মধ্যে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি জার্মানির ‘ফ্যুয়েরার বা সর্বোচ্চ শাসকে পরিণত হন।

নানা বিতর্ক

তাঁর এই সাফল্যের কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর, অধ্যাপক ব্রেকার, অধ্যাপক আর্নেস্ট ফ্রাঙ্কেল, অধ্যাপক এলান বুলক, রিটার, পিনসন, মরিস বুমন্ট প্রমুখ ঐতিহাসিকরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। এইসব জটিল বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে হিটলারের সাফল্যের কারণগুলি সম্পর্কে সাধারণভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।

ভার্সাই সন্ধি

  • (১) ফরাসি ঐতিহাসিক মরিস বুমন্ট, জার্মান ঐতিহাসিক ব্যারাক, অধ্যাপক ই. এইচ. কার প্রমুখ মনে করেন যে, হিটলারের সাফল্যের প্রধান কারণ হল জার্মান জাতির উপর অপমানজনক ভার্সাই সন্ধি আরোপ।
  • (২) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় এবং তারপর ভার্সাই সন্ধির গ্লানি জার্মান জাতির আত্মমর্যাদায় তীব্র আঘাত হানে। শুরু থেকেই জার্মান দেশপ্রেমিকরা এই সন্ধির বিরোধিতা করতে থাকে এবং নাৎসি দল এই সন্ধির বিরোধিতা করেই পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসে।
  • (৩) অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর বলেন যে, ভার্সাই সন্ধির বিরুদ্ধে যতটা প্রচার করা হয়, ভার্সাই সন্ধি ততটা নির্মম বা জার্মান স্বার্থ-বিরোধী ছিল না। এর অনেকগুলি শর্ত সংশোধিত হয়েছিল এবং বহু শর্তের কোনও প্রয়োগই হয় নি।
  • (৪) ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ভার্সাই সন্ধি সম্পাদন এবং ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হিটলারের ক্ষমতা লাভের মধ্যে চোদ্দো বছরের ব্যবধান ছিল। ততদিনে ভার্সাই চুক্তির বিরোধী জার্মান জাতির প্রতিশোধ-স্পৃহা ধূসর হয়ে যায়।
  • (৫) বলা বাহুল্য, অধ্যাপক টেলর-এর মত গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ ভার্সাই সন্ধি আত্মগর্বী জার্মান জাতির মর্যাদায় যে আঘাত হেনেছিল এবং জনজীবনে যে সংকটের সৃষ্টি করেছিল চোদ্দো বছরের মধ্যে তা ভোলা সম্ভব ছিল না।

(খ) কমিউনিস্ট ভীতি

  • (১) কমিউনিস্টদের সম্পর্কে জার্মানদের মনে প্রবল ভীতি ছিল। কমিউনিস্ট নেতৃত্বে কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন, শিল্প ধর্মঘট প্রভৃতিকে সাধারণ মানুষ এবং শিল্পপতি ও ভূস্বামীরা ভালো নজরে দেখে নি। তারা মনে করত যে, একমাত্র নাৎসিরাই কমিউনিস্টদের প্রতিহত করতে পারে।
  • (২) ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে রাইখস্ট্যাগে কমিউনিস্টদের সংখ্যা ছিল ৭৭ জন। ১৯৩২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০। সাধারণ মানুষ এটা মানতে পারে নি। এই কারণে তারা নানাভাবে নাৎসিদের সাহায্য করে। ধনী শিল্পপতিদের অর্থানুকূল্যে জার্মানির বিভিন্ন শহরে নাৎসি দলের শাখা গড়ে উঠতে থাকে।

(গ) অর্থনৈতিক সংকট

  • (১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে প্রবল অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দুষ্প্রাপ্যতা ও অগ্নিমূল্য, সীমাহীন বেকারত্ব, শিল্প ধর্মঘট প্রভৃতির ফলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
  • (২) এই অবস্থায় হিটলার বেকারদের কর্মসংস্থান, করভাবে নিপীড়িত কৃষকদের কর মকুব ও শিল্পপতিদের শিল্পে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়ে নিজ দলে টানেন। এইসব মানুষ সর্বতোভাবে তাঁর সমর্থনে অগ্রসর হয়।
  • (৩) হিটলারের উত্থান -এর মূলে অনেকে বিশ্বব্যাপী মন্দার কথা বলেন। বলা বাহুল্য, এ মত ঠিক নয়। অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর বলেন যে, বিশ্বব্যাপী মন্দার অনেক আগেই জার্মান রাজনীতিতে জটিলতার সূচনা হয় এবং এই অর্থনৈতিক মন্দা দিয়ে হিটলারের উত্থানের ব্যাখ্যা করা যায় না।

(ঘ) ইহুদি বিদ্বেষ

  • (১) হিটলারের ইহুদি-বিদ্বেষ ও ইহুদি বিতাড়ন নীতি উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদীদের আকৃষ্ট করেছিল। তৎকালীন জার্মানিতে সংখ্যালঘু ইহুদিরা ছিল ধনী, সমৃদ্ধশালী ও উচ্চশিক্ষিত। তারা উচ্চপদে চাকরি করত এবং জার্মান অর্থনীতি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। অধিকাংশ জার্মান জার্মানির সকল দুর্দশার জন্য তাদের দায়ী করত।
  • (২) এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে হিটলার ইহুদি-বিরোধী প্রচারে নামেন এবং ইহুদিদের জার্মান জাতির শত্রু বলে চিহ্নিত করে তাদের জার্মানি থেকে বিতাড়িত করার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে থাকেন।

(ঙ) রাজনৈতিক দলগুলির দুর্বলতা

  • (১) জার্মানির অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি হিটলারের উত্থানে সাহায্য করে। সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে কোনও ঐক্য ছিল না। পারস্পরিক বিরোধিতায় রাজনৈতিক দলগুলি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
  • (২) জার্মান সংসদে ছোটো ছোটো দলগুলি সংসদীয় রীতি-নীতি ঠিকমতো মেনে চলত না। সরকারি নেতৃবৃন্দ চরম দক্ষিণপন্থী ও চরম বামপন্থীদের দমন করে প্রজাতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।
  • (৩) বামপন্থীদের দমন করা সম্ভব হলেও দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদীদের দমন করা যায় নি, কারণ দেশবাসী তা চায় নি। এইসব কারণেই জার্মানিতে কোনও সরকার স্থায়ী হয় নি। ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে জার্মানিতে ২১ টি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।

(চ) বিভিন্ন দিক থেকে সাহায্য লাভ

এই সময় বামপন্থী দলগুলির মধ্যে কোনও ঐক্য ছিল না। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থী দলগুলি বামপন্থীদের বিরুদ্ধে হিটলারকে নানাভাবে মদত দিত। অভিজাত সম্প্রদায়, ভূস্বামী, শিল্পপতি ও সামরিক বাহিনী হিটলারকে নানাভাবে সাহায্য করত।

(ছ) হিটলারের ব্যক্তিত্ব

নাৎসি দলের সাফল্যে হিটলারের কর্মদক্ষতা, সাংগঠনিক শক্তি, বাগ্মিতা ও নেতৃত্বের ভূমিকা কম নয়। তাঁর আবেগপ্রবণ বক্তৃতা জনমনে প্রবল উন্মাদনার সৃষ্টি করত। ওয়েমার প্রজাতন্ত্র -এর উপর বীতশ্রদ্ধ দেশবাসীর সামনে হিটলার জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হন। দেশবাসী তাঁকে সাদরে বরণ করে।

টেলরের মন্তব্য

অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর এ সম্পর্কে অন্য কথা বলেন। তাঁর মতে, হিটলারের ব্যক্তিত্ব ও বাগ্মিতাই যদি নাৎসি দলের সাফল্যের কারণ হয় তাহলে তাদের ক্ষমতা লাভ করতে অত বিলম্ব হল কেন? তাঁর মতে, আসলে তিনের দশকে জার্মানির জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত হিটলারের উত্থানকে সহজ করে তোলে।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক জিওফ্রে ব্যারাক বলেন যে, হিটলারের শক্তি নিহিত ছিল সুবিধাভোগী শ্রেণি, শিল্পপতি, ভূস্বামী ও সেনাদলের সমর্থনের মধ্যে। ধনতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণির সমর্থন ব্যতীত হিটলারের উত্থান সম্ভব হত না।

(FAQ) হিটলারের নাৎসি দলের সাফল্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. হিটলার কবে জার্মানির সর্বোচ্চ শাসকে পরিণত হন?

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে।

২. জার্মানির সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে হিটলার কি উপাধি ধারণ করেন?

ফ্যুয়েরার।

৩. হিটলারের প্রতিষ্ঠিত দলের নাম কি?

নাৎসি পার্টি।

Leave a Comment