গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি

আজ গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি -র রাজত্বকাল, রাজ্যের বিস্তার, শাসিত অঞ্চল, সার্বভৌমত্ব দাবি, কলিঙ্গ জয়, শক, যবনদের ধ্বংস, সংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানবো।

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি

রাজত্বকাল১০৬-১৩০ খ্রিস্টাব্দ
পূর্বসূরিদ্বিতীয় সাতকর্ণি
উত্তরসূরিবাশিষ্ঠীপুত্র পুলুমায়ি
গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি

ভূমিকা :- মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর সাতবাহন সাম্রাজ্য বিস্তার ও স্থায়িত্বের দিক দিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল। এই সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন গোতমীপুত্র সাতকর্ণি।

উপাদান

তাঁর সম্পর্কে জানতে দুইটি লেখ আমাদের বিশেষ সাহায্য করে। একটি তাঁর রাজত্বকালের অষ্টাদশ বৎসরে রচিত নাসিক লেখ আর অন্যটি তাঁর রাজত্বকালের চতুর্বিংশ বৎসরে মা গৌতমী বলশ্রীর সঙ্গে যুক্তভাবে রচিত।

নাসিক প্রশস্তি

তাঁর রাজত্বকাল সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লেখ নাসিক প্রশস্তি। গৌতমীপুত্রের মৃত্যুর উনিশ বৎসর পরে তাঁর মা এই প্রশস্তি রচনা করেছিলেন। সাতবাহন বংশের দুর্দিনে পুত্রহারা মা এখানে তাঁর পুত্রের অতীত কীর্তি কাহিনী স্মরণ ও লিপিবদ্ধ করেছেন।

রাজত্বকাল

কয়েকটি সূত্র থেকে গৌতমীপুত্রের রাজত্বকাল নির্ণয় করা সম্ভব।

  • (১) প্রথমত তিনি নহপাণের সমসাময়িক ছিলেন এবং তাঁকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন। এই ঘটনাটি ১২৪-১২৫ খ্রিস্টাব্দে ঘটেছিল মনে হয়। কারণ, তার পরে নহপাণের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
  • (২) আরও মনে করা হয় যে গৌতমী পুত্রের রাজত্বের অষ্টাদশ বৎসরে তিনি নহপাণকে পরাজিত করেছিলেন। কারণ, এই বৎসরে রচিত নাসিক-লেখতে আছে যে, গৌতমী-পুত্র নহপাণের জামাতা, নাসিক ও পুনা অঞ্চলের শাসক ঋষভদত্তের অধিকারভুক্ত জমি অন্যকে দান করেছিলেন।
  • (৩) আরও জানা যায় যে, সাতবাহন সেনাবাহিনী যখন জয়লাভে তৎপর, তখন একটি সামরিক ছাউনি থেকে এই দানপত্রটি প্রচারিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, গৌতমীপুত্র নিজে তখন নাসিক অঞ্চলে উপস্থিত ছিলেন।
  • (৪) সুতরাং এই সব ঘটনা যে নহপাণের সঙ্গে তাঁর শেষ সংগ্রামকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। খৃঃ ১২৪-২৫ অব্দ যদি গৌতমীপুত্রের রাজত্বের অষ্টাদশ বৎসর হয়, তাহলে খৃঃ ১০৬ অব্দে তাঁর রাজত্ব শুরু হয়েছিল।
  • (৫) তাঁর শেষ লেখটি রাজত্বকালের চতুর্বিংশ বৎসরে রচিত হয়েছিল। মনে হয় তখন তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, এই লেখটি গৌতমী বলশ্রীর সঙ্গে যুক্তভাবে রচিত হয়েছিল। এর পরে তিনি আর বেশি দিন বাঁচেন নি।
  • (৬) সুতরাং তাঁর রাজত্বকাল ছিল ১০৬-১৩০ খ্রিস্টাব্দ।

হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার

গৌতমীপুত্র নহপাণের রাজত্বের শেষ দিকে তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। গৌতমীপুত্র মহারাষ্ট্র এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশসমূহ পুনরুদ্ধার করে সাতবাহন বংশের লুপ্ত গৌরব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করে প্রথম সাতকর্ণি অপেক্ষা সাম্রাজ্য আরও বিস্তার করেন।

উপাধি

নাসিক প্রশস্তিতে তাঁকে ‘সাতবাহন-কুল-যশঃ প্রতিষ্ঠাপনকর’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্র পুনরুদ্ধার তার প্রধান কৃতিত্ব হলেও, একমাত্র কৃতিত্ব নয়।

শাসিত অঞ্চল

নাসিক প্রশস্তিতে তিনি যে অঞ্চলগুলি শাসন করতেন, তাদের নামের বিস্তৃত তালিকা আছে। এই নামগুলি হল: আসিক (মহারাষ্ট্র), মূলক (পৈথানের পার্শ্ববর্তী), সুরথ (কাথিয়াবাড়), কুকুর (উত্তর কাথিয়াবাড়), অনুপ (নর্মদাতীরে মাহিশ্বতী), বিদর্ভ (বেরার), আকর (পূর্ব মালব) এবং অবন্তী (পশ্চিম মালব)।

বিস্তৃত অঞ্চলের অধিপতি

নাসিক প্রশস্তিতে তাকে বিন্ধ্য পর্বত থেকে মলয় পর্বত (ত্রিবাঙ্কুর পাহাড়) পর্যন্ত এবং পূর্বঘাট পর্বতমালা থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের অধিপতি বলা হয়েছে।

সার্বভৌম দাবি

ডঃ সরকার মনে করেন যে, তিনি বিন্ধ্য-পরবর্তী সমগ্র ভূভাগের উপর তাঁর সার্বভৌমত্ব দাবি করতেন।

অন্ধ্র ও দক্ষিণ কোমল অঞ্চল

লেখ এবং হিউয়েন সাঙ -এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে অন্ধ্র এবং দক্ষিণ কোমল অঞ্চল দুইটি কোনো না কোনো সময় সাতবাহন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তিন সমুদ্রের জল পান

গৌতমীপুত্র দাবি করেছেন যে তাঁর সৈন্যদল তিনটি সমুদ্রের (আরব সাগর, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর) জল পান করেছিলেন । ডঃ রায়চৌধুরী মনে করেন যে, এই দাবির মধ্যে তাঁর এই অঞ্চলের উপর আধিপত্যের অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়।

কলিঙ্গ জয়

ডঃ কে. গোপালাচারি বলেছেন যে, গৌতমীপুত্রের অধিকৃত স্থানসমূহের মধ্যে মহেন্দ্র (মহানদী এবং গোদাবরীর মধ্যবর্তী পূর্বঘাট পর্বত মালা) এবং চকোরের (পূর্বঘাট পর্বতমালার দক্ষিণ ভাগ) উল্লেখ আছে। এ থেকে কলিঙ্গ এবং অন্ধ্রদেশ যে তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

শক,যবন ধ্বংসকারী

নাসিক প্রশস্তিতে গৌতমীপুত্রকে ‘শক-যবন-পল্লব-নিসূদন’ অর্থাৎ তাদের ধ্বংসকারী বলা হয়েছে। পল্লবগণ ছিল পার্থীয় এবং যবনগণ গ্রীক। তাদের সঙ্গে গৌতমীপুত্রের সংঘর্ষের ইতিবৃত্ত জানা যায় না।

নহপানকে পরাজয়

জোগালথেম্বিতে প্রাপ্ত মুদ্রা থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, নহপাণ গৌতমীপুত্রের সমসাময়িক ছিলেন এবং তার দ্বারা পরাজিত হয়েছিলেন।

নতুন নগর নির্মাণ

নহপানের বিরুদ্ধে জয়লাভকে চিহ্নিত করার জন্য তিনি গোবর্ধন জেলায় (নাসিক) বেনাকটক নগর নির্মাণ করেন এবং শকদের অনুকরণে আড়ম্বরপূর্ণ অভিধা (রাজরাজ এবং মহারাজ) গ্রহণ করেন।

রুদ্রদামনের কাছে পরাজিত

শকদের অপর একটি শাখা, কার্দমক শাখার রুদ্রদামনের কাছে তিনি পরাজিত হন। এই শাখার প্রতিষ্ঠাতা চষ্টন গৌতমীপুত্রের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর পৌত্র রুদ্রদামন সহকর্মীরূপে শাসনকার্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় গৌতমীপুত্রকে পরাজিত করেছিলেন। রুদ্রদামনের এই জয়লাভের প্রমাণ টলেমির গ্রন্থে এবং জুনাগড়লেখতে পাওয়া যায়।

টলেমির বর্ণনা

প্রতিষ্ঠানকে (পৈথান) পুলুমায়ির রাজধানী এবং উজ্জয়িনী -কে চষ্টনের রাজধানী হিসাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এটা নিঃসন্দেহ যে চষ্টনের শাসনকালে মালব কার্দমক শকগণের অধিকারে ছিল।

হাতছাড়া অঞ্চল

১৫০ খ্রিস্টাব্দের জুনাগড় শিলালিপি তে রুদ্রদামনের অধিকারভুক্ত আকর, অবন্তী, অনুপ, সুরাষ্ট্র, কুকুর, অপরান্ত ইত্যাদির নাম নাসিক-প্রশস্তিতেও ছিল। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য যে, এই স্থানগুলি তিনি সাতবাহনদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং সাতবাহনশাসক তখন গৌতমীপুত্র ভিন্ন অন্য কেউ ছিলেন না।

বৈবাহিক সম্পর্ক

গৌতমীপুত্র তাঁর অধিকৃত কিছু অঞ্চল রক্ষা করার জন্য তাঁর অন্যতম পুত্র, বাশিষ্ঠীপুত্র সাতকর্ণির সঙ্গে রুদ্রদামনের কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। কানহেরি (অপরান্তে) লেখতে এই বিবাহ সম্পর্কের আভাস আছে।

  • (১) এই বিবাহ গৌতমীপুত্রের বাস্তব রাজনীতিজ্ঞানের পরিচায়ক। অনেকে কিন্তু এই বিবাহ সম্পর্কে কটাক্ষ করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে, বর্ণসঙ্করের বিরোধী সাতবাহনদের শক পরিবারের সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থাপন একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা।
  • (২) এর থেকে বোঝা যায় যে তখন জাতিভেদ ব্যবস্থা সম্পর্কে কথায় ও কাজে বিশেষ মিল ছিল না। অবশ্য এই বিবাহ প্রকৃতপক্ষে সাতবাহনদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করেছিল কিনা, সন্দেহ।
  • (৩) জুনাগড়-লেখতে আছে যে, রুদ্রদামন দাক্ষিণাত্যের অধিপতি সাতকর্ণিকে দুইবার পরাজিত করেছিলেন, কিন্তু কুটুম্ব বলে তাঁর রাজ্য গ্রাস করেন নি।
  • (৪) এই সাতকার্ণি কে ছিলেন, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ডঃ ডি. আর. ভাণ্ডারকর মনে করেন যে, এই সাতকর্ণি নিশ্চয়ই গৌতমীপুত্র। কারণ, বাশিষ্ঠীপুত্র পুলুমায়ি রুদ্রদামনের জামাতা ছিলেন।
  • (৫) অন্য মতে, তিনি জামাতার ভাই-ও হতে পারেন। র্যাপসন মনে করেন যে, এই পরাজিত সাতবাহন নৃপতি ছিলেন পুলুমায়ি।

সংস্কার

নাসিক প্রশস্তিতে গৌতমীপুত্র শুধু যোদ্ধারূপে চিত্রিত হননি, সংস্কারকরূপেও হয়েছেন।

  • (১) ডঃ গোপালাচারি বলেছেন যে, যোদ্ধা হিসাবে তিনি বড় ছিলেন, কিন্তু শান্তির কাজে তিনি ছিলেন আরও বড়।
  • (২) নাসিক প্রশস্তিতে আছে যে, তিনি ক্ষত্রিয়দের দর্প এবং মান চূর্ণ করেছিলেন, ব্রাহ্মণ এবং নিম্নতম শ্রেণীর স্বার্থের উন্নতি বিধান করেছিলেন এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে রক্তের মিশ্রণ বন্ধ করেছিলেন।

ধর্মীয় বিশ্বাস

গৌতমীপুত্র ব্রাহ্মণ্যধর্ম -এর পৃষ্ঠপোষক হওয়া সত্ত্বেও, বৌদ্ধদের প্রতি অতি উদার মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। কার্লে, নাসিক প্রভৃতি স্থানের বিহারবাসীদের তিনি ভূমি এবং গুহা দান করেছিলেন।

উপসংহার :- ডঃ গোপালাচারি বলেছেন যে, তাঁর শাসনের ভিত্তি ছিল শাস্ত্রীয় বিধান এবং মানবতাবোধ। তাঁর করব্যবস্থায় এই বোধ প্রতিফলিত হয়েছিল।

(FAQ) গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. সাতবাহন বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে?

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি।

২. গৌতমী কে ছিলেন?

গৌতমীপুত্র সাতকর্ণির মাতা ছিলেন গৌতমী বলশ্রী।


৩. গৌতমীপুত্র সাতকর্ণি সম্পর্কে জানতে উল্লেখযোগ্য উপাদান কোনটি?

নাসিক প্রশস্তি।

Leave a Reply

Translate »