সুমেরীয় সভ্যতা

আজ সুমেরীয় সভ্যতা -র আবিষ্কার, প্রাচীনত্ব, অধিবাসী, নগর পরিকল্পনা ও নগর জীবন, অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, ধর্মবিশ্বাস এবং সভ্যতার অবসান সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

সুমেরীয় সভ্যতা

পরিচিতিপ্রাচীন নদীমাতৃক সভ্যতা
সময়কালআনুমানিক ৪০০০-২০০০ খ্রিস্টপূর্ব
অবস্থানইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর তীরে
উল্লেযোগ্য অবদানকিউনিফর্ম লিপির ব্যবহার, জলঘড়ি ও চন্দ্র পঞ্জিকা আবিষ্কার
সুমেরীয় সভ্যতা

ভূমিকা :- এশিয়া মহাদেশের পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত বর্তমান ইরাক দেশটি প্রাচীন কালে মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিত ছিল। গ্রিক ভাষায় ‘মেসোপটেমিয়া’ শব্দের অর্থ হল ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী দেশ’।

মেসোপটেমীয় সভ্যতা

প্রাচীন কালে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নামে দুটি নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন সুউন্নত মেসোপটেমিয়া সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, পূর্বে সমগ্র পৃথিবী যখন জলমগ্ন ছিল তখন ইউফ্রেটিস নদীর পলি সঞ্চিত হয়ে এখানকার উচ্চভূমি গড়ে উঠেছিল।

সুমেরীয় সভ্যতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম এই নদীমাতৃক সভ্যতার উত্তর অংশ আসিরিয়া এবং দক্ষিণ (বা দক্ষিণ-পূর্ব) অংশ ব্যাবিলনিয়া নামে পরিচিত। ব্যাবিলনিয়ার উত্তরাংশের উচ্চ অংশ আক্কাদ এবং নিম্ন অংশ সুমের নামে পরিচিত ছিল। সুমেরকে কেন্দ্র করে প্রাচীন কালে মেসোপটেমীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে একে সুমেরীয় সভ্যতা নামেও অভিহিত করা হয়।

নদীমাতৃক সভ্যতা

মিশরীয় সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা, হরপ্পা সভ্যতা প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতা গুলির মতো সুমেরীয় সভ্যতাও ছিল নদীমাতৃক সভ্যতা।

মিল

পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত সুমেরীয় সভ্যতার সাথে আফ্রিকার মিশরীয় সভ্যতার অনেক মিল রয়েছে। নব্যপ্রস্তর যুগ পার হয়ে তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগেই উভয় সভ্যতার সৃষ্টি হয়।

আবিষ্কার

প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মেসোপটেমিয়ার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সুমেরীয় সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল।

  • (১) এখানে ছোটো ছোটো পাহাড়ের মতো বহু উঁচু ঢিপি দেখা যায়। এগুলি ‘টেল’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন টেল-এ খননকার্য চালিয়ে প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে।
  • (২) এই সব প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, সুদূর অতীতে এখানে চাষের কাজে মানুষ কোদাল ব্যবহার করত।
  • (৩) নগরজীবন, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সুমেরীয়রা যথেষ্ট অগ্রগতির পরিচয় দিয়েছিল।

প্রাচীনত্ব

আনুমানিক ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ আজ থেকে ৬০০০ বছর পূর্বে মেসোপটেমিয়ার নিম্ন অংশ সুমের অঞ্চলে সর্বপ্রথম মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা

এই সভ্যতা হল তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা। এখানাকার এরিডু শহরটি অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ৩,৫০০ অব্দে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

হেরোডোটাসের আগমন

বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস আনুমানিক ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়া ভ্রমণে আসেন। কিন্তু এই সভ্যতা সম্পর্কে তিনি কোনো বিবরণ দিয়ে যাননি।

অধিবাসী

সুমেরীয় সভ্যতার অধিবাসীরা মধ্য এশিয়ার পার্বত্য পথ অতিক্রম করে এখানে এসেছিল এবং এখানকার আদিম অধিবাসীদের পরাজিত করে সুমেরীয়রা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে অনেকে মনে করেন।

সভ্যতার আদি অবস্থা

সুদূর অতীতে সুমেরিয়া অঞ্চল ছিল জলাভূমি এবং জঙ্গলাকীর্ণ। পরবর্তীকালে এখানকার অধিবাসীরা ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে উঁচু স্থানগুলিতে বসতি গড়ে তোলে। ক্রমে এখানে বিভিন্ন নগরের প্রতিষ্ঠা হয়।

নগর পরিকল্পনা ও নগরজীবন

এখানকার প্রতিটি নগরকে কেন্দ্র করে স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রীয় জীবনে এই সভ্যতার মানুষ বিশেষ দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও উন্নত রুচিশীলতার পরিচয় দিয়েছিল।

(১) নির্মাণ পরিকল্পনা

সুমেরীয় সভ্যতায় বিভিন্ন নগর ও জনপদ গড়ে উঠেছিল।

  • (ক) নগর ও জনপদগুলি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে নির্মিত হত। এক একটি জনপদে অসংখ্য বাড়ি, মন্দির ও রাস্তাঘাট নির্মিত হত।
  • (খ) উর, উরক, লাগাস, কিশ, এরিডু, আক্কাদ প্রভৃতি শহরে খননকার্যের দ্বারা সুপ্রাচীন এই সভ্যতার নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেছে।
  • (গ) খননকার্যের ফলে এখানকার বেশ কিছু প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, মন্দির, মূর্তি, মৃৎপাত্র প্রভৃতির ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে।

(২) নগরের নিরাপত্তা

সুমেরের বিভিন্ন নগরের মধ্যে সর্বদাই সংঘর্ষ চলত। এজন্য বহিরাক্রমণ থেকে নগরীকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে নগরীগুলি উঁচু প্রাচীর ও চওড়া খাল দিয়ে ঘিরে সুরক্ষিত করা হত। সৈন্যবাহিনী সর্বদা নগরের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পাহারায় নিযুক্ত থাকত।

(৩) ঘরবাড়ি

  • (ক) সুমেরীয় অঞ্চলে পাথর বা কাঠের জোগান কম থাকায় ঘরবাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে ইটের ব্যবহার বেশি ছিল। সুমেরিয়ার অধিবাসীরাই ইট তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক ছিলেন বলে মনে করা হয়।
  • (খ) সুমেরীয় সভ্যতার অধিকাংশ ঘরবাড়ি তৈরি হত পোড়া ইট বা রোদে শুকানো ইট দিয়ে। বন্যার হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনে পোড়া ইটের বাড়ি নির্মিত হত।
  • (গ) সাধারণ বাসগৃহ এবং বিশাল অট্টালিকা উভয়ই ইট দিয়ে তৈরি হত। বড়ো অট্টালিকাগুলিতে গম্বুজ ও খিলানের ব্যবহার করা হত। সুমেরবাসী একতল ও দ্বিতল উভয় ধরনের গৃহ নির্মাণ করত।

(৪) রাস্তাঘাট

সুমেরীয় সভ্যতার রাস্তাঘাটগুলি ছিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এগুলি ইট দিয়ে বাঁধানো থাকত। তবে অধিকাংশ রাস্তাই ছিল সরু। রাস্তার ধারে বাড়িগুলির ব্যবধানও বিশেষ থাকত না। তা ছাড়া সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার মতো রাস্তার ধারে সুপরিকল্পিত পয়ঃপ্রণালী ছিল না।

(৫) শাসন পরিচালনা

সুমেরিয়ায় যুদ্ধবাদী রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

  • (ক) পছন্দমতো বিভিন্ন অভিজাতদের নিয়ে গঠিত কাউন্সিলের হাতে রাজা প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছিলেন। রাজা বা পুরোহিত শ্রেণি সুমেরীয় নগরগুলির প্রশাসন পরিচালনা করত।
  • (খ) পরিচালনার কাজে তারা বিভিন্ন আমলা, সেনাপতি, প্রহরি, জল্লাদ প্রভৃতির সহায়তা নিত।
  • (গ) শাসনব্যবস্থায় দমন-পীড়ন, অন্য নগরী আক্রমণ, পরাজিত যুদ্ধবন্দিদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় প্রভৃতি ছিল সাধারণ বিষয়।

(৬) নাগরিক স্বাধীনতা

সুমেরিয়ায় বিভিন্ন মন্দিরকে কেন্দ্র করে পৃথক পৃথক মানব-সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী গড়ে উঠত। পুরোহিত, আমলা, কারিগর, মৎসজীবী প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার মানুষ নিয়ে গঠিত সুমেরীয়ার নগরগুলি ছিল যথেষ্ট নিরাপদ ও সুশাসিত। এর ফলে এখানে নাগরিকরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ পেয়েছিল।

(৭) কৃষি

সুমেরীয় সভ্যতায় কৃষির যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছিল। নদীর উপকূলবর্তী উর্বর জমিতে প্রচুর কৃষি উৎপাদন সম্ভব হয়েছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুমেরীয়দের একটি গোষ্ঠী নতুন উর্বর কৃষিজমির সন্ধানে অগ্রসর হয় মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে হাজির হয়েছিল।

বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা

সুমেরীয় সভ্যতায় বসবাসকারী মানুষরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখিয়েছিল। তাম্র-ব্রোঞ্জ যুগে গড়ে ওঠা এই সভ্যতায় কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে অগ্ৰগতি ঘটেছিল।

(১) কৃষি

সুমেরের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ।

  • (ক) কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে তারা অরণ্য ও বনজ পরিষ্কার করেছিল এবং নদীতে বাঁধ দিয়ে সেখান থেকে বড়ো খাল কেটে কৃষিজমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করেছিল।
  • (খ) তারা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর অঞ্চলে চাষবাদ করে প্রচুর ফসল ফলাত।
  • (গ) তাদের উৎপাদিত প্রধান ফসল ছিল গম ও যব। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষও হত।

(২) খেজুর গাছের গুরুত্ব

  • (ক) সুমের অঞ্চলে প্রচুর খেজুর গাছ জন্মাত। সুমেরের মানুষ তাদের বাড়ির চারপাশেও প্রচুর খেজুর গাছ লাগাত।
  • (খ) সুমেরীয়দের খাদ্যের চাহিদা অনেকটা মেটাত এই খেজুর। এজন্য তারা খেজুর গাছকে ‘জীবন বৃক্ষ’ বলত।
  • (গ) খেজুর গাছের সুমিষ্ট রস থেকে তারা গুড় এবং তাড়ি জাতীয় মাদক তৈরি করত। খেজুর গাছের পাতা ও আঁটি তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত।
  • (ঘ) ঝুড়ি, দড়ি প্রভৃতি তৈরি করতেও খেজুর গাছের আঁশ ও ছাল ব্যবহার করা হত। এখানকার খেজুর বিদেশে রপ্তানি করে সুমেরবাসী যথেষ্ট লাভবান হত।

(৩) পশুপালন

সুমেরীয় সভ্যতার অধিবাসীদের অপর পুরুত্বপূর্ণ জীবিকা ছিল পশুপালন। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ছিল। এখানে গৃহপালিত গোরু, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশু চরে বেড়াত। পশুর মাংস, দুধ, চামড়া, লোম প্রভৃতি সবই তারা ব্যবহার করত।

(৪) বাণিজ্য

ব্যাবসাবাণিজ্য ছিল সুমেরের অধিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ পেশা। বাণিজ্যের ফলে সুমেরের অধিবাসীদের জীবনে যথেষ্ট সমৃদ্ধি এসেছিল।

(ক) স্থল ও জলপথে বাণিজ্য

এখানকার ব্যবসায়ীরা উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য দূরদূরান্তের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করত। স্থল ও জল উভয় পথেই তারা বাণিজ্য করত। স্থলপথে গোরু, গাধা প্রভৃতি পশুতে টানা গাড়িতে পণ্য পরিবহণ করা হত। জলপথে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীতে পালতোলা নৌকায় করে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহণ করা হত।

(খ) দেশীয় বাণিজ্য

দেশের অভ্যন্তরে উর, ঊরক, কিশ, লাগাস, আহ্লাদ, ব্যাবিলন, এরিড প্রভৃতি নগরের মধ্যে বাণিজ্য চলত।

(গ) বৈদেশিক বাণিজ্য

বৈদেশিক ক্ষেত্রে সিন্ধু, মিশর, পারস্য, আফগানিস্তান, আনাতোলিয়া, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।

(ঘ) আমদানি – রপ্তানি

সুমের থেকে গম, যব, বিভিন্ন ফল, পশমবস্ত্র, কার্পেট, অলংকার প্রভৃতি রপ্তানি হত। আর বিদেশ থেকে আমদানি করা হত দামি পাথর, কাঠ, সোনা, রূপা প্রভৃতি।

(ঙ) বিনিময় মাধ্যম

প্রথমদিকে ব্যাবসাবাণিজ্যের বিনিময়ের মাধ্যম ছিল খাদ্যশস্য। পরে রূপার মুদ্রার প্রচলন হয়।

(৫) অন্যান্য জীবিকা

সুমেরের অধিবাসীদের অনেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত।

  • (ক) বাঁধ নির্মাণ, খাল কাটা, গৃহ নির্মাণ, কুমোরের কাজে অনেক মানুষ নিযুক্ত থাকত।
  • (খ) এ ছাড়া ছিল সৈনিক, রাজকর্মচারী, পুরোহিত প্রভৃতি পেশার মানুষ। দাসরা সম্ভ্রান্ত লোকেদের বাড়িতে কাজ করত।
  • (গ) নদী ও জলাভূমিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছ ধরার কাজেও বহু মানুষ নিযুক্ত ছিল।

(৬) বন্যা প্রতিরোধ

ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীতে দীর্ঘকাল পলি সঞ্চিত হওয়ার ফলে প্রায়ই বন্যা হত। বন্যায় সুমেরীয়দের ঘরবাড়ি ভেসে যেত এবং জমির ফসল নষ্ট হত। তাই বন্যা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে তারা প্রধানত দুটি পদক্ষেপ নিয়েছিল।

(ক) বাঁধ নির্মাণ

সুমেরীয়রা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে বন্যার জল প্রতিরোধ করার চেষ্টা করত।

(খ) খাল খনন

তারা নদী থেকে খাল কেটে নদীর অতিরিক্ত জল বের করে দিয়ে তা কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করত।

(৭) ধর্মবিশ্বাস

সুমেরিয়ার অধিবাসীদের কাছে ধর্মের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

  • (ক) এখানে বহু দেবদেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল। সুমেরের প্রতিটি নগরেই পৃথক নগর-দেবতা ছিলেন।
  • (খ) দেবদেবীদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সমুদ্র ও মাতৃদেবী ‘নাম্মা’, আকাশের দেবতা ‘আন’ বা ‘আনু’, পৃথিবীদেবী ‘কি’, জলের দেবতা ‘এনকি’, বাতাসের দেবতা ‘এনলিস’ প্রমুখ।
  • (গ) সুমেরিয়রা সুউচ্চ স্থানের উপর বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির নির্মাণ করত। এই মন্দিরগুলি ‘জিগুরাত’ অর্থাৎ স্বর্গের পাহাড় নামে পরিচিত ছিল।

সভ্যতা ও সংস্কৃতি উৎকর্ষ

সুমেরীয় সভ্যতার অধিবাসীরা শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি ঘটিয়েছিল।

(১) চিত্রলিপি

  • (ক) সুমেরীয়দের মধ্যে বিদ্যাচর্চার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। সুমেরীয়রাই সর্বপ্রথম লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল বলে পন্ডিতগণ মনে করেন।
  • (খ) লিখন পদ্ধতির প্রচলনকে সভ্যতার ভ্রূণকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই হিসেবে সুমেরীয় সভ্যতাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা বলে মনে করা যেতে পারে।
  • (গ) প্রথমদিকে তারা বিভিন্ন ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করত এবং বিদ্যার আদান-প্রদান করত। এই লিপি চিত্রলিপি বা পিকটোগ্রাফি নামে পরিচিত। তাদের চিত্রলিপি বহু দূরবর্তী এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

(২) কিউনিফর্ম লিপি

সুমেরীয়দের লিপির নাম ছিল কিউনিফর্ম লিপি।

(ক) লিপির বিবর্তন

সুমেরীয়দের প্রথমদিকের চিত্রলিপি নানা বিবর্তনের মাধ্যমে পরবর্তীকালে আরও উন্নত হয়। এই সময় সুমেরীয়রা কাদামাটির মণ্ড তৈরি করে তাতে তিরের ফলার মতো কোনো বস্তুর অগ্রভাগ দিয়ে লিখত এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে তা শক্ত করে নিত। সুমেরীয়দের এই লিপি ‘কিউনিফর্ম লিপি’ নামে পরিচিত।

(খ) লিপির ব্যবহার

এই লিপির সাহায্যেই সুমেরীয়রা চিঠিপত্র লিখত, হিসাবপত্র লিখে রাখত এবং সাল-তারিখ বা ঋতুপরিবর্তন সংক্রান্ত কাজকর্ম করত।

(গ) লিখন পদ্ধতি

প্রথম প্রথম ডানদিক থেকে বামদিকে এই লিপি লেখা হত। পরবর্তীকালে বামদিক থেকে ডানদিকে লেখার পদ্ধতি প্রচলিত হয়।

(ঘ) পাঠোদ্ধার

স্যার হেনরি ক্রেসউইক রোলিনসন দীর্ঘ ১২ বছর কঠোর পরিশ্রমের পর ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে এই লিপির পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন।

(৩) গ্ৰন্থাগার

সুমেরের একটি প্রাচীন শহর নিপুর -এর একটি মন্দিরে খননকার্য চালাতে গিয়ে এর অভ্যন্তরে একটি প্রাচীন গ্রন্থাগারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখানে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা অন্তত পঞ্চাশ হাজার পোড়া মাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে। নিকটবর্তী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই গ্রন্থাগার ব্যবহার করত বলে অনুমান করা হয়।

(৪) সাহিত্য

প্রাচীন সুমেরে সাহিত্য ক্ষেত্রেও অগ্রগতি ঘটেছিল।

(ক) গিলগামেশ মহাকাব্য

সুমেরীয়রা ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি কোনো সময়ে পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্য ও মহাকাব্য গিলগামেশ রচনা করেছিল। এর বিষয়বস্তু হল আনুমানিক ২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ঊরুকের সুমেরীয় রাজা গিলগামেশের বীরত্ব, আন্তরিক ও ব্যর্থতার কাহিনি।

(খ) ধর্ম-সাহিত্য

সুমেরীয় সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল ধর্মকেন্দ্রিক। পুরাণগুলিও এই সভ্যতার মূল্যবান সাহিত্যকর্ম। এগুলিতে সৃষ্টিকর্তা ও মহাপ্লাবন সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।

(গ) রাজকাহিনি

এ ছাড়া বিভিন্ন রাজার জীবনকাহিনি এবং দেবতাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়েও সাহিত্য রচিত হত।

(৫) স্থাপত্য ও চিত্রকলা

স্থাপত্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রেও সুমেরীয়রা পারদর্শী ছিল।

(ক) অট্টালিকা নির্মাণ

আগুনে পোড়ানো বা রোদে শুকানো ইটের ব্যবহার করে সুমেরীয়রা বিশালাকার অট্টালিকা নির্মাণ করত। দেবতাদের বিগ্ৰহ প্রতিষ্ঠা করতে তারা মাটি দিয়ে সুউচ্চ কৃত্রিম পাহাড় ও মিনার নির্মাণ করাত। এগুলিকে জিগুরাত বা ‘স্বর্গের পাহাড়’ বলা হত। পরবর্তীকালে সুমেরবাসী কাঠ এবং পাথরের কিছু কিছু বাড়ি তৈরি করেছিল।

(খ) চিত্রাঙ্কন

সুমেরীয় সভ্যতায় বাড়ি এবং মন্দিরের দেওয়ালগুলি মাটির প্রলেপ দিয়ে প্লাস্টার করা হত। এই দেওয়ালে শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের চিত্র অঙ্কন করত। চিত্রকলার মধ্যে প্রধান ছিল জীবজন্তু, গাছপালা প্রভৃতি। বাণিজ্যের প্রয়োজনে পাথরের সিলমোহর তৈরি করা হত।

(৬) শিল্প

সুমেরীয়রা বিভিন্ন শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছিল। সুমেরীয়দের প্রধান প্রধান শিল্পগুলি হল –

(ক) মৃৎশিল্প

শিল্পের মধ্যে অন্যতম ছিল মৃৎশিল্প। পোড়া মাটির (টেরাকোটা) বিভিন্ন ধরনের অলংকার, প্রতিদিনের ব্যবহার্য পাত্র, খেলনা প্রভৃতি তৈরিতে তারা পারদর্শিতা দেখিয়েছিল।

(খ) বস্ত্রশিল্প

শণের আঁশ দিয়ে সুমেরের তাঁতিরা বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র উৎপাদন করতে শিখেছিল।

(গ) ধাতুশিল্প

প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে সম্ভবত সুমেরেই সর্বপ্রথম ধাতুর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। প্রথমদিকে তামা, ব্রোঞ্জ, দস্তা এবং পরবর্তীকালে সোনা, রূপো প্রভৃতি ধাতু ব্যবহারে অধিবাসীদের দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। খননকার্য চালিয়ে এই সভ্যতায় ধাতুর তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র, গৃহস্থালির সরঞ্জাম, সোনা-রুপোর অলংকার প্রভৃতি পাওয়া গেছে।

(৭) সমাজ

সুমেরীয় সভ্যতায় মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে উঠেছিল।

  • (ক) পুরোহিত, কারিগর বণিক, জেলে, মালি ও অন্যান্য পেশার বিভিন্ন মানুষ এই মন্দির-সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হত।
  • (খ) উৎপাদনের ১/৩ অ থেকে ১/% আশ সমাজের মানুষ রাজস্ব হিসেব দিত।
  • (গ) সুমেরীয় সমাজে লুগাস নামে ভূস্বামীদের উপম ঘটেছিল।

(৮) আইন

প্রাচীন সুমেরীয় সমাজে উন্নত আইন বিধি প্রচলিত ছিল। সুমেরীয় রাজা দুঙ্গি সুমেনের প্রাচীন আইনগুলি সংকলন করেছিলেন।

(ক) আইনের বিষয়

মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা উভয়ই এই আইনবিধির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। অপরাধ সম্পত্তির উত্তরাধিকার, জিনিসপত্র ক্রয়বিক্রয়, বাণিজ্য, চুক্তি সম্পাদন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রচিত হয়েছিল।

(খ) দণ্ড

আইন অনুসারে, অপরাধীকে তার অপরাধের সমান শাস্তি পেতে হত। তবে বিচারে সবার জন্য সমান শাস্তির ব্যবস্থা ছিল না, যেমন—কোনো ক্রীতদাস হত্যা চেয়ে কোনো অভিজাতকে হত্যা করলে বেশি শাস্তি হত।

(গ) আইনের প্রসার

সুমেরীয় আইনের অনুকরণে আসিরীয়, ব্যাবিলনীয় প্রভৃতি সভ্যতায়ও আইনবিধি রচিত হয়েছিল। ব্যাবিলনের সম্রাট হামুবাবি রচিত আইনবিধিতে সুমেরীয় আইনের সর্বাধিক প্রভাব পড়েছিল।

(৯) বিজ্ঞানে অগ্রপতি

সুমেরীয়রা বিজ্ঞানের কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটিয়েছিল।

(ক) চাকার ব্যবহার

সুমেরীয়রা চাকার ব্যবহার করে গাড়ি ও রথের প্রচলন করেছিল।

(খ) গণিত

তারা বিভিন্ন গাণিতিক সংখ্যা ব্যবহার করত এবং যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, এমনকি বর্গমূল এবং ঘনমূলের গাণিতিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। তারা গণিতের পদ্ধতি ব্যবহার হিসাবনিকাশ করত।

(গ) জ্যোতির্বিদ্যা

জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করে তারা জ্যোতিষ গণনা করত এবং জলঘড়ির সাহায্যে সময় নিরূপণ করত। চাঁদের আবর্তনের ভিত্তিতে তারা চান্দ্রমাসের প্রচলন করেছিল। সাল গণনা এবং ঋতুপরিবর্তন সম্পর্কেও তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞত ছিল।

(ঘ) চিকিৎসাবিদ্যা

বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় তারা প্রয়োজনীয় ঔষধ ব্যবহার করত।

সভ্যতার অবসান

দীর্ঘকাল ধরে বিকাশলাভ করার পর সুমেরীয় সভ্যতাও কালের নিয়মে একদা পতনের দিকে এগিয়ে যায়। আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে পাহাড়ি এলাকা থেকে আগত এলামীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এখানকার ঊর নগরী ধ্বসে করে। এরপর দ্রুত এই সভ্যতার পতন ঘটে।

উপসংহার :- জলঘড়ি, চন্দ্র পঞ্জিকার আবিষ্কার, গুণ ও ভাগ করার পদ্ধতি, ওজন ও পরিমাপ প্রবর্তন বিশ্বসভ্যতায় সুমেরীয়দের স্মরণীয় করে রেখেছে।

(FAQ) সুমেরীয় সভ্যতা হতে জিজ্ঞাস্য ?

১. সুমেরীয় সভ্যতা কোন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?

ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস।

২. সুমেরীয় লিপির নাম কি?

কিউনিফর্ম লিপি।

৩. সুমেরীয় ধর্ম মন্দিরের নাম কি ছিল?

জিগুরাত অর্থ স্বর্গের পাহাড়।

Leave a Reply

Translate »