নব্য প্রস্তর যুগ

নব্য প্রস্তর যুগ -এর সময়কাল, ভারতে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা, হাতিয়ার, কৃষির সূচনা, পশুপালন, উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

নব্যপ্রস্তর যুগ প্রসঙ্গে প্রস্তর যুগের সংজ্ঞা, প্রস্তর যুগের শ্রেণীবিভাগ, নব্যপ্রস্তর যুগ কাকে বলে, নব্যপ্রস্তর যুগের সময়কাল, ভারতে নব্যপ্রস্তর যুগের সূচনা, নব্যপ্রস্তর যুগের হাতিয়ার, নব্যপ্রস্তর যুগে কৃষির সূচনা, নব্যপ্রস্তর যুগের পশুপালন, নব্যপ্রস্তর যুগে স্থায়ী বসতি নির্মাণ, নব্যপ্রস্তর যুগের অগ্ৰগতি, নব্যপ্রস্তর যুগ সম্পর্কে গর্ডন চাইল্ডের মত, নব্যপ্রস্তর যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা, নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লব, নব্যপ্রস্তর যুগের অর্থনৈতিক জীবন, নব্যপ্রস্তর যুগের গুরুত্ব ও নব্যপ্রস্তর যুগের কেন্দ্র।

ইতিহাসে নব্য প্রস্তর যুগ

বিষয়নব্য প্রস্তর যুগ
সময়কালআনুমানিক ১০০০০ – ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব
ভারতে সূচনা আনুমানিক ৬০০০ খ্রিস্টপূর্ব
উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারচাকা
প্রামাণ্য স্থানভারত -এর মেহেরগড় সভ্যতা
নব্য প্রস্তর যুগ

ভূমিকা :- মানব ইতিহাসের প্রাচীন যুগকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- প্রাগৈতিহাসিক যুগপ্রায় ঐতিহাসিক যুগ এবং ঐতিহাসিক যুগ। আর প্রাগৈতিহাসিক যুগের তিনটি ভাগের অন্যতম হল নব্য প্রস্তর যুগ।

প্রস্তর যুগ

সাধারণ ভাবে বলা হয় যে, যখন থেকে  মানুষ বিভিন্ন ধরনের পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করে খাদ্য সংগ্রহ করত শুরু করে সেই সময়কালকে প্রস্তর যুগ বলা হয়।

প্রস্তর যুগের শ্রেনীবিভাগ

বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্ববিদ পাথরে নির্মিত হাতিয়ারের ক্রমোন্নতি লক্ষ্য করে প্রস্তর যুগকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন –

নব্য প্রস্তর যুগ

পাথরের যুগের শেষ পর্যায় নতুন পাথরের যুগ বা নব্যপ্রস্তরযুগ নামে পরিচিত।

নব্য প্রস্তর যুগের সময়কাল

মধ্য প্রস্তর যুগের পরবর্তী নব্য প্রস্তর যুগের কালসীমা হল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ।

ভারতে নব্যপ্রস্তরযুগের সূচনা

ভারতে এই যুগের সূচনা হয় দেরিতে, ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বালুচিস্তানের মেহেরগড়ে ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তার কিছু আগে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা হয় বলে ঐতিহাসিক ডি. পি. আগরওয়াল অভিমত দিয়েছেন।

নব্য প্রস্তর যুগের হাতিয়ার

এই যুগের হাতিয়ারগুলিতে ধারাবাহিক বিবর্তনের ছাপ সুস্পষ্ট।

  • (১) হাতিয়ারগুলি এই সময় যথেষ্ট তীক্ষ্ণ, মসৃণ ও উন্নত হয়ে ওঠে।
  • (২) এই যুগে মাটি খুঁড়ে বীজ বপন বা আগাছা পরিষ্কারের জন্য নতুন ধরনের যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন ঘটে।
  • (৩) ফসল কাটার জন্য এই সময় তৈরি হয় কাস্তে। এছাড়া কুলো, হামানদিস্তা, শিলনোড়া, জাঁতা, হাতুড়ি, বাটালি, নেহাই প্রভৃতি যন্ত্রপাতির উদ্ভব এই যুগেই হয়।
  • (৪) এই যুগে প্রাচীন প্রস্তর যুগের হাত-কুঠারের অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। এই সময় কুঠারের সামনের দিকটি অনেক বেশি তীক্ষ্ণ এবং কাঠের হাতলযুক্ত হয়।
  • (৫) জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকাজ ও পশুশিকারের জন্য উন্নত হাতিয়ারে প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পায়।
নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির সূচনা
  • (১) নব্য প্রস্তর যুগের মানুষ কৃষিকাজের কৌশল আবিষ্কার করে এবং স্থায়ীভাবে এক জায়গায় বসবাস শুরু করে।
  • (২) খাদ্যসংগ্রহকারী থেকে এই যুগে মানুষ খাদ্য উৎপাদনকারীতে পরিণত হয়।
  • (৩) পূর্বে খাদ্য ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা না থাকায় প্রকৃতিতে মানুষ ছিল বড়োই অসহায়। কিন্তু নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির আবিষ্কারের ফলে মানুষের সেই অনিশ্চয়তা দূর হয়।
নব্যপ্রস্তরযুগের পশুপালন

নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ কৃষির প্রয়োজনে পশুপালন করতে শুরু করে।

  • (১) পশুকে কৃষিজমিতে কাজে লাগিয়ে কৃষি উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়।
  • (২) পরিবহণের কাজেও পোষ মানানো পশুকে কাজে লাগানো শুরু হয়।
  • (৩) এই সময় দক্ষিণ এশিয়ায় হাতি ও মহিষকে এবং জর্ডনে কুকুর ও ছাগলকে প্রতিপালন করা শুরু হয়।
নব্য প্রস্তর যুগে স্থায়ী বসতি নির্মাণ
  • (১) নব্য প্রস্তর যুগে কৃষির আবিষ্কারের ফলে মানুষ নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ফলে মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে।
  • (২) এই সময় বন্যপশুর দ্বার আক্রান্ত হওয়ার ভয় মানুষের অনেকটা কমে যায়। তারা এই যুগের শেষদিকে কুটির বা গৃহনির্মাণ করতে শুরু করে।
  • (৩) কুটির তৈরির জন্য তারা গাছের ডালপালা, লতাপাতা, ঘাস প্রভৃতি ব্যবহার করত।
  • (৪) এই বসতি অঞ্চল ক্রমে গ্রামে পরিণত হয়। কোথাও কোথাও এই গ্রামগুলিকে কেন্দ্র করে নগর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নব্য প্রস্তর যুগে অন্যান্য অগ্রগতি
  • (১) কৃষির আবিষ্কারের ফলে নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান করতে সক্ষম হলে তাদের খাদ্যের জন্য আর বিশেষ চিন্তা করতে হত না।
  • (২) এর ফলে অবসরকালে মানুষ নিজেদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দিকে অগ্ৰগতির সুযোগ পায়।
  • (৩) এই সময় মানুষ আগুনের নানাবিধ ব্যবহার, চাকার ব্যবহার, মুৎশিল্প, বয়নশিল্প, যানবাহন তৈরি, নৌকায় পাল খাটানো, গৃহনির্মাণ, পাথর সাজিয়ে ‘ডোলমেন’ নামে সমাধি নির্মাণ প্রভৃতি করতে শেখে। এ যুগের শেষদিকে ধাতুর ব্যবহার শুরু হয়।
  • (৪) এক কথায়, নব্যপ্রস্তর যুগের স্থায়িত্বকাল পুরাতন প্রস্তর যুগের তুলনায় অনেক কম হলেও নব্য প্রস্তর যুগের অগ্রগতি ও প্রাপ্তি ছিল অনেক বেশি।
নব্যপ্রস্তরযুগ সম্পর্কে গর্ডন চাইল্ডের মত

এই যুগে কুষিসহ বিভিন্ন বিষয়ে যেসব অগ্রগতি লক্ষ করা গিয়েছিল সেগুলির গভীর বিশ্লেষণ করে বিখ্যাত ঐতিহাসিক গর্ডন চাইল্ড সেগুলিকে সেই সময়ের মানুষের অগ্রগতির স্বাভাবিক ধারা বলে মানতে পারেননি।

নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব

পূর্ববর্তী যুগগুলির তুলনায় অনেক কম সময়ে নব্যপ্রস্তর যুগে যে অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছিল তাকে ঐতিহাসিক গর্ডন চাইল্ড ‘নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছেন।

নব্য প্রস্তর যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা
  • (১) নগর সভ্যতা গড়ে ওঠার পূর্বে পৃথিবীতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
  • (২) পূর্বে মানুষের যাযাবরবৃত্তির জন্য কোনো গোষ্ঠীর নেতার পদটি সর্বদা স্বল্পস্থায়ী হত। কিন্তু নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ যাযাবর জীবন থেকে নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুললে কোনো গোষ্ঠীর নেতা বা দলপতির পদটি স্থায়িত্ব লাভ করে।
  • (৩) উর্বর কৃষিজমি দখল ও অন্যান্য কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হত। সংঘর্ষে জয়লাভের প্রয়োজনে দলনেতারা তাদের গোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন নিয়মকানুন চাপিয়ে দিতেন।
  • (৪) এই ভাবে একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। নব্য প্রস্তর যুগেই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার একটি পটভূমি তৈরি হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
নব্যপ্রস্তরযুগের অর্থনৈতিক জীবন
  • (১) নব্য প্রস্তর যুগের মানুষের অর্থনীতির ভিত্তি ছিল কৃষি ও পশুপালন।
  • (২) হাতিয়ারের উন্নতির ফলে এই সময় কৃষি উৎপাদন যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজে বিনিময় প্রথার প্রচলন ঘটে।
  • (৩) সমাজে ক্রমে শ্রম বিভাজনের সূত্রপাত ঘটে। পুরুষ ও নারীর মধ্যেই প্রথম এই শ্রমবিভাজন দেখা দেয়।
  • (৪) পুরুষদের কাজ ছিল হাতিয়ার তৈরি, শিকার, পশুপালন ও ঘরবাড়ি তৈরি। অন্যদিকে নারীদের কাজ গৃহকাজ, সন্তান পালন, কৃষিকাজ, বস্ত্র উৎপাদন, মৃৎপাত্র তৈরি, ঝুড়ি তৈরি প্রভৃতি।
নব্য প্রস্তর যুগের অস্তিত্বের নিদর্শন

ভারতের মেহেরগড় সভ্যতা নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এছাড়া ইরাকের জারমো ও হাসুনা, জর্ডনের জেরিকো, দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া, পাকিস্তান -এর অন্তর্গত বালুচিস্তান, ভারতের বিহার, ওড়িশা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন স্থানে নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির বিভিন্ন নিদর্শন মিলেছে।

নব্য প্রস্তর যুগের গুরুত্ব

প্রাচীন যুগের ইতিহাসে নব্য প্রস্তর যুগের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

(১) হাতিয়ারের অগ্রগতি

এই যুগে হাতিয়ারগুলির অভাবনীয় উন্নতি সম্ভব হয়। হাতিয়ারগুলির কার্যকারিতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

(২) কৃষির উন্নতি

নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ চাষবাস করতে শেখে। ফলে মানুষের জীবনধারার যথেষ্ট উন্নতি সম্ভব হয়।

(৩) পশুপালন

এই যুগে মানুষ বিভিন্ন পশুকে পোষ মানানোতে আরও দক্ষ হয় এবং তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শেখে।

(৪) যোগাযোগ ব্যবস্থা

নব্য প্রস্তর যুগে মানুষ স্থল ও জলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটায়।

(৫) প্রযুক্তির অগ্রগতি

কৃষি ও পশুপালনের মাধ্যমে নব্য প্রস্তর যুগে যে সচ্ছলতা আসে তার ফলে নতুন নতুন আবিষ্কার সম্ভব হয়। যেমন — গৃহনির্মাণ, চাকা তৈরি, নৌকা তৈরি, লাঙল তৈরি প্রভৃতি।

(৬) উপজাতীয় সমাজ

এই যুগে মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে উপজাতীয় সমাজ গড়ে তোলে। সামাজিক সংগঠন হিসেবে এই সময় পরিবারের উদ্ভব ঘটে। এই সমাজে পেশাভিত্তিক বিভিন্ন শ্রেণিরও উদ্ভব ঘটে।

(৭) ভাষার বিকাশ

নব্য প্রস্তর যুগে মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক ও বিনিময় প্রথার ব্যাপকতার ফলে ভাব-বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ক্রমে ভাষার উন্নতি ঘটে।

(৮) শিল্পকলা

এই যুগে বিভিন্ন প্রতীক চিহ্নের সাহায্যে চিত্রাঙ্কন করা হত। এগুলি লিখন পদ্ধতির আবিষ্কারের প্রাথমিক প্রয়াস বলে মনে করা হয়। এই সময় বিভিন্ন মৃৎপাত্রের গায়ে অলংকরণও করা হত।

উপসংহার :- বর্তমান সভ্যতাকে আমরা জ্ঞান, শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এসবের মাপকাঠিতে যেমন করে সংজ্ঞায়ন করি, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই নব্য প্রস্তর যুগের হাত ধরেই।

(FAQ) নব্য প্রস্তর যুগ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. নব্য প্রস্তর যুগের প্রধান আবিষ্কার কি?

চাকা।

২. নব্য প্রস্তর যুগের বিপ্লব কথাটি কে ব্যবহার করেন?

ঐতিহাসিক গর্ডন চাইল্ড।

৩. নব্য প্রস্তর যুগের একটি কেন্দ্রের নাম লেখ।

ভারতের মেহেরগড় সংস্কৃতি।

Leave a Comment