সাতবাহন যুগে সমাজ ও ধর্ম

সাতবাহন যুগের সমাজ ও ধর্ম প্রসঙ্গে জাতিভেদ প্রথা, জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা, ধর্ম ব্যবস্থা, বৌদ্ধ ধর্মে অনুরক্তি, বিহারের জন্য গ্ৰাম ও অর্থ দান এবং ধর্ম সহিষ্ণুতা সম্পর্কে জানবো।

সাতবাহন যুগে সমাজ ও ধর্ম

বিষয় সাতবাহন যুগে সমাজ ও ধর্ম
সাম্রাজ্য সাতবাহন সাম্রাজ্য
প্রতিষ্ঠাতা সিমুক
শ্রেষ্ঠ রাজা গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী
শেষ রাজা যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী
ধর্ম বৈদিক হিন্দু ধর্ম
সাতবাহন যুগে সমাজ ও ধর্ম

ভূমিকা :- সাতবাহন রাজারা বর্ণাশ্রম ধর্ম ও জাতিভেদ প্রথার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে নাসিক প্রশস্তিতে দাবী করা হয়েছে। গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী চিরাচরিত চারটি জাতিকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেন এবং উপজাতির উদ্ভব বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

জাতিভেদ প্রথা

সাতবাহন রাজ্যে বৃত্তির ভিত্তিতে সামাজিক শ্রেণী বিভাগ করা হত। চারটি শ্রেণীর নাম ছিল –

  • (১) মহারথী, মহাভোজ প্রভৃতি সামন্তশ্রেণী,
  • (২) অমাত্য, মহামাত্র প্রভৃতি কর্মচারী, নিগম বা ব্যবসায়ী শ্রেণী, সার্থবাহ এবং বণিক ও শ্রেষ্ঠীশ্রেণী;
  • (৩) লেখক, বৈদ্য, হলকিয় বা কৃষক, সুককি প্রভৃতি ছিল তৃতীয় শ্রেণী,
  • (৪) বর্ধকী বা সূত্রধর, মালাকার, লৌহ বণিক বা কর্মকার ও মৎস্য জীবিকা ছিল চতুর্থ শ্রেণী।

জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা

  • (১) সাতবাহন রাজারা বিভিন্ন শ্রেণীর পার্থক্য রক্ষা করার চেষ্টা করতেন বলে জানা যায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সাতবাহন যুগে জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সাতবাহন গৌতমীপুত্রের পুত্রকে শক রাজকন্যার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য হতে হয়েছিল।
  • (২) সাতবাহন রাজারা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবী করলেও ক্ষত্রিয়ের মতই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজ্য শাসন করেছেন। সাতবাহন রাজারা উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্মের অনুরাগী হলেও দক্ষিণের স্থানীয় অধিবাসী প্রথাকে অস্বীকার করতে পারেন নি।
  • (৩) মোট কথা, সাতবাহন রাজারা যেমন উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি দক্ষিণের অধিবাসীদের ওপর চাপান, তেমনি নীচ থেকে দক্ষিণের স্থানীয় উপজাতিক সংস্কৃতিও আত্মপ্রকাশ করে।

ধর্মব্যবস্থা

  • (১) সাতবাহন রাজারা বৈদিক হিন্দুধর্মের অনুরাগী ছিলেন। প্রথম সাতকর্ণী অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। সাতবাহন রাজারা ব্রাহ্মণদের ভূমি, অর্থ ও ঘোড়া প্রভৃতি দান করেন। ইন্দ্র, চন্দ্র, সূর্য ও বাসুদেব তাদের উপাস্য দেবতা ছিলেন। তবে লৌকিক ধর্মকেও তারা স্বীকার করতেন।
  • (২) শিব, স্কন্দ ও মাতৃদেবতার পুজোকেও তারা সমর্থন করতেন। দক্ষিণ ভারতের উপজাতি সংস্কৃতিকে তারা উপেক্ষা করতে পারেন নি। শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম এবং নাগপুজো সাতবাহন যুগে জনপ্রিয় ছিল। ডঃ ভাণ্ডারকরের মতে, শিব ও কৃষ্ণ ছিলেন খুবই জনপ্রিয় দেবতা।

বৌদ্ধধর্মে অনুরক্তি

সাতবাহন রাজারা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ভসদায়ন, মহাসঙ্ঘিকা প্রভৃতি বৌদ্ধদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ছিল। সাতবাহনরা মহাসঙ্ঘিকা সম্প্রদায়কে সমর্থন করতেন। বিভিন্ন গুহা, বিহার ও লেখ থেকে সাতবাহন রাজাদের বৌদ্ধধর্ম প্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়।

বিহারের জন্য গ্ৰাম ও অর্থ দান

  • (১) নাসিক, ভট্টিপ্রলু, কার্লে প্রভৃতি স্থানের বিখ্যাত বৌদ্ধ গুহাগুলি সাতবাহন যুগে তৈরি হয় এবং এই সকল গুহা বিহারের জন্য সাতবাহন রাজারা গ্রাম ও অর্থ অনুদান করতেন।
  • (২) ডঃ ডি.সি. সরকারের মতে, গুহাবাসী ভিক্ষুদের জন্য সাতবাহন ও শক-ক্ষত্রপদের মধ্যে দান করার প্রতিযোগিতা চলত। বৌদ্ধগুহা ও স্তূপগুলি পশ্চিম উপকূলের বন্দর থেকে বাণিজ্যপথ ধরে দক্ষিণের মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ব‌ক্তিগত প্রচেষ্টায় নির্মিত স্তূপ ও গুহা

শুধুমাত্র রাজ দাক্ষিণ্যের ফলে নয়, বণিক ও সাধারণ লোকের দানে এই সকল গুহা ও স্তূপ তৈরি হয়েছিল। অন্ধ্র অঞ্চলে অমরাবতীর স্তূপগুলিও এভাবে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল। সাতবাহন নগরী জুন্নারকে ঘিরে প্রায় ১৩৫টি গুহা তৈরি করা হয়।

ধর্মসহিষ্ণুতা

ভারতীয় রীতি অনুসারে তারা ধর্মসহিষ্ণুতা নীতি অনুসরণ করতেন। বৈদিক হিন্দু ধর্মের অনুরাগী হলেও সাতবাহন রাজারা বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

উপসংহার :- অমরাবতী, ঘণ্টশাল প্রভৃতি স্থানে স্তূপ তৈরি করা হয়। কার্লের চৈত্য পাহাড়ের ভেতর গর্ত করে তৈরি করা হয়। এর স্তম্ভগুলি ছিল জমকালো এবং ভাস্কর্যে মণ্ডিত। অন্ধ্রের অমরাবতীর স্তূপগুলি ব্যক্তিগত বেসরকারী প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়।

(FAQ) সাতবাহন যুগের সমাজ ও ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. সাতবাহন রাজারা কোন ধর্মের অনুরাগী ছিলেন?

বৈদিক হিন্দু ধর্ম।

২. পুরাণে সাতবাহনদের কি বলা হয়েছে?

অন্ধ্র।

৩. সাতবাহন রাজ্য কে প্রতিষ্ঠা করেন?

হিমুকে।

৪. সাতবাহন রাজ্যের শ্রেষ্ঠ রাজা কে?

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী।

৫. সাতবাহন রাজ্যের শেষ রাজা কে?

যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী।

Leave a Reply

Translate »