মিশরীয় সভ্যতা

আজ মিশরীয় সভ্যতার সময়কাল, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন, শিল্প, সংস্কৃতি, সেনাবাহিনী, ফ্যারাওদের শাসন, নীলনদের অবদান, সভ্যতার অবসান সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

মিশরীয় সভ্যতা

ধরণনদীমাতৃক সভ্যতা
সূচনাকালআনুমানিক ৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব
অবস্থানআফ্রিকা মহাদেশের নীলনদের তীরে
উল্লেখযোগ্য অবদানমমি ও পিরামিড নির্মাণ
মিশরীয় সভ্যতা

ভূমিকা :- পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেসব প্রাচীন সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল মিশরীয় সভ্যতা। কেউ কেউ মিশরীয় সভ্যতাকেই পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা বলে মনে করেন।

সময়কাল

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ বা তারও আগে আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে নীলনদের উভয় তীরে মিশরীয় সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল।

মিল

আফ্রিকার মিশরীয় সভ্যতার সাথে পশ্চিম এশিয়ার সুমেরীয় সভ্যতার অনেক মিল আছে। নব্যপ্রস্তর যুগ পার হয়ে তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগেই উভয় সভ্যতার সৃষ্টি হয়।

নীলনদ

নীলনদ আফ্রিকার বুরুন্ডির উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভিক্টোরিয়া হ্রদে পড়েছে। তারপর ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে বেরিয়ে উগান্ডা, তানজানিয়া, সুদান, ইথিওপিয়া, মিশর প্রভৃতি স্থান অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে এসে মিশেছে। নীলনদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৪০০ কিলোমিটার। পৃথিবীর দীর্ঘতম এই নদীর যাত্রাপথের দুই তীরে প্রাচীন কালে মিশরীয় সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল।

সীমা

মিশরের উত্তরে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে লোহিত সাগর, পূর্বে আরবের মরুভূমি এবং পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি অবস্থিত।

নীলনদের অবদান

মিশরীয় সভ্যতার বিকাশে নীলনদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন –

(১) মরুভূমির গ্রাস থেকে মুক্তি

মিশরের পূর্বে আরবের মরুভূমি এবং পশ্চিমে সাহারা মরুভূমির প্রসার ঘটেছে। কিন্তু মাঝখান দিয়ে নীলনদ প্রবাহিত হওয়ায় মিশর ঊষর মরুভূমির গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং সুজলা-সুফলা হয়ে উঠেছে।

(২) কৃষির প্রসার

প্রতি বছর বন্যার ফলে পলি সঞ্চিত হয়ে নীলনদের উভয় তীরের বিস্তীর্ণ উপত্যকা যথেষ্ট উর্বর হয়ে ওঠে। এই উর্বর মাটিতে প্রাচীনকালে কৃষির যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে।

(৩) সেচের সুবিধা

মিশরে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম বৃষ্টিপাত হয়। এজন্য নীলনদ থেকে খাল কেটে কৃষিজমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করে সেখানে কৃষিকাজে উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়েছে।

(৪) শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ

কৃষির ওপর ভিত্তি করে প্রাচীন কালে মিশরে শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

(৫) অনুকূল জলবায়ু

নীলনদের প্রবাহের ফলে মিশর মরুভূমির রুক্ষ জলবায়ুর প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছে। নীলনদের প্রভাবে এই অঞ্চলের মানুষের বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এখানকার মানুষ যথেষ্ট পরিশ্রমী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছে।

(৬) নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা

অনুকূল জলবায়ুতে নীলনদের উভয় তীরে বিভিন্ন নগর, শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

(৭) যোগাযোগের সুবিধা

নীলনদ থাকায় মিশরে জলপথে দূরদূরান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ও পণ্য পরিবহণ করার কাজ খুবই সহজ হয়েছে।

হেরোডোটাসের উক্তি

এক কথায়, নীলনদ না থাকলে দুই দিকের রুক্ষ মরুভূমি মিশরকে গ্রাস করে নিত এবং মিশরীয় সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হত না। এজন্য প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস মিশরকে ‘নীলনদের দানা বলে অভিহিত করেছেন।

সভ্যতার প্রথম পর্ব

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উন্মেষকালে এখানে কৃষি ও পশুপালন প্রচলিত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

(১) কৃষি

মিশরে কৃষির বিকাশ প্রাচীন যুগ থেকেই শুরু হয়।

  • (ক) মেরিমদে (Merimde) অর্থাৎ নিম্ন মিশরীয় অঞ্চলে এবং উচ্চ মিশরের বাদারি (Badari) নামের অঞ্চলে আদি কৃষিকাজের প্রচলন ছিল।
  • (খ) পরবর্তীকালে নীলনদের বন্দ্বীপ অঞ্চলের কিছুটা দক্ষিণে ফায়ূম (Fayum) নামক অঞ্চলে কৃষিকাজের প্রসার ঘটেছিল।
  • (গ) কাঠের সঙ্গে ধারালো পাথরের ফলা ব্যবহা করে তারা জমি চাষ করত। তারা খাল কেটে এবং নদীতে বাঁধ দিয়ে জমিতে জলসেচ করত।
  • (ঘ) গম, ভুট্টা ও তিসি ছিল তাদের অন্যতম কৃষি উপাদান।  

(২) পশুপালন

প্রাচীন মিশরীয়রা বিভিন্ন পশুপালন করত। ছাগল, ভেড়া, গোরু, রাজহাঁস প্রভৃতি প্রাণীকে তারা পোষ মানাত। নিকটবর্তী বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ও জলাশয়ে পশুচারণের সুবিধা ছিল।

(৩) শিকার

কৃষি পদ্ধতির প্রচলন থাকলেও প্রাচীন মিরীয়রা শিকারের পেশাকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেয়নি। তারা নদীতে মাছ, কুমির, জলহস্তী প্রভৃতি শিকার করত। বড়শি, তাঁর, ছুরি, হারপুন প্রভৃতি অস্ত্র শিকারের কাজে ব্যবহার করা হত।

(৪) শিল্প ও কারিগরিবিদ্যা

প্রাচীন মিশরীয়রা শিল্প ও কারিগরিবিদ্যাতেও যথেষ্ট পারদর্শী ছিল।

  • (ক) তারা বিভিন্ন মৃৎপাত্র, ঝুড়ি প্রভৃতি তৈরি করত। মৃৎপাত্রগুলিতে কালো ও লাল রং ব্যবহার করা হত।
  • (খ) বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরিতে পাথর ও তামার ব্যবহারও প্রচলিত ছিল। পাথর, শামুক, ঝিনুক প্রভৃতি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অলংকার তৈরি হত।
  • (গ) প্রাচীন মিশরীয়রা জলযান বা নৌকা, গোরুর গাড়ি প্রভৃতি তৈরি করত। তারা বছরের হিসেব রাখার জন্য পঞ্জিকাও তৈরি করেছিল বলে জানা যায়।

(৫) নগর-রাষ্ট্র

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় নগর-রাষ্ট্রের সূচনা হয়।

  • (ক) নব্য প্রস্তুর যুগে মিশরীয়রা নীলনদের অববাহিকায় দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন বসতি গড়ে তুলেছিল। এসব বসতিকে ‘লোম’ বলা হত।
  • (খ) লোম ছিল প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন নগর রাষ্ট্র। এসব নগর রাষ্ট্রের অর্থনীতি গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে পৃথক ছিল। প্রতিটি নগর রাষ্ট্রের পৃথক শাসক থাকতেন।
  • (গ) পরবর্তীকালে বিভিন্ন লোম যুক্ত হয়ে মিশরে দুটি বড়ো রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল—উত্তর মিশর ও দক্ষিণ মিশর।
  • (ঘ) আরও পরে ওই দুটি রাজ্য একত্রিত হলে ঐক্যবদ্ধ মিশরের উত্থান ঘটে এবং ‘ফ্যারাও’ নামে শাসকদের শাসন শুরু হয়।

ফ্যারাওদের শাসন

মিশরীয় ভাষায় প্রাচীন মিশরের শাসকদের বলা হত ‘ফ্যারাও’। ‘ফ্যারাও’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে মিশরীয় ‘পেরো’ শব্দটি থেকে যার অর্থ হল বড়ো বাড়ি বা রাজপ্রাসাদ। ফ্যারাওগণ সুবিশাল রাজপ্রাসাদে বসবাস করতেন।

(১) ঐক্যবদ্ধ মিশরের আত্মপ্রকাশ

  • (ক) প্রাচীন মিশরে প্রথমদিকে অন্তত ৪০টি ছোটো ছোটো রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। এই রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বদা যুদ্ধবিগ্রহ চলত।
  • (খ) যুদ্ধবিগ্রহের দ্বারা খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের মধ্যে মিশরে দুটি শক্তিশালী রাজ্য গড়ে ওঠে। আনুমানিক ৩২০০, খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এই দুটি রাজ্য সংযুক্ত হলে ঐক্যবদ্ধ মিশরের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
  • (গ) ঐক্যবদ্ধ মিশরের প্রথম ফ্যারাও ছিলেন মেনিস। তাঁর রাজধানী ছিল মেনসিফ। মেনিসের পর মিশরের সিংহাসনে বসেন জোসার।
  • (ঘ) পরবর্তীকালে ফ্যারাওদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন খুফু, টুটেনখামেন, দ্বিতীয় রামেসিস প্রমুখ।

(২) ফ্যারাওদের ক্ষমতা

প্রাচীন মিশরের ফ্যারাওরা বিপুল ক্ষমতা ভোগ করতেন। যেমন –

(ক) দৈব ক্ষমতা

মিশরের সাধারণ অজ্ঞ, অশিক্ষিত ও শ্রমজীবী মানুষ সেদেশের সম্রাট অর্থাৎ ফ্যারাওদের দেবতার মতো শক্তিধর মনে করত। তারা বিশ্বাস করত যে, ফ্যারাওদের নির্দেশেই চন্দ্র-সূর্যের উদয় হয়, ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা-ভূমিকম্প হয়, ঋতু পরিবর্তন হয়, মিশরের কল্যাণ হয় ইত্যাদি।

(খ) শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা

মিশরের ফ্যারাওগণ ছিলেন সেদেশের আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থার সর্বময় কর্তা। তাঁদের আদেশই ছিল দেশের আইন। তাঁরাই ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ শাসক এবং সর্বোচ্চ বিচারক।

(গ) জমির মালিকানা

মিশরের সমস্ত জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ফ্যারাও। ফ্যারাওদের কাছ থেকেই অভিজাত শ্রেণি জমি লাভ করতেন এবং তা কৃষকদের মধ্যে বিলি করে তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন।

(ঘ) দেশরক্ষা

দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্তা ছিলেন ফ্যারাও। বৈদেশিক শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করা তাঁর দায়িত্ব ছিল।

(ঙ) পুরোহিত নিয়োগ

ফ্যারাওগণ শাসনব্যবস্থায় নিজেদের একাধিপত্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পুরোহিতদের নিয়োগ করতেন এবং পুরোহিত শ্রেণির পরামর্শ অনুসারে দেশ শাসন করতেন। প্রকৃতপক্ষে পুরোহিতরা ফ্যারাওদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতেন।

(চ) অন্যান্য দায়িত্ব

নীলনদ ছিল মিশরের প্রাণস্বরূপ। এজন্য নীলনদের রক্ষণাবেক্ষণে ফ্যারাওরা বিশেষ দায়িত্ব পালন করতেন। এ ছাড়া খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ, মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ প্রভৃতি বিষয়েও ফ্যারাওরা উদ্যোগ নিতেন।

সমাজব্যবস্থা

মিশরের সমাজ ব্যবস্থা ছিল অনেকটা হরপ্পা সভ্যতার মতো।

(১) মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

মিশরীয় সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক সম্পত্তির অধিকার ছিল মেয়েদের হাতে। পৃথিবীর প্রথম মহিলা শাসক ছিলেন হাঁটাসু (খ্রিস্টপূর্ব ১৫২০-১৪৮০ অব্দ)।

(২) ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য

মিশরীয় সমাজ ছিল শ্রেণিবিভক্ত। এখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে তীব্র ব্যবধান ছিল। ফ্যারাওদের অধীনে প্রাচীন মিশরে কৌম বা গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন গোষ্ঠী বা দলের অধিপতি নিজ নিজ এলাকার সর্বময় কর্তা ছিলেন।

(৩) শোষক ও শোষিত

সমাজে ন্যায়বিচার খুবই কম ছিল। সমাজে শোষক ও শোষিত শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। ফ্যারাও, পুরোহিত, আঞ্চলিক প্রশাসক, রাজকর্মচারী, কারারক্ষক, প্রহরী প্রমুখ ছিল শোষক শ্রেণিভূক্ত এবং কৃষক, কারিগর ও ক্রীতদাসরা ছিল শোষিত শ্রেণিভূক্ত। প্রাক-রাজবংশীয় যুগেই মিশরে দাসপ্রথার উদ্ভব ঘটেছিল।

(৪) ক্রীতদাসদের অবস্থা

ক্রীতদাসরাই মিশরীয় সমাজে সর্বাধিক শোষিত ছিল। মিশরীয় সমাজে ক্রীতদাসরা ছিল ‘লুটের মাল’। প্রভুরা তাদের অধীনস্থ ক্রীতদাসদের বিভিন্ন পরিশ্রমসাধ্য কাজে নিয়োগ করে নিজেদের জীবনে অপার স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আসতেন।

পুরোহিতদের ক্ষমতা

মিশরের শাসনব্যবস্থায় ফ্যারাও কর্তৃক নিযুক্ত পুরোহিত শ্রেণির যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল। ফ্যারাওদের ছত্রছায়ায় থেকে পুরোহিতরা প্রভৃত সম্পত্তি ও শাসনতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতেন।

(১) উপাসনা

প্রাচীন মিশরের পুরোহিতদের প্রধান কাজ ছিল দেবমন্দিরে দেবতাদের পুজো করা। তাঁরা মন্দিরে প্রদীপ জ্বালানো এবং দেবতার উদ্দেশে নৈবেদ্য নিবেদন করতেন।

(২) ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সংযোগরক্ষা

মিশরে ঈশ্বরের সঙ্গে সাধারণ জনগণের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন পুরোহিতরা। তাঁরা ঈশ্বরের আদেশ ও আশীর্বাদ জনগণের কাছে পৌঁছে দিতেন। সাধারণ মানুষের প্রার্থনাও পুরোহিতদের মাধ্যমেই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোেত। সাধারণ মানুষ পুরোহিতদের মাধ্যমে মন্দিরে সোনা, রূপো বা অন্যান্য সামগ্রী দান করে ঈশ্বরের করুণা চাইতে পারত।

(৩) বিদ্রোহ দমন

পুরোহিত শ্রেণি দেশের দরিদ্র প্রজাদের বিদ্রোহ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন। তাঁরা প্রজাদের বোঝাতেন যে, ফ্যারাও হলেন ঈশ্বরের প্রেরিত দূত। তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অর্থ ঈশ্বরের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করা। কষ্ট ভোগ করেও প্রজারা যদি ফ্যারাও-এর যাবতীয় আদেশ মেনে চল তাহলে তারা পরলোকে সুখী হবে ইত্যাদি।  

(৪) শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব

পুরোহিতরা শাসনকার্যের বিভিন্ন বিষয়ে ফ্যারাওকে পরামর্শ দিতেন। ফ্যারাওগণও পুরোহিতদের হাতে কিছু কিছু আইন, শাসন ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা ছেড়ে দিতেন।

(৫) শিক্ষাদান

মন্দিরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, সেখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করা, বর্ষপঞ্জি তৈরি করা প্রভৃতিও পুরোহিতদের অন্যতম কাজ ছিল।

(৬) দাসদাসী নিয়োগ

ফ্যারাও-সহ সাধারণ মানুষ বিভিন্ন উপলক্ষ্যে পুরোহিতদের জমি ও অন্যান্য সামগ্রী দান করতেন। পুরোহিতরা এই জমিতে ক্রীতদাস এবং মন্দিরে ক্রীতদাসী নিয়োগ করত। থিবস শহরের একটি মন্দিরে একজন পুরোহিতের অধীনে ৮০০০০ দাসদাসী ছিল।

সেনাবাহিনী

  • (১) মিশরের সাম্রাজ্য ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হলে সেখানে সেনাদল গঠন করার বিশেষ প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজন থেকে ফ্যারাওয়া পৃথক সেনাবাহিনী গঠন করেন।
  • (২) সেনাদল প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল – পদাতিক ও রথারোহী। কৃষক, শ্রমিক, ক্রীতদাস এবং শত্রুপক্ষের যুদ্ধবন্দিদের যুদ্ধের কাজে নিয়োগ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করা হয়।

মিশরীয় সভ্যতার অর্থনীতি

মিশরীয় সভ্যতায় সুপ্রাচীনকালে এক সুনির্দিষ্ট অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছিল। কৃষি, পশুপালন, শিল্প, ব্যাবসাবাণিজ্য প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে এই অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।

(১) কৃষি

  • (ক) প্রাচীন মিশরের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। রেডিয়ো কার্বন-১৪ পরীক্ষার সাহায্যে মিশরের ফায়ুম অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে কৃষিকাজের প্রচলন ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • (খ) মিশরীয়রা আদিতে জলাভূমি অঞ্চলে কুমির ও মাছ শিকার করত এবং নীলনদের সুবিস্তৃত উপত্যকা অঞ্চলের উর্বর জমিতে কৃষিকাজ করত।
  • (গ) জলাভূমি ও জঙ্গল পরিষ্কার করে পরে তারা প্রচুর কৃষিজমি উদ্ধার করেছিল। মিশরে বৃষ্টিপাত প্রয়োজনের তুলনায় কম হত বলে সেখানকার অধিবাসীরা নীলনদ থেকে খাল কেটে কৃষিজমিতে জলসেচ করত।
  • (ঘ) গম, যব, ভুট্টা, ভিসি, জোয়ার, বিভিন্ন শাকসবজি, শণ প্রভৃতি ছিল মিশরের প্রধান কৃষিজ ফসল।।

(২) পশুপালন

পশুপালনও মিশরের বহু অধিবাসীর জীবিকা ছিল।

  • (ক) নীলনদের উপত্যকায় সুবিশাল তৃণভূমিতে তারা পশুচারণ করত। তাদের গৃহপালিত পশুপাখির মধ্যে প্রধান ছিল গোরু, ছাগল, ভেড়া, শূকর, গাধা, রাজহাঁস প্রভৃতি।
  • (খ) পশুপাখির মাংস, দুধ, চামড়া প্রভৃতির প্রয়োজনে এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তারা পশুপালন করত।
  • (গ) বন্যার পর নরম মাটিতে বীজ বুনে মিশরীয়রা তাদের গৃহপালিত গবাদিপশুর দলকে বীজের ওপর দিয়ে ছুটিয়ে দিত। ফলে বীজগুলি মাটিতে গেঁথে যেত।

(৩) শিল্প

  • (ক) প্রাচীন মিশরে বিভিন্ন শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল এবং শিল্পের ওপর ভিত্তি করে কারিগর শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল।
  • (খ) মিশরে যেসব শিল্পের অগ্রগতি ঘটেছিল সেগুলি হল বস্ত্রশিল্প, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, ধাতুশিল্প, অলংকার শিল্প প্রভৃতি। এখানকার মৃৎপাত্রগুলি ছিল বেশ মসৃণ ও উন্নত।
  • (গ) মিশরের শিল্পী ও কারিগররা প্রতিটি পেশাতেই দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিল।

(৪) ব্যাবসাবাণিজ্য

মিশরে প্রধানত রাজা ও রাজপুরুষরাই বাণিজ্যের কাজে নিযুক্ত ছিল। বিনিময় প্রথার মাধ্যমেই বাণিজ্য চলত।

(ক) দেশীয় ও বৈদেশিক বাণিজ্য

অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক উভয় ধরনের বাণিজ্যই প্রচলিত ছিল। দেশের ভেতরে স্থলপথে পশুটানা গাড়িতে করে পণ্য পরিবহণ করা হত। বৈদেশিক ক্ষেত্রে সমুদ্রপথে বড়ো জাহাজ ও নৌকা ব্যবহার করা হত। সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া বা সুমেরীয় সভ্যতা, প্যালেস্টাইন, ক্রীট, আরব, সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা প্রভৃতি অঞ্চলের সঙ্গে মিশরের বৈদেশিক বাণিজ্য চলত।

(খ) আমদানি-রপ্তানি

মিশর থেকে বিদেশে বস্ত্র, মৃৎশিল্প, কাচের সামগ্রী, চামড়ার সামগ্রী, খাদ্যশস্য প্রভৃতি রপ্তানি হত। অন্যদিকে বিদেশ থেকে মিশরে আমদানি করা হত সোনা, তামা, কাঠ, হাতির দাঁত, মশলা, সুগন্ধি তেল, বিভিন্ন বিলাস সামগ্রী প্রভৃতি।

(৫) অন্যান্য পেশা

উপরোক্ত বিভিন্ন পেশা ছাড়া প্রাচীন মিশরে আরও কিছু পেশার উদ্ভব ঘটেছিল।

  • (ক) কিছু মানুষ লোকগণনা, গবাদিপশু গণনা, আয়করের হিসাব রাখা, শিল্প-বাণিজ্যের তদারকি করা প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
  • (খ) বহু মানুষ সৈনিক হিসেবে ফ্যারাও-এর দেহরক্ষী ও প্রাসাদরক্ষী হিসেবে কাজ করত।
  • (গ) এ ছাড়া চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, পিরামিড ও অন্যান্য অট্টালিকা নির্মাণ, নৌকা নির্মাণ প্রভৃতি কাজেও অনেকে নিযুক্ত ছিল।

মিশরীয় সভ্যতার শিল্প-সংস্কৃতি

পৃথিবীর সুপ্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে। এই সভ্যতায় শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অগ্রগতি লক্ষ করা গিয়েছিল।

(১) লিপি

লিপি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিশরীয় সভ্যতার মানুষেরা বেশ দক্ষ ছিল বলে মনে করা হয়।

(ক) হায়ারোগ্লিফিক লিপি

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় মানুষ প্রথমদিকে বিভিন্ন ছবির সাহায্যে তাদের মনের কথা লিখে রাখত। তারা প্রতিটি অক্ষরের জন্য পৃথক ছবি ব্যবহার করত। এগুলিকে চিত্রলিপি বলা হয়। পরবর্তীকালে নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে এই লিপি আরও উন্নত হয়। মিশরের এই চিত্রলিপি হায়ারোগ্লিফিক (Hieroglyphic) লিপি নামে পরিচিত) মিশরীয়রা এই লিপির দ্বারা ‘সূর্য’ বোঝাতে একটি বৃত্ত এঁকে এর মাঝখানে একটি বিন্দু বসাত, ‘জল’ বোঝাতে ঢেউ-এর ছবি আঁকত ইত্যাদি।”

(খ) লিপির ব্যবহার

গ্রিক ভাষায় হায়ারোগ্লিফিকের অর্থ হল ‘পবিত্র লিপি’। মিশরীয় অর্থে এর নাম দেবলিপি। মিশরীয়রা নলখাগড়ার কলম দিয়ে প্যাপিরাস গাছের পাতায় বা পাথরে এই লিপিতে লিখত। তারা এই লিপিতে চিঠিপত্র লেখা, বই লেখা, রাজস্ব আদায় ও ব্যাবসার হিসাব রাখা, বর্ষপঞ্জি তৈরি করা প্রভৃতি বিভিন্ন কাজ করত।

(গ) লিপির পাঠোদ্ধার

বিখ্যাত ফরাসি পণ্ডিত শাঁ পোলিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার করেন।

(২) চিত্রকলা

মিশরের প্রথম ফ্যারাও মেনিসের আমল থেকেই সেদেশে বিভিন্ন শিল্পকলার উৎকর্ষ লক্ষ করা যায়। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে প্রাচীন মিশরে বেশ অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়।

  • (ক) বিভিন্ন মন্দির ও অন্যান্য অট্টালিকার দেওয়ালে বিভিন্ন রঙিন ছবি আঁকা হত। এসব চিত্রের বিষয়বস্তু ছিল রাজা, রাজপরিবার, কর্মরত কারিগর, কৃষক, উৎসবের নাচগান।
  • (খ) রাজার ছবি খুব বড়ো করে এবং উজ্জ্বল রঙে আঁকা হত। তবে সাধারণ মানুষ ও ক্রীতদাসদের ছবি আঁকা হত ছোটো করে এবং অনুজ্জ্বল রং দিয়ে।

(৩) স্থাপত্য ও ভাস্কর্য

মিশরে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটেছিল।

(ক) মন্দির

মিশরে দেবতা আমন-এর উপাসনার উদ্দেশে এক সুবিশাল ও সুদর্শন মন্দির নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ২৫ মিটার উঁচু এই মন্দিরে ১৩০টি স্তম্ভ এবং একটি বড়ো হলঘর ছিল।

(খ) পিরামিড

সুদর্শন ও বৃহদায়তন স্থাপত্যশিল্পে মিশরে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল। মিশরের স্থাপত্যশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল সেদেশের অসংখ্য পিরামিড।

(গ) স্ফিংসের মূর্তি

মিশরের অপর উল্লেখযোগ্য শিল্প নিদর্শন হল আবু সিম্বেল-এর মন্দির এবং বিশালাকার ‘স্ফিংস’-এর মূর্তি। এটি হল গিজার পিরামিড সংলগ্ন এক বিশাল পাথরের মূর্তি। পৃথিবীর বৃহত্তম এই মূর্তির মুখমণ্ডল মানুষের মতো কিন্তু দেহটি সিংহের মতো।

(ঘ) অন্যান্য মূর্তি

এ ছাড়া পাথর, কাঠ, মাটি প্রভৃতি দিয়ে বিভিন্ন মূর্তি নির্মিত হত। এসব মূর্তির মধ্যে বিভিন্ন ফ্যারাও, ক্রীতদাসদের তদারককারী, রাঁধুনি, শ্রমিক প্রমুখের মূর্তি অন্যতম।

(৪) শিক্ষা

সেই সময় মিশরে বিনা অর্থে বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল।

  • (ক) যার লেখাপড়ার যোগ্যতা থাকত, সেই বিদ্যালয়ে আসতে পারত। তবে মিশরে মূলত উচ্চশ্রেণির মানুষের মধ্যে বিদ্যাচর্চার প্রচলন ছিল।
  • (খ) সাধারণ পরিবারের খুব কম সংখ্যক ছেলে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও মেয়েরা বিদ্যাচর্চার সুযোগ পেত না।
  • (গ) মিশরে পুরোহিতরা মন্দির প্রাঙ্গণে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতেন। লিপিকাররা মিশরীয় সমাজে শিক্ষার বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা নিতেন।

(৫) বিজ্ঞানচর্চা

প্রাচীন মিশরে গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অগ্রগতি ঘটেছিল।

(ক) গণিতশাস্ত্র

প্রাচীন মিশরেই পাটিগণিত ও জ্যামিতির উদ্ভব ঘটেছিল বলে অনেকে মনে করেন। এখানকার মানুষ দশের গুণিতক ধরে গণনার কাজ করত। তারা যোগ, বিয়োগ ও ভাগ করার পদ্ধতি, দশমিকের ব্যবহার, ক্ষেত্রফল ও ঘনফল নির্ণয়ের পদ্ধতি প্রভৃতি জানত। তারা যেমন ভগ্নাংশের হিসাব জানত তেমনি লক্ষাধিক সংখ্যার হিসাবও গণনা করতে পারত।

(খ) জ্যোতির্বিদ্যা

পুরোহিতরা বর্ষপঞ্জি তৈরি করতেন। মিশরের জ্যোতিষীরাই প্রথম বছরকে ৩৬৫ দিনে, এক মাসকে ৩০ দিনে এবং এক দিনকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করেছিলেন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দে মিশরে পৃথিবীর প্রথম সৌরপঞ্জিকা আবিষ্কৃত হয়।

(গ) চিকিৎসাবিদ্যা

মিশরীয়রা মানবদেহে নাড়ির স্পন্দন ও হূৎপিণ্ডের ভূমিকা, গাছপালার ভেষজ গুণাগুণ প্রভৃতির কথা জানত এবং শল্যচিকিৎসায় ব্রোঞ্জের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত। তারা চক্ষু, দন্ত, পাকস্থলী ও অস্ত্রের চিকিৎসায় যে পারদর্শী ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মমি করার অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা শারীরবিদ্যার (Anatomy) জ্ঞান অর্জন করেছিল।

(৭) সাহিত্য

মিশরীয় সভ্যতায় সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।

(ক) অগ্রগতি

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় সাহিত্যের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটেছিল। মিশরীয়রা গদ্যসাহিত্য ও কাব্যচর্চা করত। পঞ্চম ও ষষ্ঠ রাজবংশের আমলে মিশরের মন্দির ও পিরামিডের গায়ে খোদাই করা লিপিগুলি তাদের সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। দ্বাদশ রাজবংশের আমলে মিশরীয় সাহিত্যের যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছিল।

(খ) ধর্মীয় সাহিত্য

‘মৃতের পুস্তক’ (Book of the Dead) নামে অভিহিত নিদর্শনগুলি ছিল তাদের উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় সাহিত্য। সমাহিত মৃতদেহের পাশে প্যাপিরাসে লেখা এসব সাহিত্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। এগুলিতে জাদুবিদ্যা, শ্লোক, প্রার্থনা, ঔষধপত্র প্রভৃতির আলোচনা থাকত।

(গ) অন্যান্য সাহিত্য

‘ইখনাটন-এর রাজকীয় স্তুতি’, ‘মেমফাইট ড্রামা’ প্রভৃতি মিশরীয় সাহিত্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এ ছাড়া অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গল্পকাহিনি মিশরীয় সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ।

(৭) ধর্মীয় জীবন

মিশরীয় সভ্যতায় ধর্মের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

  • (ক) মিশরের অধিবাসীরা বহু দেবতার আরাধনা করত এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও জীবজন্তুর পুজো করত।
  • (খ) মিশরীয়দের সূর্যদেবতা ‘রা’ প্রথমদিকে প্রধান দেবতা ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যুদ্ধের দেবতা বলে গণ্য হন এবং বাস্তুদেবতা আমন মিশরের প্রধান দেবতার আসন লাভ করেন।
  • (গ) মিশরের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দেবতা ছিলেন উর্বরতার দেবতা আসিরিস, পাপপুণ্য বিচারের দেবী আইসিস, আকাশের দেবতা হোরাস প্রমুখ।
  • (ঘ) এ ছাড়া মিশরে কুমির, গোরু, শিয়াল প্রভৃতি পশু ও বিভিন্ন গাছপালার পুজো করা হত।

(৮) মমি

  • (ক) প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুতেই জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। মৃত্যুর পরও এক জীবন থাকে এবং মৃতদেহের মধ্যেই তার আত্মা বেঁচে থাকে।
  • (খ) মিশরীয়রা নিজেদের জীবদ্দশায় তাদের কবরের স্থান, কবরের পদ্ধতি প্রভৃতির পরিকল্পনা করে যেত।
  • (গ) কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিরা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও সুগন্ধি দ্রব্য মাখিয়ে ও বেশ কয়েকটি স্তরে সাদা কাপড় জড়িয়ে মৃতদেহটিকে সংরক্ষণ করে রাখত। এভাবে সংরক্ষণ করা মৃতদেহটিকে ‘মমি’ বলা হত।

(৯) পিরামিড

  • (ক) প্রাচীন মিশরের ফ্যারাও এবং বিভিন্ন ধর্মী ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ মমি করে সমাধি দেওয়া হত।
  • (খ) মৃতদেহের পাশে মৃত ব্যক্তির প্রিয় খাবার, আসবাবপত্র, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রাখা হত।
  • (গ) এই সমাধিক্ষেত্রের ওপর পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে ত্রিকোণাকৃতি সুবিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করা হত। এগুলি পিরামিড নামে পরিচিত।

(১০) নেক্রোপোলিস

মিশরের ফ্যারাও পরিবার বা রাজপরিবারের সদস্যদের সমাধিস্থলকে মৃত্যুপুরী বা নেক্রোপোলিস বলা হত।

  • (ক) থিবস নগরীতে চার বর্গমাইল এলাকায় এই নেক্রোপোলিস অবস্থিত ছিল। এর একদিকে ছিল নীলনদ এবং অন্যদিকে ছিল পার্বত্য এলাকা ও মরুভূমি।
  • (খ) এখানকার রাজাদের সমাধিস্থল ‘ভ্যালি অব কিংস’ এবং রানিদের সমাধিস্থল ‘ভ্যালি অব কুইনস নামে পরিচিত।
  • (গ) ভ্যালি অব কিংস-এ এখনো পর্যন্ত ৬২টি সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে। ভ্যালি অব কুইনস-এ রানি নেফারতিতির সমাধিটি সবচেয়ে বড়ো।

মিশরের পিরামিড

প্রাচীন বিশ্বের সভ্যতাগুলির মধ্যে একমাত্র মিশরেই পিরামিড তৈরি হয়। পিরামিডগুলির সুবিশাল আয়তন, উচ্চতা ও নির্মাণকার্য শিল্প সমালোচকদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে। মিশরে পিরামিডের অস্তিত্বের জন্য এই দেশকে পিরামিডের দেশ’ বলে অভিহিত করা হয়।

(১) পিরামিড নির্মাণ

গ্রিক ভাষায় ‘পিরামিড’ কথার অর্থ হল “সুউচ্চ।

  • (ক) মিশরের ফারাও জোস-এর আমলে ইমহোটেপ নামে বিখ্যাত স্থপতি প্রথম পিরামিড তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন। তিনিই রাজধানী মেমফিস-এ জোস-এর সমাধির ওপর প্রথম পিরামিডটি নির্মাণ করেন।
  • (খ) পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম আশ্চর্য এই পিরামিড ছিল প্রাচীন মিশরের স্থাপত্যশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
  • (গ) পিরামিডের নিম্নভাগ চওড়া হয় এবং ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হতে হতে একটি বিন্দুতে গিয়ে সমাপ্ত হত। ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করা এবং নিজেদের মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্য মিশরের বিভিন্ন ফ্যারাও পিরামিড তৈরি করতেন।

(২) উল্লেখযোগ্য পিরামিড

  • (ক) মিশরে ছোটো-বড়ো বহু পিরামিড কালের করাল গ্রাস উপেক্ষা করে আজও মাটির ওপর সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। মিশরে অস্তিত্বশীল পিরামিডগুলি আজও দর্শকদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
  • (খ) মিশরের অধিকাংশ উল্লেখযোগ্য পিরামিড নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০-১৭০০ অব্দের মধ্যে। এই সময়কালকে মিশরে পিরামিডের কাল বলে উল্লেখ করা হয়।
  • (গ) মেনেস, খুফু, টুটেনখামেন, দ্বিতীয় রামেসিস, নেফরা, মেনকাউরা, তৃতীয় থুটমোস প্রমুখ ফ্যারাও-এর পিরামিড বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

(৩) খুফুর পিরামিড

  • (ক) মিশরে নির্মিত অসংখ্য পিরামিডের মধ্যে আয়তনে প্রথম তিনটি বড়ো পিরামিড হল ফ্যারাও খুফু, নেফরা ও মেনকাউরা-র তৈরি পিরামিড।
  • (খ) এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হল খুফুর তৈরি পিরামিড। ফ্যারাও যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ অব্দে মিশরের কায়রোর নিকটে ১৩ একর জমির ওপর এই পিরামিডটি নির্মাণ করেন। এর উচ্চতা ৪৫০ ফুট এবং পরিধি ৭০০ ফুট।
  • (গ) প্রায় ১ লক্ষ শ্রমিক ২০ বছর ধরে এই পিরামিডটি নির্মাণ করেছিল। প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের চাঁই দিয়ে এটি নির্মিত হয়েছে।

মিশরীয় সভ্যতার অবসান

সুদীর্ঘ অস্তিত্বের পর মিশরীয় সভ্যতায় এক সময় অবক্ষয় শুরু হয়।

  • (১) মিশরের শেষ শক্তিশালী ফ্যারাও ছিলেন তৃতীয় রামেসিস (খ্রি.পূ. ১১৯৮ থেকে খ্রি.পূ. ১১৬৭)। তাঁর পরবর্তীকালে মিশরে কুসংস্কার ও পুরোহিত শ্রেণির ক্ষমতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • (২) এরপর বহিরাগত শত্রুরা বারংবার মিশরে হানা দেয়। লিবিয়ার বর্বর জাতি খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ অব্দের পরবর্তী প্রায় ২০০ বছর মিশরে আধিপত্য চালায়।
  • (৩) এরপর কিছুকাল আসিরীয়রা (খ্রি.পূ. ৬৭০ থেকে খ্রি.পূ. ৬৬২ অব্দ) এবং কিছুকাল পারসিকরা (খ্রি.পূ. ৫২৫ অব্দ থেকে) মিশরকে পদানত করে রাখে।
  • (৪) এরপর ম্যাসিডনিয়ার গ্রিক বীর আলেকজান্ডার মিশর জয় (থ্রি.পূ. ৩৩২ অব্দ) করেন। গ্রিকদের পর মিশর রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। এভাবে মিশরের গৌরব ক্রমে ম্লান হয়ে যায়।

উপসংহার :- প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে মিশরীয় সভ্যতা ছিল অন্যতম। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সভ্যতা এবং নব নব আবিষ্কারে মিশর ছিল বিশ্বসভ্যতায় অগ্রগামী।

(FAQ) মিশরীয় সভ্যতা হতে জিজ্ঞাস্য ?

১. মিশরীয় সভ্যতা কোন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?

নীলনদ।

২. মিশরীয় সভ্যতা কোন যুগের সভ্যতা?

তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের।

৩. মিশরকে নীলনদের দান বলেছেন কে?

গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস।

৪. মিশরীয় সভ্যতা কত বছরের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল?

২৫০০

Leave a Reply

Translate »